দেবব্রত মণ্ডল
২০০০ সাল। মুক্তি পেল রাকেশ রোশন পরিচালিত ছবি কহো না প্যায়ার হ্যায়। রোম্যান্টিক ছবির ভক্ত দর্শকরা নবাগত জুটি ঋত্বিক রোশন আর অমীশা প্যাটেলকে মাথায় তুলে নিয়েছিলেন। সেইসময় ছবিটি তৈরি করতে খরচ হয়েছিল দশ কোটি টাকা, আর বিশ্বব্যাপী আয় করেছিল ৮০ কোটি টাকার বেশি। এরপর কেটে গেছে পঁচিশটা বছর। এই ২৫ বছরে বলিউডে বহু উত্থান পতন ঘটেছে। গত ১৮ জুলাই মুক্তি পেয়েছে সইয়ারা। মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে ফের ঝড় উঠেছে। কহো না প্যায়ার হ্যায়-এর মত এই ছবিরও নায়ক-নায়িকা দুই নবাগত – অহন পাণ্ডে আর অনীত পাড্ডা। এই লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার সময়ে মিন্ট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দশ দিনে সইয়ারা প্রায় ২৫০ কোটি টাকার ব্যবসা করে ফেলেছে। ইতিমধ্যেই ছাওয়া-র পরে ২০২৫ সালের দ্বিতীয় বৃহত্তম হিট হয়ে উঠেছে এই প্রেমের ছবিটি। কোনো নবাগত জুটির ছবির এত দর্শক টানার ঘটনাও গত এক-দেড় দশকের বলিউডে বারবার হয়নি।
কী আছে এই ছবিতে? বাণী আর কৃষের গল্প কি খুব নতুন কিছু? তা তো নয়। কৃষ একজন গায়ক। সব গায়কের মতই তারও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তার স্বভাবটি রুক্ষ। বাণী ঠিক তার উলটো। সে সুন্দর, শান্ত। এই বাণীরই প্রেমে পড়ে কৃষ। তারপর কী হল? জানতে গেলে দেখতে হবে মোহিত সুরি পরিচালিত এই ছবি। কিন্তু এমন ছবি তো আগেও হয়েছে। ‘অ্যাংরি ইয়াংম্যান’-এর সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করছে বাণীর মত নরম মনের মেয়ে। এই গল্প তো নতুন বোতলে পুরনো মদ। তবু কেন দর্শকদের পছন্দ হচ্ছে এই ছবি?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আসলে পরিচালক মোহিত নিপুণভাবে দর্শকদের আবেগ ছুঁয়ে যেতে পেরেছেন। সইয়ারা দুরন্ত ভালবাসার গল্প। বাণীকে দেখে কৃষের মনে বসন্তদিনের আনাগোনা শুরু, তারপর আঙুলে আঙুল, ঠোঁটে ঠোঁট – শুরু হয় প্রেমের কাব্য। এই প্রেম যেন আমাদের কাছে চেনা হয়েও অচেনা। কিন্তু কেন? আসলে আজকালকার ইঁদুর দৌড়ে আলগা হচ্ছে সম্পর্কের বাঁধন। ফলে একাকিত্বে ভুগছে জেন জি। ঠিক এখানেই আলাদা সইয়ারা। মোহিতের এই ছবি ভালবাসার মানুষটার সঙ্গে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত থেকে যেতে শেখায়, শেখায় জীবনের হাজারো উত্থান পতনে কীভাবে আরও বেশি করে বেঁধে বেঁধে থাকতে হয়। এটাই বোধহয় এই ছবির অনন্যতা। এ যুগে এমন প্রেমিক/প্রেমিকা পাওয়া কি মুখের কথা যে জীবনের সমস্ত সুখ দুঃখে সঙ্গী হবে একইভাবে? এখনকার ব্যস্ত নাগরিক জীবনের প্রেম, ভালবাসা বড্ড ঠুনকো। সেখানে সইয়ারা যেন এই প্রজন্মের কাছে এক ঝলক বসন্ত বাতাস।
সইয়ারা সফল হওয়ার আরও একটি কারণ – স্বাদ বদল। লক্ষ করলে দেখা যাবে, গত কয়েক বছরে বলিউডে যে সমস্ত ছবি তৈরি হয়েছে, তার বেশিরভাগই ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক। নতুবা ‘অ্যাকশন’ ছবি কি ‘থ্রিলার’-এর মোড়কে প্রোপাগান্ডা। একদিকে রামসেতু (২০২২) বা ছাওয়া; অন্যদিকে অ্যানিমাল (২০২৩)। এইসব গল্প বলতে বলতে নিটোল প্রেমের গল্পটা বলতেই যেন ভুলে গিয়েছিল বলিউড। হিংসা, ঘৃণা, বিদ্বেষ, বিষাক্ত পৌরুষ দেখিয়েই বিপুল ব্যবসা হচ্ছে। তাই ওসবই চলছে।
আরো পড়ুন অ্যানিমাল: আরএসএসের পারিবারিক আদর্শের রুপোলি নির্মাণ
আসলে একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায়, এইসব ছবি ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ফসল। ইতিহাসের পাতা উলটালে দেখা যাবে, বাবরি মসজিদে রামলালার আবির্ভাবের আশেপাশেই দূরদর্শনে রামানন্দ সাগরের রামায়ণ, বি আর চোপড়ার মহাভারত দেখানো শুরু হয়। অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের সময়েও সাংস্কৃতিক পরিসরে শাসকের হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছিল। নরেন্দ্র মোদীর আমলে তো কথাই নেই। ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের কিছুদিন আগে থেকেই এক নতুন সাংস্কৃতিক প্রবণতা শুরু হয়। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য, চক্রবর্তী অশোক সম্রাট, বীর শিবাজি, ভারত কা বীর পুত্র – মহারাণা প্রতাপ সম্প্রচারিত হতে শুরু করে। এইসব ধারাবাহিকে ঐতিহাসিক তথ্যের বিস্তর গোলমাল দেখা যায়। আবার সাম্প্রতিক অতীতে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীশ ঔরঙ্গজেবের সমাধি সংক্রান্ত বিতর্কে দাবি করেছেন, ছাওয়া ছবির কারণেই নাকি ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে মানুষের মনে। এমনকি শিবসেনা প্রধান একনাথ শিন্ডে তখন বলেছিলেন, ঔরঙ্গজেব খুব খারাপ লোক ছিলেন। তাই যে তাকে সমর্থন করবে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে না।
বলিউডের এমন গেরুয়াকরণ দেখতে দেখতে বোধহয় দর্শকরাও কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। সইয়ারা আবার তাঁদের প্রেম, বন্ধুত্ব, ভালবাসার কাহিনি উপহার দিয়েছে। এর সঙ্গে এমনকি আগের প্রজন্মও নিজেদের যাপনের মিল খুঁজে পাচ্ছে, আর বর্তমান প্রজন্ম এই ছবির হাত ধরে আজকের পৃথিবীতে খুঁজে চলেছে এমন একজনকে, যে তাকে চিরকাল ভালবাসায় বেঁধে রাখবে।
মোহিত সুরির আরেকটি ছবি, আশিকি ২ – এর কথা আমাদের আজও মনে আছে। ছবিটির গানগুলি আলাদাভাবে আমাদের মনে দাগ কেটে গিয়েছিল। সইয়ারার গানগুলির কথাও বলতেই হবে। অরিজিৎ সিং কেন যে এখন যে কোনো পরিচালকের স্বাভাবিক পছন্দ তা এই গানগুলি থেকেই স্পষ্ট। আসলে গোটা ছবিতে মোহিত গল্পের উপর ভরসা রেখেছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন, বায়োপিক বা অ্যাকশন ঘরানা নয়, তিনি যদি দর্শকদের আবেগকে ছুঁতে পারেন তবেই সাফল্য আসবে। না, দর্শকরা তাঁকে হতাশ করেননি।
আজ হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী। এখানে অনেক কৃষ আর বাণী প্রয়োজন, যারা শেষপর্যন্ত একে অপরের জন্য থেকে যেতে জানে। ভালবাসায় বিশ্বাস রেখে, প্রেমে বিশ্বাস রেখে। আজকাল বাতাস ভারি বারুদের গন্ধে, স্বজন হারানোর চিৎকারে। এখনই প্রেমের বার্তা ছড়ানোর সময়। যদি সীমান্তের বাসিন্দা গুলি বিনিময়ের আতঙ্কে লুকিয়ে থাকা ছেলেটা ভালবাসার ভরসা পায়, যদি কারোর মনে হয় ‘মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ।’ আসলে প্রেম তো এমন এক স্রোত যা পৃথিবীর হিংসা, দৈন্য, হতাশাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ধরে। সইয়ারা সেই প্রেমের ছবি।
নিবন্ধকার পেশায় সাংবাদিক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







