অর্ক মুখার্জি

বাংলার শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাকে বলা হয়ে থাকে উপার্জনের জগতের প্রবেশদ্বার। উচ্চমাধ্যমিকের পর ছেলেমেয়েরা রাজ্যভিত্তিক বিভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসে বা উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফলের ভিত্তিতে বিভিন্ন ডিগ্রি কলেজ বা বৃত্তিমূলক পাঠক্রমে যোগ দেয়। পশ্চিমবঙ্গের অনেক শিক্ষার্থী, যারা বিভিন্ন কারণে সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতি না নিয়ে রাজ্যের জয়েন্ট এন্ট্রান্সের প্রস্তুতি নেয়, তারা সেই পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে সরকারি বা বেসরকারি ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়। ইদানীং বহু ছাত্রছাত্রী নার্সিং, প্যারামেডিকাল ইত্যাদি পাঠক্রমে যোগ দেওয়ায় আগ্রহ দেখাচ্ছে। তাদের জন্য রাজ্য আয়োজিত প্রবেশিকা পরীক্ষা হল জেনপাস (JENPAS-UG)। প্রতিবছর উচ্চমাধ্যমিকের পর সেই পরীক্ষার জন্য ফর্ম পূরণ শুরু হয় এবং মোটামুটি মে বা জুন মাসে প্রবেশিকা পরীক্ষা হয়ে দু-এক মাসের মধ্যে ফল প্রকাশিত হয়। এছাড়াও যারা বিভিন্ন বিষয়ে সাধারণ স্নাতক স্তরে পড়াশোনা করে, তারাও উচ্চমাধ্যমিকে প্রাপ্ত নম্বর অনুযায়ী এবং/অথবা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করে পছন্দসই বিষয় পড়তে ভর্তি হয়। মোটকথা, জুন-জুলাই বাংলার কাছে কেবল বৃষ্টি বা ফুটবল বা ইলিশ নয়, বরং কলেজে কলেজে নতুনদের আগমনের মরশুম। অথচ এবছর এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অগাস্ট মাস আসতে চলল, অথচ স্কুল ছেড়ে কয়েক লক্ষ ছাত্রছাত্রীর উচ্চশিক্ষার প্রথম ধাপে পা রাখা হল না এখনো।

পশ্চিমবাংলায় বাংলা মাধ্যমে যারা পড়াশোনা করে, তাদের অনেকেরই প্রথম পছন্দ জয়েন্ট এন্ট্রান্স পাশ করে বৃত্তিমূলক উচ্চশিক্ষায় যোগ দেওয়া। এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়েছিল ২০ মার্চ এবং তার ঠিক ১ মাস ৭ দিনের মাথায়, অর্থাৎ ২৭ এপ্রিল, হয়েছিল জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষা। প্রায় তিনমাস কেটে গেছে। মাঝে কিছু তারিখ হাওয়ায় ভেসে বেড়ালেও আজ পর্যন্ত সরকারিভাবে জানানো হয়নি যে কবে ফল প্রকাশিত হবে। আগেরবারের ফল ঘোষণা হয়েছিল পরীক্ষা হওয়ার ২৬ দিনের মাথায়। তবুও যাদবপুরের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ সমেত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একাধিক শাখায় ছাত্র ভর্তি না হওয়ায় কাউন্সেলিং চলেছিল বহুদিন ধরে। দুর্গাপুজোর আগে পর্যন্ত ভর্তি প্রক্রিয়া জারি ছিল।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এদিকে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘প্রভিশনাল অ্যাডমিশন’ নামক গালভরা কথার আড়ালে আসন সংরক্ষণের জন্য টাকা নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং, টেকনোলজি, আর্কিটেকচার এবং ফার্মেসি শাখায় ভর্তি আরম্ভ করে দিয়েছে। অনেক ছাত্রছাত্রী দ্বিধাগ্রস্ত। তারা এবং তাদের অভিভাবকরা বুঝে উঠতে পারছেন না কী করা উচিত। অধিকাংশ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করছে এবং বিভিন্নভাবে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে ফল প্রকাশের জন্য বসে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ, বরং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেশি টাকা খরচ করে ভর্তি হয়ে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ। খুব ভাল ফল করা ছেলেমেয়েরা সর্বভারতীয় পরীক্ষার র‍্যাংকের ভিত্তিতে রাজ্য ছাড়ছে। প্রবাসী শ্রমিকদের দুরবস্থা আমরা দেখতেই পাচ্ছি। পাশাপাশি রাজ্য সরকারের শিথিলতার কারণে বহু ছাত্রছাত্রী, যারা হয়তো এই রাজ্যে থেকেই পড়াশোনা করতে চেয়েছিল, তারাও কিন্তু এই বিলম্বের কারণে প্রবাসী ছাত্র বা ছাত্রী হয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে জমি হাঙরদের মত পেট ফুলছে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোরও।

আগেই বলেছি, নার্সিং ও প্যারামেডিকাল পড়তে স্নাতক স্তরে ভর্তি হওয়ার প্রবেশিকা পরীক্ষা হল জেনপাস। ওয়েস্ট বেঙ্গল জয়েন্ট এন্ট্রান্স একজামিনেশনস বোর্ড এই পরীক্ষারও আয়োজক। তাদের ওয়েবসাইটে গেলে এই নিবন্ধ প্রকাশের সময়ে পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ দেখানো হচ্ছিল ২৫ মে, ২০২৫। বিগত কয়েক বছরে এই পাঠক্রমগুলোতে ভর্তি হওয়ার আগ্রহ প্রবলভাবে বেড়েছে বিশেষ করে ছাত্রীদের মধ্যে। এসব নিয়ে পড়াশোনা করলে সরকারি বা বেসরকারি ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় বেশি বলে মনে করছে ছাত্রছাত্রীরা। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেক ছাত্রছাত্রী এই পরীক্ষায় পাশ করতে ভাল করে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য উচ্চমাধ্যমিকের পরে একবছর কোথাও ভর্তি না হয়ে প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য নিবিড় প্রস্তুতি নেয়। পরের বছর ভাল র‍্যাংক করে সরকারি কলেজে সুলভে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যায়। বহু নিম্নবিত্ত পরিবারের ছাত্রছাত্রী এই ঝুঁকি নিয়ে থাকে। ফলে জেনপাস নিয়ে এবারের অনিশ্চয়তা তাদের ঘোর বিপদে ফেলেছে। তারা হতাশ। এই অপ্রত্যাশিত বিলম্বের কারণে তাদের মুখ যত মলিন হচ্ছে, তত চওড়া হচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের হাসি।

আরো পড়ুন কলেজ সংকট: ছাত্রছাত্রী সব গেল কোথায়?

এমনিতেই বেশ কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষায় পুঁজিপতিদের ব্যাপক প্রবেশ ঘটছে। খবরের কাগজের পাতা জুড়ে বিজ্ঞাপন, চকচকে রাস্তার পাশে ঝলমলে হোর্ডিং, টিভিতে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সাধারণ ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের মগজ ধোলাইয়ের ফলে শিক্ষার ব্যবসা গতি পেয়েছে। অন্যদিকে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় জং ধরছে। সরকার সব জেনেও উদাসীন। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে গেলে যদি এরকম হাপিত্যেশ করে বসে থাকতে হয়, অনিশ্চয়তায় ভুগতে হয়, তাহলে যারা সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনেক কম খরচে পড়াশোনা করতে চেয়েছিল, তারাও সাধ্যের বাইরে গিয়ে হলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী হয়ে উঠবে। এমনিতেই সাধারণ শাখায় স্নাতক স্তরে পড়াশোনার চাহিদা কমছে, প্রতিবছরই রাজ্যের শীর্ষস্থানীয় কলেজগুলোতেও অনার্সের আসন ফাঁকা থেকে যাচ্ছে। এবছরের অবহেলার ফলে আরও আসন ফাঁকা থাকবে। বহু ছাত্রছাত্রী অন্য রাজ্যের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে বাধ্য হবে। বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অন্য রাজ্যের ভুয়ো প্রতিষ্ঠানে খোঁজখবর না নিয়ে ভর্তি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ছাত্রছাত্রীরা প্রতারিত হয়েছে, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভর্তি হলেও সেখানে যথার্থ পরিকাঠামোর অভাবে ছাত্রছাত্রীরা তেমন কিছুই শিখে উঠতে পারে না। একগাদা টাকা খরচ করলেও, শিক্ষা শেষে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ বা জ্ঞানের অভাবে অদক্ষ কর্মী হিসাবেই কাজের বাজারে গণ্য হয়। আমাদের বাংলাতেও এমন অনেক বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে, যেখানে ছাত্রছাত্রী শিক্ষান্তে মার্কশিট আর সার্টিফিকেট পায় বটে, কিন্তু শিক্ষার ভাঁড়ার শূন্যই থেকে যায়।

এবারের অচলাবস্থা কেন তৈরি হয়েছে? পশ্চিমবঙ্গ সরকার বলছে, এর জন্যে দায়ী ২০১০ সালে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (ওবিসি) তালিকায় কিছু নতুন গোষ্ঠীকে ঢোকানোর বিজ্ঞপ্তি সংক্রান্ত মামলায় আদালতের নির্দেশাবলী। অথচ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা করেছে যে তারা আপাতত স্নাতকোত্তরে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করবে ২০১০ সালের আগের ওবিসি তালিকা অনুযায়ী। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে স্কুল সার্ভিস কমিশন আয়োজিত শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষার জন্য ফর্ম পূরণের সময়েও একই পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে। তাহলে স্নাতক স্তরে ভর্তি বা বিভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষায় একই কাজ করা হচ্ছে না কেন? সবচেয়ে বড় কথা, এই অস্বাভাবিক দেরি নিয়ে রাজ্যের শিক্ষা দফতরের তরফ থেকে কিছুই বলা হচ্ছে না স্পষ্ট করে। শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে – এসব নিয়ে কিছু কথা বলা বা সাংবাদিক বৈঠক করা নিছকই সময় নষ্ট। অদ্ভুত নীরবতা। ছেলেমেয়েদের হাহাকার কি মন্ত্রীসান্ত্রীদের কানে পৌঁছচ্ছে না?

ক্রমশ গোটা রাজ্যের কলেজ শিক্ষা বেসরকারি পুঁজির দখলে চলে যাচ্ছে। সামনে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবস। হয়ত জমকালো অনুষ্ঠান হবে বেসরকারি শিক্ষা পুঁজির ভালবাসায়। কিন্তু যারা সরকারি কলেজের ছাত্রছাত্রী হতে পারত, কম খরচে পড়াশোনা করতে পারত, তাদের দুর্দশার কথা কারোর মনে থাকবে না। অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলোও এ নিয়ে নীরব। মোদ্দাকথা, পড়তে হলে টাকা ছাড়ো। নইলে হতাশায়, অনিশ্চয়তায় ভোগো। এই নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিরাজমান সার্বিক নীরবতা আসলে শ্মশানের শান্তি।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.