অতি সম্প্রতি বাঙালির ক্ষাত্রতেজ আবার জ্বলে উঠেছে। এমনকি যারা হোয়াটস্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বিষাদসিন্ধু ইংরিজিতে রচনা করে, তারাও বিপন্ন বাঙালির সমর্থনে তুমুল উত্তেজনা প্রকাশ করছে। এ নিয়ে অবশ্য কথা বলা মুশকিল। কেননা বাঙালি ‘অস্মিতা’-য় যে কেউ আমাকে মুহূর্ত মধ্যে বিজেপি বলে দেগে দিতে পারে। সুতরাং প্রথমেই বলা ভাল যে, পৃথিবীতে আবির্ভাবের পরে আমি যা যা মূল কাজ করেছি তা বাংলা ভাষায়। আমার ছেলেও একই পথ অনুসরণ করেছে। কারণ ডিএনএ একই। আমি নিজে বাঙালি, তবে ইদানীং অন্য বাঙালিদের সঙ্গে একটা তফাত দেখতে পাই। আগের মত বাঙালি আর বাড়িতে বিদ্যাসাগরের ছবি টাঙায় না, ছেলে চাকরি করবে জেনেও, রোলের দোকান করলেও বাড়িতে উনিশ শতকের মহৎ ব্যক্তিদের দু-চারখানা বই রাখে না। বাঙালি সম্পূর্ণ স্বাধীন, স্বতন্ত্র হয়ে গেছে। একথা ঠিক যে সম্প্রতি কিছু বাঙালির প্রতি বিভিন্ন রাজ্যে যে অত্যাচার চলছে তা অসাংবিধানিক এবং অমানবিক। কিন্তু তাতে আয়কর আইন অনুযায়ী যারা আগে মধ্যবিত্ত ছিল, এখন ভদ্রবিত্ত হয়েছে, তাদের যে প্রতিক্রিয়া দেখি তাতে আমার কখনো কখনো কিছু কৌতূহল তৈরি হয়।
ক) পরিযায়ী শ্রমিক কথাটা খুব শুনছি। আমরা ছোটবেলা থেকে জানতাম – যে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেক পাখি আলিপুর চিড়িয়াখানার সরোবরে, সাঁতরাগাছির ঝিলে বা কখনো কখনো হিন্দমোটর কারখানার ভিতরের জলাশয়টিতে বছরের এক নির্দিষ্ট সময়ে আসে। এখন সেসব এলাকা প্রোমোটার পরিবৃত, ফলে তারা আর এইসব উপদ্রুত এলাকায় আসে না। আমাদের জীবন থেকে সেইসব নীলকণ্ঠ পাখি বিদায় নিয়েছে। পাখিরা পরিযায়ী – একথা আমি বুঝতে পারি। কিন্তু বুঝতে পারি না – কেন হঠাৎ পরিযায়ী শ্রমিক বলা হবে। কারণ আমাদের ছেলেমেয়েরা, যারা বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ে আজ পুনে, কাল আম্বালা, পরশু বেঙ্গালুরু করছে, তারা তো পরিযায়ী ইঞ্জিনিয়ার নয়। আমাদের সাংসদরা যখন বিভিন্ন রাজ্যে যান, ধরা যাক, মনমোহন সিং যখন গৌহাটি থেকে দিল্লি গিয়ে প্রথমে অর্থমন্ত্রী, পরে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, তখন তো তিনি পরিযায়ী ভারতীয় নাগরিক ছিলেন না। হঠাৎ শ্রমিকদের ক্ষেত্রেই পরিযায়ী আখ্যা এল কেন? বিপুলসংখ্যক বাঙালি গ্র্যাজুয়েট এখন নানা রাজ্যে বিভিন্ন পেশায় কাজ করেন, ঘুরেও বেড়ান। তাঁদের কাউকে এই আখ্যা দেওয়া হয় না। আসলে এ হল শ্রেণি আভিজাত্য, ভদ্রবিত্ত বাঙালির এক ধরনের করুণা বিতরণের বিশেষণ। ‘আহা! ওরা শ্রমিক, ওরা ইটভাটায় কাজ করে, ওদের জন্যে তো আমাদের মন কেঁদে ওঠা উচিত।’ এরকম কান্না অক্ষয়কুমার দত্তের ছিল, দীনবন্ধু মিত্রের ছিল। তাহলে আমাদের থাকবে না কেন? আমরা তো সনাতন বাঙালি ধর্মেরই অনুসারী। আমার শুধু মনে হয়, এই পরিযায়ী শব্দটিকে বাদ দেওয়া যেতে পারে। এটি পাখিদের জন্য রাখা হোক। তারা হয়ত আবার গান গাইবে শীতকালে, কৃতজ্ঞতা জানাবে গরমে উড়ে যাওয়ার সময়ে। মানুষকে সম্মানজনক অভিধা দিতে পারলেই বরং আমার ভাল লাগবে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
খ) আরেকটি কথা আজকাল খবরের কাগজে খুব দেখি, লোকমুখে বারংবার শুনি – অনাড়ম্বর জীবন! আমার জিজ্ঞাস্য – জীবনে আড়ম্বর কি থাকতেই হয়? আমরা তো কত রাজনীতিবিদ দেখেছি নানা দলের। ধরা যাক, গণেশ ঘোষ। তিনি সাংসদ ছিলেন, কিন্তু ছোট্ট একটি চৌপায়ার উপর বসে থাকতেন কালীঘাটের বাড়িতে। আমাদের পাড়ায় হেম ঘোষ ছিলেন। তিনি নামকরা স্বাধীনতা সংগ্রামী, কিন্তু টিনের চালার বাড়িতে থাকতে কোনো অসুবিধা হত না। মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন অজয় মুখোপাধ্যায় যে পাঞ্জাবি পরতেন, সেও নিতান্ত হাটের পাঞ্জাবি। তিনি অনাড়ম্বর জীবন কাটাচ্ছেন – এরকম কাউকে বলতে শোনা যায়নি। কোনো সম্পাদকীয় লেখা হয়নি। আড়ম্বর এল কোত্থেকে?
আসলে গত কয়েক বছরে বাঙালির রাজনীতিতে এত অর্থের সমাগম হয়েছে যে কেউ যদি দক্ষিণ কোরিয়ার গাড়ি চড়া আর নিয়মিত অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণ বাদ রাখেন, বা দামি পানীয় এবং সুস্বাদু মাংসের জন্য পার্ক স্ট্রিট কি চীনেপাড়ায় না যান – তিনি অনাড়ম্বর জীবনের অধিকারী হয়ে যান। আড়ম্বরই এখন আমাদের জীবনের স্বাভাবিক শর্ত, কারণ আয়কর দিতে হয়। যে সমস্ত রাজনীতিবিদ আয়কর দেওয়া সত্ত্বেও রাস্তায় হাঁটেন, তাঁদের জীবনযাত্রাকেই আমরা আলাদা করে অনাড়ম্বর বলে দাগিয়ে দিয়েছি। যেমন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। অথচ তাঁর ওই জীবনযাপন যে কোনো মানুষের স্বাভাবিক সৎ জীবনযাপন, অসাধারণ কিছু নয়। যে দেশে মানুষ একের পরে এক জেলা হেঁটে পার হয় ঝড়ের ভয়ে, সে দেশে একজন মানুষ বাতানুকূল ঘর ছাড়াই ঘুমোতে পারেন – এই অভ্যাসকে আলাদা করে আড়ম্বরহীনতা বলার কিছু নেই। এই তো স্বাভাবিকতা।
গ) আরেকটি কথাও খুব চালু হয়েছে, কালীঘাটে বসে শুনতে পাই জীবনের সায়াহ্নে। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। বলা বাহুল্য, দুর্গাপুজোর দিকে তাকিয়ে এই কথা বলা হয়। ঈদে একথা বলা হয় না, বড়দিনে একথা বলা হয় না। বড়দিনে তবু ভদ্রবিত্তরা কেক কেনেন, ইদানীং সান্তাক্লজ টুপি পরে পানভোজন করতেও দেখা যায়। ঈদের সময়ে কিন্তু বলা হয় না যে ওটিও এক বড় অংশের বাঙালির বড় উৎসব। সেখানে ধর্ম ছাড়াই সকলের অংশগ্রহণ করা উচিত, একে অপরকে আলিঙ্গন করা বা মিষ্টি খাওয়ার অধিকার সকলেরই আছে। আমরা ওই উৎসবের সম্প্রদায়গত পরিচিতির কারণে যে পাঁচিল তুলে দিই, তা যে অন্যায় সেকথা কিন্তু কেউ বলে না। অথচ দুর্গাপুজোর সময়ে হঠাৎ দেখি আমাদের বিবেকের বিস্ফোরণ হয়। সকলকেই ওই উৎসবে আহ্বান করা হয়।
আরো পড়ুন বাংলা মাধ্যম ও বাংলা বিপন্ন, কিন্তু রেডিও জকির হাতে নয়
আমার তো দুর্গোৎসব বলতেই আমাদের ছোটবেলার কিছু কিছু কুঅভ্যাস অনুযায়ী মনে পড়ে বঙ্কিমবাবুর কথা। তিনি কমলাকান্তের মুখ দিয়ে বলেছিলেন ‘মা উঠিলেন না। উঠিবেন না কি?’ সপ্তমীর দিন কমলাকান্তের এই যে রোদন, তা আজকের বাঙালির মনে আছে কিনা জানি না। কিন্তু তারা যে উৎসব করে তা সবার নয়। কিছু হীনবল মুৎসুদ্দি শ্রেণির জমিদার, রাধাকান্ত দেবের মত বড়লোকেরা ব্রিটিশদের খুশি করতে এর আয়োজন করতেন এবং রুপোর মুদ্রা আর বাঈজির পদপাত দেখে সেকালে লোকে মূর্ছা যেত। একালেও ইনস্টলেশন আর্টের নামে শহরকে পণবন্দি করে যে ‘বীভৎস মজা’ – তাতে মা তো বটেই, তাঁর সন্তানরাও হতচেতন হয়ে থাকেন। এই দুর্গোৎসব সবার হতে যাবে কেন? যে দুর্গোৎসব সবার, সে তো রামপ্রসাদের সেই বেড়া ভাঙা কিশোরী কন্যার বা ছৌ নাচের সেই মুখোশ পরা দেবীর, যা দেখে আমাদের চাষিরা জেগে উঠে ভেবেছিল – একদিন মা-ও তাদের জন্য অস্ত্র ধারণ করবেন। আর বিজন ভট্টাচার্য, ঋত্বিক ঘটকের মত বোকারা ভেবেছিলেন যে যদি দেবী গর্জন করেন সেই ‘গর্জং গর্জং ক্ষণং মূঢ়’ শুনে পাঁচ বছরের সাংসদ, বিধায়করা কেঁপে উঠবে। নতুন যুগ আসবে। তার যখন কোনো সম্ভাবনা নেই, তখন এ উৎসব সবার নয়, কিছু কিছু মানুষের। বাকিরা দর্শক, উচ্ছিষ্টভোগী।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








