দেবব্রত বিশ্বাসের নাম উচ্চারিত হলেই এখন আমরা দ্রুত একাকার করে নিই তাঁর গান নিয়ে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের সঙ্গে তাঁর দ্বৈরথের কথা। এই সূত্রেই দেবব্রত বিশ্বাসের ‘ব্রাত্য’ অভিধা রীতিমত ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। জর্জ বিশ্বাস মানেই বিতর্ক, তিনি মানেই তাঁকে গান গাইতে না দেওয়া। সেই থেকেই নাটকের বিষয় হয়ে ওঠে ‘রুদ্ধসঙ্গীত’। কিন্তু এইসব অভিযোগ বা পালটা অভিযোগের আড়ালে আমরা ভুলেই যাই, আজ দেবব্রত বিশ্বাসের যে বিপুল পরিমাণ গান আমাদের সামনে রয়েছে, তার বেশিরভাগই মিউজিক বোর্ডের অনুমোদন নিয়েই প্রধানত হিন্দুস্থান কোম্পানির পরিবেশনায় গ্রামোফোন রেকর্ডে প্রকাশিত। তাহলে তাঁর গান বিশ্বভারতী আটকে দিল কোথায়? কার্যত দেবব্রত তাঁর ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত গ্রন্থে এই বিষয়ে এমন কিছু লেখেননি যা এই তথাকথিত বিতর্কে ইন্ধন দেয়। বরং স্পষ্টই উল্লেখ করেছেন যে এই বিতর্কের কেন্দ্রে তাঁর গায়ন ছিল না, ছিল পরিবেশনের ক্ষেত্রে গানের প্রিলিউড ও ইন্টারলিউডে যন্ত্র ও সুরের ব্যবহার। তাঁর গাওয়া কিছু গানে এইসব ক্ষেত্রে যন্ত্রের বাদনভঙ্গিমা ‘নাকি’ গানের কথা ও ভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই ছিল মিউজিক বোর্ডের কর্তাদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও অভিমত।

রবীন্দ্রনাথের গানের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল, তাঁর আগের সময়ের বাংলা গানের তিন তুকের কাঠামো (অর্থাৎ স্থায়ী-অন্তরা-আভোগ) ভেঙে তিনি প্রথম বাংলা গানের শরীরে যোগ করলেন একটি নতুন স্তবক – যার নাম সঞ্চারী। এই সংযোগের পিছনে একটি সচেতন ভাবনা রয়েছে, যার কথা তিনি বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেছেন তাঁর সংগীতচিন্তা গ্রন্থে। তত্ত্বগতভাবে তিনি মনে করতেন, গানের কথা ও তার অন্তর্গত ভাবের হাত ধরেই গড়ে উঠবে গানের সুরের চলন, আর গানের সেই কাব্যগর্ভা আদল তার গভীর ও অনিঃশেষ ব্যঞ্জনা নিয়ে বেজে চলবে শ্রোতার মনে। এই ভাবনা থেকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তিনি গানের সুর তৈরি করেছেন প্রথাগত শাস্ত্রীয় ব্যাকরণকে অস্বীকার করে। সঞ্চারী সেই ভাবপ্রকাশ ও বিস্তারের এক অনিবার্য মাধ্যম হয়ে দেখা দেয় তাঁর গানে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বস্তুত, চার তুকের গানে ওই সঞ্চারী অংশটি মূল গানের ভাবটিকে রসোত্তীর্ণ করার এক আশ্চর্য জাদুকাঠি। একেবারে হাতেগরম উদাহরণবাদল দিনের প্রথম কদমফুল’ গানটি। স্থায়ী থেকে অন্তরা অবধি এই গানে ফুটে ওঠে এক বিনিময়ের ছবি। বন্ধু তাঁকে বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল দান করেছেন, আর তার বিনিময়ে কবি তাঁকে শ্রাবণের গান এনে দিয়েছেন। এই পর্যন্ত এসে গানের আবেদন আটকে যেতে পারত। কিন্তু সঞ্চারীতে এসে একটি ভিন্ন প্রশ্ন জেগে উঠল গানে – ফুলের ডালি তো একদিন শুকিয়ে যাবে, তখন কীসের বিনিময়ে স্থায়ী হবে এই স্মারক? সঞ্চারীতে বলা হল ‘আজ এনে দিলে, হয়তো দিবে না কাল–/ রিক্ত হবে যে তোমার ফুলের ডাল।’ কার্যত এই উন্মুখ সংশয় থেকেই গানের ব্যঞ্জনা উড়াল দেয় আভোগে ‘এ গান আমার শ্রাবণে শ্রাবণে/তব বিস্মৃতিস্রোতের প্লাবনে/ ফিরিয়া ফিরিয়া আসিবে তরণী বহি তব সম্মান।’

অর্থাৎ ফুলের ডালি রিক্ত হলেও ‘এ গান আমার’ কিন্তু এক নিঃসীম নিবেদন যা নাকি ‘তব বিস্মৃতিস্রোতের প্লাবনে’ বা ভুলে যাওয়ার ভিতর দিয়েও জাগরূক থাকবে চিরকাল। ফুল ফোটার সংশয় আছে, আছে তার সময়ের বেড়া, কিন্তু গান? সে তো এক কবির ভেসে চলার অনন্ত অবলম্বন। ফুলের দানকে গানের সুরের ভিতর এক স্থায়ী বিনিময়ের স্মারক করে তোলার সামর্থ্য তাঁর আছে। সঞ্চারীর ওই জিজ্ঞাসাটুকু ফুটে না উঠলে এই গানের নির্মাণ হয়ে উঠতে পারে না এমন কোনো মায়াবী ছায়াপথের সঙ্গী।

এখন চার পর্বে বিন্যস্ত এই গান কীভাবে গাওয়া হবে? একটানা? নাকি খানিক বিরাম দিয়ে? মূলত এই জিজ্ঞাসা থেকেই গানের প্রিলিউড ও ইন্টারলিউডের প্রসঙ্গ উঠে আসে। সমস্যা আরও জটিল হয়, কেননা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এই বিষয়ে কোনো নির্দেশ দিয়ে যাননি। কিছু গানের স্বরলিপিতে এই পর্যন্ত নির্দেশ আছে যে স্থায়ী থেকে অন্তরা হয়ে সঞ্চারীতে যাওয়ার আগে হয়ত আবার স্থায়ী ছুঁয়ে যেতে হবে। কোথাও বলা হয়েছে অন্তরা দুবার করে গেয়ে সঞ্চারীতে যাওয়ার কথা, কখনো সঞ্চারী দুবার গেয়ে আভোগে যেতে হয়। কিন্তু এই চলাচলগুলি মেনে নিলেও, সমস্ত গানটিই কি একবারে টানা গাওয়া হবে? কবি নিজে যখন নিজের গান গাইতেন, তিনি পুরো গানটি একসঙ্গে গেয়ে যেতেন। তাঁর গাওয়া কয়েকটি গান গ্রামোফোন কোম্পানি রেকর্ড করেছিল। সেখানেও একই ধরন আমরা দেখি এবং সেখানে কোনো যন্ত্রানুষঙ্গ নেই। রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য যে গায়ক গায়িকারা সরাসরি তাঁর কাছ থেকে তাঁর গান গাইতে শিখেছেন, তাঁরা নিজেদের প্রথম দিককার রেকর্ডে কবি প্রবর্তিত রীতিই অনুসরণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে প্রকাশ্য মঞ্চানুষ্ঠান তখন প্রচলিত ছিল না, যা হত সবই শান্তিনিকেতনের চৌহদ্দির ভিতর। হয়ত সেখানেও এই একই রীতি মানা হত।

শান্তিনিকেতনের শিল্পীদের বাইরে যেসব শিল্পীর গান বিভিন্ন গ্রামোফোন কোম্পানি রেকর্ড করেছে, সেখানে আমরা দেখব মূলত দুটি প্রথা অনুসরণ করা হয়েছে। প্রথমটি হল, গান শুরুর মুখে গানের স্থায়ীর সুর দু-তিনবার বাজিয়ে নিয়ে গানের সূত্রপাত, তারপর গোটা গানটি গেয়ে আবার স্থায়ীতে ফিরে গানের সমাপন। দ্বিতীয়টি হল, গোড়ায় স্থায়ীর সুর বাজিয়ে গান শুরু করা, তারপর অন্তরা থেকে সঞ্চারীতে যাওয়ার আগে একটু যতি, সেখানে স্থায়ীর সুরটিকে দু-তিনবার যন্ত্রে বাজিয়ে নিয়ে সঞ্চারী ও আভোগ একসঙ্গে গেয়ে স্থায়ীতে ফিরে আসা। খেয়াল করলে দেখা যাবে, দীর্ঘদিন যাঁরা সুনামের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েছেন, তাঁরা এই দুই প্রথাই মেনেছেন।

এখানে বলা দরকার, গানের মধ্যে গায়কের কণ্ঠকে সামান্য বিশ্রাম দেওয়ার জন্যই ইন্টারলিউডের প্রচলন হয়েছিল বলে ধরা যায়, এখানে কবির নির্দেশ বলে আলাদা কিছু নেই। সাধারণভাবে রবীন্দ্রনাথের গানের সঞ্চারীতে সুর অনেকখানি খাদের দিকে নেমে আসে, কণ্ঠকে ওই খাদের দিকে চালিত করার আগে স্বল্প বিরাম দিলে তা সাধারণ গায়কের পক্ষে স্বস্তি। তবে কোনো সক্ষম কণ্ঠ যদি পুরো গান একটানা গেয়ে যান, তাতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে গানের মধ্যে কথা ও সুরের বৌদ্ধিক ব্যঞ্জনা ফুটিয়ে তোলার জন্য ইন্টারলিউডের প্রয়োজন আছে। কারণ অন্তরা থেকে সঞ্চারীতে পৌঁছে গানটির ভাবগত উত্তরণ ঘটে। সেই উত্তরণের পথটিকে খানিক স্পষ্ট করার জন্য একটি ধরতাই সুরের প্রলেপ ও আবহ বাঞ্ছিত। আর দীক্ষিত শ্রোতার পক্ষেও তা প্রয়োজন। এটি তাঁর একরকম প্রস্তুতির অবসর, যা পেলে তিনি ছুঁতে পারেন উড়াল দেওয়া গানের পাখাটিকে।

আরো পড়ুন শতবর্ষে কণিকা, সুচিত্রা: যে আনন্দধারা এখনো বহিছে ভুবনে

পাশাপাশি খেয়াল করা দরকার, আদিকালের রেকর্ডিং প্রযুক্তিতে কিন্তু তিন মিনিট সময়সীমার মধ্যে গানের রেকর্ডিং সীমাবদ্ধ রাখতে হত। সেই ৭৮ আরপিএম গালার রেকর্ড থেকেই এর সূত্রপাত। পরে এক্সটেন্ডেড প্লেয়িং (ইপি) বা লং প্লেয়িং (এলপি) রেকর্ডে গানের সংখ্যা বাড়লেও একেকটি গানের সময়সীমা কখনোই তিন মিনিট ছাড়ায়নি। এই সীমাবদ্ধতার কারণে অবশ্যই প্রয়োজন হয়ে পড়ল গানের প্রিলিউড ও ইন্টারলিউডের পরিমিতি, যাতে সবটুকু নিয়েই গানের গায়নসীমা তিন মিনিটে বেঁধে রাখা যায়। অবশ্য আধুনিক প্রযুক্তিতে এই সীমাবদ্ধতা আর নেই। কারণ ডিজিটাল রেকর্ডিং ব্যবস্থায় যন্ত্রানুষঙ্গ সমেত ৫-৬ মিনিট কোনো একটানা গান রেকর্ড করার অসুবিধা নেই। সময়ের নিখুঁত হিসাব কম্পিউটার মনিটরে দেখে নেওয়া যায়, ট্র্যাক কেটে ছেঁটে সময়ের এদিক ওদিক করা যায় অনায়াসেই। কিন্তু হচ্ছেটা কী?

প্রিলিউড ও ইন্টারলিউডের ক্ষেত্রে যে প্রথা এতদিন মেনে চলা হয়েছে, অর্থাৎ শুরুতে স্থায়ীর সুর এবং ইন্টারলিউডে তারই রেশ রেখে সঞ্চারীতে যাওয়া, দেবব্রতও এই প্রথার ব্যত্যয় ঘটাননি। কেবলমাত্র ওই ছোট্ট পরিসরে বাজানো হয়েছিল একাধিক যন্ত্র, যা কেউ কেউ মনে করেছিলেন বেসুরো বা বেমানান। কিন্তু বর্তমান প্রযুক্তিতে এক-দেড় মিনিট বা তারও বেশি সময় ধরে প্রিলিউড বা ইন্টারলিউড বাজানো যায়। তার মানে এটি একটি সম্ভাবনা। গানের কথার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তৈরি করা যায় প্রিলিউড বা ইন্টারলিউড, যা আরও একটু ছড়িয়ে ধরতে পারে গানটিকে। শ্রোতার কানে আরও একটু ঘন আবহ তৈরি করতে পারে সেই সুর। এই সুযোগ বিস্তৃততর, কারণ প্রযুক্তির সাহায্যে যে কোনো ধরনের তাল বা বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার করা যায় অবাধে। সাম্প্রতিককালে গানের রেকর্ডিং করার ক্ষেত্রে অ্যারেঞ্জার নামক এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে, যিনি সঙ্গীত প্রযুক্তির সহায়তায় আলাদা করে প্রিলিউড বা ইন্টারলিউডের ট্র্যাক তৈরি করে দেন। অপার এক সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে গেছে, যার ভিতর সৃজনের স্বর বুনন করা যায়।

অ্যারেঞ্জারের বানানো ট্র্যাকের উপর শিল্পীর কণ্ঠ রেকর্ডিং হয়। তারপর শুরু হয় মিক্সিং। হামান দিস্তার বদলে মিক্সি। হাল আমলের যে কোনো শিল্পীর গান, অন্তত যাঁরা ডিজিটাল রেকর্ডিং প্রজন্মের শিল্পী, শুনে দেখছি ৫-৬ মিনিটের গানে প্রায় তিন মিনিট বরাদ্দ রয়েছে প্রিলিউড ও ইন্টারলিউডের জন্যে। দায়িত্ব নিয়ে বলছি, কিছু ক্ষেত্রে গানের প্রিলিউড বা ইন্টারলিউড যদি আলাদা করে শোনা যায়, তা যে আসলে রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো ধরতাই সুর তার হদিশ পাওয়া কঠিন শুধু নয়, অসম্ভব। অবশ্য কেউ বলতেই পারেন, এ তো আপেক্ষিক বিচার। হ্যাঁ, আপেক্ষিক তো বটেই। কিন্তু কান বলে একটি ইন্দ্রিয় আছে যাকে বাদ দিয়ে গান গাওয়াও যায় না, শেখাও যায় না। ওইসব সুরের সামনে বসে কান বিদ্রোহ করে অথবা বিষাদে ছেয়ে যায়। ভাগ্যিস বিশ্বভারতী সংগীত সমিতির আগেই পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটেছে! নতুবা আজ তাঁরা অপঘাতে মরতেন!

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.