সম্প্রীতি চক্রবর্তী

মহারাষ্ট্রের একটি জেলা বীড়, মূলত আখ চাষের জন্য বিখ্যাত। ২০১৯ সালে এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বীড়ের অসংখ্য মহিলা (২০-৫০ বছর বয়সী) জরায়ুহীন হওয়াই শ্রেয় বলে মনে করছেন। গত কয়েক বছরে এই অঞ্চলের সাড়ে চার হাজারের বেশি মহিলা হিস্টেরেকটমি করিয়েছেন। কারণ কী? বীড় একটি কৃষিপ্রধান অঞ্চল হওয়ায় পুরুষদের সঙ্গে সঙ্গে মহিলারাও এখানে আখ চাষে নিযুক্ত। খরাপ্রবণ এলাকা, তাই জলও ব্যবহার করতে হয় অনেক হিসাব করে। এমন পরিস্থিতিতে রজঃস্বলা মেয়েদের পক্ষে খেতে গিয়ে কাজ করা অসুবিধাজনক। আখ চাষের ঋতু এলে ভোর ছটা থেকে সন্ধ্যা ছটা পর্যন্ত একনাগাড়ে মাঠে কাজ করতে হয়। সেইসময় বীড়ের মহিলারা ভোর চারটেয় ঘুম থেকে উঠে আগে বাড়ির কাজ সারেন। বাড়ির রান্নাবান্না, জল আনা বা অন্যান্য গৃহস্থালির কাজ আগে শেষ করেন। ঘরের এবং বাইরের শ্রম মিলিয়ে তাঁদের কাজের সময় পুরুষদের প্রায় দ্বিগুণ। এতখানি কাজের সময়, পর্যাপ্ত জলের অভাব এবং আরও নানা স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কারণে গর্ভহীন থাকা একপ্রকার স্বীকার করে নিয়েছেন তাঁরা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

খুব কম বয়সে সন্তানধারণ করে ফেলা ভারতের আধা-শহর আধা-গ্রাম এলাকায় নতুন কিছু নয়। একটি বা দুটি সন্তান হয়ে গেলে ২০-২২ বছরের মেয়েরাও বেছে নিচ্ছেন অস্ত্রোপচারের রাস্তা। এতে এককালীন অনেকটা টাকা খরচ হলেও পরে চাষবাসের কাজ পেতে সুবিধা হয়, স্যানিটারি প্যাড বা অন্যান্য ওষুধের খরচও খানিকটা কমে যায়। এসব মাথায় রেখে, প্রয়োজন না থাকলেও অত্যন্ত কম বয়সে কাজ পাওয়ার জন্যে নিজের শরীর থেকে তাঁরা জরায়ু বাদ দিয়ে দিচ্ছেন। মুনাফা লুটছে কিছু বেসরকারি হাসপাতাল। মহিলাদের জীবিকা অন্বেষণের এই প্রচেষ্টাকে কাজে লাগিয়ে এরকম অস্ত্রোপচার করে বিস্তর অর্থ উপার্জন করছে তারা। কিন্তু নির্বিচার হিস্টেরেকটমির নানারকম দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। সুতরাং হাজার হাজার মহিলা এই সিদ্ধান্ত কতটা শারীরিক অসুবিধার কারণে নিচ্ছেন আর কতটা কাজের অভাব হলে অনাহারে কাটাতে হবে বলে – তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

এই যদি হয় ভারতের নিম্নবিত্ত, দলিত বা আদিবাসী মহিলাদের অবস্থা, তাহলে মধ্যবিত্ত মহিলাদের অবস্থা কীরকম? তাঁদের কর্মস্থল নারীর শারীরবৃত্তীয় বিষয়গুলি সম্পর্কে কতটা সংবেদনশীল? ২০২৩ সালে তৎকালীন মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী স্মৃতি ইরানির মেয়েদের ঋতুকালীন ছুটি সম্পর্কে মন্তব্য নিয়ে তর্ক বিতর্ক হয়েছিল। মাসের দুটি বা একটি দিন ভারতীয় মহিলাদের সবেতন ঋতুকালীন ছুটি দেওয়া হবে কিনা, সেই বিতর্কে স্মৃতি বলেছিলেন, এই ছুটি চালু করলে কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের প্রতি বৈষম্য বাড়বে। অর্থাৎ ঠিক যে আশঙ্কায় বীড় জেলার মহিলারা নিজেদের জরায়ু বাদ দিতে একপ্রকার বাধ্য হন, তাকেই যুক্তি হিসাবে ব্যবহার করে সাদা কলারের কাজ করা মধ্যবিত্ত মহিলাদের ঋতুকালীন ছুটি দেওয়ার বিপক্ষে সওয়াল করেন স্মৃতি। যেমনভাবে এক মহিলা কৃষক নিজের জরায়ুকে নিজের রোজগারের পথে বাধা হিসাবে দেখেন, ঠিক সেভাবেই ঋতুকালীন ছুটির দাবিকে মধ্যবিত্ত মহিলাদেরও কাজ পাওয়ার পরিপন্থী বলে মনে করা হয়।

ঋতুকালীন ছুটির ইতিহাস খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, প্রথম বিশ্ব, অর্থাৎ ইউরোপ বা আমেরিকার, প্রায় কোথাও এই সুবিধা নেই। একমাত্র স্পেনে ২০২৩ সালে আইন করে সবেতন ঋতুকালীন ছুটি দেওয়া হয়। কিন্তু এশিয়ার অনেক দেশে – যেমন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, তাইওয়ান, এমনকি আফ্রিকার জাম্বিয়াতেও এই ছুটি চালু আছে। ‘এমনকি’ শব্দটা ব্যবহার করার কারণ, আধুনিক সভ্যতার পরাকাষ্ঠা ইউরোপ বা উদারনীতির স্বর্গরাজ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে আইন করা হয়নি, তা তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের এশিয়া, আফ্রিকার বহু দেশে হয়ে গেছে। তাহলে কি কর্পোরেট পুঁজিবাদ আর মহারাষ্ট্রের কৃষিপ্রধান অঞ্চল, যেখানে এখনো সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো অনেকটাই অটুট – একই আদর্শে বিশ্বাসী? একুশ তলা উঁচু অফিসবাড়ির কর্পোরেটই হোক আর বীড়ের খরাপ্রবণ আখের খেত, লিঙ্গবৈষম্য একইরকম।

অর্থাৎ মহিলাদের শারীরবৃত্তীয় বিষয়গুলির কথা মাথায় রেখে আধুনিক কর্মনীতি তৈরি করা হয় না। এরই আরেকটি দিক দেখা যায় মাতৃত্বকালীন ছুটির ক্ষেত্রে। ভারতীয় আইন বলছে, একজন মা তাঁর প্রথম দুই সন্তানের জন্মের জন্য ২৬ সপ্তাহ সবেতন ছুটি নিতে পারেন। কিছু কিছু কোম্পানিতে পিতৃত্বকালীন ছুটিও চালু হয়েছে। উল্লেখ্য, আজ ঋতুকালীন ছুটি দিলে মহিলাদের কেউ কাজে নিতে চাইবে না বলে যুক্তি দেওয়া হয়। এই একই যুক্তি মাতৃত্বকালীন ছুটির ক্ষেত্রেও কয়েক দশক আগে খাড়া করা হত। আজকের দিনেও কর্মক্ষেত্রে মহিলারা গর্ভবতী হওয়ার খবর বহুদিন পর্যন্ত লুকিয়ে রাখেন। তাঁর কর্মক্ষমতাকে প্রশ্ন করা হবে, যোগ্যতা নিয়ে আলোচনা হবে ইত্যাদি সংশয়ের কারণে যতদিন না গর্ভবতী হওয়ার লক্ষণ স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়, ততদিন পুরুষপ্রধান কাজের পরিসরে তাঁরা খবরটি প্রকাশ করতে চান না।

আরো পড়ুন কিডনি থেকে সম্পত্তি: মেয়েদের সব দিতে হবে, পাওয়ার কথা থাক

এসব নিয়ে তবু প্রচুর কথাবার্তা হয়, কিন্তু আরেকটি বিষয় নিয়ে প্রায় কোনো আলোচনা হয় না। মনে রাখতে হবে, ভারতে বা বাংলার মত রাজ্যে ১৯৬০-৭০ দশক থেকে বহু মধ্যবিত্ত মহিলা বাড়ির বাইরে কাজে নিযুক্ত হতে থাকেন স্কুলশিক্ষিকা, ডাক্তার, সেলস গার্ল বা রিসেপশনিস্টের পেশায়। ঠিক যেমন সত্যজিৎ রায়ের মহানগর (১৯৬৩) ছবির আরতি। তাকে প্রথম প্রজন্মের মহিলা কর্মী বলা যায়। এই ২০২৫ সালে বিভিন্ন সাদা কলারের পেশায় পঞ্চাশোর্ধ্ব যে মহিলারা কাজ করছেন, অবসর নিতে আর ৫-১০ বছর বাকি, তাঁরা অনেকেই মেনোপজ, হরমোনের গোলযোগ বা আরও নানা শারীরিক সমস্যায় ভোগেন। বিবাহিতা হোক বা অবিবাহিতা, সন্তান থাকুন বা না থাকুন, পঞ্চাশোর্ধ্ব মহিলাদের হিস্টেরেকটমি এখন একেবারেই বিরল নয়। যদিও এক্ষেত্রে বিষয়টি বীড়ের মহিলাদের মত নয়। আমাদের দেশে প্রবীণ মহিলা কর্মীদের স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা প্রায় হয়ই না। সোশাল মিডিয়া, ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম বা আন্তর্জাতিক নানা প্রচারাভিযানের কারণে কমবয়সী মেয়েরা ঋতুকালীন স্রাব, মেনোপজ বা ইউটিআই নিয়ে কথাবার্তা বলতে সংকোচ না করলেও প্রবীণ মহিলারা সাবলীল নন। এঁদের অনেকেই বর্ষীয়ান স্কুলশিক্ষিকা, মেয়েদের স্কুল বা সহশিক্ষার স্কুলে পড়ান। সরকারি কর্মসূচি অনুযায়ী স্কুল, কলেজে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন বসেছে ঠিকই, কিন্তু কতখানি খোলাখুলি আলোচনা করা যায় এই স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় বিষয় নিয়ে? আমরা যারা ২০০০ সাল নাগাদ স্কুলে পড়েছি, ঋতুস্রাব সম্পর্কে ঢাকঢাক গুড়গুড় পরিবেশেই স্কুলে ও বাড়িতে বেড়ে উঠেছি। এই গোপন করার প্রবণতা থেকেই যখন আমরা কর্মক্ষেত্রে পৌঁছই, ঋতুস্রাব হোক বা মেনোপজ, কিছু নিয়েই খোলাখুলি আলোচনা করা হয় না। ফলে কোম্পানির বা সরকারের নীতিতে আর পরিবর্তন আসবে কী করে?

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের পক্ষ থেকে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে এসব নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়, তবে তা তৃণমূল স্তরে পৌঁছয় না। শুধু গ্রামাঞ্চলে নয়, শহরেও মহিলাদের প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে যতদিন না খোলাখুলি কথা বলার পরিবেশ তৈরি হবে, যতদিন এই বিষয়গুলিকে শুধু মহিলাদের সমস্যা হিসাবে দেখা হবে, ততদিন আইনের পরিবর্তন হওয়া অসম্ভব।

মহিলাদের শারীরবৃত্তীয় বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দিলে তাদের কাজে নেওয়া সম্ভব হবে না বলে যুক্তি দেওয়া হয়। কথা হল, বাদ দেওয়া হবে মানে বিকল্প পুরুষ শ্রমিক আছে, তাই মহিলা শ্রমিকদের বাদ দেওয়া যেতে পারে। বিকল্পের এই ধারণাই তো আসছে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব থেকে। পুরুষতান্ত্রিকতা শুধু পুরুষরা বহন করেন না, তাই স্মৃতি মহিলা হলেও তাঁর ২০২৩ সালের সেই বক্তব্যে পুরুষতান্ত্রিক স্বরই ধ্বনিত হয়েছে। পরিবর্তন একদিনে আসবে না, তবে মানসিকতা একটু একটু করে বদলালে দেশের আইনে হয়ত আজ থেকে ১৫-২০ বছর পর বদল আনা সম্ভব। তাতে আমাদের প্রজন্ম না হলেও আমাদের পরের প্রজন্মের মহিলা কর্মীরা হয়ত আরেকটু ভাল থাকবেন।

নিবন্ধকার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.