নিজের কবিতাকে পরে গানে রূপান্তরিত করা রবীন্দ্রনাথের জীবনে ঘটেছে অসংখ্যবার। কিন্তু গান হিসাবে তৈরি করার পর কবিতায় পরিবর্তিত করার বিস্ময়কর প্রয়াস দেখা গেছে একবারই। একেবারে জীবনের উপান্তে। সানাই কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতাই আগে গান হিসাবে লিপিবদ্ধ ও সুরবদ্ধ হয়েছিল, কবি তাদের কাব্যের আদলে বেঁধেছেন পরে। বলা যেতে পারে, অত বিরাট মাপের স্রষ্টার পক্ষে এ যেন এক বিচিত্র নিরীক্ষা – সানাই প্রকাশিত হয়েছিল কবির প্রয়াণের মাত্র বছরখানেক আগে। অনেকে বলেন, এই দুঃসাহসী পরীক্ষার পিছনে রবীন্দ্রমনের একরকম অসহায়তা আছে। পঁচাত্তর বছর পেরনোর যেসব গান তাঁর হাত থেকে বেরিয়েছে, নিজের কণ্ঠসামর্থ্যে সেই গান গাইবার ক্ষমতা তখন তাঁর ফুরিয়ে এসেছে। এই প্রাকৃতিক ক্ষয়কে তিনি মন থেকে মেনে নিতে পারছিলেন না বলেই ওগুলিকে ঘুরিয়ে ধরতে চাইলেন কবিতার আদলে, একেবারে নতুনভাবে দেখতে চাইলেন নিজের সৃষ্টিকে, যেগুলোর জন্য প্রদর্শনী (performance) আর ততটা জরুরি নয়। এই বিশ্লেষণের প্রামাণ্যতা নিয়ে মন্তব্য না করেও বলা যায়, কবির এ এক বিচিত্র খেয়াল। এই ঘটনার আগে ও পরে গান থেকে কবিতায় ফিরে আসার কোনো তুলনীয় উদাহরণ জানা নেই।

আমাদের খুব পরিচিত কিছু গানের দৃষ্টান্ত আছে এই পারাপারে। যেমন ‘প্রেম এসেছিল নিঃশব্দ চরণে’ (কবিতা: আসা-যাওয়া), ‘আমি যে গান গাই’ (কবিতা: গানের খেয়া), ‘ওগো তুমি পঞ্চদশী’ (কবিতা: পূর্ণা), ‘এসো গো জ্বেলে দিয়ে যাও প্রদীপখানি’ (কবিতা: আহ্বান), ‘দৈবে তুমি কখন নেশায় পেয়ে’ (কবিতা: গানের জাল), ‘যে ছিল আমার স্বপনচারিণী’ (কবিতা: গান) ইত্যাদি ইত্যাদি। এরই ভিতর একটি গানকে আজ আমরা একটু নিবিড়ভাবে কাছে টেনে দেখতে চাই – সানাই কাব্যগ্রন্থে তার কবিতা-নাম ‘আধোজাগা’, আর সেই গানটি ‘স্বপ্নে আমার মনে হল’, লেখা হয়েছিল ১৯৩৯ সনের শেষার্ধে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এ এক আশ্চর্য গান, যা গ্রথিত হয়েছে প্রকৃতি পর্যায়ের বর্ষা উপ-পর্যায়ে। এই গানের ভিতর আছে বিস্ময়কর কিছু ভাবনার উপাদান, যা প্রতিবার গানটি শোনা বা পড়ার পর ছিটকে আসে আমাদের মনের উপকূলে। আমরা একবার পড়ে নিই গানটি।

স্বপ্নে আমার মনে হল     কখন      ঘা দিলে আমার দ্বারে,   হায়।

     আমি   জাগি নাই জাগি নাই গো,

            তুমি   মিলালে অন্ধকারে,       হায়॥

                   অচেতন মনো-মাঝে   তখন   রিমিঝিমি ধ্বনি বাজে,

             কাঁপিল বনের হাওয়া ঝিল্লিঝঙ্কারে।

          আমি   জাগি নাই জাগি নাই গো,   নদী    বহিল বনের পারে॥

পথিক এল দুই প্রহরে                  পথের আহ্বান আনি ঘরে।

        শিয়রে নীরব বীণা                 বেজেছিল কি জানি না–

জাগি নাই জাগি নাই গো,

             ঘিরেছিল বনগন্ধ ঘুমের চারি ধারে॥

এ গান যে সম্পূর্ণত স্বপ্ন-লিখন, তা গোড়াতেই স্পষ্ট হয়ে যায় আমাদের কাছে। রচয়িতার স্বপ্নের অবচেতনে তিনি একটা কিছু বুঝতে পারছেন, কেউ এসেছিল তাঁর ঘরে। কিন্তু দরজায় করাঘাত অনুভব করলেও জেগে উঠে তাকে অভ্যর্থনা করার সুযোগ ঘটেনি। মূলত এই আক্ষেপ নিয়েই গান প্রথম আঘাত করে শ্রোতার তন্ত্রীতে। কিন্তু কে এসেছিল ? একেকটি সার্থক কবিতার মতই রবীন্দ্রনাথের গানে এই রহস্যের বিধুরতা আমাদের কাছে নতুন নয়। সত্যিই তো, কে এসেছিল এবং কে-ই বা সাড়া না পেয়ে মিলিয়ে গেল আঁধারে? এখানে ‘প্রেম এসেছিল নিঃশব্দ চরণে/তাই স্বপ্ন মনে হল তারে’ গানের কথা একটু খেয়াল করা যাক। প্রেমকে স্বপ্নের মতই অধরা হিসাবে চিহ্নিত করার কথা বলা হল এখানে। তাহলে যে এসেছিল সে কি প্রেমের দূত? এর যে কোনো স্পষ্ট উত্তর গানে আছে তা নয়। তবে গানের শরীরে আরও খুঁটিয়ে লক্ষ করলে দুটি উপাদান দেখা যাচ্ছে। প্রথমত, বনের কথা গানে এল তিনবার, আর দুটি ধ্বনির উল্লেখ – ‘রিমিঝিমি ধ্বনি’ আর ‘ঝিল্লি ঝঙ্কার’। একটি আভাস হয়ত এই যে যিনি করাঘাত শুনে জাগেননি, তিনি আসলে আছেন এক বনের অন্তরালে। এই বনকে খুব আক্ষরিক অর্থে অরণ্য হিসাবে মানতেই হবে, এমন নয়। বন একটি উপমা, যার ইঙ্গিত আসলে একটি আড়াল। কিন্তু সূক্ষ্মতর বিচারে দেখা যায় এই ‘ঝিল্লি ঝঙ্কার’ ও ‘রিমিঝিমি ধ্বনি’-র পাশাপাশি ব্যবহার খুব নতুন। ঝিল্লির আওয়াজ সাধারণত এমন কম্পাঙ্কের নয় যা কোনো বড় আওয়াজকে ঢেকে দিতে পারে, অথচ ‘ঝঙ্কার’ শব্দটির প্রয়োগে আসলে বলা হল সেই কল্পিত বনে ঝিল্লির আওয়াজ হাওয়ার সঙ্গতে এতদূর প্রবল যা করাঘাত ঢেকে দিতে পারে। কিন্তু দরজায় ঘা দেওয়ার শব্দ যে একদম শোনা যায়নি তা নয়। বরং তাকে চিহ্নিত করা যায়নি, আর তাই স্বপ্নের অচেতনেই ওই রিমিঝিমি ধ্বনি বুঝি বা সেই অস্পষ্ট আঘাতের রেশ রেখে যায়। অন্য এক গানে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘তার চলে যাওয়ার শব্দ শুনে/ভাঙল রে ঘুম অন্ধকারে’। আমাদের আলোচ্য গানের পটচিত্রে কিন্তু শুধুই ঘুম না-ভাঙার আক্ষেপ। আর গান দিয়ে আঁকা ক্যানভাসে দেখা গেল এক নদীকেও, যা বনের উপকণ্ঠে বহমান। শব্দের মিশ্রিত অভিঘাতের কথা ভাবলে নদীর বহমানতারও একটি স্বর আছে। তাহলে ঝিল্লির ঝঙ্কারের সঙ্গে কি মিশে গেল নদীর আওয়াজ, যা ঢেকে দেয় স্বপ্নের ভিতর এক নিশীথিনীর পদসঞ্চার?

গোড়াতেই বলা হয়েছে, এই গানকে তিনি কবিতায় রূপান্তরিত করেছেন। কবিতাটি খেয়াল করলে দেখা যায় (পাঠকের জন্য ‘আধোজাগা’ কবিতাটিও সংযোজিত হল, যদিও গানটি অনুভব করতে কবিতাটির পাঠ আবশ্যিক নয়)।

‘স্বপ্নে আমার মনে হল’ কবিতায় হয়ে গেছে ‘রাত্রে কখন মনে হল যেন’ এবং নদীর কোনো উল্লেখ কবিতায় নেই। সেখানে বলা হয়েছে ‘আধোজাগরণ বহিছে তখন/মৃদুমন্থরধারে।’ নান্দনিক বিচারে রাত্রের বদলে ‘স্বপ্নে’ শব্দের আবেদন বেশি গভীর, আবার কবিতার বিচারে নদীর পরিবর্তে ‘আধোজাগরণ’-এর বয়ে চলার ছবি সুতীব্র কাব্যিক। এক মাধ্যম থেকে ভিন্ন মাধ্যমে যাতায়াত করার এইসব ব্যঞ্জনাময় পায়ের ছাপগুলি খেয়াল করার মত। পাশাপাশি গান ও কবিতাকে রেখে দেখলে এমন উপাদান আরও মিলবে।

এবার এক অন্য প্রসঙ্গ। রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গানের সঙ্গে অনিবার্য হয়ে জড়িয়ে থাকে এক রহস্যময়ীর আসা যাওয়ার কথা। ‘তিমির অবগুণ্ঠনে বদন তব ঢাকি’ যে এসে দাঁড়ায় অঙ্গনে, তাকে তিনি বার বার প্রশ্ন করেন ‘কে তুমি?’ ‘বরিষণ মুখরিত’ শ্রাবণ রাতে তিনি অনুভব করেন ‘আসিছে সে ধারাজলে/নীপবনে পুলক জাগায়ে’ আবার ‘শ্রাবণঘন গহন মোহে নিশার মতো নীরব’ হয়ে সবার দৃষ্টি এড়িয়ে কেউ একজন গোপন চরণ ফেলে এসে দাঁড়ায় তার কুটিরে। কখনো আকাশের গায়ে তিনি দেখতে পান ‘প্রিয়ার ছায়া’-র ভাসমান ছবি, কখনো এমনই কোনো একান্ত প্রণয়িনীকে তিনি আর্তি জানান ‘এসো গো জ্বেলে দিয়ে যাও প্রদীপখানি/ বিজন ঘরের কোণে’। আবার এমন কারোর জন্যই তিনি পথ হতে গেঁথে নিয়ে আসেন ‘সিক্ত যূথীর মালা/ সকরুণ-নিবেদনের-গন্ধ-ঢালা’, আবার এমনও ঘটে তিনি চিনতে পারেন না এই অপর সত্তাটিকে, লেখেন ‘আমায় দাও গো বলে দাও গো বলে/সে কি তুমি, সেকি তুমি’।

আমাদের আলোচ্য গানের ক্ষেত্রে এই ‘সে কি তুমি’ প্রশ্নের প্রত্যক্ষ অভিক্ষেপ না থাকলেও তার একটি আবছায়া স্তর আছে। তা বুঝতে পারা যায় গানের সঞ্চারী ও আভোগে এসে। স্থায়ী ও অন্তরায় স্বপ্নের অচেতনে বাইরের আহ্বানে সাড়া না দিতে পারার যে আক্ষেপ, তা কিন্তু এবার ভিন্ন চেহারা নেয় পরের পর্বে। সঞ্চারীর শুরুতেই বলা হল, ‘পথিক এল দুই প্রহরে পথের আহ্বান আনি ঘরে’। এই পথিকই কি আগে এসেছিল? প্রথম প্রহরে যে আসে এ কি সেই একই সত্তা? একটু নিবিড় পাঠে দেখা যাচ্ছে, যার করাঘাতে কবির ঘুম ভাঙল না বলে প্রাথমিক আক্ষেপ, তিনি কিন্তু অপরিচিত নন। তাহলে গানের প্রথমে ‘তুমি মিলালে অন্ধকারে’ বলা যেত না। যে এসেছে বা যার আসার কথা ছিল তাকে যদি না-ই চিনতাম, তাহলে কি ‘তুমি’ বলতে পারি? তাকে ‘সে’ বলা যায়। কিন্তু ‘তুমি’ মানে তিনি পরিচিত বা পরিচিতা, আর এই পরিচয়ের সূত্র খুঁজে পেয়েই শুরু হয়েছে আক্ষেপ ‘আমি জাগি নাই জাগি নাই গো’।

রবীন্দ্রনাথের গানে ‘সে’ আর ‘তুমি’-র এইসব স্পষ্ট প্রয়োগ আছে বলেই ভরসা করে এমন ভাবা যায়। দুটি গানের কথা মনে করি। ‘তুমি মোর পাও নাই পরিচয়’। এখানে তুমির প্রয়োগ নির্দিষ্ট, অন্যদিকে ‘সে যে পাশে এসে বসেছিল তবু জাগিনি’ – এখানে আবার সেই না-জাগার আক্ষেপ। তাই আমাদের আলোচ্য গানের কথা বিচার করতে গেলে মনে হচ্ছে, ‘দুই প্রহরে’ আসা পথিক আর যিনি অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁরা এক নন। প্রথমজন পরিচিত, পরেরজন তা নন। কিন্তু তিনি ‘পথের আহ্বান’ নিয়ে এসেছেন কবির কাছে। প্রথমজন শুধু দরজায় ঘা দিয়েছেন, কোনো বার্তা কিন্তু দেননি। পথের আহ্বান? তার মানে কবি রয়েছেন এক নদী-ঘেরা বনের আড়ালে, যেখানে ঝিল্লিরাও ঝঙ্কার তুলতে পারে, হাওয়ার শব্দ প্রবল হয়ে ঢেকে দেয় অবশিষ্ট আওয়াজ। সেই চাপা পড়া শব্দে স্বপ্নের ভিতর কেবলই মনে হয় কেউ যেন ঘা দিচ্ছে দরজায় – দরজা যখন, তখন সেটা ঘর – রুদ্ধ এক যাপনের দ্যোতক। রাত্রি দুই প্রহরে আবার কেউ আসে, সেই ঘরের বাধা ছিন্ন করে তাকে ডাক দিতে থাকে বাইরের দিকে। ‘আধোজাগা’ কবিতার দিকে আরেকবার তাকিয়ে দেখি এই অংশটা ‘গভীর মন্দ্রস্বরে/কে করেছে পাঠ পথের মন্ত্র/মোর নির্জন ঘরে।’

আরো পড়ুন বাঙালির রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা: অনুভবের ছবি

একটি প্রশ্ন উঠে আসে এখানে। দ্বিতীয় প্রহরে যিনি এলেন তাঁকে কিন্তু কবি সুনির্দিষ্টভাবে চেনেন না, তাঁকে বলেন পথিক (কবিতায় ‘পথিক’ কথাটা নেই। বরং ‘কে করেছে পাঠ পথের মন্ত্র’ পংক্তিতে একটি জিজ্ঞাসা আছে)। কিন্তু তিনি যে পথের আহ্বান বা পথের মন্ত্র পাঠ করছেন তা তিনি শুনতে পেয়েছেন বা পাচ্ছেন। অর্থাৎ তিনি তখন আর ঘুমে নেই, জাগরণে। এখানেই গানটি উত্তীর্ণ হতে থাকে ভিন্ন মাত্রায়। প্রথম পর্বে অচেতন কবিমানস অনুভব করল বাইরের ডাক, ডাক কে দিল বুঝতেও পারল। কিন্তু তিনি জেগে উঠে সাড়া দিতে পারলেন না। আর দুই প্রহরে যে অজানা পথিক তাঁকে ডাক দিল, তার আহ্বান তিনি শুনলেন, তবু আফসোসে ভেঙে পড়ছেন ‘আমি জাগি নাই জাগি নাই গো’! প্রথম ‘জাগি নাই’ আর শেষের ‘জাগি নাই’ স্পষ্টত দুটি আলাদা অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকে এই গানে। যেন বা চেতনার স্তরান্তর ঘটে যায় এইভাবেই। এই দুয়ের মাঝে আছে এক নীরব বীণার উল্লেখ, যা বেজে উঠল কিনা তাও বোঝা যায় না। কেন এই বীণার উল্লেখ ? তবে কি ওই বীণার তারের ঝঙ্কারেই বেজে ওঠার কথা ছিল ঘর ছাড়ার গানের?

বীণাকে নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে একাকার করার কথা পাই আরেকটি গানে ‘আমারে করো তোমার বীণা/লহ গো লহ তুলে।’ আরেক চেনা গানে নিজের বীণাকে ‘নব চঞ্চল ছন্দে’ বেজে উঠতে দেখে তিনি স্পন্দিত হন। শিয়রে বীণাকে স্থাপন করে তিনি কি ভেবেছেন তারই সুরের ভিতর দিয়ে তিনি পেয়ে যাবেন ঘরভাঙার চাবি? এই অনুমান খুব অসঙ্গত নয়। কিন্তু বীণা বাজল কিনা এখানে তাও তিনি বুঝতে পারছেন না। কেন? পথের আহ্বান টের পাচ্ছেন অথচ বীণার জাগৃতি তাঁর শ্রুতির বাইরে? এই জিজ্ঞাসা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতেই আসলে আমরা বুঝব এই গানে ‘আমি জাগি নাই জাগি নাই গো’ দুবার উচ্চারিত হলেও তার মাত্রা দুরকম। অন্তরায় যে আক্ষেপ তার পিছনে অচেতন স্বপ্নের ঘোর স্পষ্ট। কিন্তু আভোগের জেগে না ওঠা আসলে প্রতীকী, কারণ তার আগের অবস্থান জানিয়ে দেয় তিনি শারীরিকভাবে জেগে আছেন। তাই এরপরেও ঘুম না ভাঙা মানে অন্তর-চেতনার সেই স্থিতিজাড্য, যা পথের আহ্বানকে শেষ অবধি নিজের ভিতর আসন পেতে দিতে ব্যর্থ – সেও এক ঘুম। তার ব্যাখ্যাটিও অনবদ্য – ‘ঘিরেছিল বনগন্ধ ঘুমের চারিধারে’। বনের গন্ধ ঘুমের চারিধারে ছেয়ে আছে – এমন একটি চিত্রকল্প রচনা বহু শতাব্দীর মনীষার কাজ। যাঁরা রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়া খুব সহজ ও অনায়াসসাধ্য বলে মনে করেন, তাঁরা গান গাইবার আগে ভেবে দেখবেন এই দৃশ্যকল্প, তারপর সুর লাগাবেন।

বিস্ময়ের কথা এই যে, অন্তরায় ‘নদী বহিল বনের ধারে’ আর আভোগের শেষ লাইনে ‘ঘিরেছিল বনগন্ধ ঘুমের চারিধারে’ – এই দুই সুরের চলনে ওই দুই ভিন্ন জেগে না থাকার ইঙ্গিত আছে। ‘নদী বহিল বনের ধারে’-তে সুরের চলন মুক্ত, যেন নদীর বয়ে যাওয়ার মতই। বনগন্ধ যে ঘুমের চারিধারে ঘিরে আছে তা বোঝাতে ‘চারিধারে’-র চারটি মাত্রার মধ্যে রয়েছে এক আবর্তন, যেন বা সুর দিয়েই ঘিরে রাখা হল ঘুমকে। এই সুরই কি তাহলে প্রতিরোধ করল আরেক সুরের সঞ্চার? যে সুরে বাজতে পারত শিয়রের নীরব বীণা, চঞ্চল ছন্দে স্পন্দিত করতে পারত কবির ভিতরের সেই স্থবিরতাকে! এক ঘুম থেকে আরেক ঘুমের পদচারণায়, জেগে থাকার দুই ভিন্ন স্তরের বিরোধাভাসে, ঘুম না-ভাঙার এক অতলস্পর্শী বেদনায় আর আক্ষেপে ভিজে যায় এই গান।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.