নানা কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন বিজেপিকে ভোটে জিতিয়ে দিচ্ছে – এই অভিযোগে বিরোধীরা বহুদিন সরব। এবার সুনির্দিষ্ট তথ্য হাজির করে সেই অভিযোগ আরও জোরালো করলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। গতকালের (৭ অগাস্ট, বৃহস্পতিবার) সাংবাদিক সম্মেলনে রাহুল কারচুপির একেবারে কাগুজে প্রমাণ প্রকাশ্যে এনেছেন। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হলেও নির্বাচন কমিশন বৈদ্যুতিন ভোটার তালিকা দেয়নি, নিয়ম বদলে ফেলে ভোটদানের ৪৫ দিন পরেই বুথের সিসিটিভি ফুটেজও মুছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে ফেলেছে ইতিমধ্যেই।
সাংবাদিক সম্মেলনে রাহুল নমুনা বা মডেল হিসাবে ব্যাঙ্গালোর সেন্ট্রাল লোকসভা কেন্দ্রের মহাদেবপুরা বিধানসভার ভোটার তালিকায় ব্যাপক কারচুপির সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ পেশ করেন। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে ওই কেন্দ্রে বিজেপি ৩২,৭০৭ ভোটে কংগ্রেসকে হারিয়ে জিতেছিল। ব্যাঙ্গালোর সেন্ট্রাল লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত সব বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপির থেকে কংগ্রেস বেশি ভোট পেলেও ব্যতিক্রম ছিল মহাদেবপুরা বিধানসভা এলাকা। সেখানে বিজেপি প্রার্থী কংগ্রেস প্রার্থীর থেকে ১,১৪,০৪৬টি বেশি ভোট পান। ফলে লোকসভা কেন্দ্রটি বিজেপি জিতে যায়। ভোটার তালিকায় ব্যাপক কারচুপির ফলেই এই অস্বাভাবিক ঘটনা সম্ভব হয়েছিল বলে রাহুলের অভিযোগ। তিনি দেখিয়েছেন যে মোট পাঁচটি পদ্ধতিতে এই চুরি হয়েছে। একই ব্যক্তির নাম একাধিক জায়গার ভোটার তালিকায় তোলা হয়েছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে দেখান, কেবল আলাদা আলাদা বুথেই নয়, কারো কারো নাম একইসঙ্গে মহাদেবপুরা, উত্তরপ্রদেশের দুটি কেন্দ্র এবং মহারাষ্ট্রের একটি কেন্দ্র মিলিয়ে মোট চার জায়গার ভোটার তালিকায় রয়েছে। এইরকম অবৈধ ভোটার মহাদেবপুরায় ১১,৯৬৫ জন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ভুয়ো ও অবৈধ ঠিকানা দিয়েও ভোটার তালিকায় নাম ঢোকানো হয়েছে। তিনি দেখান যে, অনেকের বাড়ির নম্বর ০, অনেকের বাবার নামের জায়গায় এলোমেলো ইংরিজি বর্ণ। এমনভাবে ৪০,০০৯ জনের নাম তোলা হয়েছে। কারচুপির তৃতীয় পদ্ধতি হল, একই বাড়ির ঠিকানা দেখিয়ে বহু ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকায় ঢোকানো। উদাহরণস্বরূপ, এক কামরার একটি বাড়ির ঠিকানায় ৪৬ জনের নাম রয়েছে। কোথাও আবার একই ঠিকানায় ৬৮ জনের নাম রয়েছে। গিয়ে দেখা গেছে সেই বাড়িতে তাঁরা কেউই থাকেন না। এভাবে নাকি ১০,৪৫২ জন ভোটারের নাম তোলা হয়েছে। মহাদেবপুরা বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকায় ৪,১৩২ জনের নামের পাশে হয় কোনো ছবি নেই বা অত্যন্ত ছোট ছবি রয়েছে, যা থেকে পরিচিতি যাচাই করা যাবে না।
সবচেয়ে বেশি কারচুপি হয়েছে নতুন ভোটারদের নাম তোলার ক্ষেত্রে। সাধারণভাবে ১৮ বছর বয়স হলে একজন ভোটার তালিকায় নাম তোলাতে পারেন। তার জন্য ফর্ম নং ৬ পূরণ করতে হয়। রাহুলের অভিযোগ – এই ফর্মের ব্যাপক অপব্যবহার হয়েছে। অতি বৃদ্ধ, যেমন ৮৫ বছর, ৯৬ বা ৯৮ বছর বয়স দেখিয়েও অনেকের নাম তোলা হয়েছে। কারোর কারোর নাম নতুন করে দুবার তোলা হয়েছে। যেমন একজন মহিলার নাম শকুন রানী। প্রথম নাম শকুন। তাঁরই নাম দ্বিতীয়বার শকুনরানী বলে রয়েছে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে নাম আর পদবি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর বয়স লেখা আছে ৭০ বছর। শুধু তাই নয়, দুটি নামেই তাঁর ভোট পড়েছে। ছবি দেখে বোঝা যাচ্ছে, দুজনে একই মহিলা। এভাবে নতুন ভোটার হিসাবে ৩৩,৬৯২ জনের নাম তুলে কারচুপি হয়েছে। রাহুল কটাক্ষ করে বলেছেন, প্রচার করা হয় যে নতুন তরুণ ভোটাররা নাকি নরেন্দ্র মোদীর ভক্ত। এই হচ্ছে সেই নতুন ভোটাররা। রাহুলের হিসাব অনুসারে, এই পাঁচ পদ্ধতিতে শুধুমাত্র মহাদেবপুরা বিধানসভা কেন্দ্রেই মোট ১,০০,২৫০ ভুয়ো ভোটারের নাম যোগ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন বিজেপিকে জেতাতেই এই চুরি করেছে।
রাহুলের মতে, এই কারণেই নির্বাচন কমিশন বৈদ্যুতিন ভোটার তালিকা প্রকাশ করছে না। কারণ তা করলে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে এই কারচুপি ধরা যেত। কংগ্রেসের ৩০-৩৫ জন ছয় মাস ধরে ভোটার তালিকা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে এই কারচুপি ধরেছেন। কারচুপির তথ্যপ্রমাণ লোপাট করতেই নির্বাচন কমিশন দ্রুততার সঙ্গে ভিডিও ফুটেজ নষ্ট করে ফেলছে বলেও রাহুলের ধারনা। রাহুলের অভিযোগ, এভাবে কারচুপি করেই গত লোকসভা ভোটে মোদীজি তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। সারা দেশে ২৫টি লোকসভা কেন্দ্রে বিজেপি ৩৩,০০০-এর কম ভোটের ব্যবধানে জিতেছে। মহাদেবপুরার মতই ভোটার তালিকায় চুরি করে নির্বাচন কমিশন সেইসব আসনে বিজেপিকে জিতিয়েছে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
একে নির্বাচন কমিশন দ্বারা সংবিধানের উপরে আক্রমণ বলে আখ্যা দিয়েছেন রাহুল। গত লোকসভা নির্বাচনে সংবিধান বাঁচানোর ইস্যুকে মুখ্য করেই কংগ্রেস তথা ইন্ডিয়া জোট প্রচার করেছিল। রাহুলের বক্তব্যে পরিষ্কার, নির্বাচন কমিশনের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সেই ইস্যুকেই হাতিয়ার করা হবে। তাই সাংবাদিকরা কংগ্রেস আগামীদিনে ভোট বয়কট করবে কিনা, ইভিএমে কারচুপি হচ্ছে কিনা – এসব নিয়ে প্রশ্ন করলেও, তিনি ভোটাধিকার চুরি যাওয়ার উপরেই জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, নির্বাচন কমিশন এমন চুরি করলে ইভিএম বা ব্যালট পেপার – কোনোকিছু দিয়েই একজন নাগরিকের ভোটের পবিত্রতা রক্ষা করা যাবে না। তিনি গত ১০-১৫ বছরের বৈদ্যুতিন ভোটার তালিকা প্রকাশ এবং ভোটগ্রহণের ভিডিও ফুটেজ দেখানোর দাবি তুলেছেন।
গত লোকসভা নির্বাচনে কারচুপি নিয়ে কেবল কংগ্রেস বা ইন্ডিয়া জোটই নয়, অন্যান্য মহল থেকেও অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচন কমিশন প্রথম থেকেই ভোটদানের হার নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করেছিল। ২০২৪ সালের ১৯ এপ্রিল প্রথম দফার ভোট শেষ হওয়ার পর প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছিল ৬০% ভোট পড়েছে। ২৬ এপ্রিল দ্বিতীয় দফার পর নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল ৬১% ভোট পড়েছে। প্রাথমিক পরিসংখ্যানের থেকে চূড়ান্ত হিসাবে ভোটদানের হার কিছু বাড়ে। কয়েকদিনের মধ্যে তা জানিয়েও দেওয়া হয়। কিন্তু ১১ দিনেও যখন ভোটদানের চূড়ান্ত হার কমিশন জানাতে পারল না, তখনই প্রশ্ন উঠেছিল। তারপর নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত যে হিসাবে দিয়েছিল, তা প্রাথমিক হিসাবের থেকে ৬% বেশি। এটা অস্বাভাবিক। সবচেয়ে বড় কথা, আসনভিত্তিক তথ্য পরিষ্কারভাবে কমিশন তখনো জানায়নি। লোকসভা ভোট চলার সময়েই নির্বাচন কমিশনের এই ভূমিকা নিয়ে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছিল।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ভয়েস ফর ডেমোক্রেসি নামে একটা সংস্থা লোকসভা নির্বাচন নিয়ে এক রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাদের অভিযোগ, ভোটের সাতটা পর্বেই নির্বাচন কমিশন ভোটদানের হারের চূড়ান্ত হিসাব পেশে অস্বাভাবিক দেরি করেছে। প্রাথমিক ও চূড়ান্ত ঘোষণার মধ্যে ভোটদানের হারে ফারাকের মাত্রাও অস্বাভাবিক। তারা অভিযোগ করেছিল, হিসাবে কারচুপি করে ভোটদানের হার বেশি দেখিয়ে নির্বাচনী ফলকে প্রভাবিত করা হয়েছে। এভাবে ৭৯টি আসনে বিজেপি কারচুপি করে জিতেছে। অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রাইটস নামে একটা সংস্থাও সমীক্ষা করে এই কারচুপির অভিযোগ এনেছে। লোকসভা নির্বাচনে অনেক কেন্দ্রেই ভোটগ্রহণের শেষে ঘোষিত ভোটদানের হার এবং গণনার আগে ঘোষিত চূড়ান্ত হারের মধ্যে ৭% থেকে ১২% ফারাক দেখা গেছে।
আরো পড়ুন কোথাকার ভোট কোথায় গড়ায়? সন্দেহ দানা বেঁধেছে
২০২৫ সালের ৭ জুন দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজে রাহুলের লেখা ‘ম্যাচ-ফিক্সিং মহারাষ্ট্র’ শীর্ষক এক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি মহারাষ্ট্র বিধানসভা ভোটে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পাঁচ ধাপে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনেছিলেন। আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, বিহারেও এর পুনরাবৃত্তি হতে পারে। ২০১৯ ও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের মধ্যে পাঁচ বছরে মহারাষ্ট্রে ভোটার সংখ্যা বেড়েছিল ৩১ লক্ষ। মাত্র পাঁচ মাস পরেই নভেম্বরে বিধানসভা নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে ৪১ লক্ষ বেড়ে যায়। রাহুল ওই নিবন্ধে দেখিয়েছিলেন, মহারাষ্ট্রে প্রায় এক লক্ষ বুথের মধ্যে মাত্র ১২,০০০-এর কাছাকাছি বুথে ভোটার সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায়। সেই বুথগুলো রাজ্যের এমন ৮৫ বিধানসভা কেন্দ্রে ছড়িয়ে আছে, যেগুলোতে লোকসভা ভোটে বিজেপির ফল খারাপ হয়েছিল। সেই বুথগুলোতেই ভোটদানের হারে কারচুপি করে মহারাষ্ট্রে বিজেপি জোটকে জেতানো হয় বলে রাহুল অভিযোগ করেছিলেন। হরিয়ানা বিধানসভা ভোটেও কারচুপির অভিযোগ ওঠে।
গতকাল সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে রাহুল যে চিত্র তুলে ধরলেন, তাতে পুরনো অভিযোগগুলো স্বীকৃতি পেল। নির্বাচন কমিশন তখন বলেছিল, বিরোধীরা আগে কোনো অভিযোগ জানায়নি। এই সাংবাদিক সম্মেলনে একজন সাংবাদিক সেই প্রসঙ্গ তুললে রাহুল স্পষ্টত নির্বাচন কমিশনকে মিথ্যাবাদী বলেছেন। নির্বাচন কমিশন এদিনের সাংবাদিক সম্মেলনের প্রত্যুত্তরে পালটা চাপ ও প্রচ্ছন্ন হুমকি দেওয়ার পথ নিয়েছে। তারা রাহুলকে এই অভিযোগ যে সত্য তা শপথ আকারে ঘোষণা করে হলফনামা দিতে হবে বলে দাবি করেছে। নির্বাচন কমিশনের এই ঔদ্ধত্য আসলে অপরাধ আড়াল করার কৌশলমাত্র। এদিকে আজই বেশ কয়েকটা রাজ্যের নির্বাচন কমিশন নিজেদের ওয়েবসাইট থেকে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত তথ্য মুছে দিতে শুরু করেছে। এই কাজ নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে সন্দেহ বাড়ায় বৈ কমায় না।
বিহারে ভোটার তালিকার বিশেষ পরিমার্জন (এসআইআর) নিয়ে বিতর্কের আবহে রাহুলের সাংবাদিক সম্মেলন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বিহারে এসআইআর-এ ভুয়ো ভোটার এবং অনুপ্রবেশকারীদের নাম কাটার অজুহাতে ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন নিজেই যে ভুয়ো ভোটারের নাম তুলছে তা রাহুলের দেওয়া তথ্যে পরিষ্কার হয়ে গেছে। অনেক রাজ্যেই এসআইআর-এর মাধ্যমে বহুসংখ্যক গরিব, বিশেষত অন্য রাজ্য বা দেশে কাজ করতে যাওয়া প্রবাসী শ্রমিক, সংখ্যালঘু, তফসিলি জাতি ও উপজাতির নাগরিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে। সেই সত্য আড়াল করতে অনুপ্রবেশকারী, রোহিঙ্গা ইত্যাদি শব্দ উচ্চারণ করে দেশজুড়ে ধর্মীয়, ভাষাগত বিদ্বেষ ছড়াতে চাইছে বিজেপি। আগেই উত্তরপ্রদেশে বাছাই করে বহু জায়গায় সংখ্যালঘুদের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আবার কোথাও কেন্দ্র বাছাই করে ভোটার সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হচ্ছে। ভোটদানের হার নিয়েও কারচুপির অভিযোগ উঠছে।
নির্বাচন কমিশনের লুকোবার কিছু না থাকলে বৈদ্যুতিন ভোটার তালিকা এবং ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করে অভিযোগ খণ্ডন করতে পারত। তার বদলে চরম ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছে। মহারাষ্ট্রের বিধানসভা ভোটের পরেই ভিডিও ফুটেজ দেখানোর দাবি উঠেছিল। আদালত ভিডিওগ্রাফি ও ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করতে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশও দিয়েছিল। তারপরেই তড়িঘড়ি কেন্দ্রীয় সরকার কনডাক্ট অফ ইলেকশন রুলস, ১৯৬১-র ৯৩ নম্বর নিয়ম বদলে দিয়ে ভোটের সময়কার ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ্যে আনা আইনত নিষিদ্ধ করে। নির্বাচন কমিশনকে বাঁচাতে কেন্দ্রের এই তৎপরতা দুই পক্ষেরই তথ্যপ্রমাণ গোপন এবং নষ্ট করার মরিয়া প্রচেষ্টা সম্পর্কে সন্দেহ বাড়িয়ে তুলছে।
২০১৪ সালে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিজেপি নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আদালতের সঙ্গে সংঘাতে যেতেও পিছপা হচ্ছে না। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য প্রধানমন্ত্রী, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতাকে নিয়ে এক প্যানেল গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল। সেবছর ডিসেম্বর মাসে কেন্দ্র তাড়াহুড়ো করে এক আইন প্রণয়ন করে। সেই আইন অনুসারে প্রধানমন্ত্রী, তাঁর নিযুক্ত একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বিরোধী দলনেতাকে নিয়ে গঠিত প্যানেল নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করবে। অর্থাৎ প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে কেন্দ্রের শাসক দলের পাল্লা ভারি করা হয়।
লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগেই নির্বাচন কমিশনার অরুণ গোয়েল পদত্যাগ করেন। এর দিন সাতেকের মধ্যেই জ্ঞানেশ কুমার ও সুখবীর সিং সান্ধুকে নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত করা হয়। লোকসভার তৎকালীন বিরোধী দলনেতা অধীর চৌধুরী অবশ্য তাঁর আপত্তির কথা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল – সম্ভাব্য কমিশনারদের নামের তালিকা যাচাই করার পর্যাপ্ত সময় তাঁকে দেওয়া হয়নি। কার্যত প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ইচ্ছানুসারে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব কুমারের নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচন কমিশনই ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন পরিচালনা করেছিল। এখনো তাঁরাই দায়িত্বে। ২০২৩ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আইন করে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও স্বায়ত্তশাসনের মূলেই কুঠারাঘাত করা হয়েছে। তার পরিণতি ক্রমশ প্রকাশ্যে আসছে। সর্বজনীন ভোটাধিকার ভারতের গণতন্ত্রের বড় সম্পদ। স্বাধীন ভারত প্রথম নির্বাচন থেকেই নাগরিকদের এই অধিকার দিয়েছে। সেই অধিকারের উপর এত বড় আঘাত আগে কোনোদিন আসেনি। পরিকল্পনামাফিক নিয়মের জটিলতায় নাগরিকদের নাম ছেঁটে আবার ভুয়ো ভোটারের নাম ঢুকিয়ে সমগ্র নির্বাচন ব্যবস্থাকেই বিপন্ন করে তোলা হচ্ছে। যার পরিণাম নিকট ভবিষ্যতেই ভয়াবহ হবে। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মেলবন্ধনে ফ্যাসিবাদের পথ সুগম হচ্ছে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







