আজ সলিল চৌধুরীর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন শুরু হচ্ছে। তাঁর জন্মদিন নিয়ে কোনো বিতর্ক বা সংশয় নেই। কিন্তু জন্মের বছর নিয়ে কিছুটা সংশয় ও বিভ্রান্তি রয়েছে। সলিলের আত্মকথা বা তাঁর নানা সাক্ষাৎকারের সূত্রেই এই বিভ্রান্তির জন্ম। কখনো নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার উল্লেখ করে তখন তাঁর বয়সের কথা বলেছেন, কখনো একটি বছরকে জন্মের বছর বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর নিজের বলা এই কথাগুলোকে পাশাপাশি রাখলে হিসাব মেলে না। আবার তাঁর জন্মস্থানে একটি মর্মর মূর্তি বসানো হয়েছিল, সেখানে উল্লিখিত জন্মের বছরটি আরও ভিন্ন। ফলে ২০২২ সাল থেকেই কোনো কোনো সংগঠন তাঁর জন্মশতবর্ষ পালন শুরু করেছিলেন। এই বিভ্রান্তি দূর করার জন্যে সলিল-কন্যা অন্তরা সাংবাদিক সম্মেলন করে জানিয়েছেন যে সলিলের পাসপোর্টে তাঁর ১৯২৫ সালকেই জন্মের বছর হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই তথ্যকে স্বীকৃতি দিয়েই যেন জন্মশতবর্ষ উদযাপন করা হয়।

তাঁর বহু সহ-পথিকের মত সলিল কিন্তু বিস্মৃত ব্যক্তিত্ব নন। এমনটা নয় যে জন্মশতবর্ষেই তাঁর প্রাপ্য উদযাপন শুরু হবে। সলিলের সঙ্গীত আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী। আমরা যেমন তাঁর গান গাই, শুনি, ঠিক তেমনি আধুনিক সঙ্গীতের যে কোনো ছাত্রের কাছেই তাঁর সঙ্গীত একটি অবশ্য পাঠ। তাঁর গান না গেয়ে বা না শুনে যেমন আমাদের সঙ্গীতরুচি নির্মিত হয় না, তেমনি তাঁর গানের নিবিড় চর্চা ছাড়া আধুনিক সঙ্গীতের একজন ছাত্রের শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। ফলে তিনি সর্বক্ষণই আছেন সঙ্গীতের রাজাধিরাজের মত। তাঁর সঙ্গীতকে উপেক্ষা করার মত স্পর্ধা বা তাঁর সঙ্গীতকে পেরিয়ে যাওয়ার মত সৃষ্টি আজও হয়নি। তার মানে কি সলিলের পর আর কোনো উচ্চমানের সঙ্গীত সৃষ্টি হয়নি? এমন কথা বলা শুধু অসত্য নয়, অনৈতিহাসিকও। তবে এমন কথা বলা কেন? এর উত্তর খুঁজতে মানুষ সলিলের জীবন এবং সময়টাকে একটু বোঝা দরকার। এই প্রসঙ্গে বিশদ আলোচনায় যাওয়ার আগে আরেকটা কথা বলা প্রয়োজন। সলিলকে যেমন কিছুতেই বিস্মৃত ব্যক্তিত্ব বলা যায় না, তেমন এটাও সত্য যে বিচিত্র গুণের অধিকারী সলিলের জীবনের এমন অনেক দিক রয়েছে যা তুলনায় অনালোকিত বা বিস্মৃত। তিনি শুধুই আধুনিক সঙ্গীতের একজন স্রষ্টা ছিলেন না। তাঁর সৃষ্ট সঙ্গীতের যেমন নানা ধারা রয়েছে, তেমনি সংস্কৃতির আরও নানা শাখায় ছিল তাঁর সহজাত সন্তরণ এবং অসামান্য অবদান, যা সঙ্গীতস্রষ্টা সলিলের তুলনায় নিতান্তই উপেক্ষিত।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

তাঁর সতত উদযাপিত সঙ্গীতের মধ্যেও এক ধরনের বিভাজনের কাঁটাতার আমরা তৈরি করে রেখেছি, যার দুই পারে রয়েছেন তাঁর তথাকথিত দুধরনের সঙ্গীতের অনুরাগীরা। তাঁরা অন্য পারের ধরন সম্পর্কে উদাসীন। ফলে বাঙালির জীবনে দ্বিখণ্ডিত হয়ে রয়েছেন সলিল। একদল শুধু তাঁর গণসঙ্গীতের চর্চা করে। আরেক দল সীমাবদ্ধ থাকে শুধুমাত্র তাঁর আধুনিক সঙ্গীতে। প্রথম দল মনে করে, সলিলের আধুনিক গানগুলো তাঁর আদর্শগত অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার পরের সৃষ্টি, ফলে বিচ্যুতির ফসল। আরেক দল মনে করে সলিলের আধুনিক গানগুলোই প্রকৃত পরিণত সৃষ্টি। দুটোই তাঁর সঙ্গীতের অপরিণামদর্শী মূল্যায়ন। অপরিণামদর্শী কথাটা এক্ষেত্রে সুপ্রযুক্ত, কারণ এই বিভাজন থেকেই সমগ্র সলিলের উদযাপন অবহেলিত হয়েছে। এরই সূত্র ধরে সঙ্গীতের বাইরে সলিলের সৃষ্টি উপেক্ষিত থেকেছে। আসামের চা বাগান থেকে ২৪ পরগণা, ৪৬ ধর্মতলা স্ট্রিট থেকে মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র জগৎ অবধি ব্যাপ্ত তাঁর জীবনের অনেক অনেক অধ্যায় বিস্মৃতিতে ঢাকা পড়েছে। জন্মশতবর্ষ উদযাপনকে ঘিরে দুই সলিলের মাঝের কাঁটাতার উপড়ে ফেলে সমগ্র সলিলের চর্চা এবং তাঁর জীবনের বিস্মৃত অধ্যায়গুলোর কাছে ফিরে যাওয়াই হবে প্রকৃত শ্রদ্ধার্ঘ্য।

যে কালপর্বে সলিলের আত্মপ্রকাশ, তাকে অশোক মিত্রের মত মানুষ অভিহিত করেছেন বাংলার দ্বিতীয় নবজাগরণ বা আলোকায়ন হিসাবে। এই কালপর্বকে বিশেষায়িত করা যায় প্রগতি সাহিত্য ও গণনাট্য আন্দোলনের মাধ্যমে। উনিশ শতকের আলোকায়নকে বলা হয় মহানগরী কলকাতার সমাজের উচ্চকোটির মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ এক সামাজিক সাংস্কৃতিক আলোড়ন। কিন্তু সলিলের কালপর্বের বৈশিষ্ট্য ছিল সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটকে যেমন নায়কোচিত আবির্ভাব ঘটে সমাজের প্রান্তে থাকা শ্রমজীবী মানুষের; তেমনি প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে গিয়ে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতির নতুন আন্দোলন গড়ে তোলার ব্রত নিয়েছিলেন মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত সমাজ থেকে আসা একঝাঁক তরুণ তরুণী। ফ্যাসিবিরোধী প্রতিবাদ, ভারতের স্বাধীনতা এবং শোষণমুক্ত শ্রেণিহীন সমাজ গড়ে তোলা – এই ছিল তাঁদের ব্রত। এমন এক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসাবেই তাঁদের কেউ সাহিত্যিক হয়েছেন, কেউ নাট্যকার, কেউ চলচ্চিত্র পরিচালক, কেউ সঙ্গীতস্রষ্টা। শিল্প, সংস্কৃতির চর্চা এঁদের ক্ষেত্রে রাজনীতির থেকে আলাদা কোনো বিষয় ছিল না। রাজনীতির প্রয়োজনেই তাঁরা শিল্পের অঙ্গনে এসেছেন।

ঋত্বিক ঘটক প্রথমে কবিতা চর্চা করেছেন কিছুদিন। পরে মনে হল গল্পের মধ্য দিয়ে রাজনীতির প্রয়োজনীয় বার্তা প্রেরণ করবেন। আবার নবান্ন নাটকের অভিনয় দেখে তাঁর মনে হয় – গল্প নয়, নাটকের মাধ্যমেই অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া যায়। তখন গল্প ছেড়ে নাটকে চলে যান। পরবর্তীকালে তিনি অনুভব করেন যে নাটকের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম চলচ্চিত্র। ফলে নাটক ছেড়ে চলে যান চলচ্চিত্রে।

ছোটবেলা থেকেই সলিলের জীবনে সঙ্গীত ছিল। লোকসঙ্গীতসহ ভারতীয় ও পাশ্চাত্য সঙ্গীত তাঁর শ্রবণবিশ্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু সঙ্গীত রচনায় তাঁর হাতেখড়ি ২৪ পরগণার কৃষক আন্দোলনের প্রয়োজনে। কৃষকদের লড়াই, শ্রমিকদের ধর্মঘট, ছাত্র সংগঠনের সভা, সমিতি, সম্মেলন তাঁর গানের ভাষা জুগিয়েছে। একই সঙ্গে নাটক লিখেছেন, গল্প লিখেছেন, কবিতা লিখেছেন। সবকিছুই চলেছে সমান্তরালভাবে। ঋত্বিক যেমন এক শিল্পমাধ্যম ছেড়ে আরেকটায় গেছেন, সলিল তেমন করেননি। বাণিজ্যিক সঙ্গীতের বাধ্যবাধকতায় যে কথা বলতে পারেননি গানে, তাকে ব্যক্ত করেছেন কবিতায়। কবিতা ছিল তাঁর মুক্ত প্রাণের প্রকাশমাধ্যম। নাটক লিখেছেন সরাসরি আন্দোলনের প্রয়োজনে। যুদ্ধ, মন্বন্তর ও দেশভাগের কালপর্বে যে মর্মান্তিক ঘটনাবলী চোখের সামনে দেখেছেন তাকে তুলে ধরেছেন অনবদ্য ছোট গল্পগুলোতে। তাঁর ‘ড্রেসিং টেবিল’ গল্পটা বাদ দিয়ে বাংলা ভাষার দেশভাগ বিষয়ক সাহিত্যের সংকলন অসম্পূর্ণ। ‘ওরে সাবধানী পথিক’ নামে তাঁর একখানা অসম্পূর্ণ গল্প পড়লে মনে হয়, সেটা হয়ত তাঁর নিজের জীবনেরই কিছু অকথিত কথা বলার উদ্যোগ। সলিলের সাহিত্যকর্ম এক অর্থে বিস্মৃতই থেকেছে বাংলা সাহিত্যের বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে। তাঁর রচিত কবিতার পূর্ণাঙ্গ সংকলন প্রকাশিত হল জন্মশতবর্ষ উদযাপনকে কেন্দ্র করেই। সলিল যে কালপর্বের সন্তান, তখন মানুষ সংকীর্ণ পরিসরে জীবনকে সীমিত রাখত না। শিল্প সংস্কৃতি ও সমাজকর্মের নানা ধারায় সমানভাবে সক্রিয় থাকতেন সে যুগের উজ্জ্বল মানুষেরা। এটাকে হয়ত রেনেসাঁ চরিত্র বলা যায়। সলিল, ঋত্বিক, সত্যজিৎ রায় ছিলেন তেমনই একেকটা চরিত্র। পরবর্তী সময় এঁদের প্রত্যেককেই একেকটা কোটরে বন্দী করে দেখেছে। ফলে সত্যজিতের সঙ্গীত প্রতিভা যেভাবে থেকেছে উপেক্ষিত, সাহিত্যে সলিলের অবদান হয়ে গেছে বিস্মৃত। সরোদ বাদক ঋত্বিক রয়ে গেছেন অজানা।

আরো পড়ুন আমাদের সুরহীন, অকিঞ্চিৎকর জীবনের সন্ধ্যারাগ

সমগ্র সলিল বলতে গেলে শুধু সৃষ্টির দিক নিয়ে আলোচনা করলেও হবে না। আন্দোলনকর্মী বা অ্যাকটিভিস্ট সলিলের জীবন নিয়েও কথা বলা জরুরি। এই আন্দোলন কর্মের সূত্রেই তিনি শুরু করেছেন কিছু অত্যন্ত জরুরি তাত্ত্বিক বিতর্ক। সেই বিতর্কগুলো আজকের সময়েও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সলিলরা যখন গণনাট্য আন্দোলনে সক্রিয়, তখন শিল্প সাহিত্যের ভাষা নিয়ে কিছু মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। শ্রমিক কৃষককে উদ্বুদ্ধ করবে যে গান, তার সাঙ্গীতিক ভাষা কেমন হবে? স্বদেশী আন্দোলনের সময়ে মুকুন্দ দাস যে গানগুলো গেয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন, তার ভাষার আমরা অনেকটা অনুরণন পেয়েছি কাজী নজরুল ইসলামের দেশাত্মবোধক গানে। লাল নিশানের জয়গান গেয়ে ‘ওড়াও ওড়াও লাল নিশান’ গানখানা নজরুল সুর করেছিলেন বৈঠকী গানের আদলেই। গণনাট্যের ঠিক প্রাক-পর্বে ইয়ুথ কালচারাল ইনস্টিটিউটে সোভিয়েতের ফ্যাসিবিরোধী বিভিন্ন গান সরাসরি অনুবাদ করে গাওয়া হয়েছে। দেশাত্মবোধক গানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেনের হাত ধরে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সুর আগেই চলে এসেছিল। গণনাট্য সঙ্ঘে যখন গণসঙ্গীত রচিত হচ্ছে তখন সেখানেও ছিল সুরের নানা ধারা। জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের গান ছিল ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও রবীন্দ্রসঙ্গীত দ্বারা প্রভাবিত। হেমাঙ্গ বিশ্বাস মূলত প্রচলিত লোকসঙ্গীতের উপর কথা বসিয়ে গান লিখেছেন। সলিল প্রথম থেকেই নানা ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন। লোকসুর যেমন ব্যবহার করেছেন, তেমনি বাংলা গানে হারমোনাইজেশন ও অর্কেস্ট্রেশন নিয়ে এসেছেন। তখন হেমাঙ্গরা প্রশ্ন তুলেছিলেন, এই সুর গরিব শ্রমিক, কৃষকদের ভালো লাগবে কিনা। তাঁদের বক্তব্য ছিল, গরিব মানুষের কাছে পৌঁছতে হলে শুধুমাত্র লোকসঙ্গীতের উপর নির্ভর করতে হবে। কারণ তাঁরা এই সুর শুনেই অভ্যস্ত।

কিন্তু সলিলের কাছে সুর আর কথা পরস্পর বিযুক্ত বিষয় ছিল না। নতুন দিনের আহ্বান জানিয়ে যে গান রচিত হবে, তার সুর অবশ্যই নতুন হবে – এই তাঁর তত্ত্ব। বেহালা, ক্ল্যারিওনেটের মত সঙ্গীতযন্ত্র যে বাংলার গ্রামাঞ্চলের সঙ্গীতচর্চার অঙ্গ হয়ে গেছে সেখানে পাশ্চাত্যের সঙ্গীতকে বর্জন করার কথা বলা প্রতিক্রিয়াশীলতাই। এছাড়াও সরাসরি আন্দোলন, সংগ্রামের গানের বাইরে মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রার গানকেও গণনাট্যের অধীত বিষয় করতে হবে – এই ছিল সলিলের সঙ্গীতাদর্শ। তিনি বলেন, মিছিলে, সভা সমিতিতে গিয়ে গণসঙ্গীত শুনে যে মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়, সে বাড়ি ফিরে কি আবার প্রতিক্রিয়াশীল বাণীর গানেই ফিরে যাবে? একটা বিকল্প জীবনবোধের গান রচনা করা কি আমাদের দায়িত্ব নয়? বলা বাহুল্য, সংস্কৃতি আন্দোলনের নিরিখে এ এক প্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক প্রশ্ন। গণনাট্য কর্মীর জীবন জীবিকার বিষয়কেও এক সঠিক নীতিগত অবস্থান থেকে দেখার কথা সেইসময় তিনি উত্থাপন করেছেন। সলিলের উত্থাপিত প্রশ্নগুলো যে আজও প্রাসঙ্গিক শুধু তাই নয়, অনেকসময়েই এই বিষয়গুলোর পুরোপুরি নিষ্পত্তি বামপন্থী সংস্কৃতি আন্দোলনের পরিসরে হয়নি।

জন্মশতবর্ষে খণ্ড সলিল চর্চা থেকে বেরিয়ে এসে সমগ্র সলিলের দিকে যদি নজর দিই, তাহলে কিছু অসামান্য ব্যাপার নজরে আসবে। আমরা দেখব যে সলিলের সঙ্গীত জীবনের দুটো পর্বের সমস্ত সৃষ্টিই এক অভিন্ন আদর্শের ধারায় প্রবাহিত। আধুনিক গান বলে যে গানগুলোকে তাঁর আন্দোলনের সহকর্মীরা দূরে ঠেলে রেখেছেন, তার গভীরেও রাজনৈতিক ভাবনা নিহিত রয়েছে। ‘সাত ভাই চম্পা’ বা ‘ক্লান্তি নামে গো’ বা ‘আমি আসছি’ বা ‘আজ নয় গুণগুণ’ গানগুলো স্রেফ অরাজনৈতিক বিনোদনের গান নয়। এমনকি বাণিজ্যিক কোম্পানির জন্যে ছোটদের গান হিসাবে যেসব গান তিনি সৃষ্টি করেছেন সেখানেও এক বিকল্প জীবনভাবনাকেই শিশুদের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন।

তাঁর গানের অর্কেস্ট্রেশন বা হারমোনাইজেশনও শুধুমাত্র আঙ্গিকগত বিষয় নয়। সামগ্রিক গানের উন্মোচন এই বিষয়গুলো ছাড়া অসম্পূর্ণ।

একজন বিশিষ্ট সঙ্গীত পরিচালকের মতে, গানের হারমোনাইজেশনের অংশগুলো শুধুমাত্র গানের মূল সুরের সাঙ্গীতিক সাযুজ্যে নির্মিত হয়নি। গানের বাণী সেখানে নির্ধারণ করেছে হারমোনাইজেশনের ধরন। এমনকি কখনো কখনো একই সুরের অন্তরায় হারমোনাইজেশন ভিন্ন হয়েছে গানের বাণীর নিরিখে। সঙ্গীতের প্রকরণ গানের বাণী বা স্রষ্টার জীবনাদর্শ বাদ দিয়ে তৈরি হয়নি। তাঁর আন্দোলনকর্মী জীবনও সরাসরি ছাপ রেখেছে সাঙ্গীতিক ব্যক্তিত্বে। আসামের প্রত্যন্ত চা বাগানের সমাজ জীবন, ২৪ পরগণার কৃষক আন্দোলন, মামাবাড়ির অঞ্চলের ধাঙড়দের ধর্মঘটের অভিজ্ঞতা, রেল শ্রমিকদের আন্দোলন – এসব বাদ দিয়ে সলিলের সঙ্গীতকেও চেনা যাবে না। সেজন্যেই উত্তরকালের বহু সঙ্গীত পরিচালক ও স্রষ্টা সলিলীয় ঘরানার সঙ্গীতে নিজের সৃষ্টিকে সাজানোর চেষ্টা করলেও তাঁর যথার্থ উত্তরাধিকার তৈরি হয়নি। এমনকি সলিলের আত্মজাও, গুণী শিল্পী হওয়া সত্ত্বেও, তাঁর উত্তরাধিকার সম্পূর্ণ বহন করতে সমর্থ হননি। সলিলের মত স্রষ্টার উত্তরাধিকার কখনোই রক্তধারায় বাহিত হয় না, হয় জীবনাদর্শের ধারাবাহিকতায়। সেই ধারাবাহিকতা নির্মাণই সলিলের জন্মশতবর্ষে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হল, আমরা সেই নির্মাণের কতটা যোগ্য?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

  1. সলিল চৌধুরী এক ভিন্ন ধারার স্রষ্টা। উনি অনুকরণীয়। ওঁর নিজস্বী ওঁর প্রতিটি সৃষ্টিতে বিরাজমান।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.