তারিখটা ছিল ১৯ নভেম্বর, বিশ্ব শৌচালয় দিবস। লিঙ্গ ও শৌচ বিষয়ক আলোচনা সভায় কথা বলছিলেন প্রতিবন্ধী মানুষেরা। তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা জানাচ্ছিলেন। সরকারি কর্মকর্তা, এনজিও কর্মী – এমন অনেক মানুষের ভিড়ে উত্তরাখণ্ড থেকে আগত নিতু রানী জানান তাঁর বড় হয়ে ওঠার কথা। নিতুর পোলিও ধরা পড়ার পর এবং তিনি আর কোনোদিনই ‘স্বাভাবিক’ উপায়ে চলাফেরা করতে পারবেন না জানার পর পরিবারের তাঁর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের বিবরণ শুনে অনেকেই স্তম্ভিত হয়ে যান।

নিতুর মা এবং মামাবাড়ির আত্মীয়স্বজন তাঁকে বিষ ইনজেক্ট করে মেরে ফেলা উচিত বলে মনে করেছিলেন। তাঁর ঠাকুমা তাঁকে দেখাশোনা করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন বলেই নিতু এখনো বেঁচে আছেন। পারিবারিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা, যাতে বারবার বাথরুমে নিয়ে না যেতে হয় তার জন্য কম খেতে দেওয়া – এই অভিজ্ঞতাগুলো অনেক প্রতিবন্ধী মেয়েদের জীবনের সঙ্গেই মিলে যায়। যেহেতু তিনি গ্রামে বড় হয়েছেন, সেহেতু কলের জল কাছাকাছি ছিল না। অনেকটা দূরে গিয়ে জল তুলতে পারা একজন প্রতিবন্ধী মেয়ের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে বহুবার তাঁর ‘ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন’ হয়েছে। তার উপর বাড়িতে হুইলচেয়ার নিয়ে চলাফেরা করার জায়গা নেই, তাই মাটিতে বসে বসেই চলা ফেরা করতে হয়। বাথরুম ভিজে থাকলে সেই ভিজে বাথরুমই ব্যবহার করতে হয়। মুম্বাইয়ের সাজানো গোছানো হোটেলে বসে এসব কথা শুনতে শুনতে রকম মনে হয় – এ যেন অন্য এক জগতের কথা। যদিও আমরা জানি যে ভারতের গ্রামের প্রতিবন্ধী মেয়েদের জীবন এরকমই। এমন আরও অনেক নিতু আছে ভারতবর্ষের আনাচে কানাচে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বাগনান কলেজের অধ্যাপক বুবাই বাগের জীবনও কিছু কম আশ্চর্য করে না আমাদের। তাঁর প্রতিবন্ধকতা ধরা পড়ার পর তাঁর দাদু মা-বাবাকে বাড়ি থেকে বার করে দেন, কারণ একমাত্র সুস্থ স্বাভাবিক শিশুই পরিবারের কাম্য ছিল। অসহ্য দারিদ্রের কারণে বুবাইয়ের মা বাধ্য হন কলমের কারখানায় কারখানায় দীর্ঘ সময়ের কাজ নিতে। অর্থাৎ বুবাইকে অনেকটা সময় একা বাড়িতে থাকতে হত। তাঁকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, খাওয়ানো – এসব দিনে একবারই করা হত। বুবাই জানান, তিনি যতদিন না যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে জন্য ভর্তি হয়েছেন ততদিন ইংরিজিতে যাকে বলে ‘ডিসেবিলিটি ফ্রেন্ডলি টয়লেট’, তা যে কী জিনিস, তিনি জানতেন না। এরকম ব্যবস্থা যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য হতে পারে সে ধারণাই বুবাইয়ের ছিল না। কলকাতা শহরেও কি এখন সব স্কুল কলেজে প্রতিবন্ধীবান্ধব শৌচালয় দেখতে পাওয়া যায়? না। আর গ্রামে তো সেটা প্রায় অসম্ভব। ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করার পর বুবাই আবার এখন গ্রামের কলেজে অধ্যাপনা করেন। এতখানি সংগ্রাম করে বড় হওয়ার পরে এখনো তাঁকে কলেজে দু বোতল খাওয়ার জল সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়, কারণ খাওয়ার জল নেওয়ার যে যে জায়গাটা কলেজে আছে, সেখান থেকে তাঁর মত প্রতিবন্ধী মানুষের পক্ষে জল নেওয়া সম্ভব নয়। বুবাই স্পষ্ট জানালেন, গ্রামে ও শহরে সচেতনতার মাত্রা একেবারেই আলাদা। শহুরে প্রতিবন্ধী মানুষ কিছুটা আন্দোলন করে, সরকারের থেকে কিছু দাবি আদায় করতে পেরেছেন। গ্রামের মানুষ এখনো জানেনই না, কী ধরনের প্রতিবন্ধীবান্ধব ব্যবস্থা তাঁরা চাইতে পারেন। কারণ সেই ধারণা তাঁদের মধ্যে তৈরিই হয়নি।

এক্ষেত্রে ভারতের প্রতিবন্ধী আন্দোলনের ব্যর্থতা মানতেই হবে। বড় বড় সেমিনারে, আলোচনা সভায় অনেক প্রতিবন্ধী আন্দোলন কর্মী উল্লেখ করেন যে ভারতের প্রতিবন্ধী জনসংখ্যার ৬৯% থাকেন গ্রামে। কিন্তু আন্দোলনের মুখ হিসাবে সবসময় শহুরে উচ্চ মধ্যবিত্তদেরই দেখা যায়। ফলে উড়ান ব্যবস্থা প্রতিবন্ধীবান্ধব করার জন্য যত লেখালিখি হয় তার ১% গ্রামের রাস্তা প্রতিবন্ধীবান্ধব করার জন্য হয় না। দারিদ্র্য ও প্রতিবন্ধকতা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। অথচ এখনো প্রতিবন্ধী আন্দোলনের বেশিরভাগ বার্তা ইংরিজি ভাষায় লেখা হয়, যা গ্রামের তো বটেই, শহরের গরিব মানুষও পড়ে উঠতে পারেন না। সুপ্রিম কোর্ট থেকে যত সদর্থক রায়ই এই আন্দোলন আদায় করুক না কেন, যাদের ওইসব রায়ে সবচেয়ে বেশি উপকার হওয়ার কথা, সেইসব মানুষ সুফল ভোগ করতে পারেন না।

আরো পড়ুন উচ্চবিত্তরা প্রতিবন্ধী আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠলে মুশকিল

প্রতিবন্ধীদের মূল স্রোতে যুক্ত করার বিষয়ে ভারত সরকারের নিস্পৃহতা অবিশ্বাস্য। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ‘মন কি বাত’-এ প্রতিবন্ধীদের বিকলাঙ্গ না বলে দিব্যাঙ্গ বলে ডাকা উচিত বলেছিলেন। ফলে প্রতিবন্ধী দফতরের নামই বদলে দিব্যাঙ্গ করে দেওয়া হয়। গালভরা নাম দেওয়া হয়েছে, অথচ একজন প্রতিবন্ধীর সাধারণ জীবনযাপনের ন্যূনতম চাহিদাগুলো মেটাতে সরকার একেবারেই উদ্যোগ নেয় না। নতুন আইন পাস করা হয়েছে, কিন্তু তা রূপায়ণ করার কোনো প্রচেষ্টা ২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি।

নিতুর মা তো চাননি নিতু বেঁচে থাক। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল – এই মেয়ে বেঁচে থাকলে সারাজীবন বোঝা হয়ে থাকবে, কোনোদিন স্বাবলম্বী হতে পারবে না। প্রতিবন্ধী মানুষ যাতে অন্যের বোঝা না হয়ে স্বাবলম্বী হতে পারেন তেমন কর্মসূচি গ্রহণ করার দায়িত্ব সরকারের উপরেই বর্তায়। সামনেই ৩ ডিসেম্বর বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস। এই উপলক্ষে সরকার যেসব প্রতিবন্ধী মানুষ লড়াই করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন তাঁদের পুরস্কৃত করবে। কিন্তু নিতুর মত যেসব মেয়ে নিজের পরিবারের মধ্যে লড়াই চালাচ্ছে, তারাও যাতে এই দেশের অন্য নাগরিকদের মতই জীবনযাপন করার অধিকার পায় সেই দায়িত্ব নেবে কে?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.