কেউ বলছেন শ্রমিকদের সপ্তাহে ৭০ ঘন্টা কাজ করার কথা, কেউ বা নিদান দিচ্ছেন সপ্তাহে ৯০ ঘন্টা কাজের। কেউ আবার বলছেন শনিবার, রবিবার ছুটি একান্তই বিদেশি ধারণা। ভারতীয় ধারণার সঙ্গে মেলে না। এঁরা কেউ রাষ্ট্রনেতা বা ধর্মীয় নেতা নন। এঁদের ইচ্ছাতেই আজ চলছে তামাম দুনিয়া। শিল্প, বাণিজ্য জগতের এইসব মহাপুরুষদের শংসাপত্র পেতে মুখিয়ে থাকেন দেশবিদেশের সরকার, জনপ্রতিনিধির দল। দুনিয়ায় গণতন্ত্র না কর্পোরেটতন্ত্র – কোনটা বিরাজ করছে তা ভাবতে গেলে আজকাল ধাঁধা লেগে যায়। বেশ কয়েকমাস ধরেই ভারতের শিল্পপতিদের একাংশ শ্রমিকদের কাজের সময় বাড়ানোর দাবি তুলছেন। অনেকে সাপ্তাহিক ছুটির যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন।
ইনফোসিসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এন আর নারায়ণমূর্তি ২০২৩ সালে সপ্তাহে ৭০ ঘন্টা কাজের কথা বলেছিলেন। তিনি কর্মীদের কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য রক্ষার ধারণাকেই নস্যাৎ করে দিতে চান। সম্প্রতি কয়েক ধাপ এগিয়ে লার্সেন এণ্ড টুব্রোর চেয়ারম্যান এস এন সুব্রহ্মণ্যম সপ্তাহে ৯০ ঘন্টা কাজের নিদান দিয়েছেন। কর্মীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা – ভারতকে বিশ্বের সেরা দেশ হতে গেলে শ্রমিক, কর্মচারীদের সপ্তাহে ৯০ ঘন্টা কাজ করা প্রয়োজন। রবিবারের ছুটি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে গিয়ে তিনি কর্মীদের ব্যক্তিগত জীবনকেও ছাড় দেননি। বিতর্কের মুখে অবশ্য কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিনি এই কথা গুরুত্ব দিয়ে বলেননি, নিতান্তই হালকা চালে বলেছেন। আবার শিল্পপতি গৌতম আদানি বলেছেন, কেউ আট ঘন্টা পরিবারের সঙ্গে কাটালে তার স্ত্রী পালিয়ে যেতে পারেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আদানির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে দেশবাসীর আগ্রহ নেই। কিন্তু তিনি এই বক্তব্যের মাধ্যমে ঘুরিয়ে কাজের সময় বাড়ানোর কথাই বলেছেন। দুই শিল্পপতির কথায় মনে হচ্ছে যে শ্রমিক, কর্মচারীদের ব্যক্তিগত জীবন বলে কিছু থাকলে তা দেশের বিকাশের অন্তরায়। তাঁদের ঘর-সংসার, সৃজনশীল কাজ – এসবে সময় কাটানো ক্ষতিকর। শ্রমিক, কর্মচারীরা দাসের মত অমানুষিক পরিশ্রম করলেই দেশের বিকাশ হবে। সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে তাঁদের পিতৃতান্ত্রিক মনোভাবও প্রকাশিত হয়েছে। পুরুষমাত্রই রোজগেরে আর স্ত্রী মানে তিনি ঘরে থাকবেন – এমন ধারণাই তাঁরা সামনে এনেছেন। অথচ দুই কোম্পানিতেই অনেক মহিলা গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন। সুব্রহ্মণ্যমের বক্তব্য নিয়ে হইচই হওয়ায় তাতে প্রলেপ দিতে এগিয়ে এসেছেন তাঁর কোম্পানির মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান সোনিকা মুরলীধরন, যিনি নিজে মহিলা।
এর আগে ক্যাব কোম্পানি ওলার সিইও ভাবিশ আগরওয়াল কর্মীদের কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্যের ধারণাকেই বিদেশি বলেছেন। তাঁর মতে শনিবার, রবিবার ছুটির ধারণা ভারতীয় নয়। ভারতে আগে চান্দ্রমাস অনুসারে কাজ চলত। উনি কি কোম্পানির কাজে সেই চান্দ্রমাস ফিরিয়ে আনতে পারবেন? তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের অনেক কর্মীকে আমেরিকা বা ইউরোপের কোনো দেশের সময় অনুসারে কাজ করতে হয়। সেইসব দেশের ছুটি অনুসারে তাঁরা ছুটি পান। এমনকি ভারতের স্বাধীনতা দিবসে অনেকে ছুটি পান না, কারণ আমেরিকা বা ইউরোপে দিনটা কাজের দিন। সেই কর্মীরা ভারতীয় সময়, রীতি অনুসারে কাজ করার বা ছুটি পাওয়ার সুযোগ পাবেন তো? সেসব ক্ষেত্রে শিল্পপতিদের দেশপ্রেম কোথায় থাকে?
শিল্পপতিদের কথা শুনলে মনে হবে ভারতে শ্রমিক, কর্মচারীরা কম সময় কাজ করেন। অথচ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) উল্টো কথা বলছে। কাজের সময়ের বিচারে ভারত বিশ্বে সামনের সারিতে রয়েছে। ভারতের শ্রমিক, কর্মচারীরা সপ্তাহে গড়ে ৪৬.৭ ঘন্টা কাজ করেন। ২০২৪ সালে প্রকাশিত আইএলও রিপোর্ট জানাচ্ছে, দেশের অর্ধেকের বেশি শ্রমিক, কর্মচারী সপ্তাহে ৪৯ ঘন্টার বেশি কাজ করেন। এশিয়ার উন্নত দেশ বলে পরিচিত জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরে গড় সাপ্তাহিক কাজের সময় যথাক্রমে ৩৬.৬, ৩৮.৬, ও ৪২.৬ ঘন্টা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিক, কর্মচারীদের গড় সাপ্তাহিক কাজের সময় ৩৮ ঘন্টা।
ভারতের মত বেকার সমস্যায় জর্জরিত দেশে বরং কাজের সময় কমিয়ে শ্রমিক, কর্মচারীর সংখ্যা বাড়ালেই বিকাশ হওয়ার কথা। আইএলওর আরেক রিপোর্ট অনুসারে, ভারতে বেকারদের মধ্যে যুবক-যুবতীদের অনুপাত বেড়ে চলেছে। আইএলও এবং ইনস্টিটিউট অফ হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের যৌথ সমীক্ষার সেই রিপোর্ট প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালের মার্চ মাসে। তা থেকে জানা গেছে, ভারতের মোট বেকারের ৮৩% যুবাবস্থায় আছেন। তাদের সিংহভাগ উচ্চশিক্ষিত। মাধ্যমিক বা তার বেশি শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন যুবসমাজের ৬৫.৭% কর্মহীন। স্বঘোষিত দেশভক্ত কর্পোরেট কর্তাদের বাণীতে মনে হতে পারে, বেকারদের সংখ্যা বৃদ্ধি, কাজের মজুরি কমে যাওয়াই দেশের বিকাশের মাপকাঠি। কাজের সময়ের বিচারে বিশ্বের সেরা আর মজুরির হারে পিছিয়ে থাকা দেশ হতে না পারলে ভারত বিশ্বসেরা হবে না।
এমনিতেই কাজের নির্দিষ্ট সময় থাকা নিয়মিত শ্রমিক, কর্মচারীর সংখ্যা ভারতে নগণ্য। নব্বই শতাংশের বেশি শ্রমিক অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন। এমনকি সংগঠিত ক্ষেত্রেও অসংগঠিত শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। কর্পোরেট থেকে শুরু করে সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পর্যন্ত সবক্ষেত্রেই বাড়ছে অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক, কর্মচারীর সংখ্যা। তাঁদের অধিকাংশেরই কাজের সময় অনেক বেশি। বেড়ে চলেছে নির্দিষ্ট পরিমাণের বদলে কাজ অনুসারে মজুরি পাওয়া শ্রমিক, কর্মচারীর সংখ্যা। সবক্ষেত্রে আবার মজুরি বা বেতনও বলা হয় না। এমনকি গালভরা নামের আড়ালে অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের শ্রমিক পরিচয়কেই স্বীকৃতি না দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। গিগ কর্মীরা এর বড় উদাহরণ। বাড়িতে বসে নানা কাজ করে উপার্জন করা শ্রমিকের সংখ্যাও কম নয়। তাঁদের বড় অংশ মহিলা। তাঁরাও কাজ অনুসারে মজুরি পান। সুতরাং কাজের সময় নির্দিষ্ট নয়। বরং কাজের সময় যত বাড়বে, তত তাঁদের উপার্জন বাড়বে। ভারতের বিশালসংখ্যক শ্রমিক ন্যূনতম মজুরি, কাজের নির্দিষ্ট সময়, কাজের নিরাপত্তা, নানা সামাজিক প্রকল্পের অধিকার থেকে বঞ্চিত। আইনি অধিকারও কম। যাও বা আছে, বাস্তবে অধিকাংশেরই সেই অধিকার থেকে প্রাপ্তি শূন্য বললেই চলে। শ্রমিক হিসাবে স্বীকৃতিও অনেকেরই নেই। তাঁদের শ্রমে উৎপাদিত পণ্য ও পরিষেবা দেশের জিডিপি বাড়ায় কেবল।
যাঁদের কাজের নির্দিষ্ট সময় এবং বিভিন্ন অধিকার আছে, এখন তাঁদেরও সেইসব অধিকার সংকুচিত করা বা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। আসলে পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্যে শ্রমিক পীড়নের বীজ রয়েছে। এখানে কেবল পণ্য উৎপাদন করলেই হয় না, বাড়তি মূল্যও পেতে হয়। একমাত্র শ্রমই সেই উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি করতে পারে। শ্রমিকের সৃষ্ট সেই মূল্যের একটা অংশ মজুরি হিসাবে দেওয়া হয়। শ্রমিকের সৃষ্ট সেই উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ করে পুঁজির মালিক যে মুনাফা পায়, তার একটা অংশই পুঁজি হিসাবে বিনিয়োগ করা হয়। শ্রমিককে যত বঞ্চিত করা যাবে, পুঁজি তত বাড়বে। পুঁজি ও শ্রমের এই দ্বন্দ্বে রাষ্ট্র পুঁজির পক্ষেই থাকে। কখনো কিছুটা রেখে ঢেকে, শ্রমিকদের কিছু অধিকার দিয়ে। আবার কখনো নগ্নভাবে শ্রমিকদের অর্জিত অধিকার, নিরাপত্তা কেড়ে নিয়ে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ভূমিকা যত বাড়ে, শ্রমের উৎপাদনশীলতা তত বাড়ে। তখন কমসংখ্যক শ্রমিক নিয়োগ করে উৎপাদন করা যায়। আবার উৎপাদন বাড়াতে কম শ্রমিক দিয়ে বেশিক্ষণ কাজ করানো যায়। স্বাভাবিক বুদ্ধি বলে, প্রযুক্তিতে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়লে শ্রমিকদের কম সময় খাটিয়েও মুনাফা হয়। সেই বুদ্ধিতে কাজের সময় কমা উচিত অথবা মজুরি বাড়ার কথা। কিন্তু পুঁজির যুক্তি স্বাভাবিক বুদ্ধির ধার ধারে না। তার চাই আরও মুনাফা, পুঁজির কেন্দ্রীভবন। তাই, তার দাবি কাজের সময় বাড়াও, মজুরি বাড়িও না। একান্ত বাড়াতে হলে বাড়তি সৃষ্ট মূল্যের অতি সামান্য অংশ বাড়তি মজুরি হিসাবে দাও।
পুঁজিবাদের প্রথম দিকে পরিষেবা ক্ষেত্রের গুরুত্ব ছিল না। এখন তো উৎপাদন নয়, পরিষেবা ক্ষেত্রের বিকাশকেই দেশের বিকাশ হিসাবে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরিষেবা ক্ষেত্রে কাজ করা ব্যক্তিও শ্রমিক। সে তিনি কোনো নির্মাণ কর্মী বা উচ্চ বেতনের প্রযুক্তি কর্মী – যা-ই হোন। তাঁরাও মালিকের জন্য উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি করেন। তাঁদেরও বঞ্চিত না করলে মুনাফা বাড়ে না। তাই অল্প লোক দিয়ে বেশি সময় খাটিয়ে নেওয়া, মজুরি যথাসম্ভব কম রাখা – সবটাই চলে পুঁজির যুক্তিতে। একজন কর্মচারীকে হয়ত ল্যাপটপ বা হাল ফ্যাশনের স্মার্ট ফোন দেওয়া হল। অনেক শ্রমিক কোম্পানি থেকে এসব পেলে খুশি হন, শ্রমিক হিসাবে জাতে উঠেছেন বলে মনে করেন। এমনকি নিজেকে অনেকে শ্রমিক বলে মানতেও চান না। অথচ দেখা যায়, সেই ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন দিয়ে কোম্পানি তাঁকে কাজের সময়ের বাইরেও কাজ করিয়ে নিচ্ছে। এমনকি ছুটির দিনেও অনেকের মুক্তি নেই। হালে যে বাড়িতে বসে কাজ চালু হয়েছে, তা হল কাজের সময় বাড়ানোর আরেক ফিকির। কাজের চাপ যত বাড়ছে, সেই অনুসারে মজুরি বা বেতন বাড়বে না। মনপ্রাণ কোম্পানিকে সঁপে দিতে হবে। এককথায়, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক, গিগ কর্মী থেকে তথাকথিত আধুনিক ঝাঁ চকচকে কোম্পানির শ্রমিক-কর্মচারী, হাতুড়ি পেটানো শ্রমিক থেকে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অফিসে বসে কাজ করা তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী – কারোর পরিবার পরিজন, বিশ্রাম, বিনোদন বলে কিছু থাকা চলবে না। তাঁদের হতে হবে জ্যান্ত যন্ত্র।
আরো পড়ুন ৭০ ঘন্টার নিদান: কর্পোরেট দাস ব্যবসায়ীর মন কি বাত
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রক্তকরবী নাটকে মনুষ্যত্বের এই অবমাননা দেখিয়েছেন। সেখানে যক্ষপুরীতে সোনা তুলতে গিয়ে অধিকার তো বটেই, এমনকি নিজেদের নাম, পরিচয় হারিয়ে ৪৭ফ, ৬৯ঙ হয়ে গেছেন শ্রমিকরা। আজও শ্রমিকদের অবস্থার কোনো মূলগত ফারাক হয়নি। নব্য উদারবাদী অর্থনীতিতে তাঁদের উপর আক্রমণ আরও বেড়েছে। শ্রমিক, কর্মচারীরা যেটুকু অধিকার অর্জন করেছিলেন তাও কেড়ে নিতে প্রকাশ্য হুমকি দিচ্ছে কর্পোরেট জগৎ। তাই আইন বদলানো হয়। আবার আইন না মানলে, শ্রমিকের মজুরি না প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের টাকা মেরে দিলে, ন্যূনতম মজুরি না দিলে, কাজের সময় বাড়ালে, ইচ্ছে মত ছাঁটাই করলেও মালিকের কোনো শাস্তি হয় না। এসব কাজকে আইনসম্মত করার দাবি পর্যন্ত উঠছে। নারায়ণমূর্তি বা সুব্রহ্মণ্যমরা প্রলাপ বকছেন না। দেশের বিকাশের বাহানায় এই অন্যায়, মনুষ্যত্বহীন দাবিকে যুক্তিগ্রাহ্য করতে চাইছেন মাত্র।
সুব্রহ্মণ্যম কিন্তু লার্সেন এণ্ড টুব্রোর কর্মচারীদের গড় বেতনের থেকে ৫০০ গুণ বেশি বেতন পান। আইএলও এবং ইনস্টিটিউট অফ হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের যৌথ সমীক্ষা জানাচ্ছে, দেশের স্থায়ী বা নিয়মিত শ্রমিকদের গড় প্রকৃত মজুরি ২০১২ সালের তুলনায় ২০২২ সালে কমেছে। স্বনিযুক্ত মানুষের উপার্জনও কমেছে। অস্থায়ী কর্মীদের উপার্জন বেড়েছে অতি সামান্য। আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সাসটেনেবল এমপ্লয়মেন্ট এক রিপোর্টে বলেছে, ২০১৮ সালে দেশের কর্মরত মানুষের ৮২% পুরুষ ও ৯২% মহিলা মাসে ১০,০০০ টাকারও কম উপার্জন করতেন। সাত বছর পরে বাজার দর অনেক বেড়েছে, কিন্তু মজুরি কি বিশেষ বেড়েছে? শস্তা শ্রমের বাজারের বড় অংশ নারী শ্রমিক। আজও মজুরিতে লিঙ্গ বৈষম্য কমেনি। সংবিধানে বর্ণিত সমানাধিকার বা সুপ্রিম কোর্টের সম কাজে সম বেতনের নির্দেশ অক্লেশে লঙ্ঘিত হচ্ছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) রিপোর্ট অনুসারে, ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সারা দেশে মোট ১,১২,০০০ দিনমজুর আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ দিনে গড়ে ১০২ জনের বেশি দিনমজুর আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। তার মধ্যে ২০২১ সালে দৈনিক গড়ে ১১৫ জন দিনমজুর আত্মহত্যা করেন। গত সেপ্টেম্বরে কাজের চাপ সহ্য না করতে পেরে উত্তরপ্রদেশের এক আর্থিক সংস্থার এরিয়া ম্যানেজার আত্মহত্যা করেন। গতবছরেই মহারাষ্ট্রের পুনেতে কাজের চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন মাত্র ২৬ বছরের যুবতী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট আনা সেবাস্তিয়ান। দিনমজুর থেকে উচ্চ বেতনের কর্মী – আর্থিক দুর্দশা বা কাজের চাপে সকলেই আত্মহত্যা করছেন। শিল্পপতিদের দেশের বিকাশের নিদানে জিডিপি বৃদ্ধির হার ধনাত্মক হলেও হতে পারে, কিন্তু মজুরদের অবস্থা আরও সঙ্গীন হয়।
দেশের বিকাশের কর্পোরেট প্রচারকরা কিন্তু কর কাঠামোর পরিবর্তনের বিরোধিতা করেন। যাঁরা বিকাশের স্বার্থে পরিবার, পরিজন ছেড়ে শ্রমিক, কর্মচারীদের আরও বেশি সময় কাজ করতে জ্ঞান দেন, তাঁরাই আবার কর্পোরেট কর বৃদ্ধির তীব্র বিরোধী। আসলে দেশের বিকাশ নয়, কোম্পানি আর নিজেদের বিকাশই তাঁদের ধ্যান জ্ঞান। দেশবাসীর বিনাশের বিনিময়ে সেই বিকাশের রথ এগিয়ে চলে। ওদের বিকাশের জন্য প্রকৃত মজুরি কমাতে হবে, শ্রমিকদের কাজ বাড়াতে হবে। বেকার যত বেশি হবে, শ্রমিকের প্রতি বঞ্চনাও তত বাড়বে। ফিরে যেতে হয় রবীন্দ্রনাথের কাছে। ‘ধনের ধর্মই অসাম্য। … ধন জিনিসটাকে পাঁচজনের কাছ হইতে শোষণ করিয়া লইয়া পাঁচজনের হাত হইতে তাহাকে রক্ষা না করিলে সে টেঁকে না। এইজন্য ধনকামী নিজের গরজে দারিদ্র্য সৃষ্টি করিয়া থাকে।’ (‘লোকহিত’)
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








