দীপক গিরি

রবি ঠাকুরের লেখা ‘জীবিত ও মৃত’ গল্পের শেষ লাইন ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল, সে মরে নাই।’ মানুষের আজন্মলালিত সংস্কার এমনই কঠিন ও নির্মম যে শ্মশানে চিতায় ওঠার পরপরই মৃতপ্রায় কাদম্বিনীর হৃদস্পন্দন ফিরে আসে, কিন্তু জনমানসে তাকে জীবিত বলে আর কেউ মেনে নিতে পারে না। এমনকি প্রিয়জনরাও তাকে কাদম্বিনীর ভূত হিসাবে গণ্য করে এবং ভূত তাড়ানোর যাবতীয় আয়োজন করে। অবশেষে অন্য পথ না পেয়ে কাদম্বিনী পুষ্করিণীর জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে তার জীবিত থাকার প্রমাণ দিয়ে যায়। কূপমণ্ডূক সামাজিক সংস্কারের কোপে কাদম্বিনীদের যেমন তৎকালীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে আত্মহনন ব্যতীত আর কোনো পথ ছিল না, তেমনি আজ জাল ওষুধের সিন্ডিকেটের কোপে এদেশে মামণি রুইদাসের মত হাজার হাজার প্রসূতি, শিশু সমেত সাধারণ রোগীর জন্য সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় মৃত্যু ব্যতীত যেন আর গত্যন্তর নেই। নতুন বছরের শুরুতেই মেদিনীপুর মেডিকাল কলেজ ও হাসপাতালে সন্তানের জন্ম দেওয়ার পরেই জাল ওষুধের বিষক্রিয়ায় মামণির মৃত্যু, এ রাজ্যের শাসক দল ও অসাধু ওষুধ কোম্পানির আঁতাতকে একেবারে উন্মুক্ত করে দিয়েছে।

স্বাধীন দেশে প্রসূতি মৃত্যুর হার কমানোর জন্য সরকারি উদ্যোগেই স্থানীয় স্তর থেকে জেলা, রাজ্য ও কেন্দ্রীয় প্রশাসন প্রতিটি প্রসূতি মৃত্যুর ব্যাপারে আভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান করে থাকে। অনিচ্ছাকৃত ভুল বা কোনো পরিকাঠামোগত ত্রুটি থাকলে সেগুলো শুধরে নিয়ে প্রসূতি মৃত্যুর হার কমানোর সুযোগ থাকে। গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ সহ ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড ও কর্ণাটকের অসংখ্য হাসপাতাল ও মেডিকাল কলেজের ডাক্তাররা প্রসূতি মৃত্যুর কারণ হিসাবে কিছু বিষাক্ত ওষুধ – বিশেষত রিঙ্গার্স ল্যাকটেট স্যালাইন, অক্সিটোসিন সমেত কিছু ইন্ট্রাভেনাস অ্যান্টিবায়োটিক – চিহ্নিত করেছেন এবং স্থানীয় ও রাজ্য স্তরের কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। কর্ণাটক ড্রাগ কন্ট্রোল এই জাতীয় বেশকিছু ওষুধকে কালো তালিকাভুক্ত করে উৎপাদক সংস্থা পশ্চিমবঙ্গ ফার্মাসিউটিকাল কোম্পানিকে গত বছর মার্চেই নিষিদ্ধ করেছিল। তারপর গতমাসের প্রথম সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ড্রাগ কন্ট্রোল, কর্ণাটক ও আমাদের রাজ্যের ড্রাগ কন্ট্রোল যৌথভাবে ওই কোম্পানির চোপড়ার কারখানায় হানা দেয় এবং ওষুধ উৎপাদন নিষিদ্ধ করে। এর প্রায় একমাস পরে গত ৭ জানুয়ারি এ রাজ্যের সেন্ট্রাল মেডিকাল স্টোর একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ওই কোম্পানির রিঙ্গার্স ল্যাকটেট দ্রবণ ব্যবহার বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। সেই বিজ্ঞপ্তির মাত্র দুদিন পরেই, ৯ তারিখ রাতে, মেদিনীপুর মেডিকাল কলেজে পাঁচজন প্রসূতিকে ওই নিষিদ্ধ কোম্পানির রিঙ্গার্স ল্যাকটেট দ্রবণই স্যালাইন হিসাবে সিজারিয়ান প্রসবের পরে দেওয়া হয়। জ্বর, কাঁপুনি সমেত অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। সিসিইউতে স্থানান্তরিত করলেও অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়। ১০ তারিখ ভোরে একদিনের নবজাতককে রেখে জীবনের মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মামণি।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

তরুণী মা মামণির এই মর্মান্তিক মৃত্যু স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও প্রশাসন সমেত পুরো সমাজের কাছে বেশ কিছু সত্য ও প্রশ্ন তুলে ধরে।

প্রথমত, সেন্ট্রাল মেডিকাল স্টোরের পশ্চিমবঙ্গ ফার্মাসিউটিকাল কোম্পানির ব্যাপারে বিজ্ঞপ্তি জারি করতে এত সময় কেন লাগল? কর্ণাটকে নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার পরে একবছর কেটে গেল আর এ রাজ্যের ড্রাগ কন্ট্রোলের হানার একমাস কেটে গেল। তারপর বিজ্ঞপ্তি জারির সময় হল? ওই বিজ্ঞপ্তি কি সত্যিই জনস্বার্থের কথা ভেবে দেওয়া, নাকি স্বাস্থ্য দফতরের কর্তারা নিজেদের দায় ঝেড়ে ফেলার জন্য কাজটা করেছিলেন? কেন গত একবছর ধরে ওইসব বিষাক্ত ওষুধ রাজ্যের প্রায় সমস্ত মেডিকাল কলেজ ও হাসপাতালে সরবরাহ হতে দিলেন রাজ্যের স্বাস্থ্য অধিকর্তারা? তাঁরা কি সব জেনেও আজ না জানার ভান করছেন?

আরো পড়ুন জনস্বাস্থ্যের বিভিন্ন সূচকে পিছিয়ে বাংলা

দ্বিতীয়ত, মামণির মৃত্যু আর অন্য প্রসূতিদের মর্মান্তিক অবস্থার সব দায় জুনিয়র ডাক্তার সমেত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর চাপিয়ে দেওয়া এ রাজ্যের চিরকালীন ধারা মেনেই হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন তোলা দরকার – ডাক্তার, নার্স, মেডিকাল প্রযুক্তিবিদ ও স্থায়ী গ্রুপ ডি স্টাফের হাজার হাজার পদ শূন্য কেন? কেন মেডিকাল কলেজের মত সর্বোচ্চ স্তরের স্বাস্থ্য পরিষেবার জায়গায় ইউএসজি সিটি স্ক্যানের মত জরুরি পরীক্ষা ২৪ ঘন্টা চালু থাকে না? কেন হাসপাতালের অভ্যন্তরে নানা ধরনের দালাল চক্র চলছে? কেন সরকারি দলের কিছু সিনিয়র ডাক্তার নিজের বিভাগে ছড়ি ঘুরিয়ে কাজে ফাঁকি দেবেন? কেন দশকের পর দশক ধরে রাতের এমার্জেন্সি ওটিগুলোকে সচল রাখতে শুধু স্নাতকোত্তর ছাত্রছাত্রীদেরই অসাধ্য সাধনের দায় নিতে হবে? আজ মেডিকাল কলেজ কর্তৃপক্ষ ও স্বাস্থ্য ভবনের কর্তারা বেহায়ার মত কী করে এসব দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন? মেদিনীপুর মেডিকাল কলেজে বিষাক্ত ওষুধ ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে চালু থাকা এবং পরিকাঠামোগত ত্রুটির দায় প্রিন্সিপাল এবং মেডিকাল সুপার এড়িয়ে যান কী করে?

তৃতীয়ত, স্বাস্থ্য দফতরের কর্তা ও কলেজ কর্তৃপক্ষ বারবারই বলছেন, তদন্ত চলছে এবং তা সম্পূর্ণ হলে দোষীদের সাজা দেওয়া হবে। তার মধ্যেই মেদিনীপুর মেডিকাল কলেজের অধ্যক্ষ বিজ্ঞপ্তি দিলেন যে অপারেশন থিয়েটারে স্নাতকোত্তর ছাত্রছাত্রীরা ঢুকতে পারবে না। তাহলে কি মামণির মৃত্যুর জন্য স্নাতকোত্তর ছাত্রছাত্রীরা দায়ী – একথা ধরেই নেওয়া হল? নাকি এটা হুমকি সংস্কৃতি ব্যবহার করে তাদের চুপ করিয়ে রাখার নোংরা রাজনৈতিক খেলা? তদন্তের নামে আসলে তথ্যপ্রমাণ লোপাট করা হচ্ছে না তো?

আর জি কর মেডিকাল কলেজের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ সমেত রাজ্য পুলিস প্রশাসনের প্রয়াস আমরা সবাই দেখেছি। একইভাবে এক্ষেত্রেও প্রসূতিদের নির্মম পরিণতির আসল কারণ চেপে গিয়ে সত্যকে আড়াল করার একইরকম প্রয়াস চালানো হচ্ছে বলে সন্দেহ হয়।

চতুর্থত, মামণির মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কয়েক বছর আগে এবং সম্প্রতি আর জি কর আন্দোলনের সময়েও আন্দোলনকারী জুনিয়র ডাক্তাররা জাল ওষুধ চক্র এবং শাসক দলের মদতপুষ্ট স্বাস্থ্য সিন্ডিকেটগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল। কিন্তু শাসক দল এবং কর্তৃপক্ষ হুমকি সংস্কৃতি আর কিছু সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে সত্য চেপে গিয়েছে। এ রাজ্যে সেই সিন্ডিকেট রাজের অন্যতম পাণ্ডা, আর জি কর মেডিকাল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ এবং তাঁর সহযোগীদের কুকীর্তি ইতিমধ্যেই সারা দেশ জেনে গেছে। সাধারণ জনতাও শুরুতে আন্দোলনকারী জুনিয়র ডাক্তারদের কথা বিশ্বাস করেনি। কিন্তু ধর্ষিত মেয়েটির হত্যাকাণ্ড সমাজের বিবেককে দারুণভাবে নাড়া দেয়। হাজার হাজার মানুষ জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনের পাশে দাঁড়ান। সেই চাপেই প্রশাসন ও তদন্তকারী সংস্থা সন্দীপ ঘোষ, অভিজিৎ মন্ডল ও আশীষ পাণ্ডেদের গ্রেফতার করতে বাধ্য হয়। গতবছরের শেষদিকেই কিন্তু তদন্তকারী সংস্থার গাফিলতিতে তারা জামিনে মুক্ত হয়ে গেছে। নতুন বছরের শুরুতেই আবার স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক সিন্ডিকেটের শিকার হল মামণি। আরও কয়েকজন নবজাতকের মা এখনো মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। তাহলে কি অসাধু ওষুধ কোম্পানি আর শাসক দল ও প্রশাসনিক কর্তাদের এই চক্রের হাতে সাধারণ রোগীদের নিধনযজ্ঞ চলতেই থাকবে?

আপনাদের নিশ্চয়ই গতবছর লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রকাশিত নির্বাচনী বন্ড কেলেঙ্কারির কথা মনে আছে। দেখা গিয়েছিল একাধিক ওষুধ কোম্পানি নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে কেন্দ্র ও রাজ্যের প্রায় সমস্ত শাসক দলকে হাজার হাজার কোটি টাকা জুগিয়েছিল। এই কারবার করে সবচেয়ে বেশি টাকা তুলেছিল বিজেপি দল। দ্বিতীয় স্থানে ছিল তথাকথিত মা মাটি মানুষের দল তৃণমূল কংগ্রেস। তার ফল তো ফলবেই।

নিবন্ধকার পেশায় ডাক্তার। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.