গরিব, অন্নদাতা, যুবক ও মহিলাদের বিকাশের কথা বললেও, তৃতীয় নরেন্দ্র মোদী সরকারের বাজেটে বিকশিত ভারতের আসল রূপ সামনে চলে এল। সব কা সাথ, সব কা বিকাশ নয় – সরকারের আসল লক্ষ্য ধনীর বিকাশ আর আমজনতার বিনাশ। ভোটের আগে ফেব্রুয়ারি মাসে অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ করেছিল মোদী-২ সরকার। মোদী-৩ সরকারের পূর্ণাঙ্গ বাজেটে সরকারি নীতির কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। ২৩ জুলাই বাজেট পেশের আগের দিন প্রকাশিত হয়েছিল সরকারের আর্থিক সমীক্ষা। সেই সমীক্ষায় বেকার সমস্যা, অসাম্য, খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির হারে অধোগতির কথা তুলে ধরা হয়। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বড় বড় কোম্পানি কর্মসংস্থানের সুযোগ দিচ্ছে না। ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ৭৮,৫০,০০০ জনকে চাকরি দেওয়ার নিদান দেওয়া হয়েছে। সমীক্ষা জানিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজের সুযোগ কমাবে। বেকার সমস্যা, অসাম্যের অভিযোগ মোদী সরকার এতদিন অস্বীকার করে এসেছে। বিভিন্ন সমীক্ষার রিপোর্টকে ভিত্তিহীন, অসত্য বলে নস্যাৎ করেছে। কিন্তু এবারের আর্থিক সমীক্ষায় সেইসব অভিযোগই সরকারি স্বীকৃতি পেল। যদিও বাজেট ওই সমস্যাগুলোর সমাধানে কোনো আশার আলো দেখাতে পারল না।

২০২৪-২৫ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে মোট ব্যয় বরাদ্দ হয়েছে ৪৮,২০,৫১২ কোটি টাকা। গতবারের (২০২৩-২৪) থেকে মাত্র ৩,১৭,০০০ কোটি টাকা বেশি। যদিও গতবারের বরাদ্দ অর্থ সবটা খরচ হয়নি, ৬১,০০০ কোটি টাকা কম খরচ হয়েছিল। শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন, কৃষিতে বরাদ্দ অর্থের সবটা খরচ করা হয়নি। সরকার মানুষের আর্থসামাজিক বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোকে যে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি তা এই তথ্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। বাজেটে সরকার কোনো খাতে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করে, বাস্তবে তার থেকে কম বা বেশি খরচ হতে পারে। তার জন্য আর্থিক বছরের মাঝে সমীক্ষার মাধ্যমে সরকার সেই খাতে খরচ বাড়বে না কমবে তার হিসাবে করে থাকে। বাজেট বরাদ্দের থেকে এই সংশোধিত বরাদ্দের পরিমাণ বাড়তে বা কমতে পারে। তবে সাধারণভাবে বাড়ে। দেখা যাচ্ছে, ২০২৩-২৪ আর্থিক বছরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সংশোধিত বরাদ্দ কমেছে। পরের বছর বাজেটে কোন খাতে কত খরচের হিসাব ধরা হবে তা এই সংশোধিত বরাদ্দকে ভিত্তি করেই করা উচিত। কিন্তু সরকার সাধারণত তা করে না। করলে আসল চিত্রটা ধরা পড়ে যাবে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কর্মসংস্থান

কর্মসংস্থান তৈরি করার লক্ষ্যে ২০২৪-২৫ আর্থিক বছরের বাজেটে কয়েকটি প্রকল্প ঘোষিত হয়েছে।

  • সংগঠিত ক্ষেত্রে যাঁরা নতুন কাজ পাবেন, তাঁদের প্রথম মাসে সরকার থেকে ১৫,০০০ টাকা দেওয়া হবে। এই টাকা দেওয়া হবে তিনটি কিস্তিতে। যাঁদের বেতন মাসে এক লাখ টাকা বা তার কম, তাঁরাই এই সুযোগ পাবেন। এঁদের একবছরের মধ্যে ছাঁটাই করা চলবে না। সরকারের আশা, এর ফলে ২,১০,০০,০০০ যুবক-যুবতী উপকৃত হবেন।
  • উৎপাদন ক্ষেত্রে কারখানায় প্রথম চাকরি পাওয়া কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডে অর্থ জমা করার জন্য চারবছর উৎসাহ ভাতা দেওয়া হবে। এতে নাকি ৩০,০০,০০০ যুবক-যুবতী উপকৃত হবেন।
  • নতুন কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডে অর্থ জমা করার জন্য দুবছর পর্যন্ত সরকার মাসে ৩,০০০ টাকা করে দেবে। এতে ৫০,০০,০০০ কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশা করা হয়েছে।
  • সেরা ৫০০টি কোম্পানিতে আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি যুবক-যুবতীকে শিক্ষানবিশ হিসাবে নিযুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকার তাঁদের মাসে ৫,০০০ টাকা করে ভাতা দেবে। এছাড়া এককালীন ৬,০০০ টাকা দেওয়া হবে।
  • কুড়ি লক্ষ যুবক-যুবতীর কাজের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য ১,০০০ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটকে উন্নত করা হবে।

সরকার সাধারণভাবে সরকারি দফতর, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় কর্মসংস্থানের কথা বলে। যখন সরকারের লক্ষ লক্ষ পদ খালি পড়ে রয়েছে, তখন সরকারি নিয়োগের প্রতিশ্রুতি কিন্তু দেওয়া হয়নি। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য নতুন পুঁজি বিনিয়োগের গল্পও নেই। মন্ত্রীমশাইরা এখন তাই পকোড়া বা তেলেভাজার দোকান করে আত্মনির্ভর হতে বলেন। কাজের জন্য স্বনিযুক্ত প্রকল্প নিয়ে ঢাক পেটান। আর্থিক সমীক্ষায় নয়া উদারনীতির কর্মহীন বিকাশের আসল চিত্র স্বীকার করা হয়েছে। পুঁজি বিনিয়োগ হচ্ছে, কোম্পানিগুলির মুনাফা আর সঙ্গে আর্থিক বিকাশের হার বাড়ছে। কিন্তু কাজের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। সরকার নিজে চাকরি না দিয়ে এখন বেসরকারি সংস্থায় চাকরি দিতে খরচ করবে।

এই খরচ করার কথা আসলে নিয়োগকর্তা কোম্পানিগুলোর। প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমা দেওয়ার জন্য অর্থের একাংশ যেমন কোম্পানিগুলোর দেওয়ার কথা, তেমন বেতন বা মজুরি তারাই দেবে। মজুরি বা বেতন দয়ার দান নয়, শ্রমশক্তি বিক্রি করে শ্রমিক তা পান। শ্রমের বিনিময়ে শ্রমিক যে মূল্য সৃষ্টি করেন, তার একাংশ মজুরি হিসাবে তাঁদের দিয়ে উদ্বৃত্ত মূল্যের বড় ভাগ আত্মসাৎ করে মালিক পক্ষ। এখন সেই মজুরির একটা অংশ মালিককে দিতে হবে না, সরকার দিয়ে দেবে। মালিকদের ঘুরপথে ভর্তুকি দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্বপ্ন বেচছে কেন্দ্রীয় সরকার। এতে কর্মসংস্থানের যে সংখ্যাটা বলা হচ্ছে তার পুরোটাই অনুমান। কোনো নিশ্চয়তা নেই।

 

মন্দায় শ্রমের বাজারে চাহিদার থেকে জোগান বেশি থাকে। অর্থাৎ কর্মপ্রার্থীর থেকে চাকরির সুযোগ কম থাকে। দক্ষ কর্মপ্রার্থীও কাজ পান না, কিংবা দক্ষ শ্রমিক কাজ হারান। বেকার সমস্যার কারণ কর্মপ্রার্থীর দক্ষতার অভাব নয়, কাজের সুযোগ ক্রমশ কমে যাওয়া। সেই সত্যটাকে আড়াল করা হচ্ছে।

 

সংগঠিত ক্ষেত্রে কাজের কথা বলা হলেও অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক কিংবা সংগঠিত ক্ষেত্রের অস্থায়ী শ্রমিকের কাজ ও মজুরির নিশ্চয়তা নিয়ে কোনো কথা বলা হয়নি। কোম্পানিগুলো স্বল্প মেয়াদে কর্মী বা শিক্ষানবিশ নিয়োগ করবে। তাঁদের বেতন বা ভাতাও যেমন কম হবে, তেমন তার একাংশ সরকার দেবে বলে কোম্পানির খরচও কমবে। নির্দিষ্ট সময়ের পর তাঁদের ছাঁটাই করে নতুন নিয়োগের মাধ্যমে সরকারের ভর্তুকিও কোম্পানিগুলো পাবে। কতজন নতুন করে কাজ পেল তার প্রচার হবে। কতজন কাজ হারাল, সেই তথ্য সরকার দেবে না। সরকারের এই নীতিতে স্বল্প মেয়াদে কম মজুরিতে অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ আরও বাড়বে। তাঁদের ন্যূনতম মজুরি, অবসরকালীন সুযোগের কোনো প্রশ্নই থাকবে না। নয়া উদারনীতির নির্দেশে শস্তা শ্রমের বাজার তৈরি করাই সরকারের ফন্দি, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে তার বয়ে গেছে। তাই তো এত আপত্তির পরেও সরকার অগ্নিবীর প্রকল্পে ৮৩% বরাদ্দ বাড়িয়ে করেছে ৫,২০২ কোটি টাকা।

নয়া উদারনীতির প্রণেতা এবং দালালরা দক্ষ শ্রমিকের অভাবের কথা প্রচার করে থাকে। শ্রমের বাজারে শ্রমিকের চাহিদা আছে, কিন্তু দক্ষ শ্রমিকের যোগান নেই বলেই এত বেকার – এমন একটা প্রচার চালানো হয়। নির্মলা সীতারামণের বাজেট সেই মানসিকতারই প্রতিফলন। পণ্যের চাহিদার অভাবে সারা বিশ্বজুড়ে আর্থিক মন্দা চলছে। মানুষের কেনার ক্ষমতা নেই। মন্দায় শ্রমের বাজারে চাহিদার থেকে জোগান বেশি থাকে। অর্থাৎ কর্মপ্রার্থীর থেকে চাকরির সুযোগ কম থাকে। দক্ষ কর্মপ্রার্থীও কাজ পান না, কিংবা দক্ষ শ্রমিক কাজ হারান। বেকার সমস্যার কারণ কর্মপ্রার্থীর দক্ষতার অভাব নয়, কাজের সুযোগ ক্রমশ কমে যাওয়া। সেই সত্যটাকে আড়াল করা হচ্ছে। আড়াল করা হচ্ছে কর্মহীন বিকাশের বাস্তবতা। মোদীজির বিকশিত ভারত সেই কর্মহীন বিকাশের পথেই চলছে।

কৃষিক্ষেত্র

বাজেট দাবি করেছে, কৃষিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কৃষি ও কৃষিজাত কাজে বরাদ্দ হয়েছে প্রায় ১,৫২,০০০ কোটি টাকা। কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রকের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ১,৩২,৪৭০ কোটি টাকা। মোট বাজেট বরাদ্দের তিন শতাংশেরও কম। অথচ আর্থিক সমীক্ষাই জানাচ্ছে, ২০২৩-২৪ সালে কৃষিক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ১.৪%। কৃষকদের দাবি অনুযায়ী ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের জন্য আইন প্রণয়ন করার ব্যাপারে বাজেট এবারেও নীরব। প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনায় বরাদ্দ গতবারের সংশোধিত বরাদ্দের থেকে ৪০০ কোটি টাকা কমেছে। অথচ আর্থিক সমীক্ষা বলেছে, খামখেয়ালি আবহাওয়ায় ফসল উৎপাদন কমছে। অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টিতে ফসল বিমার প্রয়োজনীয়তা যখন বাড়ছে, তখন সেই প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো হল। পিএম কিষাণ প্রকল্পেও বরাদ্দ বাড়ানো হয়নি।

কৃষি গবেষণা, ফসল মজুত, বিতরণের জন্য বড় বড় কোম্পানির অনুপ্রবেশের সুযোগ আরও বাড়ানো হয়েছে। কৃষির উন্নতির জন্য জাতীয় সমবায় নীতির কথা বলা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সমবায় পরিচালনায় রাজ্যের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে কেন্দ্রীকরণের যে ঝোঁক এনডিএ আমলে দেখা যাচ্ছে – এই পদক্ষেপ তারই অনুসারী। কৃষক উৎপাদক সংস্থা (এফপিও), সমবায় প্রভৃতি গড়ে ফসল চাষ, মজুত, বিক্রির উপর জোর দেওয়ার মধ্যে নতুনত্ব নেই। এর আগেও সরকার ২২,০০০ নতুন গ্রামীণ হাট, ১০,০০০ এফপিও গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই কাজ কতটা এগিয়েছে, এফপিওগুলোর বর্তমান অবস্থা কী তা সরকার জানায়নি।

 

জমির মালিকানার তথ্য ডিজিটাল হলেও সেই জমিতে ভাগে বা অন্য কোনো বন্দোবস্তে চাষ করা কৃষকের জন্য কিন্তু কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। জমির তথ্য ডিজিটাল করলেই প্রকৃত কৃষক চিহ্নিত করা যায় না। মালিকানার জোরে অনেকে চাষ না করেও সরকারি নানা সুযোগ পেয়ে যান, প্রকৃত কৃষক বঞ্চিত হন।

 

এক কোটি কৃষককে জৈব চাষে উৎসাহিত ও সহায়তা করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ফসলের দাম নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। সারে গতবছরের সংশোধিত বরাদ্দের থেকে এবার বরাদ্দ ২৫,০০০ কোটি টাকার বেশি কমেছে। রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব চাষে উৎসাহ বাড়ানোর চেষ্টা টেকসই করতে গেলে ফসলের দামের নিশ্চয়তা জরুরি। নাগরিকদের আধারের মত এবার জমির জন্য আধারের কথা বলা হয়েছে। থাকবে আইডেন্টিফিকেশন নম্বর। জমি সংক্রান্ত তথ্য ডিজিটাল করা হবে। জমির ডিজিটাল নথি ও জমি মানচিত্র জমি লুঠ প্রতিরোধে কার্যকরী হতে পারে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা। আবার এই তথ্যকে হাতিয়ার করে বড় বড় কোম্পানি কৃষি জমি সরাসরি কম দামে কিনে নিতেও পারে। ডিজিটাল নথিভুক্তি বা জমি আধারের খরচ কৃষককে বহন করতে হলে প্রান্তিক, ক্ষুদ্র কৃষকরা সংকটে পড়বেন। সবচেয়ে বড় কথা, জমির মালিকানার তথ্য ডিজিটাল হলেও সেই জমিতে ভাগে বা অন্য কোনো বন্দোবস্তে চাষ করা কৃষকের জন্য কিন্তু কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। জমির তথ্য ডিজিটাল করলেই প্রকৃত কৃষক চিহ্নিত করা যায় না। মালিকানার জোরে অনেকে চাষ না করেও সরকারি নানা সুযোগ পেয়ে যান, প্রকৃত কৃষক বঞ্চিত হন। এই ব্যবস্থা পাট্টা না থাকা খাস জমিতে চাষ করা কৃষকদেরও উপকার করবে না।

বিভিন্ন মন্ত্রক ও প্রকল্পের জন্য ব্যয় বরাদ্দ

গ্রামোন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ মিলিয়ে মোট বাজেট বরাদ্দ ৪,২৩,২৭৭ কোটি টাকা। শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা খাতেই বরাদ্দ হয়েছে ৪,৫৪,৭৭৩ কোটি টাকা। এর সঙ্গে আছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের জন্য বরাদ্দ ১,৫০,৯৮৩ কোটি টাকা। দেশের নাগরিকের কাছে বড় নিরাপত্তা পেট ভরা পুষ্টিকর খাবার, উপার্জন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা। সেগুলোকেই সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে না। যে দেশ বিশ্ব ক্ষুধা সূচক, শিশু অপুষ্টির বিচারে পৃথিবীতে একেবারে পিছনের সারিতে রয়েছে, সেই দেশে খাদ্যে ভর্তুকি কমে যাচ্ছে। গতবারের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় এবার খাদ্যে ভর্তুকি প্রায় ৬,৫০০ কোটি টাকা কমে হয়েছে ২,০৫,২৫০ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ সালে খাদ্যে খরচ হয়েছিল ২,৭২,৮০২ কোটি টাকা। অতিমারির সময়ে ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ আর্থিক বছরে রেশনে খাদ্যদ্রব্যের জন্য বরাদ্দ বেড়েছিল। তারপর থেকে কমেই চলেছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী ৮০ কোটি মানুষকে বিনামূল্যে খাদ্যশস্য দেওয়ার বড়াই করছেন। খাদ্য নিরাপত্তা আইন অনুসারে প্রত্যেক নাগরিককে খাদ্যের অধিকার সরকার দিতে পারেনি। সেই আইনের কথা বেমালুম চেপে গিয়ে মিথ্যা প্রচার করছে সরকার।

আরো পড়ুন মধ্যবিত্তকে ভুল বুঝিয়ে গরিবকে ভুলে থাকা বাজেট 

২০২২ সালের মধ্যে অপুষ্টিমুক্ত ভারত গড়তে ২০১৮ সালে নেওয়া হয়েছিল সক্ষম অঙ্গনওয়াড়ি ও পোষণ ২.০ প্রকল্প। সুসংহত শিশু বিকাশ প্রকল্পের সঙ্গে আরও কয়েকটি প্রকল্প জুড়ে এই গালভরা নাম দেওয়া হয়েছিল। অপুষ্টি কমেনি, কিন্তু এই প্রকল্পে বরাদ্দ কমেছে। এবারের বাজেটে গতবারের সংশোধিত বরাদ্দের থেকে ৩২৩ কোটি টাকা কমে তা হয়েছে ২১,২০০ কোটি টাকা। মিড ডে মিলের গালভরা নাম হয়েছে পিএম পোষণ প্রকল্প। গতবারের (২০২৩-২৪) সংশোধিত বরাদ্দের থেকে এবার এই প্রকল্পে বরাদ্দ মাত্র ২,৪৬৭ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ১২,৪৬৭ কোটি টাকা। অথচ ২০২২-২৩ আর্থিক বছরে এই প্রকল্পে খরচ হয়েছিল ১২,৬৮১ কোটি টাকা। খাদ্যদ্রব্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে চলেছে। আর শিশু, পড়ুয়াদের রান্না করা খাবারের জন্য বিভিন্ন প্রকল্পে খরচ কমানো হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে প্রাথমিক স্কুলের পড়ুয়াদের জন্য মিড ডে মিলে মাথা পিছু বরাদ্দ ৫.৪৫ টাকা আর উচ্চ প্রাথমিকের পড়ুয়াদের জন্য মাথা পিছু ৮.১৭ টাকা। দুর্মূল্যের বাজারে এই টাকায় পুষ্টিকর তো দূরের কথা, পেট ভরা খাবার দেওয়াই দায়। তারই মধ্যে এলপিজিতে ভর্তুকি এবার কমানো হয়েছে ৩০০ কোটি টাকার বেশি।

আর্থিক সমীক্ষায় ১০০ দিনের কাজ (মনরেগা) দরিদ্র এলাকায় কম হওয়ার কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে কাজের চাহিদার সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতির দুর্দশার কোনো সম্পর্ক নেই। উত্তরপ্রদেশ ও বিহার মিলিয়ে বাস করেন দেশের দরিদ্র মানুষের ৪৫% (উত্তরপ্রদেশে ২৫%, বিহারে ২০%)। অথচ ওই দুই রাজ্যে ১০০ দিনের কাজে ব্যয় হয়েছে বরাদ্দের মাত্র ১৭% অর্থ। এর মানে অবশ্য এই নয়, যে ওই রাজ্য দুটোয় কাজের চাহিদা কম। এর মানে হল রাজ্য সরকারের ব্যর্থতায় কাজ হয়নি। পাশাপাশি তামিলনাড়ুতে দেশের মোট গরিব মানুষের মাত্র এক শতাংশের বাস হলেও ব্যয় হয়েছে বরাদ্দের ১৫% অর্থ। পশ্চিমবঙ্গ ও মণিপুরে কাজ বন্ধ রয়েছে। দেশজুড়ে জব কার্ড হোল্ডার পরিবারগুলোকে বছরে ১০০ দিন কাজ দিতে বরাদ্দ অনেক বাড়ানো প্রয়োজন। অথচ মনরেগায় বরাদ্দ গতবারের সংশোধিত বরাদ্দের চেয়ে বাড়েনি।

শিক্ষায় বরাদ্দ মাত্র ৮,০০০ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ১,২৫,৬৩৮ কোটি টাকা। উচ্চশিক্ষায় বরাদ্দ প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকা কমেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বরাত কমেছে প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকা (৬১%)। উচ্চশিক্ষায় দেশের প্রতিষ্ঠানে পড়ার জন্য প্রতিবছর এক লক্ষ ছাত্রছাত্রীকে ১০,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত ৩% সুদের হারে ঋণ দেওয়া হবে। ফি নিয়ন্ত্রণের বদলে ঋণ ব্যবস্থা। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রচুর টাকা খরচ করে পড়ার জন্য ছাত্রছাত্রীরা ধার করবে। শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা জমবে। চাকরির সুযোগ কমছে, ফলে দেনার দায়ে ডুববে ছাত্রছাত্রীরা। স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ মাত্র ১.৭% বেড়েছে।

কর কাঠামোয় বাড়বে অসাম্য

সরকারের খরচের ১৯% যায় ঋণের সুদ মেটাতে আর আয়ের প্রধান উৎস সেই ঋণই। সরকারের আয়ের ২৭% আসে ঋণ ও অন্যান্য দায় থেকে। সরকারের আয়ের আরেক বড় উৎস হল কর। প্রত্যক্ষ করের থেকে পরোক্ষ কর কম হলে অসাম্য কমার সম্ভাবনা থাকে। সারা বিশ্বেই অসাম্য কমাতে প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। অনেকেই সম্পদ করের প্রস্তাব দিচ্ছেন। এবারের বাজেটে প্রত্যক্ষ কর থেকে আয় ধরা হয়েছে ২২,৫৫,৪২৬ কোটি টাকা। আর পরোক্ষ কর থেকে আয় হবে ১৬,১৮,৭৪৪ কোটি টাকা। অসাম্য কমাতে পরোক্ষ কর আরও কমানো প্রয়োজন ছিল। উল্টে কর্পোরেট করের চেয়ে এই দেশে জিএসটি বাবদ আদায় বেশি হয়। জিএসটি হতদরিদ্র মানুষকেও দিতে হয়, আর কর্পোরেট কর দেন ধনকুবেররা।

 

আয়কর ও জিএসটি আদায় যেখানে লক্ষ্যমাত্রাকে ছাপিয়ে যায়, সেখানে কর্পোরেট কর আদায় হয় লক্ষ্যমাত্রার থেকে কম। কোম্পানিগুলো দিব্যি কর ফাঁকি দিয়ে মুনাফা বাড়াচ্ছে। অথচ যে জিএসটির ৬৩% দেয় গরিব, নিম্নবিত্ত মানুষ; তা লক্ষ্যমাত্রার থেকে বেশি আদায় হওয়ায় সরকার আর্থিক বিকাশের দাবি করে। সব কা সাথ সব কা বিকাশের অপূর্ব নমুনা।

 

গত বছর কর্পোরেট কর আদায় হয়েছিল ৯,১১,০৫৫ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার থেকে ১১,০০০ কোটি টাকা কম। এবারে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০,২০,০০০ কোটি টাকা। আয়করের বড় অংশ দেন মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবী, পেশাজীবীরা। গতবার আয়কর আদায় হয়েছিল ১০,৪৪,৭২৬ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার থেকে প্রায় ১,৪৪,০০০ কোটি টাকা বেশি। এবছর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১১,৮৭,০০০ কোটি টাকা। গত আর্থিক বছরে জিএসটি বাবদ আয় হয় ৯,৫৭,০৩২ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার থেকে ৪৩২ কোটি টাকা বেশি আদায় হয়েছিল। ২০২৪-২৫ সালের বাজেটে জিএসটি আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বেড়ে হয়েছে, ১০,৬১,৮৯৯ কোটি টাকা। আয়কর ও জিএসটি আদায় যেখানে লক্ষ্যমাত্রাকে ছাপিয়ে যায়, সেখানে কর্পোরেট কর আদায় হয় লক্ষ্যমাত্রার থেকে কম। কোম্পানিগুলো দিব্যি কর ফাঁকি দিয়ে মুনাফা বাড়াচ্ছে। অথচ যে জিএসটির ৬৩% দেয় গরিব, নিম্নবিত্ত মানুষ; তা লক্ষ্যমাত্রার থেকে বেশি আদায় হওয়ায় সরকার আর্থিক বিকাশের দাবি করে। সব কা সাথ সব কা বিকাশের অপূর্ব নমুনা। বিদেশি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ বাড়াতে তাদের কর্পোরেট কর ৪০% থেকে কমিয়ে ৩৫% করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় বাজেট সরকারের শ্রেণিচরিত্র আরও স্পষ্ট করেছে। এই সরকার অসাম্য কমাতে চায় না। বিকাশের গুড় উপর থেকে সামান্য চুঁইয়েও যাতে নিচে না আসে তারই নীতি ঠিক করে। আর্থিক সংকট সমাধানে চাহিদা বাড়াতে আমজনতার আয় বাড়ানোর কথা তারা ভাবতে চায় না। নয়া উদারনীতির দর্শনে সে কেবল জোগানের দিক নিয়েই ভাবে। নয়া উদারনীতির প্রতি এই কট্টর সমর্থনও ধর্মীয় মৌলবাদের মতই বিপজ্জনক।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.