সন্তোষ সেন

ফুলে ফেঁপে ওঠা অর্থপুঁজির (finance capital) করাল গ্রাসে নদী জল জমিন জঙ্গল সবকিছু প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে লোপাট হয়ে যাচ্ছে আমাদের রাজ্য সহ সারা দেশের প্রতিটি প্রান্তে। নদীর মাটি চুরি করে, ম্যানগ্রোভ অরণ্য সাফ করে ইটভাটার রমরমা। পাহাড় জঙ্গল বনাঞ্চল ধ্বংস করে উন্নয়নের বুলি আউড়ে চলছে নির্বিচারে কয়লা, লোহা, বক্সাইট সহ আকরিক তুলে আনার দৌড়। বাজারনির্ভর ভোগ্যপণ্য উৎপাদন বাড়িয়ে তুলছে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বড় বড় বিপর্যয় ঘটে যাচ্ছে অহরহ।

পরিবেশ বিপর্যয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দেশের জনগণের জীবনযাপন, কৃষিকাজ, মৎস্য চাষ ইত্যাদি। বনবাসী মানুষকে নিজ ভূমি থেকে উৎখাত করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিশ্ব উষ্ণায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, ঋতুছন্দে পরিবর্তনের ফলে খেটে খাওয়া মানুষের বিপর্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফসলের উৎপাদন কমছে। গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট, অতিবৃষ্টি, হড়পা বান ও ধসের কবলে গোটা ২০২৩ সাল জুড়ে হিমাচল প্রদেশ থেকে শুরু করে উত্তরাখণ্ড হয়ে সিকিমের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন জীবিকার মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। প্রচুর মানুষ বানভাসি, কত শত গবাদি পশু ভেসে গেছে বানের জলে, হেক্টরের পর হেক্টর কৃষিজমি জলের তলায়, হাজার হাজার ঘরবাড়ি ভেসে গেছে খড়কুটোর মত। বড়লোকের গাড়িও ভেসেছে জলের তোড়ে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ভয়াবহ বায়ুদূষণের পাশাপাশি দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই বন্যায় ভাসছে বারবার। এদিকে ২০২৪ সালে মাসাধিককাল জুড়ে দক্ষিণবঙ্গে জারি থাকল তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা। এই মুহূর্তে দিল্লির সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৬-৪৭ ডিগ্রি। তীব্র গরমে মানুষের হাঁসফাঁস অবস্থা। দীর্ঘ অনাবৃষ্টিতে মাঠের ফসল শুকিয়ে কাঠ। বারবার জলসেচ করে গাছকে কোনোরকমে বাঁচিয়ে রাখা গেলেও ফলন অত্যন্ত কম, বাজারে জিনিসপত্রের দাম ঊর্ধ্বমুখী। ফলের রাজা আমের দেখা নেই।

উন্নয়ন আর অপরিকল্পিত নগরায়নের ঠেলায় গাছ কেটে, পুকুর জলাশয় নদী, এমনকি নালা বুজিয়ে চলছে নির্মাণকাজ। কংক্রিটের চাদরে মুড়ে দেওয়া শহরে জল বেরনোর রাস্তা নেই, একটু বেশি বৃষ্টি হলেই হাঁটু ছাড়িয়ে কোমর সমান জল দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। গাছ, লতাগুল্মবিহীন কংক্রিটের জঙ্গলে তাপ মাথা কুটে মরছে, সারাদিন ধরে শোষিত অতিরিক্ত তাপ রাতেও আর বিকিরিত হয়ে ফিরে যেতে পারছে না। মেট্রো শহর সমেত মফস্বলগুলো এক একটি হিট ট্র্যাপ জোনে পরিণত। স্কুল, কলেজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে বেশ কিছুদিন ধরে। আমাদের কোনো হুঁশ নেই। যা হওয়ার তাই ঘটছে বারবার, তবু আমরা নিশ্চুপ।

বহুজাতিক কর্পোরেটের হাইব্রিড চাষ বয়ে এনেছে কৃষকের সমূহ সর্বনাশ, কমেছে মাটির উর্বরতা, পাল্টে যাচ্ছে জমির চরিত্র। রাসায়নিক চাষের বিষ আর শহরের বর্জ্য নদীনালা, জলাশয়, সমুদ্রের দূষণ ক্রমাগত বাড়িয়েই চলেছে। সমুদ্রের বুকে তৈরি হয়েছে ৪০০-র বেশি ডেড জোন বা মৃত্যু উপত্যকা, যেখানে মাছ, তিমি সমেত হাজারে হাজারে সামুদ্রিক প্রাণ মারা যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। চাষের কাজে ব্যবহৃত নাইট্রোজেন, ফসফরাস খেয়ে শ্যাওলাদের দল ক্রমাগত অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলেছে। তৈরি হচ্ছে অ্যালগাল ব্লুম। শ্যাওলার বাড়বাড়ন্তে সূর্যের আলো সাগরের গভীরে ঢুকতে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। অথচ পৃথিবীর ৬০% অক্সিজেন আসে সমুদ্রের ফাইটোপ্ল্যাংকন থেকে। সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র চরম সংকটে। জলের প্রাণির প্রাণ ওষ্ঠাগত।

বিষ পান করে মানুষের নিত্যনতুন রোগভোগ লেগেই আছে। অপ্রয়োজনীয় ও অপরিমিত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার দেশি বিদেশি ফার্মা কোম্পানির মুখে হাসি ফোটালেও সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। উপকারী ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, লক্ষ কোটি অণু জীব সমেত বৃহৎ প্রাণ হারিয়ে যাচ্ছে এক এক করে। মানুষও আজ আর ছাড় পাচ্ছে না। মানবসভ্যতা এর মধ্যেই পৌঁছে গেছে মানুষেরই সৃষ্ট গণবিলুপ্তির খাদের দোরগোড়ায়।

কর্পোরেটের পয়লা নম্বরের সেবাদাস কেন্দ্রীয় সরকার এবং নানারকমের রাজ্য সরকারগুলো পরিবেশ লুণ্ঠনের অবাধ ছাড়পত্র দিয়ে দিচ্ছে অবলীলাক্রমে। ওদের ব্যবসা এবং মুনাফার পাহাড়কে সুউচ্চ করে তুলতে উদ্বাহু কেন্দ্রীয় সরকার বনাধিকার আইন, জৈববৈচিত্র্য আইন – সবকিছু উল্টে পাল্টে দিচ্ছে। মণিপুরের পাহাড় জঙ্গল ও দামি আকরিক সরকারের পেয়ারের বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর হাতে নির্বিবাদে তুলে দিতে সাত বোনের দেশে উত্তেজনা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে নির্দ্বিধায়। সবদিক দিয়ে বিপর্যস্ত হচ্ছেন দেশের জনগণ। কাশ্মীর, লাদাখ অঞ্চলে মাটির গর্ভে থরে থরে সাজানো আছে লিথিয়ামের মত বহুমূল্য আকরিক। মুনাফাবাজ কর্পোরেটের শ্যেনদৃষ্টি পড়েছে বিরল খনিজ পদার্থের উপর। তাই লাদাখের হাজার হাজার হেক্টর তৃণভূমি দখল করে নেওয়া হয়েছে তথাকথিত সবুজ শক্তি সৌরবিদ্যুতের নামে। যার সুফল স্থানীয় আদিবাসী মানুষ তো পাবেনই না, উল্টে তাঁদের প্রধান জীবিকা মেষপালন ও পশমিনা চাদর তৈরি আজ হুমকির মুখে। এপেক্স বডি ও কার্গিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্সের সহযোগিতায় সোনম ওয়াংচুকের নেতৃত্বে হাজার হাজার লাদাখবাসী দীর্ঘদিন ধরে মরণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

আরো পড়ুন পরিবেশ রক্ষার নাম করেও শোষণ চালাচ্ছে প্রথম বিশ্ব

এই আন্দোলনগুলোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে কর্পোরেটের অবাধ লুঠতরাজ আরও মসৃণ করার জন্য মানুষে মানুষে বিভাজন বাড়িয়ে তুলতেও কুণ্ঠাবোধ করছে না ওরা, ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে সহযোগিতা সহমর্মিতা ভ্রাতৃত্ব ও বিশ্বমানবতার মূল্যবোধকে। লোকসভা নির্বাচনের প্রচার হচ্ছে মূলত ধর্মীয় বিভাজনকে প্রধান ইস্যু করে। মানুষের মননকে বিষিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে পুরোদমে। সাংবিধানিক স্বীকৃত বাকস্বাধীনতা আজ ছেঁড়া কাগজে পরিণত। পুঁজিকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে, মুনাফার পথকে বাধাহীন করতে মানুষকে তার ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে পুরে দিয়ে ব্যক্তিমানুষে পরিণত করার সমস্ত চক্রান্ত বহাল।

ভারতবর্ষের সত্যিকারের যুক্তিবাদী ভাবধারার ঐতিহ্যকে গুলিয়ে দিয়ে সারা দেশজুড়ে ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরি করা হচ্ছে। অবিজ্ঞান, অপবিজ্ঞান, কুসংস্কারের চাষ চলছে। ধর্ম, সাম্প্রদায়িকতাকে কেন্দ্র করে ভোটের দামামা বেজে উঠেছে। প্রতিবাদীদের দেশদ্রোহী তকমা সেঁটে জেলে পুরে দেওয়ার কালা কানুন তৈরি আছে। সমস্ত দিক দিয়ে ফ্যাসিবাদী শক্তি গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করছে। ধর্মের নামে, সনাতনী সংস্কৃতির নামে ভোট বৈতরণী পার করার চেষ্টা হলেও মানুষের হাতে কাজ, দুবেলা পেট ভরে খাবার, পরিবেশ সংকট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ব্যবস্থা সুগম করা, মূল্যবৃদ্ধি কমানো, মজুরি বাড়ানোর দিকে সরকার বাহাদুরের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই, সেই নিয়ে কোনো আলোচনা পর্যন্ত হচ্ছে না। তারা ভয় পাচ্ছে মানুষের ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে। পরিবেশ মেরামতি ও রক্ষা করার কাজে তাদের মনোনিবেশ নেই। দেশের গণতন্ত্র, সংবিধান রক্ষা করার পরিবর্তে তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে শাসক দল।

সংবিধানের ৫-১১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত জন্মসূত্রে প্রাপ্ত নাগরিকত্বের সব অধিকারকে জলাঞ্জলি দিয়ে নতুন কালা কানুন সিএএ লাগু করা হল। ২০১৯ সালে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাস করিয়ে নেয়। চারবছর ঝুলিয়ে রাখার পর ২০২৪ সালের ১১ মার্চ, নির্বাচনের নির্ঘণ্ট প্রকাশের কয়েকদিন আগে সিএএ-র বিধি তৈরি করে তা কার্যকর করা হল। এই লেখায় সিএএ কী ও কেন তার বিশদ আলোচনা মুলতুবি রেখে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলতে চাই পাঠকের ভাবনাকে উস্কে দিতে। নতুন আইনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ, পার্সি আর খ্রিস্টানরাই শুধু নাগরিকত্ব পাবেন। বলা ভাল নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন। চারবছর পর আইন লাগু করার কারণ কি নির্বাচনী বন্ড নিয়ে ফেঁসে যাওয়া বিজেপির ভোট বৈতরণী পার হওয়ার মরিয়া প্রচেষ্টা? মানুষে মানুষে ধর্মীয় বিভাজন বাড়িয়ে ভোটে জেতার পথ সুগম করার চেষ্টা?

রাজনীতির স্বার্থে কেন দেশের মানুষকে বারবার কাগজের পিছনে ছুটতে হবে? প্রকৃতপক্ষে নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার কোনো অধিকার নেই রাষ্ট্রনেতাদের। নাগরিকত্বের সাংবিধানিক অধিকারের সম্পূর্ণ উল্টো পথে হেঁটে বর্তমান আইনে তিনটি দেশ থেকে ধর্মীয় কারণে বিতাড়িত অমুসলিমদের ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য নানাবিধ শর্ত আরোপ করা হয়েছে। নাগরিকত্বের আবেদনে উল্লিখিত তিনটি দেশের নখানা সার্টিফিকেট, পারমিট বা পরিচয়পত্রের মধ্যে অন্তত একটি দাখিলের কথা বলা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হল, কোনো দেশ কি সে দেশের নাগরিককে লিখে দেবে, যে তিনি ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে ওই দেশ থেকে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন? কোনো পরিচয়পত্র পেয়ে থাকলেও এতদিন তা আগলে রাখা সম্ভব? বিশেষ করে বন্যা, ভূমিকম্প, নদীর ভাঙন ইত্যাদি দুর্যোগে বারবার আক্রান্ত মানুষের পক্ষে কি সব কাগজপত্র গুছিয়ে রাখা সম্ভব? সরকার যদি সত্যি নাগরিকত্ব দিতে চায়, তাহলে ভারতে প্রাপ্ত ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড, আধার কার্ড বা পাসপোর্টের ভিত্তিতে এইসব অসহায় মানুষগুলোকে সাংবিধানিক অধিকার দেওয়া হবে না কেন? সরকারের দেওয়া এইসব পরিচয়পত্রকে মূল্য না দেওয়া মানে তো নিজের দেওয়া নথিকেই সরকার সন্দেহ করছে।

নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার সঙ্গে সঙ্গেই তো একজন মানুষ নিজেকে বেনাগরিক বলে স্বীকার করে নিলেন। তাহলে তাঁরা এতদিন কী করে ভোট দিলেন? তাঁদের ভোটে নির্বাচিত সরকার কীভাবে দেশ শাসন করল? সবই তো তাহলে বেআইনি হয়ে যায়। সবচেয়ে বড় কথা, সংবিধান যে দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে ঘোষণা করেছে, সেই দেশ কি আদৌ ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব প্রদান করতে পারে? সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিকদের আইনের চোখে সমতা এবং আইন দ্বারা সমভাবে রক্ষিত হওয়ার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-জাতভিত্তিক বৈষম্যের শিকার না হওয়ার অধিকারের কথা বলা হয়েছে ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে। এই দুই অধিকারই বাস্তবত লঙ্ঘিত হচ্ছে নতুন নাগরিকত্ব আইনে।

আবেদন করার পর যথেষ্ট প্রমাণের (কোনটা প্রমাণ তা কে ঠিক করবেন জানা নেই) অভাবে নাগরিকত্ব বাতিল হওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘ক্রনোলজি’ অনুযায়ী এনআরসি তো অবশ্যম্ভাবী। আসামে ঠিক এটাই হয়েছে। সরকারি দফতরের কলমের খোঁচায় ১৯ লক্ষ মানুষকে রাতারাতি বেনাগরিক ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ১২ লক্ষের বেশি হিন্দু। এনআরসিতে কারোর রেহাই নেই – একথা স্পষ্ট বুঝে নেওয়া দরকার। ডিটেনশন ক্যাম্পই যদি ঠিকানা হয়, তাহলে সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লিখিত জীবনের অধিকারও খর্ব হতে বাধ্য। অনির্দিষ্টকাল একজন মানুষকে ডিটেনশন ক্যাম্পের অন্ধকূপে আটকে রাখা ভারতীয় এবং আন্তর্জাতিক সমস্ত বিধির পরিপন্থী। অর্থাৎ এক কথায় ২০০৩ এবং তারপর ২০১৯ সালের সংশোধনী আইন সম্পূর্ণভাবে বেআইনি নয় কি? সংবিধান, গণতন্ত্র, আইন, এতদিন ধরে লাগু থাকা সুযোগসুবিধা – এসব লঙ্ঘন করার পাশাপাশি বর্তমান সংশোধনী আইন আরও একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিককে তুলে ধরেছে।

এনআরসির মধ্যে দিয়ে আসামের মত সারা দেশে লক্ষ কোটি মানুষকে বেনাগরিক করে দিয়ে রাষ্ট্র কী করতে চাইছে? শস্তা শ্রমিক তৈরি করাই এসবের আসল উদ্দেশ্য নয় তো? সমস্ত ধরনের পরিচয়পত্র হারিয়ে বেনাগরিক মানুষ কার্যত বাধ্য হবেন কর্পোরেটদের শর্ত মেনে শস্তা মজুরে পরিণত হতে। বেনাগরিক হয়ে যাওয়া এইসব মানুষের জমিজমা, বাস্তুভিটে সহজে কেড়ে নেওয়া যাবে। বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলের জনজাতি এবং আদিবাসী মানুষকে থেকে উচ্ছেদ করে পাহাড় জঙ্গল নদীসহ সমস্ত খনিজ সম্পদ নির্বিবাদে লুঠ করার ছাড়পত্র পেয়ে যাবে দেশি বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। বর্তমানে প্রায় ৩১,০০০ শরণার্থী অমুসলিমকে নাগরিকত্ব দেওয়ার নামে সিএএ চালু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পরবর্তীকালে আসামের মত সারা দেশে এনআরসি হলে আমরা কতজন প্রয়োজনীয় কাগজ দেখাতে সমর্থ হব? এখন যাঁদের বয়স পঞ্চাশের বেশি, তাঁদের তো জন্মের প্রমাণপত্রই ছিল না। মূলত বাড়িতে ধাইমার তত্ত্বাবধানেই প্রসব করানো হত। গ্রাম মফস্বলের মানুষ হাসপাতাল বিষয়টির সঙ্গে তেমন পরিচিতই ছিলেন না। এই আলোকেও বিচার করতে হবে সিএএ এবং এনআরসি-কে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই, বিশেষ করে নয়া উদার অর্থনীতির যুগে সমস্ত দেশে উৎপাদন প্রক্রিয়া ও উপকরণ ছড়িয়ে দিয়ে অর্থপুঁজি আজ আন্তর্জাতিক। বড় বড় বিজ্ঞান গবেষণা ও প্রযুক্তির উন্নয়ন, পরিবেশ বিপর্যয় এবং তার সমাধানও আজ বিশ্ব পরিসরে পরিব্যাপ্ত। তাহলে শুধুমাত্র মানুষকেই কেন জাতীয় স্তরে, বা জাতপাত বর্ণ ধর্মের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আবদ্ধ করে রাখার চেষ্টা চলবে? পুঁজির বিনিয়োগ, উৎপাদন, সঞ্চালন ও বাজারের স্বার্থে কাঁটাতারের বেড়া টপকে সে আজ বিশ্বজুড়েই ছড়িয়ে পড়েছে। তাহলে কেবল মানুষই কেন কাঁটাতারের যন্ত্রণায় বারবার বিদ্ধ হতে থাকবে? একজন মানুষকে কেন বারবার তার নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে?

সামাজিক সমস্যা, যুদ্ধ ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া মানুষগুলোর নাগরিকত্বের কী হবে? ইউরোপ, আমেরিকায় ছড়িয়ে থাকা লক্ষ লক্ষ ভারতীয়কে যদি ওই দেশগুলো নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকার করে, তখন কী হবে? বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এর মধ্যেই মানুষের বিরুদ্ধে, মানবতার বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্টড়ের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্ণবিদ্বেষ, হিংসা, ঘৃণা, কঠোর অভিবাসন নীতির মত তাস খেলে আমেরিকার হেজ ফান্ডের বলে বলীয়ান হয়ে আবার ক্ষমতায় ফিরতে তৎপর। ব্রিটিশ প্রধামন্ত্রী ঋষি সুনকও জানিয়েছেন, দেশের নিয়ম নীতি, আইনকানুন, সংবিধানের বিরোধিতা মানেই দেশদ্রোহিতা। সব শক্তিকেন্দ্র থেকে সহসা একই রকমের বাণী বর্ষিত হচ্ছে। আসলে এভাবেই ভুবন জোড়া ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলো মানুষকে নানা খোপে পুরে টুকরো টুকরো করতে সচেষ্ট। বিশ্বজোড়া এই প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে আমাদের বিশ্ব মানবতার কথা, শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিকতার কথা আবার সোচ্চারে সামনে আনতে হবে।

সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে একদিকে সংসদে একের পর এক জনস্বার্থ বিরোধী আইন পাস করা হচ্ছে, পরিবেশ আইনগুলোকে পর্যন্ত কর্পোরেটের স্বার্থে আমূল পাল্টে দিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করা হচ্ছে। দেশের শীর্ষ আদালত হস্তক্ষেপ করে সরকারকে জানিয়ে দিয়েছে – একটি সুস্থ পরিবেশ নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। সেই অধিকার রক্ষায় কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তিযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করুক। অন্যদিকে দেশের বিশিষ্ট মানুষজন আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি সরকার আবার ক্ষমতায় এলে দেশের সংবিধান আমূল পাল্টে ফেলে তথাকথিত হিন্দুরাষ্ট্র বা রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা কুরবে। দেশে আরও কিছু মন্দির মসজিদ বা গির্জা তৈরি করলে মানুষের পেটে ভাত, হাতে কাজ জুটবে তো, পরিবেশ সমস্যার সমাধান হবে তো?

আজ স্পষ্ট বুঝে নেওয়া দরকার – দেশের প্রবল বেকারত্ব, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, আর্থিক বৈষম্য, আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি এবং সংবিধান, গণতন্ত্র তথা পরিবেশ সংকট আজ জট পাকিয়ে আছে। সব সমস্যা যুক্ত হয়ে পরিণত হয়েছে এক বড় মালায়। এই মালার সুতোয় সজোরে টান দিতে পারলে সব সমস্যা ছিঁড়ে পড়বে এক এক করে। মানুষ মুক্ত হবে, প্রকৃতি মুক্ত হবে, নারী তার মর্যাদা ফিরে পাবে। তাই চিরাচরিত শ্রম বনাম পুঁজির দ্বন্দ্বের পাশাপাশি আজ প্রকৃতি বনাম পুঁজির দ্বন্দ্ব বড় হয়ে উঠেছে। এই দ্বন্দ্ব আসলে একই সমস্যার দুটি মেরু। তাই এই সমস্যাকে সম্যক বুঝে নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো যত শীঘ্র মানুষের কাছে পৌঁছবে, ততই মঙ্গল।

শিক্ষক, পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.