গত মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতি, আহসানুদ্দিন আমানুল্লাহ ও প্রশান্ত কুমার মিশ্রের ডিভিশন বেঞ্চ পতঞ্জলির এম ডি বালকৃষ্ণের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার নোটিস জারি করেছে। কারণ সংস্থার পক্ষ থেকে আধুনিক বিভিন্ন রোগ সম্পর্কিত আজব বিজ্ঞাপন। ডায়াবেটিস-১, সুগার, তীব্র শ্বাসকষ্টের মত দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে রামদেবের দাওয়াই নাকি যথেষ্ট; অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের কোনো প্রয়োজন নেই। রামদেব নাম করা যোগগুরু সন্দেহ নেই, আর এখন দেশজুড়ে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানে ঘটা করে প্রতিবছর যোগ দিবসও পালন করা হচ্ছে। আধুনিক জীবনযাপনে যোগব্যায়ামের যে গুরুত্ব আছে তাও অনস্বীকার্য, কিন্ত তা বলে অন্য সব চিকিৎসা পদ্ধতি অন্তঃসারশূন্য, এমনটা শিক্ষিত মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়া কষ্টসাধ্য।

ঘটনার সূত্রপাত বছর তিনেক আগে। কোভিড অতিমারীর সময় ‘কোরোনিল’ নামে এক টিকা বার করে রামদেবের সংস্থা এবং দাবি করে যে মাত্র সাতদিনে সেটা করোনাকে গোড়া থেকে নির্মূল করতে সক্ষম। ক্লিনিকাল ট্রায়ালে নাকি এমনটাই দেখা গেছে। সেইসময় হুড়মুড়িয়ে বিক্রিও হয়েছিল ওই ওষুধ। ফলে প্রায় ২৫০ কোটি টাকার মুনাফা হয় রামদেবের আয়ুর্বেদ সংস্থার। নিজের দই টক কোন গোয়ালা বলবে? তাই এমন বিজ্ঞাপনে সমস্যা ছিল না, থাকার কথাও নয়। কিন্ত রামদেব আরও এক কাঠি আগে বেড়ে দাবি করেন, ‘অ্যালোপ্যাথি এক অ্যায়সি স্টুপিড ঔর দেওলিয়া সায়েন্স হ্যায়…”। এখানেই বাধে গণ্ডগোল। মহান যোগগুরুর দাবি, রেমডেসিভির, ফেভিফ্লু – এসব নাকি করোনা রোগীদের কোনো কাজেই লাগেনি। বোঝো কাণ্ড! অতিমারীর সময়ে ডাক্তার, নার্স, ওষুধ সরবরাহের লোকজন নিজেদের জীবন বিপন্ন করে ছুটে বেড়িয়েছেন করোনা রোগীর সেবায়। স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কত মানুষ যে শুধু লোকজনকে সাহায্য করতে গিয়ে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তার ইয়ত্তা নেই। ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (আইএমএ) তখন তড়িঘড়ি কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রকের কাছে রামদেবের এহেন অপপ্রচারের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানায়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

যে দেশের বিজ্ঞানীরা সীমিত অর্থবলে, প্রযুক্তিগত নানা অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও চন্দ্রাভিযান, মঙ্গল অভিযান সফল করেছেন, আদিত্যের মত সৌরযান পাঠাচ্ছেন মহাকাশে, সেই দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রক পতঞ্জলির এহেন অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেবে – বিজ্ঞানমনস্ক, স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ অন্তত তাই ভেবেছিলেন। কিন্ত কোথায় কী? তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষবর্ধন নাকি মৃদু ধমক দিয়েছিলেন ওই সংস্থার মাথাদের। যোগগুরু রামদেবের কাছ থেকে আরেকটু সংবেদনশীল মন্তব্য আশা করেছিলেন তিনি। আইএমএ সেইসময় দাবি করেছিল পতঞ্জলির বিরূদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা দায়ের করুক স্বাস্থ্যমন্ত্রক, না হলে তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হবেন।

হলও তাই। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আমানুল্লাহ সম্প্রতি সলিসিটর জেনারেল কেএম নটরাজকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন ‘এতদিনে পতঞ্জলির বিরূদ্ধে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কেন্দ্র?’ সঙ্গে বলা হয়েছে, আদালতের পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত ওই সংস্থাকে এই ধরনের সমস্ত বিজ্ঞাপন বন্ধ রাখতে হবে। অন্যথায় প্রত্যেক পণ্যের উপরে এক কোটি টাকা করে জরিমানা হবে। গত নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের আর এক বিচারপতি কোহলি বলেছিলেন ‘আদালত ভুয়ো বিজ্ঞাপন দিতে নিষেধ করেছিল… তারপরও বারবার আপনার সংস্থা দাবি করে এসেছে আপনাদের ওষুধেই আছে পার্মানেন্ট রিলিফ বা চির নিরাময়!’ এই সূত্র ধরেই বিচারপতি আমানুল্লাহ ধমকেছেন পতঞ্জলিকে, ‘এই পার্মানেন্ট রিলিফ বলতে আপনারা কী বোঝাতে চাইছেন… মৃত্যু আর সুস্থতা ছাড়া তৃতীয় কোনো পার্মানেন্ট রিলিফ হতে পারে না।’

আরো পড়ুন যুক্তিবোধ সমূলে উৎপাটিত করতেই ডারউইন বিদায়

বর্তমানে দেশের জৈব প্রযুক্তি বিভাগ, জিনতত্ত্ব গবেষণা এতটাই এগিয়ে আছে যে, ক্লিনিকাল ট্রায়ালে পরীক্ষামূলক সাফল্য না মিললে টিকা বা ওষুধ জনসাধারণের ব্যবহারের জন্যে অনুমতি দেওয়া হয় না। সেখানে পতঞ্জলির এহেন অপপ্রচার কোনোভাবেই কাম্য নয়। দেড়শো কোটি মানুষের দেশে কিছু কিছু অপপ্রচার হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সংস্থার মাথাদের সঙ্গে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের জনপ্রতিনিধিরা, অনেক ক্ষেত্রে মন্ত্রীরাও একই মঞ্চে কুশল বিনিময় করছেন – এ দৃশ্য স্বস্তিদায়ক নয়। মহাকাশ বিজ্ঞান, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, জৈব প্রযুক্তি প্রভৃতি বিষয়ে অভূতপূর্ব উন্নতি হলেও যে দেশের শতাব্দীপ্রাচীন জাতীয় বিজ্ঞান মহা অধিবেশন কোনো এক অদৃশ্য অঙ্গুলিহেলনে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, গবেষণা খাতে বরাদ্দ বিভিন্ন বহুমুখী অনুদান প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায় বা অন্য প্রকল্পের সঙ্গে মিশিয়ে গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া হয়, সেখানে এরকম ঘটনা ঘটতেই পারে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.