প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ছোট্ট দ্বীপ তুভালু। বাসিন্দা সাকুল্যে ১২,০০০। সমুদ্রের জলস্তর ক্রমাগত বাড়তে থাকলে আগামী কয়েকশো বছরের মধ্যে তলিয়ে যাবার আশঙ্কা যে দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর, তার অন্যতম এই তুভালু। সেই চরমতম পরিণতি যদি ঘটেই, তবে প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজের রাষ্ট্রসত্তাটুকু টুভালু টিকিয়ে রাখতে চায় পৃথিবীর মানচিত্রে। এই মর্মে তুভালুর জনৈক মন্ত্রীর নাটকীয় ঘোষণার সাক্ষী রইলেন মিশরের শার্ম অল শেখে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ আয়োজিত জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রায় ২০০ দেশের প্রতিনিধিরা। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ২৭তম শীর্ষ সম্মেলন, ওরফে COP27, চলার কথা ছিল ৬ থেকে ১৮ নভেম্বর। কিন্তু সম্মেলনের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে লেগে গেল আরও দুদিন।

কী সেই অভীষ্ট লক্ষ্য?

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়ার জন্য একটি ক্ষয়ক্ষতি তহবিল (Loss and Damage fund) তৈরি করা।

১৯৯২ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের আইনি কাঠামো (United Nations Framework Convention for Climate Change বা UNFCCC) তৈরি হওয়ার সময় থেকেই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো প্রথম বিশ্বের দেশগুলোর কাছে প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার দাবি জানিয়ে আসছে। এই দাবির পিছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক ন্যায়ের যুক্তি – প্রথম বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলো গ্রীনহাউস গ্যাস এবং কার্বন নির্গমন বেশি করলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বৃহত্তর বলি হয় স্বল্পোন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো। কাজেই সেই বিপর্যয়জনিত ক্ষয়ক্ষতি সামলানোর জন্য উন্নত দেশগুলোর সহায়তা তাদের ন্যায্য পাওনা। কিন্তু দীর্ঘ তিন দশকে বহু আলাপ আলোচনা সত্ত্বেও প্রথম বিশ্বের দেশগুলো এ বিষয়ে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি। একের পর এক সম্মেলনে প্রথম বিশ্বের দেশগুলোর কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি যত এসেছে, অর্থ তত আসেনি। গত এক বছরে পাকিস্তানের ভয়াবহ বন্যা, ইউরোপের তাপপ্রবাহ, আফগানিস্তানের ভূমিকম্প, পূর্ব আফ্রিকার তীব্র খরা – একের পর এক বিপর্যয় এই তহবিলের প্রয়োজনীয়তাকে আরও প্রকট করে তুলছিল। অবশেষে COP27 বাস্তবায়িত করতে পারল সেই বহু প্রতীক্ষিত ক্ষয়ক্ষতি তহবিল। ২০০১, ২০১১ এবং ২০১৬ সালের পর এই চতুর্থবার COP সম্মেলন হল আফ্রিকা মহাদেশে। সেই সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর দাবিদাওয়া পূরণের লক্ষ্যে কিছুটা হলেও এগোতে পারল সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ।

আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্দিষ্ট অবস্থান নেওয়া সম্ভব হল এই সম্মেলনে। যেমন পৃথিবীর গড় উষ্ণতা বৃদ্ধি প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে হলে জলবায়ু সংকট ও জীববৈচিত্র্যের সংকটকে যে দুটি আলাদা বিষয় হিসাবে দেখা আর সম্ভব নয়, বরং সামগ্রিক অর্থে প্রকৃতির সংরক্ষণ ও প্রতিস্থাপনই একমাত্র পথ, তা স্পষ্টভাবে বলা হল। আলোচনায় বিশেষ প্রাধান্য পেল বিকল্প এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির বিস্তার। ব্রাজিলের সদ্য নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান লুলা দা সিলভা ২০৩০ সালের মধ্যে ব্রাজিলে অরণ্যনিধন সম্পূর্ণ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। দীর্ঘকালীন অর্থসংস্থানের ক্ষেত্রে প্যারিস চুক্তির শর্তানুযায়ী উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু খাতে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি সত্বর পালন করার নির্দেশ দেওয়া হল এবং প্যারিস চুক্তির বাস্তবায়নের পথে কোন দেশ কতটা এগিয়েছে তার খতিয়ানও অচিরেই তৈরি করার সিদ্ধান্ত হল। পাশাপাশি আরও যে কয়েকটি তহবিলের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেল, সেগুলো হল – অভিযোজন তহবিল বা adaptation fund (২১১.৫৮ মিলিয়ন ডলার), ন্যূনতম উন্নত দেশসমূহের জন্য তহবিল বা fund for the least developed countries (৭০.৬ মিলিয়ন ডলার), জলবায়ু পরিবর্তন খাতে বিশেষ তহবিল বা special climate change fund (৩৫ মিলিয়ন ডলার), বিশ্ব পরিবেশ তহবিল বা global environment facility-র অষ্টম কিস্তি (১০৫.৬ মিলিয়ন ডলার) এবং বিশ্ব সুরক্ষা সংস্থান তহবিল বা global shield financing facility।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুঝতে মূল দুটি পন্থার কথা বলে UNFCCC – অভিযোজন (adaptation) এবং প্রশমন (mitigation)। অভিযোজনের উপর বারবার জোর দেওয়া হল COP27-এর বিভিন্ন বৈঠকে। এই প্রসঙ্গে অভিযোজন বলতে বোঝায় পরিবর্তনশীল জলবায়ুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। গাছ লাগানো থেকে শুরু করে জৈব চাষ, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, শস্য আবর্তন, জলনিকাশী ব্যবস্থার উন্নয়ন, উপকূলবর্তী ভূমিক্ষয় প্রতিরোধে ম্যানগ্রোভ অরণ্য বা অন্যান্য পরিবেশবান্ধব পরিকাঠামো – সবই অভিযোজন প্রক্রিয়ার অংশ। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সহায়তায় বিভিন্ন দেশের সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসন তাদের অভিযোজন ক্ষমতা বাড়াতে পারে। প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মানুষে, যাঁদের জীবন জীবিকা ব্যাপকভাবে প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীল এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রকোপ যাঁদের উপর সবচেয়ে বেশি, তাঁরা এই অভিযোজন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার – যেমন পেরু বা কিরিবাতির মৎস্যজীবী সম্প্রদায়, ঘানা বা কোস্টারিকার কৃষকরা। এঁদের শিক্ষিত, সক্ষম এবং সচেষ্ট করে তোলা অভিযোজন প্রকল্পগুলোর অন্যতম লক্ষ্য। বিভিন্ন তহবিলের মাধ্যমে COP27-এ অভিযোজন খাতে মোট ২৩০ মিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হল, যাতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সর্বাধিক সংকটাপন্ন অঞ্চলগুলোকে ২০৩০ সালের মধ্যে অনেকটা প্রতিরোধক্ষম করে তোলা যায়। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বিশ্বের সর্বত্র আগাম বিপদসংকেত দেওয়ার পরিকাঠামো তৈরি করার জন্যেও তিন বিলিয়ন ডলারের একটা প্রকল্পও ঘোষিত হল COP27-এ।

জলবায়ু পরিবর্তন রোখার দ্বিতীয় পন্থা প্রশমন, অর্থাৎ গ্রীনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমানো। সে ব্যাপারে কিন্তু খুব একটা আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি COP27। গ্রীনহাউস গ্যাসের মূল উৎস জীবাশ্ম জ্বালানি, অথচ কয়লার ব্যবহার ধীরে ধীরে কমানোর বিষয়ে যৌথ সম্মতিতে পৌঁছনো গেলেও সৌদি আরবের বিরোধিতার ফলে তেল ও গ্যাসের ব্যবহার কমানোর বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গীকার সম্ভব হয়নি। আবার জীবাশ্ম জ্বালানি অর্থাৎ তেল, গ্যাস এবং কয়লা উত্তোলক কোম্পানিগুলির তরফে ৬৩৬ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন এই সম্মেলনে। পৃথিবীর মোট গ্রীনহাউস গ্যাসের ৭৬% কার্বন ডাই অক্সাইড এবং মোট নির্গমনের ৭২% আসে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষেত্র থেকে। মজার কথা, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলাফল সংক্রান্ত যেসব গবেষণা হয়, তার একটা বড় অংশই চলে জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী সংস্থাগুলোর টাকায়। সুতরাং সর্ষের মধ্যে ভূত থেকে যায়। অতি সম্প্রতি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন গবেষক নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে মোট ২৬টা গবেষণাকেন্দ্রের ১,৭০০ প্রবন্ধ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, প্রাকৃতিক গ্যাস প্রস্তুতকারক সংস্থার টাকায় পরিপুষ্ট গবেষণাগুলোর ফলাফলও পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির তুলনায় প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহারকে শ্রেয়তর বলে দাবি করে। একইভাবে, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির বিকাশের ক্ষেত্রেও নানারকম আইনি বাধার সৃষ্টি করে জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদক সংস্থাগুলো। কখনো সরাসরি, কখনো তাদের টাকায় চলা নানারকম থিঙ্কট্যাঙ্ক, এনজিও, গবেষণাকেন্দ্র ইত্যাদি শাখা সংস্থার মাধ্যমে।

সাম্প্রতিককালে উত্তর আমেরিকার বেশ কয়েকটা উপকূলবর্তী বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রের বিরুদ্ধে আনা জনস্বার্থ মামলার পিছনে এদের স্পষ্ট ইন্ধন রয়েছে। কাজেই ধরে নেওয়া যায়, এই সংস্থাগুলোর তরফে এতজন প্রতিনিধির অংশগ্রহণ COP27-এর কার্যপ্রণালীকেও প্রভাবিত করেছে।

COP27
জীবাশ্ম জ্বালানি ও সিমেন্ট উৎপাদনের ফলে নির্গত মোট কার্বন-ডাই-অক্সাইড (১৭৫১ – ২০১৭)। সূত্র: সেন্টার ফর ক্লাইমেট এন্ড এনার্জি সলিউশনস

প্রাকৃতিক বিপর্যয়জনিত ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টা এই অভিযোজন এবং প্রশমনের থেকে আলাদা। বিশ্বের অধিকাংশ স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থা এক্ষেত্রে কামানধারী শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধে গিয়ে কাঠের তির-ধনুক নিয়ে প্রথম সারিতে দাঁড়ানোর মত। প্রথমত, সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতির প্রভাব উন্নত অঞ্চলের তুলনায় অনুন্নত অঞ্চলে অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে উত্তর আমেরিকার ফ্লোরিডায় আয়ান নামক হ্যারিকেন এবং জুন থেকে অক্টোবরের মধ্যে পাকিস্তানের বন্যার কথা। আর্থিক ক্ষতির মূল্যায়ন ফ্লোরিডায় ৬৭ বিলিয়ন ডলার এবং পাকিস্তানে ৪০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু মৃতের সংখ্যা ফ্লোরিডায় ১৪৬, আর পাকিস্তানে সরকারি হিসাবেই ১,৭০০-র বেশি মানুষ মৃত, ১২,০০০-এর বেশি আহত, আট লক্ষের বেশি বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এবং ২০ লক্ষের বেশি মানুষ ঘরছাড়া। ফ্লোরিডা উপকূলের ক্ষতিগ্রস্ত সমস্ত বাড়িরই বিমা করানো ছিল। সেখানে পাকিস্তানের ঘরছাড়া মানুষের ভেঙে যাওয়া পায়রার খোপের মতো ঘিঞ্জি আস্তানা নতুন করে গড়ে তুলতে হয়ত বেশ কয়েক বছর লেগে যাবে। অনেক ক্ষেত্রে আদৌ সম্ভবই হবে না।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মানিয়ে নেওয়ার মত পরিকাঠামোর অভাবে এবং প্রান্তিক সম্প্রদায়ের বিকল্প জীবিকার অভাবে একটা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ই সুদূরপ্রসারী আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়। অথচ বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতি বছরই একাধিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে থাকে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের পিছনে উন্নয়নশীল দেশের প্রান্তিক সম্প্রয়দায়গুলোর অবদান নগণ্য। এমনকি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমনের হার যদি শূন্যেও নেমে যায়, তাহলেও শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে ইতিমধ্যেই হওয়া নির্গমনের ফল থেকে তারা রেহাই পাবে না। সর্বোপরি আর্থিক বন্টনে চূড়ান্ত বৈষম্যের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোজন, প্রশমন এবং পুনর্বাসনের ক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় এতটাই অপ্রতুল যে উন্নত দেশগুলোর তরফে আর্থিক সহায়তা আর নেহাত ক্ষতিপূরণের ব্যাপার নয় – মানবিকতা এবং ন্যায়ের বিষয়, সামগ্রিকভাবে প্রাণ ও প্রকৃতি সংরক্ষণের ব্যাপার।

আরো পড়ুন সিলিকোসিস: সভ্যতার স্বার্থে ঘটে চলা নীরব গণহত্যা

১৯৯১ সালে UNFCCC-র প্রাথমিক খসড়া তৈরি করার সময়ে ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর তরফে ভানুয়াতু একটা বিমা প্রকল্পের প্রস্তাব আনে, যাতে প্রত্যেকটা দেশ তাদের জাতীয় গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমন ও জাতীয় আয় অনুযায়ী অনুদান দেবে। সে প্রস্তাব বাতিল হয়। ২০০৭ সালের COP13 সম্মেলনে প্রথম লিখিতভাবে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে প্রাকৃতিক বিপর্যয়জনিত ক্ষয়ক্ষতির জন্য আলাদা তহবিলের প্রস্তাব উপস্থাপিত হয়। কিন্তু আমেরিকা-ইউরোপের ধনী দেশগুলো, বিশেষত আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত অনিশ্চিত পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিপূরণের দায় নিতে হওয়ার আশঙ্কার এই খাতে অর্থসংস্থানের ব্যাপারে বারবার পিছিয়ে গেছে। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরো সম্মেলনে পরিবেশের অবনতির ক্ষেত্রে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দায় চিহ্নিত করা হলেও তারা তা স্বীকার করেনি এবং কোনোরকম আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতাও মেনে নেয়নি। এরপর ২০১৫ সালের প্যারিস সম্মেলনে এই তহবিলের প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও উন্নত দেশগুলোর তরফে ক্ষতিপূরণের আইনি দায়বদ্ধতাকে লিখিতভাবে খারিজ করা হয়। ২০২১ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে COP26 সম্মেলনে ১৩৪টা দেশ (G77) এবং চীন মিলিতভাবে এই তহবিলের দাবিকে জোরালো করে তোলে। সেই দাবি মঞ্জুর না হলেও বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়। এরপর চলতি বছর জুন মাসে জার্মানির বন শহরে আয়োজিত অধিবেশনে পুনরায় বিতর্ক হয় প্রস্তাবিত তহবিলকে ঘিরে। COP27 ২০ নভেম্বর মিশরের শার্ম অল শেখে এই দীর্ঘ বিতর্কের অবসান ঘটাল।

তবে তহবিল নির্মাণ ও বন্টনের খুঁটিনাটি নির্ধারণ এখনো বাকি। সে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ২৪ দেশের এক সমিতিকে। ইউরোপিয় ইউনিয়ন এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের অনুদানের বিষয়ে সম্মত হলেও এবং ৩০০ মিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকলেও কতটা অর্থ তারা শেষ অবধি দিতে পারবে সে বিষয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে। গতবছর মার্কিন কংগ্রেস ডেমোক্র্যাটদের দখলে থাকার সময়েই যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুত অর্থের মাত্র ৪০% দিয়েছিল, রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের দখল নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। ইউরোপের দেশগুলো, যাদের মূল আগ্রহের জায়গা গ্রীনহাউস গ্যাস এবং জীবাশ্ম জ্বালানির উপর কঠোরতর নিয়ন্ত্রণ, তারা এই সম্মেলন থেকে খুব একটা লাভবান হল না। অন্যদিকে এই মুহূর্তে বিশ্বের বৃহত্তম গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী চীন এখনো উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে ক্ষয়ক্ষতি তহবিলে অনুদানের দায় থেকে অব্যাহতি পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তোষ বজায় রইল।

এত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও COP27 হয়ে রইল বিশ্বের মুষ্টিমেয় ধনী ও উন্নত দেশগুলোর স্বার্থপর টালবাহানার বিরুদ্ধে এশিয়া-আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের উন্নয়নশীল দেশগুলোর অক্লান্ত সঙ্ঘবদ্ধ প্রয়াসের সাফল্যের নজির।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.