মাঘ মাসের শেষের দিকে মন উতলা হতে শুরু করে। বাড়ির পাশে যে দুটো কুর্চি ফুলের গাছ আছে, শীতে তারা পাতা ঝরিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। এই সময় আবার তাদের ডালপালায় কচি পাতা ভরে উঠতে থাকে। আসন্ন ফাল্গুনের মাতাল সমীরণ কত কথা যে মনে করিয়ে মনকে ওলটপালট করে দিয়ে যায়! বসন্তে মন উদাস হওয়া নিয়ে কত কবি, লেখক কত কথাই না লিখে গেছেন।

বাংলার ঋতু বৈচিত্র্য অনুযায়ী সবার শেষে আসে বসন্ত। বসন্ত ক্ষণস্থায়ী। শহরে তো তার উপস্থিতি টের পাওয়াই দায়। আজকাল বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে বসন্ত চোখের পলকে হারিয়ে যায়। এই সময় প্রকৃতি শীতের ধূসর চাদর ছেড়ে নানা রঙের অলঙ্কার আর পোশাকে নিজেকে সাজিয়ে তোলে। তাপমাত্রাও ধীরে ধীরে বেড়ে যায়। ঠান্ডা, গরমের মরশুম। এই সময়ের বিভিন্ন রোগ শরীরকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সেই কোনকাল থেকে মানুষ প্রাকৃতিক টোটকা বা ওষুধের উপর ভিত্তি করে জীবন কাটিয়ে আসছে। আমার পিসির কাছে শুনেছি, ফাল্গুন মাস পড়তেই বাড়িতে ফুলকপি আর বাঁধাকপি খাওয়া বন্ধ হয়ে যেত। ঠিক যেমন পৌষমাসে শেষ মুলো খাওয়া হয়, তার কারণ মাঘ মাসের মুলোতে সাল হয়ে যায়। আসলে তখনকার দিনে কৃষিকাজে এত বিপুল রাসায়নিক সারের ব্যবহার ছিল না। তাই মরশুমের বাইরের ফসল আর খাওয়ার উপযোগী থাকত না।

টুকটুক পিসির কাছে শুনেছি যে এই মরশুম পরিবর্তনের সময়ে ওদের ঘুম থেকে উঠে বাসি মুখে চিরতার রস খাওয়া আবশ্যিক ছিল। সঙ্গে সবার নামে রাখা থাকত এক টুকরো কাঁচা হলুদ আর গুড়। যে খাবে না তার সেদিন জলখাবার খাওয়াও হবে না। সেই ভয়েই সবাই সোনা মুখ করে বিষ তেতো চিরতা আর কাঁচা হলুদ চিবিয়ে খেয়ে ফেলত।

চিরতা আর কাঁচা হলুদ – দুটোই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে।

আমার মামাবাড়ির উল্টো দিকে টুম্পাদিদের বাড়ি ছিল। একতলা লাল মেঝের বাড়ি। ওদের বাড়িতে যে কত গাছ ছিল! গাছের ঝোপ দিয়েই প্রবেশদ্বারে বেড়া দেওয়া ছিল। ওদের বাড়ি থেকে গাঁদাল পাতা নিয়ে এসে তাই দিয়ে পাতলা জিওল মাছের ঝোল রান্না হত। টগবগ করে সবুজ ঝোল ফোটার সময়ে গাঁদাল পাতা থেকে উটকো গন্ধ বেরোত। সেই ঝোল খেয়ে পাকস্থলির গোলযোগ নিরাময় হত।

ফাল্গুন মাস কচি নিমপাতার সময়। বাড়ির গাছের নিম পাতা তুলে এনে শুকনো খোলায় টেলে নিয়ে কৌটোতে ভরে রাখা হয়। প্রথম পাতে ভাতের সঙ্গে সামান্য ঘি আর নিমপাতা ভাজা এই সময় বড়ই উপাদেয়। কৌটো থেকে ভাজা নিমপাতা দিয়ে নিম-বেগুন তৈরি হয়। কিম্বা ঘি ভাতের সঙ্গে দুটো গিমা শাকের বড়া। জ্বর কিম্বা সর্দিকাশির পর মুখের রুচি ফেরাতে তেতোর কোনো জুড়ি নেই।

আরো পড়ুন আমিষ খান বলে গাঙ্গুলি জেঠিমা, ঘোষ কাকুও দেশের মানুষ নন?

আমার মামাবাড়িতে একটা সজনে গাছ ছিল। শীতের শেষে বা বসন্তের শুরুতে সেই গাছ ফুলে ভরে উঠত। মাটি থেকে ফুল কুড়িয়ে সেগুলো ঝেড়ে বেছে তৈরি হত সজনে ফুলের ছেঁচকি। তাতে শয়লা বেগুন পড়ত। তখন কে জানত যে একদিন সজনে ফুল বাজারে ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হবে? সুপার ফুডের তালিকায় গণ্য হয়ে moringa flower নিয়ে এখন পৃথিবী উত্তাল। সজনে ফুলের বড়া কিম্বা ঘন্টও প্রথম পাতেই খাওয়া হয়। শুঁয়োপোকার উপদ্রবের জন্য আজ আর সেই গাছ নেই।

এই সময় জলবসন্ত রোগের আশঙ্কা থাকে। জলবসন্তের ফোঁড়াগুলো যখন প্রথম উঠতে শুরু করে তখন রোগীকে মেথি ভেজানো জল খাওয়ানো হয়। ফলস্বরূপ বেশি ফোঁড়া হয় না।

সর্দিকাশি অথবা শ্বাসনালীর পথ মসৃণ করতে বাসকপাতার রসের বিশেষ ভূমিকা আছে।

মামাবাড়ির পিছনে যে বাগান ছিল সেখানে থানকুনি পাতা আর কালমেঘ পাতার গাছ ছিল। আবাদি জমিতে এগুলো মানুষের অজান্তেই বেড়ে উঠত। বসন্ত হওয়ার পর থানকুনি পাতা বেটে তার রস খাওয়ালে শারীরিক দুর্বলতা হ্রাস পায়। আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে থানকুনি পাতা ঘষলে তাতেও ক্ষত নিরাময় হয়। কালমেঘ পাতার রস যকৃতের অসুখে বিশেষ উপযোগী। কালমেঘের বড়িও তখন বাড়িতে মজুত থাকত। মামাবাড়ির সেই বাগানের সঙ্গে সঙ্গে এইসব ভেষজগাছও এখন হারিয়ে গেছে।

আমাদের ছোট কলোনি পাড়ায় যখন ফ্ল্যাট হতে আরম্ভ করল, তার কোপ পড়ল এই ভেষজ উদ্ভিদগুলোর উপর। বহু ভেষজ গুণসম্পন্ন এই গাছগুলো কারোর যত্নের তোয়াক্কা করেনি কোনোদিন। তারা স্বাবলম্বী। আজ নিমপাতা খেতে গেলেও বাজারে ছুটতে হয়। সজনে ফুল তো মহার্ঘ্য। ওষুধের গুণে ভরা এইসব শাকপাতা আমাদের সারা বছরের খাদ্য তালিকায় থাকলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আপনিই বেড়ে যাবে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.