সুমন গোস্বামী

অধর্ম? কে ধর্ম মানে? আমার ধর্ম শত্রুনাশন/নিরস্ত্রকে মারব না তা সবসময় কি মানতে পারি? — শঙ্খ ঘোষ

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এবছর এই লেখার সময় অবধি ৮১ জন, গতবছর দুশোর বেশি। হ্যাঁ, ছত্তিসগড়ের জঙ্গলে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে মৃত মানুষের সংখ্যা এটা। সরকারি ভাষ্যে এঁরা হলেন ভয়ানক ‘লেফট উইং এক্সট্রিমিস্ট’ — অতি বামপন্থী, সাধারণত আমরা যাঁদের মাওবাদী নামে জানি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ঘোষণা ছিল, ২০২৬ সালের মধ্যে মাওবাদীদের নিকেশ করা হবে। একথা পরিষ্কার রাষ্ট্র সেই পথেই এগোতে চাইছে। গত ২০ জানুয়ারি ছত্তিসগড়ে রাষ্ট্রীয় জওয়ানরা দুই মহিলাসহ ১৪ জনকে হত্যা করেছিল। ৯ ফেব্রুয়ারি হত্যা করা হল আরও ৩৫ জন ভারতীয় নাগরিককে। স্বভাবতই মহাখুশি শাহ তাঁর এক্স হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট করেছেন যে ‘নকশালমুক্ত ভারত গড়ার পথে এটি একটি বড়সড় সাফল্য।’ আরও বলেছেন, ‘নকশালপন্থা এখন অন্তিম সময়ে উপস্থিত।’ কোনো একটি মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমে সেই মতাদর্শে বিশ্বাসীদের ধরে ধরে হত্যা করেই মতাদর্শটিকে শেষ করে ফেলা যাবে – এরকম তিনি ভাবতেই পারেন। কিন্তু যেসব স্থিতধী মানুষ এমনটা ভাবেন না, তাঁরা কি একটু তলিয়ে ভাববেন না?

যাঁরা মারা গেলেন, যাচ্ছেন, তাঁরা কারা? ভারতের নাগরিক ছাড়া অন্য কিছু কি? যে জওয়ানরা হত্যালীলায় মেতেছেন, তাঁদের মাইনে যে তহবিল থেকে আসে তাতে তো এই মানুষগুলিরও অবদান আছে। কোনোভাবে, কোনো মন্ত্রীসান্ত্রী কি এই সরল সত্যটি অস্বীকার করতে পারেন? আজ অবধি যতজন তথাকথিত ‘মাওবাদী’ রাষ্ট্রীয় জওয়ানদের হাতে নিহত হয়েছেন (সংখ্যাটা সরকারি হিসাবেই পাঁচ হাজারের বেশি), একটু খুঁজে দেখুন, প্রায় সকলেই দরিদ্রতম আদিবাসী জনতার অংশ। কেন এই মানুষগুলিকে মরে যেতে হয়? কেন এই মৃত্যুগুলি আমাদের সেভাবে নাড়া দেয় না? বিরোধী দলগুলি সঙ্গত কারণেই বর্তমান ভারত সরকারের বিবিধ কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করে থাকে। কিন্তু এই বিষয়টি নিয়ে তারা নির্বিকল্প নীরবতা অবলম্বন করে কেন? নির্বিচারে মানুষ মারা কি কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সরকারের কাজ হতে পারে? কয়েকশো মানুষকে হত্যা করে সরকার ঘোষণা করে দিল – এরা ছিল নকশাল। ব্যাস! দায় ফুরিয়ে গেল? দেশের বর্তমান আইনে কি কোথাও লেখা আছে যে নকশাল মাত্রেই বধ্য? চূড়ান্ত মদগর্বী স্বৈরাচারী সরকারও তো মানুষ খুন করার বেলায় কিছু আড়াল আবডাল রচনা করার চেষ্টা করে থাকে। দুর্ভাগ্যের কথা, আমাদের দেশে সেসবেরও প্রয়োজন হচ্ছে না। আমাদের সকলের হিরণ্ময় নীরবতা এই সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

ছত্তিসগড়ের জঙ্গলে সশস্ত্র বামপন্থী বনাম রাষ্ট্র – এই লড়াইটি চলছে অন্তত চার দশক ধরে। কিন্তু নতুন শতকের গোড়া থেকে তা অন্য মাত্রা নিয়েছে। তার কারণ আজ আর অজানা নয়। ওই ভূমির নীচেই চাপা পড়ে আছে প্রভূত খনিজ সম্পদ, যার জন্য হাপিত্যেশ করে বসে আছে দেশি-বিদেশি কর্পোরেট সংস্থাগুলি। কেবলমাত্র বস্তার জেলাতেই যে পরিমাণ লৌহ আকরিক আছে, তা গোটা দেশের তিন ভাগের এক ভাগ। সেই সঙ্গে আছে ম্যাঙ্গানিজ, বক্সাইট, কয়লা, ডলোমাইট আর হীরে। অবাধ লুণ্ঠনের এই অপরূপ ভূমিতে কিন্তু বেশকিছু মানুষও থাকেন, যাঁরা ওখানে আছেন মোদী-শাহ-কর্পোরেট বা ব্রিটিশ বা মোগল, এমনকি হর্ষবর্ধন-বিক্রমাদিত্য-চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যদেরও আগে থেকে। ‘মাওবাদী’ রাজনীতির প্রভাবে এই স্থানীয় মানুষ কর্পোরেটদের অবাধ লুণ্ঠনে প্রবল বাধাবিপত্তি সৃষ্টি করছেন, তাই কর্পোরেটদের হয়ে রাষ্ট্র নিজেই নেমে পড়েছে ‘জমি উদ্ধার’ করার খেলায়। ঠিক যেমন মহাভারতের খাণ্ডব দাহন হয়েছিল যুধিষ্ঠিরের নতুন রাজধানী গঠনের তাগিদে।

এই কম্মে গতি আনার জন্য রাষ্ট্র পরিপূর্ণ বলপ্রয়োগ করতে চেয়েছে আর সেসব অভিযানের আশ্চর্য সুন্দর সব নামকরণও করে চলেছে। শতকের প্রথম দশকে নিজের দেশের জনগণের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধের নাম ছিল অপারেশন গ্রীন হান্ট। কেন্দ্রে তখন মনমোহন সিংয়ের ইউপিএ সরকার। পরবর্তীকালে প্রক্রিয়াটিকে ডাকা হত অপারেশন সমাধান নামক আরেকটি মিষ্টি নামে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ছত্তিসগড়ে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর মূল অভিযানের একটি বর্ধিত অংশ নির্দিষ্ট করা হয় ছত্তিসগড় রাজ্যের জন্য, তার নাম রাখা হয় অপারেশন কাগার। কী করা হচ্ছে সেই অপূর্ব অপারেশনে?

আরো পড়ুন কর্পোরেট স্বার্থে পরিবেশ ধ্বংসের অঙ্গ মণিপুর, কাশ্মীরের অশান্তি

বিপুল পরিমাণ নানা নামের বাহিনীকে তো নামানো হয়েছেই, তার সঙ্গে আকাশে চক্কর কাটছে ড্রোন, সঙ্গে আছে নাইট ভিশন ক্যামেরা। ভয়াবহ অস্ত্রগুলিতে আছে লেজার রেঞ্জ ফাইন্ডার। মানবাধিকার সংগঠনগুলির অভিযোগ – অন্তত পাঁচবার আকাশ থেকে বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। নিজের দেশের জনগণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের এই ‘মিষ্টি’ যুদ্ধ সত্যিই অতুলনীয় এবং অভূতপূর্ব। আরও বিস্ময়কর হল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির পরিপূর্ণ নীরবতা। কয়েকটি ছোট বামপন্থী দল ছাড়া এ সম্পর্কে কোনো শব্দ খরচ করেনি আর কেউ, অন্তত এই লেখার সময় অবধি। অথচ গণতন্ত্রের গুষ্টির তুষ্টি করে রাষ্ট্রনিযুক্ত সেনাবাহিনীর এমন নির্বিচার হত্যালীলা এদেশে এর আগে চলেছে কিনা সন্দেহ। অথচ সংসদে এ নিয়ে কোনো ঝড় ওঠেনি। তাহলে দেশটায় গণতন্ত্র বলে আর কী রইল?

এই নির্বিচার হত্যালীলার সমস্ত খরচ (পুরস্কারের অর্থ সমেত) জুগিয়ে চলেছি আমি-আপনি, আমরা সবাই – ভারতের ১৫০ কোটি জনতা। অতএব আমরা চাই বা না চাই, রক্তের দাগ এসে লাগছে আমাদের হাতেও। মাওবাদীদের মতাদর্শ সঠিক না বেঠিক – তা নিয়ে বিতর্কের সময় এ নয়। আমাদের সকলের প্রিয় দেশের এমন নরখাদক চেহারা আমরা দেখতে চাইছি কিনা, প্রশ্ন সেটি। আর সব সরিয়ে রেখে জোর গলায় এই জঘন্য কর্মকাণ্ড বন্ধ করার জন্য চিৎকার করা আশু কর্তব্য। অন্য বিতর্ক না হয় পরে করা যাবে।

নিবন্ধকার মানবাধিকার কর্মী। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.