সন্তোষ সেন
মাটির নীচে যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের হাত ধরে সমাজ সত্যি সত্যি কতটা এগোয়, মানুষ কতটা সভ্য হয় – সেসব প্রশ্ন ইতিউতি উঠতে শুরু করেছে। সর্বগ্রাসী উন্নয়নের অজুহাতে প্রকৃতি ও পরিবেশ নিধনের এইসব কর্মকাণ্ড দুরন্ত গতিতে এগোতে থাকলে কী নিদারুণ পরিণাম ডেকে আনে তা বিপর্যস্ত যোশীমঠ সহ উত্তরাখণ্ডের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষজন, কুলু-মানালি-শিমলা সমেত পুরো হিমাচল প্রদেশের মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। আসাম ও উত্তরবঙ্গে বিগত কয়েক মাস ধরে দফায় দফায় তুমুল বৃষ্টি, প্রবল বন্যা হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র, মহানন্দা, তিস্তা, তোর্সা, জলঢাকা, রায়ডাক বিপদসীমা পেরিয়ে যাওয়ায় উত্তরবঙ্গের এক বড় অংশের জনগণের জীবন জীবিকা বিপর্যস্ত। উত্তরাখণ্ড থেকে হিমাচল পেরিয়ে প্রকৃতির রুদ্ররোষ ভয়ঙ্কর রূপে আছড়ে পড়েছে সিকিমের উপরেও।
নীল-সাদা মেঘে মৃদুমন্দ হওয়ায় পেঁজা তুলোর মত ভেসে থাকা শরতের আকাশ, মাঠে ঘাটে শুভ্র কাশফুলের যখন হৃদয়ে দোলা দেওয়ার সময়, ঠিক সেইসময় আশ্বিন মাসের ১৭ তারিখ মধ্যরাতে সিকিমবাসী ঘুম চোখে প্রবল আতঙ্ক নিয়ে জেগে উঠতে বাধ্য হলেন। মেঘভাঙা প্রবল বৃষ্টিপাত এবং ১৭,০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত দক্ষিণ সিকিমের লোনক গ্লেসিয়ার লেক জলের তোড়ে ফেটে যাওয়ার ফলে (গ্লেসিয়ার লেক আউটবার্স্ট) বিশাল জলরাশি চোখের পলকে দুর্বল চুংথাং বাঁধকে উড়িয়ে দিয়ে নেমে আসে তিস্তার বুকে। সিকিম এবং পুরো উত্তরবঙ্গ বন্যায় বিপর্যস্ত। তিস্তার উপর ১৪টি সেতু হাওয়া হয়ে গেছে। শিলিগুড়ি-সিকিমের জীবনরেখা যে ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক, তার এক বড় অংশ তিস্তার তোড়ে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাওয়ায় সমতলের সঙ্গে সিকিমের যোগাযোগ কার্যত বন্ধ ছিল এক পক্ষকাল। জলের তোড়ে ভেসে, কাদা চাপা পড়ে মৃত ১০০ জন নাগরিক, নিখোঁজ শতাধিক। প্রলয়ের আপাত শান্ত তিস্তার ক্যানভাসে ফুটে উঠছে একের পর এক দুর্বিষহ চিত্র। প্রবল স্রোতে ভেসে আসা বড় বড় পাথর, বালি, কাদার নিচে চাপা পড়েছে মৃতদেহ। চুংথাং এলাকায় ৫,০০০ ফুট উপরে অবস্থিত সিকিমের সর্ববৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তিস্তা-৩ ছারখার। হাজার হাজার বিঘা চাষের জমি জলের তলায় চলে গেছে। রাতজাগা মানুষগুলোর চোখেমুখে আতঙ্ক স্পষ্ট।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
নদী পাহাড় জঙ্গল, বিস্তৃত দিগন্তরেখা, অপরূপ কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় সোনালি সূর্যোদয় সমেত নৈসর্গিক দৃশ্যের টানে ছুটে যাওয়া কয়েক হাজার পর্যটক আটকে পড়েছিলেন সিকিমের নানা পর্যটন কেন্দ্রে। আপাতত বছরখানেক সিকিম, কেদার-বদ্রী, কুলু-মানালির অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার কথা ভুলে এই ধ্বংসের কারণগুলো বুঝে নেওয়া দরকার।
একদিকে পাহাড় এলাকায় ওই ধ্বংস, অন্যদিকে চামড়া পোড়ানো গরমে অস্বাভাবিক আর্দ্রতায় হাঁসফাঁস করলেন দক্ষিণবঙ্গের মানুষজন। ক্লান্ত, অবসন্ন মানুষের কর্মক্ষমতা কমছে, বাড়ছে অসুস্থতা। শিশু, বৃদ্ধ সমেত কাতারে কাতারে মানুষ অসুস্থ হয়ে ওষুধের দোকানে, হাসপাতালে, ডাক্তারের চেম্বারে দৌড়চ্ছেন। অপ্রতুল বৃষ্টির কারণে চাষের সংকট এবং কৃষকদের দুরবস্থা ক্রমশ বাড়ছে।
ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, ২০২৩ সালের শীত ইদানীংকালের উষ্ণতম শীতকাল হবে। তাঁরা জানিয়েছেন এমন আশঙ্কা মিলে যাওয়ার সম্ভাবনা ৯৫%। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে অগাস্ট পর্যন্ত উত্তর গোলার্ধের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে ১.০৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। এই আট মাস ছিল দ্বিতীয় উষ্ণতম জানুয়ারি-অগাস্ট। এ বছরের মার্চ থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রতল গরম হতে শুরু করেছে, যা গোটা পৃথিবীর আবহাওয়ার উপরেই প্রভাব ফেলে। ভারতের আবহাওয়ার উপর এর প্রভাব খুব বেশি। এই কারণেই ২০২৩ সালে ভারতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাতের চেয়ে অনেক কম ছিল। এই মুহূর্তে প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রতলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১.৬ ডিগ্রি বেশি, যা সবার জন্যই চিন্তার কারণ। বিজ্ঞানীদের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি – পৃথিবীর তাপমাত্রা এই দুরন্ত গতিতে বাড়তে থাকলে, নির্বিচারে একরের পর একর বনাঞ্চল ধ্বংস করলে, পাহাড় ফাটিয়ে জঙ্গল কেটে মাটির বুক চিরে জীবাশ্ম জ্বালানি, আকরিক তুলে আনার লোভ লালসা আর বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি বজায় থাকলে চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনাগুলো বারবার ঘটবে।
আসলে প্রকৃতিকে তার নিজস্বতা রক্ষা করতে না দিলে আমাদের রেহাই নেই। বন্যায় ভেসে যেতে হবে, তাপপ্রবাহে দগ্ধ হতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খাদ্যশস্যের ফলন কম হওয়ায় তীব্র খাদ্যসংকট ও জলসংকট দেখা দেবে। রুষ্ট প্রকৃতি এসব ঘটাতে শুরু করেছে। তবু বুলেট ট্রেনের গতিতে এগিয়ে চলেছে উন্নয়নে, নগরায়ন, পুঁজির পুনরুৎপাদন, বাজার-ব্যবসা বাণিজ্য-মুনাফার সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ। এইসব অমানবিক, অবৈজ্ঞানিক পদক্ষেপকে বাধাহীন মসৃণ সড়কে তরতর করে এগিয়ে নিয়ে যেতেই পরিবেশ আইনের পরিবর্তন করা হচ্ছে। পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করলেই পাঠক নিশ্চিত হবেন যে বিজেপিচালিত কেন্দ্রীয় সরকারের কর্পোরেট ভজা রাজনীতির সঙ্গে আজকের পরিবেশ নীতি, মণিপুর ও কাশ্মীরে অস্থিরতা তৈরি, দেশজুড়ে বিভেদ বিভাজন বাড়িয়ে তোলা – সবকিছু এক দক্ষ শিল্পীর নিখুঁত টানে ঘটছে।
পরিবেশ আইনগুলো কাদের স্বার্থে কীভাবে পাল্টে দেওয়া হচ্ছে
২৫ জুলাই ২০২৩। সংসদে যখন মণিপুরের হিংসা নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা চলছে, তখনই দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ আইনের সংশোধনী বিল কোনোরকম আলোচনা, বিতর্কের সুযোগ না দিয়েই ধ্বনি ভোটে পাশ করিয়ে নেওয়া হয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে। বিল দুটি হল বন সংরক্ষণ সংশোধনী বিল ও জীববৈচিত্র্য সংশোধনী বিল, ২০২১। এই বিল দুটির মধ্যে দিয়ে যেটুকু আইনি বিধিনিষেধ ছিল, সেটুকুও বিলুপ্ত করে আদিবাসী মানুষের জঙ্গলের উপর সমস্ত অধিকার কেড়ে নিয়ে প্রকৃতপক্ষে তাঁদের উচ্ছেদ করে পাহাড়, জঙ্গল ও আকরিক লুঠের অবাধ ছাড়পত্র দেওয়া হল পেয়ারের কর্পোরেট সংস্থাগুলোকে। অরণ্য আইনের সংশোধনী বিলের আসল উদ্দেশ্য হল দেশের বেশকিছু বনাঞ্চলকে সংরক্ষণের আওতার বাইরে রাখা। এই সংশোধনীতে সুপ্রিম কোর্ট নির্ধারিত অরণ্যের সংজ্ঞা পরিবর্তন করে বেশ কিছু অরণ্যকে ব্যক্তি মালিকানার আওতায় ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা আছে।
১৯৭২ সালের স্টকহোম পরিবেশ সম্মেলনের সিদ্ধান্তের কারণে আন্তর্জাতিক চাপ, অরণ্য থেকে খনিজ সম্পদ এবং মূল্যবান কাঠ সংগ্রহের মরিয়া প্রয়াসের জন্য ক্রমহ্রাসমান অরণ্য আচ্ছাদন রোধ করতে ভারতে ১৯৮০ সালে অরণ্য সংরক্ষণ আইন তৈরি হয়। এই আইনের পিছনে অরণ্যবাসীদের নিরন্তর আন্দোলনও এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। কেন্দ্রীয় সরকার গঠিত ফরেস্ট আডভাইসরি কমিটির (FAC) অনুমোদন ব্যতিরেকে অরণ্যভূমিকে অন্য কোনোভাবে ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ফলে জঙ্গল লুঠের ক্ষেত্রে বণিক সমাজের বেশ খানিকটা সমস্যা হচ্ছিল। তাই এবারের সংশোধনীতে বেশকিছু বনাঞ্চলকে সংরক্ষণের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। যেমন
১। আন্তর্জাতিক সীমানা থেকে দেশের ভিতরে ১০০ কিলোমিটার অরণ্যভূমিকে এই সংরক্ষণের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। এই ছাড়ের আওতায় পড়বে সম্পূর্ণ উত্তর-পূর্ব ভারত। এবার মিলিয়ে নিন, মণিপুরে মেইতেই সম্প্রদায়ের বিত্তশালী মানুষের পাহাড়ে জমি কেনার বাসনা এবং কুকিদের সঙ্গে সংঘর্ষকে। এছাড়াও হিমালয়ের বিভিন্ন অংশের বনাঞ্চল এবং সুন্দরবনের বাদাবন থাকবে সংরক্ষিত তালিকার বাইরে। সারা পৃথিবীতে চিহ্নিত ৩৬টি জীববৈচিত্র্যের হটস্পটের মধ্যে ভারতে রয়েছে চারটি। তার মধ্যে উত্তর-পূর্ব ভারত এবং হিমালয়ের বনাঞ্চল দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হটস্পট। অন্যদিকে সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম বাদাবন। অর্থাৎ এই তিনটি হটস্পটের বনাঞ্চল পরিবেশরক্ষার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিকে সম্পূর্ণ অবহেলা করে এইসব জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ অঞ্চলে বেসরকারি এবং সরকারি যৌথ উদ্যোগে নির্মাণকার্যের পাক্কা বন্দোবস্ত করা হল।
২। নিরাপত্তার নামে দেশের যে কোনো প্রান্তে পাঁচ থেকে ১০ হেক্টর পর্যন্ত বনভূমি অধিগ্রহণ করে অরণ্য ধ্বংস করার ক্ষমতা সরকার এই সংশোধনীর মাধ্যমে নিয়েছে। এখানে বলা আছে, চরমপন্থী বাম আন্দোলন দমন করতে সরকার যে কোনো সময়ে এই ব্যবস্থা নিতে পারে। অন্যদিকে এই সংশোধনীর মধ্য দিয়ে যে সমস্ত অরণ্য সংরক্ষণের আওতার বাইরে চলে যাবে সেখানে অরণ্য অধিকার আইন (২০০৬)-এর কী হবে তা নিয়ে সরকার নীরব। অসংরক্ষিত বনাঞ্চলে আদিবাসী-বনবাসীদের অরণ্যের অধিকার খর্ব হতে বাধ্য। প্রকৃতপক্ষে দেশের অরণ্য ও অন্যান্য জৈবিক সম্পদ বহুজাতিকদের সামনে উন্মুক্ত করে দিয়ে প্রাকৃতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে সঙ্গে জৈবিক সম্পদ সম্পর্কিত জ্ঞান বা মেধা সম্পত্তির অবাধ লুঠের ছাড়পত্রও দেওয়া হল। অথচ সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ স্পষ্ট চেতাবনি দিয়েছে – জীববৈচিত্র্যের লুণ্ঠন আমাদের মূল্যবান জীনগত বৈচিত্র্যের পক্ষে এক চ্যালেঞ্জ এবং এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে না পারলে আমাদের খাদ্য, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিপন্ন হবে। বাস্তবে ঘটছেও তাই।
জীববৈচিত্র্য সংশোধনী বিল, ২০২১
এই বিলে যেসব বিশেষ দিক সংযুক্ত করা হয়েছে, তা চালু থাকা ২০০২ সালের আইনকে অত্যন্ত লঘু করে আমাদের জৈব সম্পদকে কার্যত বহুজাতিকদের হাতে তুলে দেওয়ারই নীল নকশা। প্রথমত এই বিলে আনুষ্ঠানিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে – “collaborative research projects”-এর নামে রাজ্য বায়োডাইভার্সিটি অথরিটিকে না জানিয়েই দেশের সম্পদ বাইরে পাচার করা যাবে। দেশে গবেষণা, পেটেন্টিং এবং বাণিজ্যিক ব্যবহার সমেত জৈবিক সম্পদে আরও বেশি করে বিদেশি বিনিয়োগ আনা অন্যতম লক্ষ্য। এই সরকার আবার আত্মনির্ভরতা, আত্মগরিমার কথা বলে। ২০০২ সালে প্রণীত আইনে কিন্তু মূল উদ্দেশ্য ছিল জৈববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং সঠিক ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া যা, স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য উপযোগী।
জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য পুরো লণ্ডভণ্ড করে কাদের স্বার্থে এরকম প্রাণঘাতী পরিকল্পনার ছক কষা হচ্ছে, তা স্পষ্ট বলে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রী। কোনোরকম রাখঢাক না করেই বিলটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভূপেন্দর যাদব সংসদে স্পষ্ট জানিয়েছেন “Ease of doing business and promotion of the AYUSH industry”। অর্থাৎ আয়ুর্বেদ, যোগ, ইউনানী সমেত আয়ুষ শিল্পের ব্যবসাকে সহজ সরল করে তুলতেই এই বিল। ব্যবসা করার ক্ষেত্রে পুরনো আইনে কোথায় আটকাচ্ছিল? পতঞ্জলির মালিক রামদেবের দিব্য ফার্মেসিকে উত্তরাখণ্ডের বায়োডাইভার্সিটি বোর্ডের ২০০৬ সালে পাঠানো নোটিসে বলা হয় – বোর্ডকে না জানিয়ে দেশের জৈব সম্পদ ব্যবহার করে দিব্য ফার্মেসি আইন লঙ্ঘন করেছে। এই নোটিসকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে গেলে কোম্পানি হেরে যায়। অন্যায়ভাবে সব লুটেপুটে খেতে না দিলে রামদেব বাবাজি ফোঁস তো করবেনই। অন্যদিকে জৈব সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের শিল্পসংস্থাকে বিশেষ ছাড় দেওয়ার জন্য গুজরাটের একটি আয়ুর্বেদিক ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধিরা ২০১৬ সালে সরকারের কাছে আবেদন করে। কিন্তু চালু আইনের জাঁতাকলে পড়ে এই বিশেষ আবেদন মেনে নিতে পারেনি পরিবেশ মন্ত্রক। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, অর্থাৎ ওষধি গাছগাছড়া, জলাভূমি বা জঙ্গলে প্রাপ্ত নানা ধরনের জিনিস সহজে ব্যবহারের সুবিধা না পেলে দেশের প্রাচীন ঐতিহ্যের ধ্বজাধারী ধান্দাবাজ ব্যবসায়ীদের গোঁসা তো হবেই। ব্যবসায়ীদের পেট আরও মোটা করতে আইনি বাধা হটিয়ে সহজে করে খেতে দেওয়ার ব্যবস্থা (ease of business) না করলে এরা পার্টি ফান্ডে চাহিদা অনুযায়ী টাকা জুগিয়ে ভোট বৈতরণী পার করাতে কেন সাহায্য করবে? দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্ক তো এরকমই হওয়া উচিত, তাই নয় কি?
আরো পড়ুন জনবিরোধী সর্বনাশা বন সংরক্ষণ বিধি
এসবের সঙ্গে মণিপুর সমেত উত্তর-পূর্ব ভারত ও কাশ্মীরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মিলিয়ে দেখলে গোটা পরিকল্পনা স্পষ্ট হবে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি পাহাড় ফাটিয়ে, পরিবেশ ধ্বংস করে লিথিয়ামের মত ভারি ধাতু তুলে আনার প্রয়োজনও কাশ্মীরে সংবিধানের ৩৭০ নং অনুচ্ছেদ বাতিল করার অন্যতম কারণ। অন্যদিকে নৈসর্গিক প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ মণিপুরের জঙ্গল ও পাহাড়ের নিচে সঞ্চিত নানা আকরিক লুঠ করার জন্য কুকি-জো-নাগা জনজাতির মানুষদের সরে যেতে বাধ্য করার নীল নকশা রূপায়ণের জন্যই মেইতেই সম্প্রদায়ের একটা অংশকে খেপিয়ে তুলে বিভেদ বাড়িয়ে হিংসা, ঘৃণা অশান্তির গভীর বীজ বপন করা হচ্ছে। তাই মণিপুরের মেয়েদের, কুকি মায়েদের লড়াইয়ের পাশে দাঁড়াতে হলে বিজেপি নামক রাজনৈতিক দলটির নানা মুখোশের আড়ালে থাকা কর্পোরেট ভজা, আদানিবান্ধব আসল মুখটিকে উন্মোচিত করতে হবে। বিজেপির পরিবেশনীতি স্পষ্ট করে বুঝে নিতে হবে পরিবেশ কর্মী সমেত বাম ধারার রাজনৈতিক দলগুলোকে।
বিজেপির রাজনৈতিক চালাকি
বর্তমান সরকার কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রকৃতিকে সরাসরি লুঠ করার জন্য নানা ফন্দিফিকির চলেছে। তাই আদ্যোপান্ত ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির ধারক ও বাহক এবং আরএসএসের হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান আদর্শের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হয়েও কর্পোরেটের এক নম্বর সেবাদাস বিজেপি দলটি, আদিবাসী ভাবাবেগকে মূলধন করে সত্যের পচা মাছের দুর্গন্ধকে শাক দিয়ে ঢাকার মরিয়া চেষ্টায় আদিবাসী সমাজের একজনকে রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ করেছে। তাদের এই নিখুঁত দাবার চালে কিস্তি মাত হয়ে গেল মাননীয়া রাষ্ট্রপতি দ্রোপদী মূর্মুর। দেশের প্রশাসনিক প্রধানের কাছে বিনীত প্রশ্ন – মণিপুরের নিষ্ঠুরতম নারী নির্যাতন এবং জঙ্গল, পাহাড়ের উপর বনবাসী জনজাতিদের ন্যূনতম অধিকারটুকুও যখন কেড়ে নেওয়া হল আইন করে, তখন তিনি গর্জে উঠলেন না কেন?
আসলে প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে কর্পোরেটের মৃগয়াক্ষেত্র বানানোর লক্ষ্যেই মায়ানমার থেকে নাগাল্যান্ড, মণিপুর, ত্রিপুরা, বাংলাদেশ হয়ে রেললাইন পাতার কাজ চলছে জোর কদমে। খনিজ সম্পদ পরিবহনের সুবিধার্থেই ছবির মত প্রকৃতি ধ্বংস করে অবৈজ্ঞানিক এইসব প্রকল্পের পরিকল্পনা। পাহাড়-জঙ্গল-নদী-আকরিক লুঠ আর উন্নয়নে, নগরায়নের সর্বরোগহর দাওয়াই দিয়ে আদিবাসী জনজাতি সহ দেশের খেটে খাওয়া গরিব মানুষের বারোটা বাজানো হচ্ছে। নতুন দুই আইন প্রণয়নের ফলে দেশের অরণ্য, পাহাড় ও জীববৈচিত্র্যের উপর নির্ভরশীল কোটি কোটি মানুষের জীবন জীবিকা এখন বিপদের মুখে। বৈচিত্র্যময় বাস্তুতান্ত্রিক গঠনের কারণে আমাদের দেশ জৈবিক বৈচিত্র্যের দিক দিয়ে সমৃদ্ধ। এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০,০০০ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ৮৫,০০০ প্রজাতির প্রাণির হদিশ পাওয়া গেছে। বিশ্বব্যাপী উদ্ভিদ সম্পদের প্রায় ১২% রয়েছে ভারতে। তিন হাজারেরও বেশি ধরনের ওষধি রয়েছে যা বিভিন্ন জনজাতির মানুষ ব্যবহার করেন। এনভায়রনমেন্টাল ইনফরমেশন সিস্টেমের ডেটাবেস অনুযায়ী, এক হাজারের বেশি ধরনের উদ্ভিদ ব্যবসায়িক ওষধি হিসাবে চিহ্নিত।
সরকারের যেন এই সম্পদ রক্ষা করার কোনো দায় নেই, প্রকৃতির এই দানের উপর নির্ভরশীল প্রকৃতির সন্তানদের রক্ষা করারও দায় নেই। তাই মণিপুর, মিজোরাম, মেঘালয়, কাশ্মীর ছাড়াও ভারত রাষ্ট্র দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় কয়েক শতাব্দী ধরে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপর আকাশপথে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায় – ছত্তিসগড়, তেলেঙ্গানা, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশার আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সামরিক অভিযান চালানো হয় হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমকে ব্যবহার করে। খনিজ সম্পদে পূর্ণ এইসব পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা এলাকাগুলো থেকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোকে চিরতরে উচ্ছেদ করে দেশের সব প্রাকৃতিক সম্পদ কর্পোরেটের করাল গ্রাসে নিয়ে আসতে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার মরিয়া। তাই প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর প্রতিটি এলাকার জনগণের বিরুদ্ধে চলছে অঘোষিত যুদ্ধ। কাশ্মীর থেকে সংবিধানের ৩৭০ নং অনুচ্ছেদ প্রত্যাহার, মণিপুরে অস্থিরতা তৈরি, ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গায় মদত জোগানো সেই যুদ্ধেরই নিদর্শন। পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং পুনরুৎপাদনের কাজটি আজ আদতে কর্পোরেটের বিরুদ্ধে পুরোদস্তুর রাজনৈতিক আন্দোলন। এই সত্য উপলব্ধি করতে না পারলে পৃথিবীর উত্তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, চাষের সংকট, খাদ্য ও জলের সংকট, পরিবেশগত উদ্বাস্তু, রোগভোগের তীব্রতা – এসব স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াবে।
লেখক বিজ্ঞান শিক্ষক, বিজ্ঞান ও পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক এবং প্রবন্ধকার। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








সবগুলো প্রতিবেদন যুগোপযোগী। আরো চাই।