আবার খবরের শিরোনামে সিঙ্গুর। চুক্তিভঙ্গের দায়ে টাটা গোষ্ঠীকে মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে সালিশি আদালত। গত ৩০ অক্টোবর টাটা মোটর্স এই খবর শেয়ার বাজারকে জানায়। টাটা মোটর্স রাজ্যের শিল্পোন্নয়ন নিগমের থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৭৬৫ কোটি ৭৮ লক্ষ টাকা পাবে। ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে যতদিন না তা আদায় হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত বার্ষিক ১১% হারে সুদও পাবে। এছাড়া মামলার খরচের জন্য পাবে এক কোটি টাকা। মনে করা হচ্ছে, সুদ সমেত ক্ষতিপূরণের অঙ্ক ১৭৬৫ কোটি টাকায় পৌঁছে যেতে পারে। সিঙ্গুরে কারখানাও হল না, জমিও চাষযোগ্য হল না। উলটে বিপুল অর্থ দিতে হবে সরকারি কোষাগার থেকে। সালিশি আদালতের এই রায়ের পরে স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপান উতোর।
তৃণমূল সরকার রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। পাশাপাশি এর জন্য তারা পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকারকে দোষারোপ করছে। আগের সরকারের চুক্তির জন্যই এই বিশাল ক্ষতিপূরণের বোঝা এখনকার সরকারকে বইতে হবে বলে তাদের অভিযোগ। টাটা কারখানা না করে চলে গেল, অথচ রাজ্য সরকারকে কেন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে? সাদা চোখে মনে হতে পারে, চুক্তিভঙ্গ টাটাই করেছে। বামফ্রন্টের বড় শরিক দল অভিযোগ তুলেছে, তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর চুক্তিভঙ্গ করেছে। দায় এখনকার সরকারের। টাটা কারখানা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ২০০৮ সালে। কিন্তু ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ২০১৬ সাল থেকে। বামফ্রন্টের বড় শরিকের প্রতিক্রিয়া – জমি নিয়ে চুক্তিভঙ্গ না করলে আজ এই গুণাগার সরকারকে দিতে হত না। পাশাপাশি তারা তৃণমূলের বিরুদ্ধে সিঙ্গুরে কারখানা করতে না দিয়ে রাজ্যের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার অভিযোগ আবার তুলেছে। সন্দেহ নেই, লোকসভা ভোটে এই রাজ্যে সিঙ্গুর আবার ইস্যু হতে চলেছে। হয়ত বা জাতীয় ইস্যুগুলোর থেকেও এটা বেশি গুরুত্ব পেয়ে যাবে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
রাজ্যে ২০১১ সালের পালাবদলের ক্ষেত্রে সিঙ্গুর আন্দোলন এক মাইলফলক। ২০০৬ সালে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ের পরেই বামফ্রন্ট সরকার সিঙ্গুরে এই মোটর গাড়ি কারখানার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিল। সেবার নির্বাচনে উন্নয়ন, বিশেষত শিল্পায়ন, ছিল বামফ্রন্টের অন্যতম বড় প্রতিশ্রুতি। এমনকি বড় শরিক দলের পক্ষ থেকে উন্নয়নই শ্রেণি সংগ্রাম – এমন স্লোগানও দেওয়া হয়েছিল। যদিও বামফ্রন্টের সব শরিক দল এর সঙ্গে একমত ছিল না। উন্নয়নের শ্রেণিচরিত্র নিয়ে বিতর্ক ছিল। সিঙ্গুর আন্দোলনে এই বিতর্ক আরও প্রকট হয়। টাটাদের জমি দেওয়ার চুক্তি হয় ২০০৭ সালের মার্চ মাসে। আন্দোলনের জেরে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে টাটা কারখানা সরিয়ে নিয়ে যায় গুজরাতের সানন্দে।
২০২১ সালে বিধানসভায় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী জানান, ২০১৯ সালে মাত্র ৩০১টি ন্যানো গাড়ি তৈরি হয়েছিল। ২০২০ সালে একটিও হয়নি। যদিও ওই কারখানায় টাটা অন্য মডেলের গাড়ি তৈরি করছে। ২০২২ সালে গুজরাট বিধানসভায় রাজ্যের শিল্প রাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুসারে, ওই কারখানায় সরাসরি চাকরি হয়েছে সাত হাজার মানুষের। ২০১৫-১৬ থেকে ২০২১-২২ পর্যন্ত উৎপাদিত পাঁচ লক্ষ গাড়ির মধ্যে ন্যানো গাড়ি ছিল ২.৫ লক্ষ। গুজরাট সরকার ওই কারখানা গড়ার জন্য টাটাকে মাত্র ০.১% সুদের হারে ৫৮৭ কোটি ৮ লক্ষ টাকা ঋণ দেয়। গুজরাট বিধানসভায় সেইসময় কংগ্রেস বিধায়করা টাটা মোটর্সের বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ তুলেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য, সরকারের সঙ্গে চুক্তির শর্ত ছিল বছরে প্রায় ২.৫ লক্ষ ন্যানো গাড়ি উৎপাদিত হবে। অথচ সরকারের তথ্য বলছে, সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে লেগেছে সাত বছর
মধ্যবর্তী দেড় বছরে সিঙ্গুর আন্দোলন রাজ্য রাজনীতির সমীকরণ অনেকটাই বদলে দিয়েছিল। সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে গ্রামবাসীদের প্রতিবাদে প্রথম শামিল হওয়া বেশ কয়েকটি বামপন্থী দল (অবশ্যই সবাই নয়) সরাসরি তৃণমূলের নেতৃত্বে আন্দোলনে শামিল হয়। একদিকে বিভিন্ন বামপন্থীদের সমর্থন, অপরদিকে সরাসরি কংগ্রেস এবং পরোক্ষে বিজেপির সমর্থনে তৃণমূলের নেতৃত্বে এক জোরদার বিরোধী জোটের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। কলকাতায় সে সময়ের বিরোধী দলনেত্রীর (আজকের মুখ্যমন্ত্রী) অনশন মঞ্চে এসেছিলেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা রাজনাথ সিং। অপরদিকে যারা ভোট বয়কটপন্থী, তাঁরাও অনেকে তৃণমূলের মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন দিন বদলের স্বপ্ন। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, লালগড় সারা দেশকে তোলপাড় করে দিয়েছিল।
২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনেই কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূলের জোট হয়েছিল। সেই জোট বজায় ছিল ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও। শ্রেণি রাজনীতির পরিচিত ছক তখন একেবারে গুলিয়ে গেছে। কারোর কাছে পুঁজিবাদী উন্নয়ন শ্রেণিসংগ্রাম, কেউ আবার তৃণমূলের শ্রেণিচরিত্র না ভেবে তার মধ্যেই মুক্তির পথ খুঁজছেন। সংসদীয় ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিই হয়ে উঠেছিল সব। তার মধ্যেও বামফ্রন্টের কয়েকটি শরিক দলসহ অনেক বাম দল পুঁজিবাদী উন্নয়নের মডেল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। তাদের সেইসময় তৃণমূলের মদতদাতা বলে অপপ্রচারও কম হয়নি। এখনো আড়ালে আবডালে সেই প্রচার অব্যাহত। ২০১১ সালে পালাবদলের পর তৃণমূল সম্পর্কে অনেকের আশাভঙ্গ হতে বেশি সময় লাগেনি। তৃণমূলের মধ্যে পুঁজিবাদবিরোধী উপাদান খোঁজাটাই যে চরম মূর্খামি ছিল, তা আর কে বলবে? আবার কেউ কেউ এখনো সরকারি পদ, পুরস্কার বা শাসকদলের ঘনিষ্ঠ হওয়ার মোহ কাটাতে পারেননি। প্রতিবাদী ভাবমূর্তি স্বছন্দে জলাঞ্জলি দিয়েছেন ক্ষমতার কাছে। তৃণমূলও এই ১২ বছরের শাসনকালে কর্পোরেটের আস্থাভাজন হয়েছে। সবই চলেছে ক্ষমতার নিয়ম মেনে।
শ্রেণি রাজনীতির পরিচিত ছক তখন একেবারে গুলিয়ে গেছে। কারোর কাছে পুঁজিবাদী উন্নয়ন শ্রেণিসংগ্রাম, কেউ আবার তৃণমূলের শ্রেণিচরিত্র না ভেবে তার মধ্যেই মুক্তির পথ খুঁজছেন। সংসদীয় ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিই হয়ে উঠেছিল সব।
পুঁজিবাদী উন্নয়নের পথে চললেও সিঙ্গুর থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে তৃণমূল কিন্তু চেষ্টার কসুর করেনি। ২০১১ সালেই আইন করে টাটাকে লিজে দেওয়া জমি ফেরত নেয় সরকার। টাটা গোষ্ঠী সেই আইনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল। অবশেষে ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট টাটার জন্য জমি অধিগ্রহণকে অবৈধ বলে রায় দিয়ে তৃণমূল সরকারের নতুন আইনকেই স্বীকৃতি দেয়। রাজ্যজুড়ে তখন চলেছিল তৃণমূলের বিজয়োৎসব। কিন্তু টাটার সঙ্গে করা চুক্তির এক ধারা অনুসারেই চুক্তিভঙ্গের দায়ে পড়ে সরকার। সেই সংক্রান্ত নিষ্পত্তিতেই এতদিন পর ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিল সালিশি আদালত।
দেশের আইনে ব্যক্তি মালিকানার অধিকারকে রক্ষাকবচ দিতে অনেক মারপ্যাঁচ রয়েছে। তাই যৌথ বা সামাজিক মালিকানায় থাকা জমি সহজে দখল করা যায়, কোম্পানির মালিকানায় থাকা জমি অত সহজে নেওয়া যায় না।
বামফ্রন্টের বড় শরিকের অভিযোগ, আগ বাড়িয়ে জমি ফেরত নিয়ে চুক্তিভঙ্গের দায়ে পড়েছে তৃণমূল সরকার। না হলে টাটা গোষ্ঠীকে ক্ষতিপূরণ দিতে হত না। টাটার সঙ্গে সেইসময় কী চুক্তি হয়েছিল তা প্রকাশ্যে আনার দাবি বহুবার উঠেছিল। যদিও ২০০৮ সালে শিল্পমন্ত্রী প্রয়াত নিরুপম সেন চুক্তির ধারাগুলি বিধানসভায় উল্লেখ করেছিলেন বলে দাবি করা হচ্ছে। তৃণমূল ক্ষমতায় এসে এত বছরের মধ্যেও সেই চুক্তি প্রকাশ্যে আনেনি। না আনার কারণ হয়ত বা আইনি জটিলতা, যে আইনি জটিলতায় বন্ধ কারখানার জমি সরকারের অধিগ্রহণেও নাকি নানা বাধা আছে। সেই প্রসঙ্গ সিঙ্গুর বিতর্কের সময়েই উঠেছিল। দেশের আইনে ব্যক্তি মালিকানার অধিকারকে রক্ষাকবচ দিতে অনেক মারপ্যাঁচ রয়েছে। তাই যৌথ বা সামাজিক মালিকানায় থাকা জমি সহজে দখল করা যায়, কোম্পানির মালিকানায় থাকা জমি অত সহজে নেওয়া যায় না। দিনের শেষে টাটাকে কারখানা গড়তে রাজনৈতিক ঝামেলা পোহাতে হল না। উলটে হয়ত ক্ষতিপূরণও পেয়ে যাবে, এদিকে সিঙ্গুরে সরকারের ফেরত নেওয়া জমিতে এখনো চাষ শুরু হল না। বরং ভেড়িসহ তৃণমূল আশ্রিত মাটি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য বাড়ল। এভাবেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় আইনি সুবিধা পায় বিভিন্ন কোম্পানি।
বামেদের একথা অজানা নয়। কিন্তু সালিশি আদালতের রায়ে অনেকে যেন উচ্ছাস চাপা দিতে পারছেন না। তৃণমূলের ভুল ধরতেই ব্যস্ত থাকছেন। এখনো তাঁরা মনে করছেন, সিঙ্গুর থেকে টাটা চলে যাওয়ায় মহা সর্বনাশ হয়ে গেছে। কারখানা হলে চাকরি হত, উন্নয়নের অনেক পথ খুলে যেত। অথচ ২০০৭-০৮ সালে বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দার পর অটোমোবাইল শিল্পে সংকট বেড়েছে। সেই মন্দা কিন্তু এখনো কাটেনি। উলটে অতিমারির ধাক্কা এখনো কাটিয়ে ওঠা যায়নি। গুজরাতের সানন্দে ন্যানো তৈরির কারখানা চলে যাওয়ার ঘটনাকে নরেন্দ্র মোদীকে মমতা ব্যানার্জির দেওয়া উপহার বলা হচ্ছে। কারণ তিনি তখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। অভিযোগ সত্যি হতেই পারে। কিন্তু সেই উপহার কি গুজরাটের বিকাশ ঘটিয়েছে?
কিছু তথ্য থেকে বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা করা যায়। ২০২১ সালে বিধানসভায় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী জানান, ২০১৯ সালে মাত্র ৩০১টি ন্যানো গাড়ি তৈরি হয়েছিল। ২০২০ সালে একটিও হয়নি (সূত্র: দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া)। যদিও ওই কারখানায় টাটা অন্য মডেলের গাড়ি তৈরি করছে। ২০২২ সালে গুজরাট বিধানসভায় রাজ্যের শিল্প রাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুসারে, ওই কারখানায় সরাসরি চাকরি হয়েছে সাত হাজার মানুষের। ২০১৫-১৬ থেকে ২০২১-২২ পর্যন্ত উৎপাদিত পাঁচ লক্ষ গাড়ির মধ্যে ন্যানো গাড়ি ছিল ২.৫ লক্ষ। গুজরাট সরকার ওই কারখানা গড়ার জন্য টাটাকে মাত্র ০.১% সুদের হারে ৫৮৭ কোটি ৮ লক্ষ টাকা ঋণ দেয়। গুজরাট বিধানসভায় সেইসময় কংগ্রেস বিধায়করা টাটা মোটর্সের বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ তুলেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য, সরকারের সঙ্গে চুক্তির শর্ত ছিল বছরে প্রায় ২.৫ লক্ষ ন্যানো গাড়ি উৎপাদিত হবে। অথচ সরকারের তথ্য বলছে, সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে লেগেছে সাত বছর (সূত্র: দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)। ২০১৭ সালে রাহুল গান্ধী গুজরাট বিধানসভার নির্বাচনী প্রচারে ন্যানোকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া নিয়ে অভিযোগ তুলেছিলেন (সূত্র: দি ইকনমিক টাইমস, ২৭ নভেম্বর, ২০১৭ তারিখের ইন্টারনেট সংস্করণ)। ২০১৬ সালে ২৮ জন শ্রমিককে ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে শ্রমিকরা সেই কারখানায় ধর্মঘট করলে রাজ্য সরকার সেই ধর্মঘটকে বেআইনি ঘোষণা করে (সূত্র: দি ইকনমিক টাইমস)। অর্থাৎ কোম্পানিকে সরকারের অতি কম সুদে ঋণ দেওয়া, চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী উৎপাদন না হওয়া, শ্রমিক ছাঁটাই এবং কোম্পানির প্রতি সরকারের পক্ষপাতিত্ব – সবই চলেছে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের নিয়ম মেনে। টাটা গোষ্ঠী আর পাঁচটা কোম্পানির থেকে বেশি ভাল বা খারাপ – কোনোটাই নয়।
মোদীর গুজরাট মডেল বহু আলোচিত। তা নিয়ে প্রচার করেই তিনি ২০১৪ সালে কেন্দ্রে ক্ষমতায় এসেছিলেন। বামেরা সেই মডেলের বিরোধিতায় সদা সরব। এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে সিঙ্গুর অন্য কোনো মডেলের সন্ধান দিত। কারণ ওই উন্নয়ন মডেলের কোনো রাজ্য বা রাষ্ট্রীয় সীমানা নেই। সারা বিশ্বজুড়ে চলছে ওই পুঁজিবাদী উন্নয়ন মডেল। ১৯৯১ সাল থেকে নয়া উদারনীতির পথে ভারত সেই ধ্বংসযজ্ঞে শামিল হয়েছে, যেখানে আমাদের গেলানো হয় – খাদ্যে বা নানা পরিষেবায় ভর্তুকি পিছিয়ে পড়ার লক্ষণ। অথচ করসহ নানা ছাড় ও আর্থিক সাহায্যের মধ্য দিয়ে কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে ঘুরিয়ে ভর্তুকি দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষ সহজে ঋণ পান না, তাঁদেরই ব্যাঙ্কে জমা রাখা টাকা ঋণ হিসাবে পায় বড় বড় কোম্পানি। সেই ঋণ বকেয়া রেখে দিব্যি বিদেশেও পালিয়ে যাওয়া যায়।
আরো পড়ুন ভর্তুকি উন্নয়নের পরিপন্থী: বাজার মৌলবাদীদের কুসংস্কার
এই নীতিতেই আমাদের গেলানো হয় যে চাষের কাজে যুক্ত থাকা মানে পিছিয়ে পড়ার লক্ষণ। সিঙ্গুর প্রকল্পের বেলাতেও এমন আওয়াজই তোলা হয়েছিল। অথচ এই মডেলে কৃষিতে পুঁজি বিনিয়োগ বাড়ে, কৃষি ব্যবস্থা চলে যায় দেশবিদেশের বড় বড় কোম্পানির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। চাকরির গল্প বলে মানুষকে তাদের জীবিকা, বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ করে এই উন্নয়ন চলে। বেকারত্বের হারও বাড়ে। বিগত শতাব্দীর নয়ের দশক থেকে এই শতাব্দীর এক ও দুই দশকের কিছু সময় পর্যন্ত দেশজুড়ে শিল্পায়ন, স্পেশাল ইকনমিক জোন ইত্যাদি নিয়ে প্রচার তুঙ্গে ছিল। জমি অধিগ্রহণ নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। কোথাও আবার জনশুনানির মাধ্যমে মানুষ প্রকল্প আটকেও দিয়েছিলেন। উন্নয়নের নামে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আন্দোলন ভোট রাজনীতিকেও প্রভাবিত করেছিল। তার মোকাবিলায় ইউএপিএ আইনের সংশোধনী, অপারেশন গ্রিন হান্টের মত নানা ব্যবস্থা করে রাষ্ট্র। সারা দেশে বামপন্থীরা এসবের বিরুদ্ধে সরব হলেও এই রাজ্যে চিত্রটা ছিল আলাদা। বামফ্রন্টের কয়েকটি শরিক দল সরব হলেও, এমনকি ইউএপিএর সরাসরি বিরোধিতা করলেও, বড় শরিক দল খুব বেশি প্রতিবাদ করেনি।
এখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। নতুন কারখানার কথা কম শোনা যায়। বন্ধ কারখানায় গড়ে ওঠে বহুতল আবাসন, অত্যাধুনিক দোকান। প্রাকৃতিক সম্পদ অবাধে লুঠ করতে প্রণীত হয় নতুন নতুন আইন অথবা আইন সংশোধন করা হয়। ইউএপিএ আইন আরও কঠোর করে বিরোধীদের কারারুদ্ধ করতে কেন্দ্রের বিজেপি ও রাজ্যের তৃণমূল সরকার কেউ কম যায় না। জনশুনানির সুযোগটুকুও কায়দা করে তুলে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবাদ করলেই রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা রাজ্যদ্রোহিতার দায় চাপানো হয় প্রতিবাদীদের ঘাড়ে। যে তৃণমূল কংগ্রেস মানুষের সম্মতিতে জমি অধিগ্রহণের কথা বলেছিল, তাদের আমলেই চলছে মাটি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য। রাতারাতি কৃষিজমির চরিত্র বদলে দেওয়া হচ্ছে। নানা প্রকল্পের নামে স্থানীয় মানুষ, এমনকি প্রচলিত আইন অনুসারে গ্রামসভাকে, পাত্তা না দিয়ে চলছে জল জমি জঙ্গল পাহাড় লুঠ। তৃণমূল তাদের শ্রেণিচরিত্র অনুসারেই এই কাজ করছে। এখন আর কোন প্রকল্পে কত চাকরি হবে তা নিয়ে সরকার আগের মত গলা ফাটায় না। পকোড়া বা তেলেভাজা শিল্পের কথা বলে। তারই সঙ্গে চলে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি আর কর্মসংস্থানের মিথ্যে গল্প। নানা সমীক্ষার রিপোর্টকে কেন্দ্রীয় সরকার হয় অস্বীকার করে, নয় সরকারি রিপোর্টে বিকৃত তথ্য দেওয়া হয়। রাজ্য সরকার নানা মন্ত্রকের বার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ বন্ধ করে দেয়। শ্রমমন্ত্রকের বার্ষিক রিপোর্ট না থাকায় রাজ্যে কর্মসংস্থানের কোনো চিত্র পাওয়া যায় না। কেন্দ্রের বিজেপি ও রাজ্যের তৃণমূল সরকারের এই কাজে মিলের কারণ হল পুঁজিবাদী উন্নয়ন মডেল। তা আজ আরও আগ্রাসী, বেপরোয়া।
টাটার গাড়ি কারখানা রাজ্যে পরিত্যক্ত হয়েছে ২০০৮ সালে। পনেরো বছরে এই উন্নয়নের কদর্য, হিংস্র চেহারা আরও প্রকট হয়েছে। এখনো যদি টাটা চলে যাওয়ায় দারুণ ক্ষতি হল বলে প্রচার চলে, তাহলে ডানেদের থেকে বামেদের আলাদা করা যায় না। সেইসময়েও যায়নি বলেই, সবকিছু গুলিয়ে গিয়েছিল বলেই তৃণমূল ক্ষমতায় আসার সুযোগ পেয়েছিল। প্রচার চলছে, সিঙ্গুরের মানুষ এবং যাঁরা প্রতিবাদ করেছিলেন তাঁরাও নাকি অনেকে এখন হা হুতাশ করছেন। কথাটা সত্যি, কারণ পরিত্যক্ত জমিতে কিছুই হচ্ছে না। তবে এই প্রচারের অন্য একটা দিক রয়েছে। এখনকার রাজ্য সরকার ঐ জমিতে অন্য কোনো কারখানা গড়তেও পারে। তাতে বামফ্রন্টের উল্লসিত হওয়ার কারণ নেই। তখন এর পুরো কৃতিত্ব নেবে তৃণমূল। সাধারণ মানুষ থেকে শিল্প মহল, সবাই জানবে যে তৃণমূলই শিল্প করতে পারে। বামফ্রন্ট পারেনি। যেমনভাবে শালবনীতে জিন্দালের নেওয়া জমির একাংশে নতুন শিল্প গড়ে তোলার কথা ঘোষণা হল। বামেদের এই উন্নয়ন মডেলকেই প্রশ্ন করতে হবে।
সিঙ্গুর বিতর্ক অনেকগুলি সমস্যাকে সামনে এনেছিল। যেমন, ইচ্ছুক-অনিচ্ছুক চাষি নিয়ে বিভ্রান্তি। একদিকে দেখা গেছিল বেশিরভাগ চাষি খাতায় কলমে জমি দিতে ইচ্ছুক, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষ কারখানা চাননি। আসলে যেসব জমির মালিককে চাষি বলা হয়েছিল, তাঁদের কজন প্রকৃত চাষি ছিলেন? মালিকানা না থাকলেও সেই জমিতে চাষ করা, বর্গায় নাম না থাকা চাষি তো ক্ষতিপূরণ পাবেন না। চাকরিও পাবেন না। উঠে এসেছিল ভূমি সম্পর্কের একটা দিক। ভূমি সংস্কারের পরেও কৃষিতে পুঁজির দাপট বাড়ায় কৃষক জমি হাতে রাখতে পারছেন না। জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণই হোক, শস্যবিমাই হোক, কৃষি ঋণই হোক – তাঁরা বঞ্চিতই থাকেন। গত পনেরো বছরে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। কৃষিক্ষেত্রে থাকা পিছিয়ে পড়ার লক্ষণ – এই মন্ত্রোচ্চারণ না করে এসব সমস্যা নিয়েই তো লড়াই গড়ে তোলা যায়। নগরায়ন ও উন্নয়নের নামে পরিবেশ, জীবিকা বিপন্ন করার নীতির বিরুদ্ধেও লড়াই করা যায়। পনেরো বছরে রাজ্যের অর্থনীতি-রাজনীতি অনেক বদলেছে, বদলেছে রাজনৈতিক সমীকরণ। সিঙ্গুরে কারখানা হলে দারুণ উন্নতি হত – এখনো এই কথা বলে গেলে না হবে বামপন্থার শক্তিবৃদ্ধি, না বাড়বে ভোট। টাটা ভাল না আদানি ভাল, অথবা পুঁজিপতিদের মধ্যে প্রগতিশীল খোঁজাও আজকের আগ্রাসী পুঁজির যুগে অবান্তর। পুঁজিবাদী উন্নয়নবিরোধী আন্দোলনগুলিকে শ্রেণি আন্দোলনে উন্নীত করার মধ্যেই আছে বামেদের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








অসাধারণ লেখা। একদম সঠিক বক্তব্য! লেখককে অনেক অনেক ধন্যবাদ। শ্রেণী সংগ্রাম তীব্র করবার লড়াই জারি থাকুক! ইনকিলাব জিন্দাবাদ!