বহুদলীয় নির্বাচনী গণতন্ত্রে ভোটদাতাদের সচেতন নাগরিক হিসাবে ভোট প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের মূল কাঠামোকে পোক্ত করে। স্বচ্ছ রাজনৈতিক পরিবেশে, সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এক দায়িত্বশীল সরকার গঠন করা সম্ভব। অথচ আমাদের দেশে এই নির্বাচন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড ক্রমেই হয়ে উঠছে অস্বচ্ছ। পেশীশক্তি আর অর্থবলের উপর নির্ভর করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া এখন অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। এর পাশাপাশি বেড়ে চলেছে নির্বাচনের খরচ। ২০১৯ সালের ভারতের সাধারণ নির্বাচন ছিল বিশ্বের সবথেকে ব্যয়বহুল নির্বাচন, যাতে আনুমানিক ৫৫ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। অঙ্কটা ১৯৯৮ সালের নির্বাচনের খরচের থেকে এক, দুই বা তিন গুণ নয়, ছয় গুণ বেশি।

যেরকম রাজকীয়ভাবে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের প্রচার করে, প্রার্থীরা যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেন, ভারতের মত এক মধ্যম আয়ের দেশে সেই বিপুল অর্থ তো আর কৌটো ঝাঁকিয়ে চাঁদা তুলে জোগাড় হয় না। বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের চাঁদার সিংহভাগ পেয়ে থাকে কর্পোরেট ব্যবসায়ীদের থেকে। এটা সহজেই অনুমেয় যে কর্পোরেট ব্যবসায়ীরা মুনাফার সঙ্গে সম্পর্কহীন ব্যয় করবে না। কাজেই দেশের ও দশের নামে নেওয়া অনেক সরকারি সিদ্ধান্তের পিছনেই কর্পোরেট মুনাফার সমীকরণ থেকে যায়। তবু সে একরকম চলছিল, কারণ কোন কর্পোরেট কাকে কত চাঁদা দিল, সেই হিসাব ছিল জনসমক্ষে বা অন্তত নির্বাচন কমিশনের কাছে। কিন্তু ২০১৭-১৮ সালে আনা নির্বাচনী বন্ড এই আপাত স্বস্তিটুকুও কেড়ে নিল এবং রাজনৈতিক চাঁদা বা আয়ের উপর একটা কালো পর্দা টেনে দিল, যে পর্দার আড়ালে কী লেনদেন হচ্ছে তা আর কারোর জানার উপায় রইল না।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

নির্বাচনী বন্ডের মূল বৈশিষ্ট্য, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া থেকে যে কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানি পরিচয়পত্র (KYC) জমা দিয়ে তাদের মনোমত রাজনৈতিক দলের জন্য এই বন্ড কিনতে পারে। এক হাজার টাকা থেকে এক কোটি টাকার মূল্যের এই বন্ড কেনার কোনো উর্ধ্বসীমা নেই। আপাতদৃষ্টিতে বন্ডে দাতার নাম লেখা থাকে না। বছরে চার মাস এবং নির্বাচন থাকলে তার আগে এই বন্ডের কেনাবেচা হয়, মাসে সর্বোচ্চ দশদিন মত। এই বন্ডের আয়ু ১৫ দিন, তারমধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলোকে এই টাকা ভাঙিয়ে নিতে হয়, না হলে সেই টাকা পিএম কেয়ার্স তহবিলে চলে যায়। এখানে বিশেষ করে উল্লেখ্য, গতবছরের তথ্য বলছে বন্ড কেনা এবং ভাঙানো, দুটোই সবচেয়ে বেশি হয় বিভিন্ন নির্বাচন চলাকালীন বা তার কিছু আগে পরে। অর্থাৎ নির্বাচনে বেড়ে চলা অর্থবলের বড় জোগান আসে এই বন্ড থেকে। অন্যভাবে বললে, নির্বাচনী বন্ড দেশের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনগুলোতে বিশেষ প্রভাব ফেলার ক্ষমতা রাখে এবং সেই প্রভাব অত্যন্ত অসম আর অস্বচ্ছতায় ঘেরা।

অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস (ADR)-এর পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, মার্চ ২০১৮ থেকে জুলাই ২০২৩ সময়কালে ২৭ খেপে মোট ২৪,০১২ খানা নির্বাচনী বন্ড বিক্রি হয়েছে; অর্থমূল্য ১৩,৭৯১.৯০ কোটি টাকা। ২০১৭-২০১৮ সালে মোট বিক্রি হওয়া বন্ডের ৯৫% পেয়েছে কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপি, দ্বিতীয় স্থানে কিন্তু অনেক পিছিয়ে কংগ্রেস। সামান্য ছিটেফোঁটা পেয়েছে অন্য কয়েকটা দল। ২০১৭-২০১৯ সালের হিসাব ধরলে বন্ড থেকে বিজেপির আয় তার মোট আয়ের ৬০.১৭%। ২০১৯-২০ সালে সাতটা জাতীয় দলের মোট আয়ের ৬২% এসেছে বন্ড থেকে, ২০১৮-২০১৯ সালে যা ছিল ৫২%। ওই সময়ে আঞ্চলিক দলগুলোর আয়ের ৫৩% এসেছে বন্ড থেকে। এককথায় নির্বাচনী বন্ড হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক দলগুলোর আয়ের পছন্দের উৎস। স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে, আপনার-আমার মত সাধারণ মানুষই হয়ত এই বন্ড কিনে দলগুলোকে চাঁদা দিচ্ছে। কিন্তু তথ্য বলছে ৯৪.২৬% বিক্রিত বন্ড কেনা হয়েছে ন্যূনতম ১ কোটি টাকার মূল্যে, যা কর্পোরেট চাঁদার দিকেই ইঙ্গিত করে।

আরো পড়ুন তৃণমূল কংগ্রেস ও গোয়া নির্বাচন: শূন্য শুধু শূন্য নয়

নির্বাচনী বন্ডের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের দিক হল দাতাদের নাম গোপন রাখা। কোটি কোটি টাকার অনুদান কে কাকে দিল, সে সম্পর্কে কোনো তথ্যই সাধারণ মানুষ বা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পৌঁছয় না। এমনকি নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত এই তথ্য জানে না। আরও উদ্বেগের কথা, সরকার (শাসকদল) চাইলেই স্টেট ব্যাঙ্কের কাছ থেকে দাতাদের নামধাম জানতে পারে, কারণ বন্ড কিনতে গেলে পরিচয়পত্র দিতে হয় এবং প্রত্যেক বন্ডে থাকে বিশেষ আলফা নিউমেরিক কোড। নির্বাচনী বন্ড থেকে বেশি টাকা সবসময় শাসকদলগুলোই পেয়েছে (কেন্দ্রে ও রাজ্যে) দেখা যাচ্ছে। ফলে নির্বাচনী লড়াই বিরোধী দল এবং ছোট দলগুলোর পক্ষে অসম প্রতিযোগিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া নাম গোপন থাকার সুযোগ নিয়ে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে সরকারি কোম্পানি বা বিদেশি কোম্পানিগুলো যদি দেশের নির্বাচনকে প্রভাবিত করে, তা দেশের সুরক্ষা ও সার্বভৌমত্বের জন্যও আশঙ্কাজনক। তাই এরকম সম্ভাবনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা একেবারেই অনভিপ্রেত।

২০১৭-১৮ সালে ADR ও কমন কজ এবং পরে কংগ্রেস ও সিপিএম দল সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় ভোটারদের গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর নির্বাচনী বন্ডের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে এবং এর বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে। অনুদান দাতাদের পরিচয় প্রকাশ না করা যে ভোটদাতাদের জানার মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ – সেকথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। গত ৩১ অক্টোবর এই জনস্বার্থ মামলার শুনানির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার পক্ষের আইনজীবী জানান, ভোটারদের নির্বাচনী বন্ডের অনুদান বিষয়ে বিস্তারিত জানার কোনো অধিকার নেই। এরকম একটা বিতর্কিত মন্তব্যে আদালতে সমালোচনার ঝড় ওঠে এবং নাগরিক সমাজের এক অংশও নির্বাচনী বন্ডের বিরোধিতায় সরব হয়। এই মামলার শুনানিতে কর্পোরেট চাঁদার বিষয়টাও বারবার উঠে আসে। আবেদনকারীদের আইনজীবী বলেন, কর্পোরেট কোম্পানি তাদের শেয়ারহোল্ডারদের অনুমতি না নিয়েই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে চাঁদা দেয়। এটা অনৈতিক এবং শেয়ারহোল্ডারদের বিশ্বাসভঙ্গের শামিল।

সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিসহ পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চে এই মামলা এখন বিচারাধীন। সময় বলবে আইনের ফয়সালা কী হবে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর জনগণের কাছে জবাবদিহি অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে মজবুত করতে নির্বাচনী বন্ড নিষিদ্ধ করা বা এর অস্বচ্ছতার দিকগুলো দূর করা প্রয়োজন। এছাড়াও রাজনৈতিক দলগুলোকে তথ্যের অধিকার আইনের অধীনে আনা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির ব্যক্তিদের প্রার্থী মনোনীত করা, রাজনৈতিক দলের আয়-ব্যয়ের ব্যাপারে আরও স্বচ্ছতা আনতে প্রয়োজনে জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের সংস্কার করে রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও শৃঙ্খলাপরায়ণ এবং দায়বদ্ধ করে তোলা একান্ত কাম্য।

যাঁরা ভোটদাতা তাঁদের রাজনৈতিক দলগুলোর খুঁটিনাটি সম্পর্কে জানার অধিকার নেই, অথচ ভোটে জিতলে শাসকদলের প্রত্যেক নাগরিকের সমস্ত তথ্যের উপর নিয়ন্ত্রণের অধিকার জন্মায় – এই যদি নিয়ম হয়, তাহলে এই গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠার যথেষ্ট কারণ আছে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সেই উদ্বেগ প্রকাশ করার অধিকার আছে প্রত্যেক নাগরিকের। গণতন্ত্র যদি বেনামে চলে তাহলে তা অচিরেই বেহাত হবার আশঙ্কা থাকে। বেহাল তো ইতিমধ্যেই হয়েছে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.