পলাশ পাল
সম্প্রতি সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের জেনারেল অ্যাসেম্বলিতে আনা গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের উপর ভোটাভুটিতে ভারত ভোটদানে বিরত থেকেছে। এর অর্থ প্যালেস্তাইন ও ইজরায়েল প্রশ্নে নরেন্দ্র মোদী সরকারের তথাকথিত ভারসাম্যের নীতি – একদিকে গাজায় মানবিক সাহায্য দান এবং স্বাধীন প্যালেস্তাইনের পক্ষে অবস্থান বজায় রাখা, অন্যদিকে ইজরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে পরোক্ষভাবে তার হত্যাযজ্ঞ সমর্থন করার কৌশল থেকে সরে এসে তেল আভিভের যুদ্ধনীতিকেই স্বীকৃতি দেওয়া। অবস্থানটি পশ্চিমী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনীয়। তারা বরাবরই মুখে স্বাধীন প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রের কথা বললেও কার্যক্ষেত্রে প্যালেস্তিনীয়দের মুক্তি সংগ্রামের চেয়ে ইজরায়েলের নিরাপত্তা ও দখলদারিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। সন্দেহ নেই, নয়াদিল্লির এই পদক্ষেপ ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, ওয়াশিংটনের কর্মকর্তা এবং হিন্দুত্ববাদীদের খুশি করেছে। কিন্তু এর মধ্যে দিয়ে মোদী সরকার প্যালেস্তিনীয় এবং ভারতের বড় অংশের মানুষ, যাঁরা প্যালেস্তাইনের মুক্তি সংগ্রামের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন, তাঁদের ভাবাবেগে আঘাত করেছে।
প্যালেস্তাইন ও গাজা প্রশ্নে ইজরায়েল এবং পশ্চিমী দেশগুলোর নীতি বহু আলোচিত। বস্তুত তাদের অবস্থান ১৯৬৯ সালে নির্মিত বার্ন ছবিটির কথা মনে করিয়ে দেয়। বার্ন হল আখ চাষে সমৃদ্ধ একটি কাল্পনিক ক্যারিবিয়ান দ্বীপ। গিলো পন্টিকার্ভো পরিচালিত এই ছবিটিতে দেখানো হয় বার্নের আখ বা চিনি শিল্পের উপর দখলদারি কায়েম করতে ষোড়শ শতকে পর্তুগিজরা প্রথমে দ্বীপটিতে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং সেখানকার আদিবাসীদের হত্যা করে। পরে এই ধ্বংসস্তুপের উপরে গড়ে তোলে এক নতুন ব্যবস্থা – আফ্রিকা থেকে ক্রীতদাস আমদানি করে তাদের নতুন করে আখ উৎপাদনের কাজে লাগায়। কিন্তু তিনশো বছর পরে, উনিশ শতকের মাঝামাঝি, আর্বিভাব ঘটে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির। তারা ক্রীতদাসদের সাহায্যে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে পর্তুগিজদের হাত থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয় এবং দ্বীপটির অর্থনীতি পুরোপুরি কব্জা করে। বার্ন দ্বীপে শুরু হয় মুক্ত বাণিজ্যের যুগ।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ক্রীতদাস আফ্রিকানরা প্রথমে ভেবেছিল তারা লড়াই করছে স্বাধীনতার জন্য, কিন্তু অচিরেই তাদের ভুল ভাঙে। ফলত দশ বছরের মধ্যেই তারা আবার বিদ্রোহী হয়ে ওঠে, বিদ্রোহ দমনে এবার আসরে নামে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী সরকার এবং, আজকের অর্থে, কর্পোরেটদের মিলিত শক্তি। বিদ্রোহীদের পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দিতে শাসকরা তাদের নির্বিচারে হত্যা করে এবং ভস্মীভূত করে দেয় সমস্ত ক্ষেত। বিদ্রোহীরা পরাজিত হয়, তবে তাদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা অনির্বাণ শিখার মত জ্বলতে থাকে। ছবিটি একদিকে যেমন সাম্রাজ্যবাদ থেকে নয়া সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ থেকে নয়া উপনিবেশবাদ, উদারবাদ থেকে নয়া উদারবাদে পরিক্রমণ, তেমনি তা শোষিতদের স্বাধীনতা ও অধিকার বুঝে নেওয়ার অদম্য লড়াইয়ের কাহিনিও বটে। পাশাপাশি ছবিটি ক্ষমতাবানদের এই ভাবনাও তুলে ধরে, যে বেশি মুনাফার জন্য কখনো কখনো ধ্বংস করাও প্রয়োজন।
বাস্তবিক, ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ বিদেশমন্ত্রী আর্থার ব্যালফোর যেদিন ‘ঈশ্বরের দ্বারা প্রতিশ্রুত ভূমি’-তে ইহুদি জনগোষ্ঠীর জন্য একটি ‘জাতীয় বাসভূমি’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা করেন, প্যালেস্তিনীয় আরবদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল সেদিনই। কারণ ওই ঘোষণায় আরবদের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি কথাও ব্যয় করা হয়নি। ইজরায়েল সৃষ্টির জন্য প্যালেস্তাইনদের ধ্বংস করতে হবে –কথার মারপ্যাঁচে সেদিন একথা ভাল করেই বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
পশ্চিমী দেশগুলোর প্যালেস্তিনীয়দের নির্মূল করার দ্বিতীয় আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ ছিল ১৯৩৭ সালে লর্ড আর্ল পিলের নেতৃত্বাধীন রয়্যাল কমিশনের সুপারিশ। সেখানে বলা হয়েছিল, পবিত্র বেথেলহেম আর জেরুজালেম থাকবে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত অছি অঞ্চল হিসাবে। গ্যালিলি এবং উপকূলবর্তী সমভূমি নিয়ে গঠিত হবে একটি সার্বভৌম ইহুদি রাষ্ট্র। অবশিষ্ট অংশ ট্রান্স-জর্ডনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি স্বাধীন আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের জেনারেল অ্যাসেম্বলি কিছুটা পরিবর্তন করে এই প্রস্তাব অনুমোদন করে। পরিবর্তিত অংশে বলা হল, ব্রিটেনের শাসন শেষ হয়ে যাওয়ার পর জেরুজালেম শহরটিকে নিয়ন্ত্রণ করবে আন্তর্জাতিক প্রশাসন। এই পর্বে ইজরায়েল রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
প্যালেস্তাইনে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে ১৯৪৮ সালের ১৫ মে। তার একদিন আগে, অর্থাৎ ১৪ মে, আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে স্বাধীন ইজরায়েল আর পরদিন ব্রিটিশরা বিদায় নেওয়ার সময় থেকেই শুরু হয় প্যালেস্তিনীয় আরবদের মহাবিপর্যয়। একটি হিসাব অনুসারে, ওই বছরের অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় সাত লক্ষ প্যালেস্তিনীয় উদ্বাস্তু হয়ে পার্শ্ববর্তী জর্ডান, লেবানন ও সিরিয়ায় আশ্রয় নেয়। কেউ কেউ বসবাসের জন্য বেছে নেয় গাজা, ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক আর জেরুজালেমের পূর্বাংশ। যাঁরা ইজরায়েলের সীমানার মধ্যে থেকে গেলেন, তাঁরা হয়ে পড়লেন নিজভূমে পরবাসী। এখনো ১৫ মে দিনটিকে প্যালেস্তিনীয়রা আল নাকবা বা বিপর্যয় দিবস হিসাবে পালন করেন। একে প্যালেস্তাইন ধ্বংস প্রক্রিয়ার তৃতীয় স্তর বললে অত্যুক্তি হয় না। নাকবার পর থেকে সময় যত গড়িয়েছে, এই নির্মূলকরণ তত বর্বর হয়েছে।
১৯৪৭ সালে ইজরায়েল প্রতিষ্ঠার সময়ে প্যালেস্তাইনের মোট জনসংখ্যার ৩৩% ছিল ইহুদি এবং তাদের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল মোট জমির ৫৭%। অথচ ১৯১৭ সালে ব্যালফোর ঘোষণার সময়ে এই সংখ্যাটা ছিল মাত্র ১০%। দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধির অন্যতম কারণ ছিল ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে ইহুদিদের অভিবাসন। বিশেষত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে নাজি আক্রমণ থেকে বাঁচতে কয়েক লক্ষ ইহুদি প্যালেস্তাইনে এসে বসবাস শুরু করেন। এককথায় প্যালেস্তাইনের ভূমিপুত্রদের মধ্যে ইহুদিদের সংখ্যা ছিল নগণ্য। পরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইহুদিদের সংখ্যা এবং ইজরায়েলের জমির পরিমাণ বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। ক্রমশই সংকুচিত হয়েছে স্বাধীন প্যালেস্তাইনের জমির পরিমাণ। ১৯৪৮-৪৯ সালে প্রথম আরব-ইজরায়েল যুদ্ধে তেল আভিভ এককভাবে পশ্চিম জেরুজালেম, নেগেভ মরুভূমি এবং গ্যালিলির কিছু অংশ দখল করে নেয়। আর ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের দ্বিতীয় আরব-ইজরায়েল যুদ্ধে গোটা জেরুজালেম সমেত গাজা, ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক (জর্ডন নদীর পশ্চিম তীর) ও গোলান উপত্যকা ইজরায়েলের করায়ত্ত হয়। ২০০৯, ২০১২ ও ২০১৪ সালেও গাজা ভূখণ্ডের উপর ইজরায়েলের বাহিনী নজিরবিহীন হামলা চালায়। প্রতি হামলাতেই কয়েকশো প্যালেস্তিনীয়র মৃত্যু ঘটে এবং হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়। এবারেও মৃত্যুর সংখ্যা ইতিমধ্যেই ১০,০০০ ছাড়িয়েছে এবং সন্দেহ নেই সংখ্যাটা আরও বাড়বে।
গাজা ও ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পরে অঞ্চল দুটিকে ইজরায়েল নিজের উপনিবেশ হিসাবে ব্যবহার করতে শুরু করে। গাজার অধিবাসীদের সমস্তরকম রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি তাদের জীবন-জীবিকার অধিকার, যেমন মাছ ধরা এবং চাষবাস কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এমনকি তাদের গাজার বাইরে আসার বা বাইরে থেকে গাজার ভিতরে ঢোকার জন্যও নির্ভর করতে হয় ইজরায়েলের সামরিক কর্তৃপক্ষের সম্মতির ওপর। বিদ্যুৎ ও জল সরবরাহের মত অত্যাবশ্যক ক্ষেত্রগুলিকেও ছাড় দেওয়া হয়নি। এর বেশির ভাগ বরাদ্দ হয় ইজরায়েলি মালিকানাধীন কৃষি খামার ও বিলাসবহুল হোটেল রিসর্টগুলির জন্য। প্যালেস্তিনীয়দের ভাগ্যে কতটুকু জুটবে তা নির্ভর করে তেল আভিভের কর্মকর্তাদের খেয়ালখুশির উপর।
একই পরিণতি ঘটে ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের অধিবাসীদের। হামাসের আত্মঘাতী হামলা থেকে বাঁচার জন্য তেল আভিভ, ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক অঞ্চলের ভিতর দিয়ে ৭০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বিরাট পাঁচিল তৈরি করে। ফলে অঞ্চলটির প্রায় ১৬% ভূখণ্ড ইজরায়েলের অর্ন্তভুক্ত হয় এবং বাস্তুচ্যুত হন কয়েক লক্ষ মানুষ। সেই সঙ্গে হাজার হাজার মানুষ মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। শুধুমাত্র জমি চুরি নয়; জেরুজালেম, গাজা ও ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের ভিতরে একের পরে এক বসতি সম্প্রসারণ করে ওই এলাকার জনবিন্যাস এবং প্যালেস্তিনীয় আরবদের জাতিগত পরিচয়কেও বিপন্ন করে তোলে। পশ্চিমী দুনিয়া এই দখলদারিতে বাধা দেয়নি তো বটেই, উলটে ২০১৭ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইজরায়েলের একক ও অবিভাজ্য রাজধানী হিসাবে ঘোষণা করে প্যালেস্তাইনকে নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়াকে আরও জোরদার করেন। বর্তমানে প্যালেস্তাইনের মোট জমির ৭৮% ইজরায়েলের সরাসরি কর্তৃত্বাধীন।
শুধু তাই নয়, ইজরায়েলি পুঁজিপতিদের জন্যে প্যালেস্তিনীয় আরবরা শস্তা শ্রমিক। তারা কিছুতেই এই সুবিধা হাতছাড়া করতে চায় না। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০০৫ সালে গাজা ও ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় ইজরায়েলি প্রশাসন, কিন্তু যেভাবে তারা প্যালেস্তাইনের অধিবাসীদের অবরুদ্ধ করে ফেলেছে, অঞ্চলটাকে উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত করেছে তাতে নিজেদের শস্তায় বিকিয়ে দেওয়া ছাড়া তাদের উপায় নেই। তাছাড়া ইজরায়েলের নীতির কারণে ওখানে কোনো শক্তিশালী শিল্প কলকারখানা ভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও গড়ে উঠতে পারেনি। পুরোটাই ইজরায়েলের কর্তৃত্বাধীন। এই কারণেই অনেকে মনে করেন ইজরায়েল এবং পশ্চিমী দুনিয়া হামাসকে যতই সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসাবে দেগে দিক না কেন, সাধারণ প্যালেস্তিনীয়দের বড় অংশের কাছে তারা মুক্তি সংগ্রামের শক্তি। হামাস শুধুমাত্র দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের তত্ত্বকেই খারিজ করে না, পশ্চিম এশিয়ায় ইজরায়েলের দখলদারির বিরুদ্ধেও তারা অন্যতম প্রতিস্পর্ধী। ১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তি অনুসারে গঠিত প্যালেস্তিনিয়ান ন্যাশনাল অথরিটি নামে একটি সংগঠনের অস্তিত্ব কাগজে কলমে রয়েছে বটে, কিন্তু বাস্তবে তার কোনো ক্ষমতা নেই। সবটাই ইজরায়েলের করায়ত্ত।
ভারত স্বাধীন ও সার্বভৌম প্যালেস্তাইন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে তার সমর্থন জানিয়ে এসেছে স্বাধীনতার পর থেকেই। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে প্যালেস্তাইন ভূখণ্ডে ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে জাতিপুঞ্জের প্রস্তাবে যে ১৩টি দেশ বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল, ভারত ছিল তাদের অন্যতম। তখন ভারত স্পষ্ট ঘোষণা করেছিল, প্যালেস্তিনীয়দের ভবিষ্যৎ প্রশ্ন সংক্রান্ত যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের প্রধান লক্ষ্য হবে তাদের স্বাধীনতা। এ বিষয়ে মহাত্মা গান্ধীর বক্তব্য ছিল, ইংল্যান্ড যতটা ইংরেজদের, ফ্রান্স ফরাসিদের, প্যালেস্তাইন ঠিক সেভাবেই আরবদের। আর আরবদের উপর ইহুদিদের চাপিয়ে দেওয়া অন্যায় ও অমানবিক। তিনি আরও বলেছিলেন, প্যালেস্তাইনে আজ যা ঘটছে, তা নৈতিকতার কোনো মাপকাঠিতে সমর্থন করা যায় না। প্রায় একই কথা বলেছিলেন জওহরলাল নেহরু – “ইহুদিদের স্বদেশের অধিকার প্যালেস্তাইনদের স্বদেশ থেকে বিতাড়নের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।” যদিও পরে ভারত তার অবস্থান কিছুটা বদল করে ১৯৫০ সালে ইজরায়েলকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃত দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯২ সালে পিভি নরসিমা রাওয়ের শাসনকালে উভয় দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। তা সত্ত্বেও এতদিন স্বাধীন প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রের প্রশ্নে ভারতের অবস্থান ছিল অনড়। বিশেষত ২০১৪ সালের আগে পর্যন্ত ইজরায়েলের সঙ্গে নানা পর্যায়ে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি করলেও স্বাধীন প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রের পক্ষে নিজের অবস্থান থেকে ভারত কখনো সরে আসেনি। এমনকি পশ্চিমী দুনিয়ার নানা হুমকিকে অগ্রাহ্য করেছে।
শুধু তাই নয়, প্যালেস্তাইনের স্বার্থকে গুরুত্ব দিতেই ১৯৫৬ সালে সুয়েজ খাল সংকটে ভারত ইজরায়েলের বিপক্ষে মিশরের পাশে দাঁড়ায়। সেইসময় মিশরের রাষ্ট্রপতি গামাল আবদেল নাসের ছিলেন জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম শরিক এবং ভারতের ঘনিষ্ঠ। এছাড়া আরব দুনিয়ার বাইরে ভারতই প্রথম দেশ যে প্যালেস্তিনীয় জনগণের বৈধ প্রতিনিধি হিসাবে প্যালেস্তাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনকে (পিএলও) স্বীকৃতি দেয়। ভারত ও মিশরের উদ্যোগেই সার্বভৌম রাষ্ট্র না হয়েও পিএলও নির্জোট আন্দোলনের শরিক হয়। প্যালেস্তাইনের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭৫ সালে পিএলওকে নয়াদিল্লিতে কার্যালয় খোলার অনুমতিও দেয়। ১৯৯৮ সালে জাতিপুঞ্জের জেনারেল অ্যাসেম্বলিতে প্যালেস্তিনীয়দের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার বিষয়ক একটি খসড়া প্রস্তাব পেশ করা হয়েছিল। সেই প্রস্তাবেরও অন্যতম উদ্যোক্তা ছিল ভারত।
আরো পড়ুন জাতীয় সঙ্গীত এবং নেশন: ইরান যা ভাবায়
কিন্তু এবার মোদী সরকার যেভাবে ইজরায়েল এবং পশ্চিমী দেশগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে প্যালেস্তিনীয়দের উপর যে হিংসা চলছে তা অগ্রাহ্য করেছে তা কেবল ভারতের ইতিহাস ও চেতনার বিরোধীই নয়, প্যালেস্তাইনকে দেওয়া ভারতের জনগণের প্রতিশ্রুতিভঙ্গের সামিল। অমানবিক তো বটেই। তবে এই অবস্থান একেবারেই আকস্মিক নয়। মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তিনি ইজরায়েলের সঙ্গে একটু একটু করে সম্পর্ক মজবুত করেছেন এবং প্যালেস্তাইনের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়েছেন। এ প্রসঙ্গে ২০১৭ সালের জুলাই মাসে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তাঁর ইজরায়েল সফরের কথা বলা যায়। কোনো প্যালেস্তিনীয় প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা না করেই তিনি দেশে ফিরে আসেন। শুধু তাই নয়, ২০১৫ ও ২০২১ সালে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মানবাধিকার সংগঠনের আনা যুদ্ধাপরাধ সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলিকে সমর্থন করা থেকেও ভারত সরকার বিরত থাকে। এসব শুধু কূটনীতি ও অর্থনীতির ছলচাতুরি ভাবলে ভুল হবে। এই অবস্থান সংঘ পরিবারের মতাদর্শের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। সংঘ পরিবারের রাজনীতির কেন্দ্রে রয়েছে মুসলমানবিদ্বেষ। উপরন্তু হামাস ইসলাম ধর্মাবলম্বী সংগঠন হওয়ায় সন্ত্রাসবাদের বুলি আউড়ে বিজেপির মুসলমানবিদ্বেষী হিন্দুদের ভোট এককাট্টা করতেও সুবিধা হয়।
সাধারণ পরিষদের শান্তি প্রস্তাবের পক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের ভোটদানে বিরত থাকার কারণ হিসাবে যে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে তা হল, প্রস্তাবে হামাসের সন্ত্রাসের নিন্দা করা হয়নি। সেদিক থেকে দেখলে পশ্চিমী দেশগুলির চোখে প্যালেস্তিনীয়দের, বিশেষত গাজার অধিবাসীদের, অপরাধ একটাই – তাঁরা হামাসের শাসনাধীন। অর্থাৎ পশ্চিমী দুনিয়া এবং ইজরায়েলের এখন একমাত্র লক্ষ হল হামাসকে পুরোপুরি ধ্বংস করা। তা করতে গিয়ে কাতারে কাতারে সেখানকার সাধারণ অধিবাসী মরে গেলেও তাদের কিছু যায় আসে না। মোদীর নতুন ভারতও এই ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গী। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রস্তাবে হামাসের আক্রমণের উল্লেখ না থাকায় ফ্রান্সের তরফ থেকেও আপত্তি জানানো হয়েছিল। কিন্তু তারপরেও অবস্থার গুরুত্ব বিবেচনা করে এমানুয়েল ম্যাক্রঁর দেশ প্রস্তাবের পক্ষেই ভোট দেয়। বিশেষত ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলির মধ্যে ফ্রান্স অন্যতম যে প্রায় শুরু থেকেই দ্ব্যর্থহীনভাবে প্যালেস্তাইনের মুক্তি আন্দোলনের সমর্থক।
মনে রাখা দরকার, গাজা একটি ছোট ভূখণ্ড। আয়তন মাত্র ৩১১ বর্গ কিলোমিটার, প্রায় ২৩ লক্ষ মানুষ এখানে বসবাস করেন। পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল অঞ্চল এটি এবং অধিবাসীদের অধিকাংশই বাস করেন দারিদ্র্যসীমার নিচে। সঙ্গত কারণেই সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মহাসচিব আন্তনিও গুতিয়েরেজ হামাসের আক্রমণের নিন্দা করার পরেও ইজরায়েলের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, হামাসের হামলা হঠাৎ করে শূন্য থেকে বা বিনা কারণে হয়নি। গত ৭০ বছর ধরে প্যালেস্তিনীয়রা যে অবর্ণনীয় জীবনযাপন করছেন, এ তার প্রতিক্রিয়া মাত্র। তিনি আরও বলেছেন, প্যালেস্তিনীয়দের ক্ষোভকে হামাসের আক্রমণের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না এবং এই হামলার কারণে তাদের শাস্তি দেওয়াও যাবে না। যুদ্ধেরও একটা নিয়ম আছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক ঘনিষ্ঠতা বহুদিনের। মোদী এখন সেই সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে মরিয়া। সেই কারণেই ২০২১ সালে ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলকে নিয়ে একটি নতুন অর্থনৈতিক জোট তৈরি হয়। পাশাপাশি ২০২২ সালে আমিরশাহী ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় কম্প্রিহেনসিভ ইকনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সিইপিএ)। উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক আদানপ্রদান বাড়িয়ে তোলা এর অন্যতম লক্ষ্য। সম্প্রতি এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে ইন্ডিয়া মিডল ইস্ট ইউরোপ ইকনমিক করিডর তৈরির পরিকল্পনা। এখানেও প্রধান অংশীদারদের মধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী এবং ইজরায়েল অন্যতম। অর্থাৎ নরেন্দ্র মোদী সরকার ইজরায়েল আর আরব দেশ – উভয়কেই এক বৃত্তে রাখতে চায়।
কিন্তু কূটনীতি যেমন সবসময় নির্দিষ্ট ছক মেনে চলে না, তেমনি শাসকরাও নিজের মর্জিমাফিক সবকিছু মসৃণভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন না। বিশেষত জনমত অমান্য করলে খেসারত দিতেই হয়। আরব রাষ্ট্রনেতাদের কাছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই তাঁদের দেশের সাধারণ নাগরিকতা প্যালেস্তাইন প্রশ্নে এককাট্টা। অধিকাংশ আরব অন্য অনেক বিষয়ে ছাড় দিলেও প্যালেস্তিনীয়দের স্বাধীনতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে কোনোরকম আপোসে রাজি নন। পরিস্থিতি আরও একটি আরব-ইজরায়েল যুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে। তখন আজকের অবস্থানের কারণে গোটা আরব দুনিয়া থেকে ভারতের বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে মুখ থুবড়ে পড়তে পারে মোদীর সাধের মধ্যপ্রাচ্য ও ইজরায়েল নীতি।
লেখক পেশায় রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসের শিক্ষক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







