ধীরে ধীরে আমাদের জীবন কীরকম কাজের হয়ে গেল! কলকাতায় শুঁড়িখানা আর প্রায় নেই, যা কিছু নিষিদ্ধ ছিল তা আজ প্রকাশ্য। আর প্রকাশ্য জিনিস মাত্রই প্রায় পাপের কাছাকাছি। লোকে আর এখন হুল্লোড় করে পানশালায় যায় না। ‘একটু বসো’ বলে নিভৃত আলোয় বসে, ধীরে কথা বলে, কাঠি দিয়ে পনিরের টুকরো বা কাবাব খায় এবং এইসব সহযোগে পানকে মনে করে জীবনের ঈষৎ সম্প্রসারণ বা একরকমভাবে ভদ্র মহলে থেকে যাওয়ার চেষ্টা। বাংলা, তোমার সুরেলা দিনগুলি আজ কোথায়? তুমি ছিলে মেধার শিখরে, জানবাজারে।
তুমি ছিলে সরস্বতীর মুদ্রা, খালাসিটোলায় – ঈশ্বরের মরদেহ গরানহাটায় পড়ে থাকতে দেখলে নিরাশ্রয় আমরা তোমার শরণ নিতাম! যে ভালবেসেছে হরিণীর মত কোনো নারী, সে-ই শুধু জানে অন্ধকার – আমরা ভেবেছি। তারপর আমাদের বিবাহ মধ্যরাতে বৌবাজার থানায়।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
প্রয়াত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একদা তোমার উপাসক ছিলেন। এখনকার প্রায় বিলিতি বোতলবন্দি তোমার মায়াতরল দেখে মনে হয়, এক ডেকাডেন্ট জনপদবধূ – যে একদা অনেক দীপমালা, অনেক ফুল্লকুসুম দেখেছে; আর সে ভাবে ব্যাকুল বাঁশরি হাতে প্রেমিক মিছিল – মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়, ঋত্বিক ঘটক, কমল মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়। গিরিশ ঘোষের কথা না-ই বা তুললাম: আমার সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল!
যদি পণ্ডিতরা বলেন যা কিছু সস্তা, গরিবগুরবোদের, তা-ই বাংলা – আপত্তির কিছু নেই। বরং বাংলা করেই নাহয় বোঝা গেল পাতন পদ্ধতি। তবু আমাদের কৈশোরেও বাংলা প্রকৃত ‘কাউন্টার কালচার’। ডিরোজিও, রিচার্ডসন সাহেবের যতটা গঙ্গাজল সম্বল করে গোমাংস চর্চায় রত ছিলেন, তার থেকে কিছু কম নিষ্ঠায় ছয় ও সাতের দশকে বঙ্গদর্শন হত না সাহিত্যের নবীন তপস্বীদের। চাট হিসাবে মেটে চচ্চড়ি দেখে মত্ত কোনো কবি – ছোট পত্রিকার বেশ সম্ভ্রান্ত কবি রাজপুত্তুর – বলে ওঠে, ‘শরীর! শরীর! তোমার মন নাই – কুসুম?’
যে স্বভাবকে জীবনানন্দ দাশ বিলাস বলেন, না-পড়তে পারলেও বই কেনার সে আয়েশ, সেরকম সংস্কার থেকেই কমলবাবু পার্ক স্ট্রিট থেকে হ্যাম কিনে খালাসিটোলায় চাট হিসাবে ব্যবহার করতেন। সেখানে তাঁকে দৈবাৎ সঙ্গদান করায় রবি ঘোষ এই দৈববাণী শোনেন ‘বাবু, রস খাজা হয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দাও’ – মাতালদের বারাণসী এই খালাসিটোলায় তখন শক্তি, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। এখানেই প্রথম জীবনানন্দের জন্মদিন পালন হয় হাংরি প্রজন্মের উদ্যোগে। এমনকি ইয়াংকি যুবককেও এই স্বর্গোদ্যানে পদচারণা করতে দেখেছি।
তবু লিটল ম্যাগাজিনের ‘অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট’ তাবিজ লাগে। শুনেছিলাম মাণিকবাবু বারোদুয়ারিতে যেতেন। সুতরাং পাঁচের দশকের বিরোধিতায় আমরা ফ্রি-স্কুল স্ট্রিট যেখানে ধর্মতলায় মেশে, সেখানে মানত করতে যেতাম। হায়! সেই মায়াঝরা সন্ধ্যা! গালায় সিল করা বোতল খোলাতেই ছিল আভিজাত্য। শুঁড়িখানা থেকে দেওয়া হত লালচে হয়ে যাওয়া ছোট ছোট ন্যাকড়া; কিন্তু অনেকেই বাড়ির কাচা রুমাল গ্লাসে ঢাকা দিয়ে মাল ছেঁকে নিতেন। ন্যাকড়ায় গালার গুঁড়ো, পাশে পাঁইট বা বোতল, ফ্রি কাঁচা ছোলা ও নুন। ‘বাংলা’ সিপ করে খাওয়ার নয়। টাইট ফিল্ডিংয়ে হঠাৎ সুইপ করার মত এক চুমুকে শেষ করে টেবিলে গ্লাস রাখার শব্দ: ঠকাস!
কেউ সোডা নিতেন, সাহসীরা জলেই চালাতেন। ইতিহাসের সেই সোনালি যুগে মোবাইল ছিল না। ‘রাইত কত হইল’? এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যে দোকানে বনমালী, পশুপতিরা সদাই হাজির। যেখানে যত পরিকল্পনা হত, তা থেকে বাস্তিল তো ছার, সমস্ত স্ফূলিঙ্গ দাবানলে পরিণত হতে পারে। একজন আর্তুর র্যাঁবোকে দেখলাম, গুরু বসার পশমের আসন পাতল বেঞ্চিতে, উলটো দিকে ‘কহিঁ দীপ জ্বলে কহিঁ দিল’!
নিজের পিতার থেকে বড় ছিল প্রিয় পিতার বিরুদ্ধে ফেদেরিকো ফেলিনির অভিযান। ভিয়েতনাম তো বটেই, প্রায় সকলের কণ্ঠস্থ ছিল সুবর্ণরেখা। আসলে এসব লেখার নয়, নিজেকে বুঝতে হয়। মহুয়া খেতে কেমন লাগে – এ প্রশ্নের জবাব দিয়ে সত্যজিৎ রায়কে বোঝাতে পারেননি সুনীল। অরণ্যের দিনরাত্রি-র পানশালাটিকে তো লেক ক্লাব মনে হয় আমার।
আরো পড়ুন অরণ্যের দিনরাত্রি মধ্যবিত্তের শখের বনবাস, তাই আজ এত হইচই
৭ ফেব্রুয়ারির দুপুরে ঋত্বিক যখন ক্রিমেটোরিয়ামমুখী, তখন অনন্য রায় তাঁর পাঁইটটুকুতে একটু জল মেশাতে গিয়েছিল (সকাল থেকে পেটে কিছু পড়েনি তো), হঠাৎ ঋত্বিকের অন্য এক সহকারীর কাতরোক্তি ভেসে আসে ‘ছিঃ! আজ নয় ভাই। আজ জল দিয়ে খেলে গুরু স্বর্গেও শান্তি পাবে না।’ সুতরাং শান্তিপর্বে অনন্যকে যথেষ্ট অনুতাপগ্রস্ত দেখায়।
আজ ‘বাংলা’-র ছিপিতে গালা নেই। আজ গাঁজা পার্কের সামনে চলমান বাসের সংখ্যা গুনতে দিলে বিজন ভট্টাচার্য, ঋত্বিকের মত কেউ ভুল করবে না। আজ – বাংলাও বিলিতি প্রায়! প্রোমোটেড কেরানি। সমস্ত পানশালায় আজ অশরীরীরা মৃদু স্নিগ্ধতায় সভ্য হওয়ার চেষ্টা করে। জয় বাংলা!
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








