‘আমরা কী দোষ করেছি? আমরা তো কাউকে কিছু বলিনি। আমরা কী দোষ করেছি?’ প্রশ্ন ছিল মুর্শিদাবাদের মিঠিপুরের নজরুল ইসলাম শেখের। বছর চল্লিশের নজরুল ২০১৫ সাল থেকেই ওড়িশায় যাচ্ছেন। সেখানে ফেরিওয়ালা হিসাবে কাজ করেন তিনি, থাকেন একটি বস্তিতে। যে বস্তির ঘরে এসে হুমকি দিয়ে গিয়েছে গেরুয়া বাহিনী। ভয়ে ওড়িশা ছেড়েছেন। কিন্তু কী দোষ করেছেন? জবাব পাননি। যারা ভয় দেখাতে এসেছিল তাদেরও এই প্রশ্ন করেছিলেন। তাঁরা বলেছেন, বেশি কথা বললে অবস্থা খারাপ করে দেওয়া হবে। একই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন ওড়িশায় কাজে যাওয়া বহু বাঙালি শ্রমিক। বাঙালি এবং মুসলমান – এই দুই পরিচয়ের জন্য আক্রান্ত হয়েছেন। হুমকির মুখে ব্যবসা, কাজ ছেড়ে রাজ্যে পালিয়ে এসেছেন।
বিজেপির রাজত্বে ওড়িশায় আক্রমণের মুখে পড়ে দলে দলে মুর্শিদাবাদ, মালদায় ফিরছেন প্রবাসী শ্রমিক, ফেরিওয়ালারা। যাঁরা এখনো ওড়িশায় রয়ে গিয়েছেন, তাঁরাও অনেকে রাজ্যে ফেরার চেষ্টা করছেন। শ্রমিকদের অভিযোগ, প্রথমে বাংলাদেশি তকমা দেওয়া হচ্ছে। তারপরেই মারধর করা হচ্ছে। সেই ভিডিও আপলোড করা হচ্ছে সোশাল মিডিয়ায়। হুমকির কথা থানায় জানানো হলেও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে কোনো উদ্যোগ নেয়নি ওড়িশা সরকার। শ্রমিকদের খোঁজ নেয়নি পশ্চিমবঙ্গ সরকারও। পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ, বিডিও অফিসের পক্ষ থেকে এখনো ঘরে ফিরতে বাধ্য হওয়া শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
শ্রমিকরা বলছেন, ওড়িশায় বহুবছর ধরে কাজ করলেও এইরকম পরিস্থিতি মুখে কখনো পড়তে হয়নি। ওড়িশায় বিজেপির সরকার আসার পর থেকেই শুরু হয়েছে হামলা। এই ওড়িশাতেই ফাদার গ্রাহাম স্টেইনসকে দুই শিশুসন্তানসহ পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। ওই রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরেই আরএসএসের প্রভাব রয়েছে। কিন্তু রাজ্যে বিজেপির সরকার আসার পর আরএসএস অক্সিজেন পেয়েছে। তার ফলে রাজ্য সরকার গঠনের পরপর একাধিক এলাকায় সেই রাজ্যের সংখ্যালঘুরাও আক্রান্ত হয়েছেন। একাধিক হিংসার ঘটনা ঘটেছে। এবার লক্ষ্য বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকরা।
১৩ অগাস্ট রাতে ধনধান্য এক্সপ্রেসে লালগোলা স্টেশনে নেমেছেন প্রায় ২০০ জন প্রবাসী শ্রমিক। স্টেশনে নেমেই ক্ষোভ জানিয়েছেন শ্রমিক, ফেরিওয়ালারা। তাঁদের সাফ কথা, বিজেপি-আরএসএসের গুন্ডারাই হামলা করেছে। সংখ্যালঘু পরিচয়ের জন্য হামলার মুখে পড়তে হয়েছে শ্রমিকদের, রক্ষা করতে উদ্যোগ নেয়নি ওড়িশা সরকার। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে? কবে কাজে ফিরতে পারবেন? এসব প্রশ্নও শ্রমিকদের মনে। পশ্চিমবঙ্গে কাজের আকাল নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাঁরা।
রাতে লালগোলা স্টেশনে দাঁড়িয়ে লালগোলার ওহেদুল আলম বলেছেন, ‘দুই লক্ষ টাকার জিনিস ফেলে রাজ্যে পালিয়ে আসতে হল। অথচ সরকারের কোনো ভাবনা নেই আমাদের নিয়ে। সংসার চালাব কী করে?’ ওড়িশার লক্ষ্মীসাগর থানার ঝরপাড়ায় কয়েকশো ফেরিওয়ালার সঙ্গেই থাকতেন তিনি। ১০ অগাস্ট থেকেই বস্তি ছাড়তে শুরু করেন তাঁরা। অনেকেই ভয়ে স্টেশনে রাত কাটিয়েছেন। ওহেদুল জানান, ‘যে পাড়ায় ফেরিওয়ালারা থাকে সেই পাড়ার বাইরে গেলেই হামলা হচ্ছে। ব্যবসা বন্ধ। এক দিন ব্যবসা করে বড়জোর ৩০০-৪০০ টাকা রোজগার হয়। বাড়িতে টাকা পাঠাতে হয়। ঘরে বসে থাকলে পেট চলবে কীভাবে?’ তবে রাজ্যে ফিরেও একই প্রশ্ন ওহেদুলের। সাতদিন হতে চলল। সরকার কোনো যোগাযোগ করেনি।
জঙ্গিপুরের লক্ষ্মীজোলার বাসিন্দা খুরশেদ শেখও ঘরে ফিরেছেন। খুরশেদ শেখকে ঘিরে ধরেছিল আরএসএসের কর্মীরা। মারধর করা হয়। প্রাণভয়ে বস্তি ছেড়েছেন তিনিও। বছর ষাটের খুরশেদের কথায় ‘আগেও ওখানে বিজেপি, আরএসএস কর্মীরা ছিল। তারা নিজেদের মতো থাকত। কিন্তু ওড়িশায় বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর তাদের ভাব বদলে গিয়েছে। সাধারণ মানুষ আমাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। কিন্তু আরএসএস কর্মীরাই মারধর করছে।’
একসময় পশ্চিমবঙ্গ এবং ওড়িশা এক ছিল। বেঙ্গল প্রভিন্সের অংশ ছিল ওড়িশা। রাজ্যভাগের পর ওড়িশা থেকে অনেকেই এই রাজ্যে কাজ করতে আসতেন। চটকল এবং শিল্পাঞ্চলে গড়ে উঠেছিল ওড়িশার মানুষের কলোনি। তবে বিগত বেশকিছু বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ওড়িশায় প্রবাসী শ্রমিক হিসাবে কাজের খোঁজে যাচ্ছেন এই রাজ্যের মানুষ। মুলত দুই ধরনের কাজ তাঁরা করেন। এক, ফেরিওয়ালা হিসাবে মশারি, জামাকাপড়, বাসনকোসন গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করা। দুই, দক্ষ নির্মাণ শ্রমিক হিসাবে কাজ করা। ফেরিওয়ালারা সাধারণত মহাজনের কাজ থেকে ফেরি করার জিনিসপত্র নেন। দিন শেষে লাভের একাংশ মহাজনকে দিতে হয়। পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া এবং ওড়িশার স্থানীয় মানুষ – দুই ধরনের মানুষই মহাজন হিসাবে কাজ করেন। নির্মাণ শ্রমিকরাও ঠিকাদারের সঙ্গে বা নিজেদের উদ্যোগে কাজ করেন। সকলেই আজ আক্রমণের মুখে এবং দিশাহারা।
পশ্চিমবঙ্গ সরকার আগের বছর ঘটা করে ওয়েস্ট বেঙ্গল মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ড তৈরি করেছে। কর্মসাথী নামের পোর্টালে শ্রমিকদের নাম নথিভুক্ত করার কাজও শুরু করেছে। কিন্তু ওড়িশায় তৈরি হওয়া সমস্যায় শ্রমিকরা সরকারকে কোনোভাবেই পাশে পাননি।
আরো পড়ুন বিড়ি শ্রমিক: যার কাজ আছে তার ভাত নেই
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী ১৯ আগস্ট ২০২৪ তারিখ অবধি ২১ লক্ষেরও বেশি শ্রমিক প্রাথমিক রেজিস্ট্রেশনের আবেদন করেছেন। তাঁদের মধ্যে মাত্র ৬,১৬,৩৯৩টি আবেদন অনুমোদিত হয়েছে। কিন্তু প্রবাসী শ্রমিকরা ভিনরাজ্যে বিপদে পড়লে তাঁদের কীভাবে উদ্ধার করা হবে? তা নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা এই প্রকল্পে নেই।
তবে সবথেকে বড় বিপদ হল, মুসলমান পরিচয়ের জন্য বাঙালি শ্রমিকদের ভিনরাজ্যে এভাবে আক্রান্ত হতে হচ্ছে। যাঁরা মারধর করছেন, হুমকি দিচ্ছেন তাঁরা আবার সেই ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছেন। অন্যদের উস্কাতে চাইছেন। ভারতীয় জনতা পার্টি আসলে দেশজুড়েই এই সংস্কৃতি চালু করতে চাইছে। যে সংস্কৃতির মর্মবস্তু – ঘৃণা। আরও স্পষ্ট করে বলা যায়, মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেই এই নির্দেশ পাচ্ছেন স্থানীয় স্তরের বিজেপি কর্মীরা। সম্প্রতি সবরং ইন্ডিয়া একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সংগঠনের গবেষণা থেকে দেখা গিয়েছে, নরেন্দ্র মোদী ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ১১০টি মুসলমানবিদ্বেষপূর্ণ ভাষণ দিয়েছেন। ওই সংগঠন প্রধানমন্ত্রীর ১৭৩টি নির্বাচনী ভাষণ বিশ্লেষণ করেছিল। লাগাতার মুসলিমদের অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত করেছেন মোদী। ওড়িশার আক্রমণ সেই একই সুরে বাঁধা। সেখানে প্রথমেই শ্রমিকদের আধার কার্ড দেখতে চাওয়া হচ্ছে। তারপর বলা হচ্ছে, সেই আধার কার্ড নাকি নকল, ওই ব্যক্তিরা নাকি বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন। সেখানে থেকেই নাকি এই নকল কাগজ তৈরি করা হয়েছে।
এই অভিযোগের সবটাই সাজানো। তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে বাংলাদেশের ঘটনা। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর ঘটা হামলার প্রতিক্রিয়াতেই এই অভিযান। আসলে বাংলাদেশের ঘটনাকে মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানোর হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে বিজেপি, আরএসএস কর্মীরা। আরও উদ্বেগের বিষয় হল, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলাকে দলীয় কর্মসূচি ছাড়িয়ে সমাজের সংস্কৃতি হিসাবে দেখাতে চাইছে আরএসএস-বিজেপি। যে ঘৃণার আগুনে রুজিরুটি হারাচ্ছেন বাঙালি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শ্রমিকরা। বিজেপির বয়ানে আগে বলা হত, সংখ্যালঘুকে দেশপ্রেমের প্রমাণ দিতে হবে। এখন বলা হচ্ছে, সে আদৌ দেশের নাগরিক কিনা তার প্রমাণ দিতে হবে। এই পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসার পথ ভারত কি জানে?
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








