মার্চের ১০ তারিখে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন লোকসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গের প্রার্থী তালিকায় অন্য রাজ্যের তিনজনের নাম ঘোষণা করলেন, অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ভেবেছিলেন এইবারে বুঝি বাংলা-বাঙালি কেন্দ্রিকতা এবং বহিরাগত বিরোধিতার বিষয়ে তৃণমূল সুর নরম করছে।
প্রাক্তন অভিনেতা শত্রুঘ্ন সিনহা এবং প্রাক্তন ক্রিকেটার কীর্তি আজাদ – দুজনেই অতীতে বিহার থেকে বিজেপির সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। গুজরাটের বাসিন্দা প্রাক্তন ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠানকে তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় দেখে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সাধারণ সম্পাদক সুকান্ত মজুমদার প্রশ্ন তুলেছেন, নিজেদের এই প্রার্থীদেরও এবার তৃণমূল বহিরাগত বলবে কিনা।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
গত পাঁচ-ছ বছরে মমতা ব্যানার্জির দল বারবারই বিজেপিকে ‘বহিরাগত শক্তি’ বলে দাগিয়েছে। বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী তাঁর সোশাল মিডিয়া পোস্টে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে রাজ্যসভাতেও তৃণমূলের অন্তত তিনজন সদস্য – সাকেত গোখলে, সাগরিকা ঘোষ, এবং সুস্মিতা দেব – বাংলার বাসিন্দা নন। প্রথম দুজন দিল্লির এবং তৃতীয় জন আসামের বাসিন্দা।
ওই পোস্টে শুভেন্দু লেখেন ‘ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী, ভারতের এক রাজ্যের নাগরিককে অন্য রাজ্যে বহিরাগত বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় না। আমরা কখনো কাউকে বহিরাগত বলি না। কিন্তু তৃণমূল নেতৃত্ব বরাবর তাদের সুবিধা অনুযায়ী জাতীয় স্তরের নেতাদের গায়ে বহিরাগত তকমা লাগিয়ে দিয়েছে।”
এর দুদিন পরে, উত্তর ২৪ পরগণার এক জমায়েতে মমতা জানিয়ে দেন যে বহিরাগত বলতে অবশ্যই তাঁরা বিজেপিকে বোঝান এবং বোঝাবেন, অন্য কোনো সম্প্রদায়কে নয়। এভাবেই সুকৌশলে বাঙালি জাত্যভিমান আর অন্তর্ভুক্তির রাজনীতিকে তিনি মিলিয়ে দিলেন। ১১ মার্চ থেকে চালু হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের নিয়মকানুন নিয়েও বিজেপিকে একহাত নেন মমতা। এই প্রক্রিয়াটিকে ‘বাঙালি তাড়ানোর ছক’ হিসাবে বর্ণনা করে তিনি বলেন যে বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধ্বংস করাই বিজেপির অন্যতম উদ্দেশ্য।
নিচু জাতের মানুষের এঁটো খেলে জাত যায় শুনে বালক স্বামী বিবেকানন্দ তাঁদের বাড়ির বৈঠকখানায় বিভিন্ন জাতের অতিথিদের জন্য আলাদা করে রাখা হুঁকোর তামাক খেয়ে দেখেছিলেন জাত গেল কিনা। এই ঘটনার উল্লেখ করে মমতা বলেন ‘রামকৃষ্ণ, মা সারদা, বা বিবেকানন্দর মত খাঁটি হিন্দুদের বিজেপি অনুসরণ করে না। তারা তাদের নিজেদের মত হিন্দুত্ব বানিয়েছে। এই হিন্দুত্বের সঙ্গে বাংলার, বা বাদবাকি ভারতেরও, কোন সম্পর্ক নেই।’
তিনি আরও বলেন যে বিজেপি শিখ মাত্রেই খলিস্তানি, মুসলমান মাত্রেই পাকিস্তানি এবং বাঙালি মাত্রেই বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দিতে চায়। দিল্লিতে বহু পশ্চিমবঙ্গীয় বাঙালিকে এই কারণে অপদস্থও হতে হয়েছে। ‘আমাদের ভাষা যে এক সেটা আমাদের অপরাধ নয়। আমাদের তো অবিভক্ত বাংলা ছিল। এখন দুই বাংলা একই ভাষায় কথা বলে। কিন্তু কাউকে বাংলা বলতে শুনলেই বিজেপি ক্ষেপে যায়।’ এমনটাই অভিযোগ মমতার৷
নাগরিকত্ব সংশোধন আইন এবং আসামের নাগরিক পঞ্জির কায়দায় নাগরিকত্ব খতিয়ে দেখার প্রক্রিয়াকে বাঙালি বিতাড়নের চক্রান্ত এবং বাংলায় বিভাজন তৈরির প্রচেষ্টা হিসাবেই তিনি দেখছেন বলে জানান। একইসঙ্গে অবাঙালিদের প্রতি যে তাঁর কোনো বিরূপতা নেই সেকথাও জানাতে ভোলেননি মমতা। বলেন ‘আমরা হিন্দিভাষীদের ভালোবাসি। আমরা জৈন, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ সকলকেই ভালোবাসি। … আমরা সকলেই ভারতীয় এবং ভারতীয়দের মধ্যে কোনো ভেদাভেদে আমি বিশ্বাস করি না।’ রবীন্দ্রনাথ এবং কাজী নজরুলের গান, কবিতা থেকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ঐক্যসূচক বেশকিছু উদ্ধৃতিও তুলে ধরেন তিনি।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদ – দুটিকে একত্র করার প্রচেষ্টায় ২০১৯ থেকে ‘জয় হিন্দ’ এবং ‘বন্দে মাতরম’-এর পাশাপাশি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে শুরু করে তৃণমূল। সেই ‘জয় বাংলা’ স্লোগান, যা কিনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান হিসাবেই সমধিক পরিচিত।
১২ তারিখের জমায়েতে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ‘জয় হিন্দ’ ও ‘বন্দেমাতরম’-কে বহুগুণে ছাপিয়ে গিয়েছিল। মমতা বাঙালি মনীষীদের নাম নেন বক্তৃতার মাঝেমাঝেই। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বা ক্ষুদিরাম বসু থেকে শুরু করে লোকনাথ বাবা, অনুকূল ঠাকুর বা দলিত সম্প্রদায়ের মধ্যে জনপ্রিয় হরিচাঁদ ঠাকুর, পঞ্চানন বর্মা – কাউকেই বাদ রাখেননি।
নাম গোপন রাখার শর্তে তৃণমূলের এক লোকসভার সাংসদ জানান যে এদিনের বক্তৃতায় তাঁর দলের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। এই সদস্য জানান ‘বাঙালিদের এবং বাঙালি সংস্কৃতিকে বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের আক্রমণ থেকে বাঁচানোই আমাদের লক্ষ্য, কিন্তু কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি আমরা ঘৃণা পোষণ করি না। বাঙালি সংস্কৃতি সকলের অন্তর্ভুক্তি ও বহুত্ববাদের কথা বলে। তারই ছায়া আমাদের প্রার্থী তালিকাতেও। নির্বাচনী প্রচারের ক্ষেত্রেও আমরা এই নীতিতেই চলব।’
বাঙালি জাতিসত্তার রাজনীতির দিকে তৃণমূল ঝোঁকে ২০১৮ নাগাদ। রামনবমী বা হনুমান জয়ন্তীর মত উৎসবকে পশ্চিমবঙ্গে জনপ্রিয় করে তোলার মাধ্যমে সঙ্ঘ পরিবার এ রাজ্যের হিন্দুদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছে দেখেই তৃণমূলের এই প্রতিক্রিয়া। তার আগে, ২০১৬-১৭ থেকেই অবশ্য বাংলা পক্ষ জাতীয় সংগঠনের উদ্যোগে বাঙালি জাতিসত্তাভিত্তিক রাজনীতির ধারাটি উঠে আসছিল হিন্দি-হিন্দু আগ্রাসন প্রতিরোধের চেতনা নিয়ে। তৃণমূল অবশ্য হিন্দি বিরোধিতা করেনি কখনো, বরং হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছে।
বাঙালি জাতিসত্তার রাজনীতির ইতিহাস অন্তত দেড়শো বছরের। হিন্দু জাতীয়তাবাদ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদ – তিনটিরই জন্ম ব্রিটিশশাসিত ভারতের বাংলায় ১৮৬০ থেকে ১৮৮০ সালের মধ্যে। ১৯০৩-১১ বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে ৷ ১৯২০-র দশকে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ বাঙালি জাতীয়তাবাদকে আরও জনপ্রিয় করে তোলেন। তাঁর মতে, বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তা ছিল ধর্মীয় বিভেদের চেয়ে শক্তিশালী।
১৯২১ সালে দেশবন্ধু কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং বাঙালি জাতিসত্তার রাজনীতিকেই আঁকড়ে থাকার পরামর্শ দেন বাঙালিদের। বাংলার শৈব ও বৈষ্ণবরা যে দক্ষিণ ভারতের আদি শঙ্করাচার্য বা মাধবাচার্যের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন – তাও বুঝিয়ে বলেন। যদিও কোনো সম্প্রদায়, এমনকি ইউরোপিয়দের প্রতিও কোনো বিদ্বেষমূলক মনোভাব তিনি কখনোই ব্যক্ত করেননি।
আরো পড়ুন লড়াই ক্ষ্যাপা: লোরেটো, জাতীয় শিক্ষানীতি ও বাঙালির প্রতিরোধ
তা সত্ত্বেও চারের দশকে, বাঙালি জাতিসত্তার রাজনীতিকে হারিয়ে দেয় সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি, যার ফলস্বরূপ দেশভাগ তথা বাংলাভাগ। স্বাধীন ভারতের অন্তর্গত পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদ – দুইই গৌণ হয়ে পড়ে। রাজনীতি আবর্তিত হয় কংগ্রেস বনাম বাম প্রশ্নে, মুখ্য হয়ে ওঠে শ্রেণিসত্তা। সাম্প্রতিককালে সঙ্ঘ পরিবারের হিন্দু জাতীয়তাবাদকে ঠেকাতেই বাঙালি ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে পুনরুজ্জীবিত করেছে তৃণমূল।
এখানে লক্ষ করতে হবে যে মঙ্গলবারের সভায় নয়া হিন্দুত্ববাদ আমদানি করার জন্য বিজেপিকে দুষবার মাত্র কয়েকদিন আগেই মমতার সরকার কিন্তু রাজ্যে রামনবমী উপলক্ষে ছুটি ঘোষণা করেছে। স্বাধীনোত্তর বাংলায় এই প্রথম রামনবমীতে সরকারি ছুটি। রামরাজাতলার মত দু-একটা জায়গা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু এই উৎসবের তেমন চল ছিলো না কোনোদিনই। ২০১৭ সাল থেকে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের উদ্যোগেই বাংলার বিভিন্ন জায়গায় রামনবমী পালন করা হচ্ছে। মমতার সরকার একদিকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গেরুয়া শিবিরের রামনবমীর মিছিলের সমালোচনা করেছে, অন্যদিকে তৃণমূলের কিছু কিছু নেতা নিজেদের মত করে রামনবমীর আয়োজন করেছেন।
২২ জানুয়ারি রামমন্দিরের প্রাণপ্রতিষ্ঠার আমন্ত্রণ তৃণমূল প্রত্যাখ্যান করেছে। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি একে ঘৃণা, অত্যাচার এবং নিরাপরাধ মানুষের লাশের উপর তৈরি মন্দির বলেছেন। তবে মমতা বারবার স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে সমাজের কোনো অংশকেই তিনি বাদ দিয়ে চলতে চান না। একদিকে রামমন্দিরের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ অংশ এবং বিশেষ করে মুসলমানদের আশ্বস্ত করতে চেয়েছেন, অন্যদিকে রামনবমীর ছুটি ঘোষণা করে রামভক্তদেরও সংহতিসূচক বার্তা দিয়েছেন।
তৃণমূলের জনৈক মন্ত্রীর কথায় ‘এতে করে আমরা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছি যে রাম বা রামনবমীর বিরূদ্ধে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আমরা কেবল রামকে ঘিরে বিজেপির বিভাজনমূলক রাজনীতির বিপক্ষে।’ তাঁর মতে কোনো সম্প্রদায়ের বিরূদ্ধে অবস্থান নেওয়াই তৃণমূলের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ আসাম, মেঘালয় বা ত্রিপুরাতেও তৃণমূল রয়েছে এবং বাংলার বাইরে বিস্তারের স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দিতেও তারা ইচ্ছুক নয়।
আউটলুক পত্রিকায় প্রকাশিত মূল প্রতিবেদন থেকে লেখকের অনুমতিক্রমে ভাষান্তরিত। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








