আবগারি দুর্নীতি মামলায় শেষপর্যন্ত বৃহস্পতিবার রাতে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে গ্রেফতার করা হল। তার আগে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চেয়ে পর পর নবার ইডি সমন পাঠায় তাঁকে, কিন্তু প্রতিবারই তিনি হাজিরা এড়িয়ে যান। দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন জানান যে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যেন তাঁকে গ্রেফতার না করা হয়। হাইকোর্ট সেই আবেদন নামঞ্জুর করে পরের শুনানির দিন ধার্য করেন ২২ এপ্রিল, অর্থাৎ একমাস পর। ইতিমধ্যে ইডি তাঁকে গ্রেফতার করল।
আর কয়েকদিন পরেই লোকসভা নির্বাচন। কাজেই প্রশ্ন উঠছে, এর ফলে রাজনৈতিক লাভ কার হবে? কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা বিজেপির, নাকি বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের – যে জোটে আম আদমি পার্টির অধিনায়ক কেজরিওয়াল এক বিশিষ্ট নাম?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
বিরোধীপক্ষের অভিযোগ, ইডি, সিবিআই, আয়কর বিভাগ ইত্যাদির মত কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে নরেন্দ্র মোদীর সরকার তাদের পিছনে লাগিয়ে এই নির্বাচনের মরশুমে হয়রান করতে বদ্ধপরিকর। সাম্প্রতিককালে কেজরিওয়াল ছাড়া ঝাড়খণ্ডের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের গ্রেফতারি, আয়কর বিভাগ দ্বারা কংগ্রেসের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা এবং টাকা নিয়ে বাজেয়াপ্ত করা – এই উদাহরণগুলি বিরোধীরা তুলে ধরছেন। তাছাড়াও উঠে আসছে পশ্চিমবঙ্গে অভিষেক ব্যানার্জি, বিহারে লালুপ্রসাদ ও তাঁর পরিবারকে হয়রান করার কথা। বলা হচ্ছে, কেন্দ্রের সরকার জোর করে স্তব্ধ করে দিতে চায় সব প্রতিবাদ, প্রতিরোধ; বিশেষ করে যাদের কণ্ঠে জোর বেশি।
কিন্তু কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে রাজনৈতিক মুনাফা তুলতে ব্যবহার করার অভিযোগ নতুন নয়। প্রায় দু বছর আগে দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস আদালতের নথি, এজেন্সির বিবৃতি এবং গত ১৮ বছর ধরে নথিভুক্ত গ্রেফতার, অভিযান বা জিজ্ঞাসাবাদের রিপোর্ট খতিয়ে দেখে জানায়, এই সময়কালে প্রায় ১৪৭ জন বড় নেতার বিরুদ্ধে তদন্ত করেছে সিবিআই। তার মধ্যে ৮৫ শতাংশেরও বেশি বিরোধী শিবিরের।
আবার এই সময়কালে কংগ্রেস ও বিজেপি সরকার কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকাকালীন সিবিআই যে ২০০ জন রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে, গ্রেফতার করেছে, তল্লাশি চালিয়েছে বা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, তাঁদের ৮০ শতাংশই নাকি বিরোধী দলের। তবে ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২২ তারিখের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইডির কেসবুক ঘেঁটে দেখা গেছে যে ২০১৪ সালে নতুন এনডিএ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিরোধী নেতাদের এবং তাঁদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের বিরুদ্ধে তদন্তের সংখ্যা কিছু বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ১২১ জন বিশিষ্ট নেতা ইডির তদন্তের আওতায় আসেন, যাঁদের মধ্যে ১১৫ জনই বিরোধী দলের। এই নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়, অভিযান চালানো হয়, জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বা গ্রেফতার করা হয়। অর্থাৎ বিরোধীদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা এখানে ৯৫%।
২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ ইউপিএ জমানায়, সিবিআইয়ের কেসবুকে মোট ২৬ জন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে তদন্তের ঘটনা পাওয়া যায়। তার ১৪ জন বিরোধী দলের, অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি।
২০১৪ সাল থেকে ইডির জালে বিরোধী নেতা
কংগ্রেস – ২৪, তৃণমূল – ১৯, এনসিপি – ১১, শিবসেনা – ০৮, ডিএমকে – ০৬, বিজেডি – ০৬, আরজেডি – ০৫, বিএসপি – ০৫, এসপি – ০৫, টিডিপি – ০৫, আআপ – ০৩, আইএনএলডি – ০৩, ওয়াইএসআরসিপি – ০৩, সিপিএম – ০২, এনসি – ০২, পিডিপি – ০২, নির্দল – ০২, এআইএডিএমকে – ০১, এমএনএস – ০১, এসবিএসপি – ০১, টিআরএস (অধুনা বিআরএস) – ০১
তথ্যসূত্র: দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ওই প্রতিবেদনের পরে ইডির হাতে গ্রেফতার হলেন কেজরিওয়াল। তার আগে গতবছর একই মামলায় দিল্লির তৎকালীন উপমুখ্যমন্ত্রী মণীশ সিসোদিয়া, পরে ওই দলেরই সঞ্জয় সিং আর এমাসে ভারত রাষ্ট্র সমিতির নেতা এবং তেলেঙ্গানার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের মেয়ে কে কবিতাকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। এই তালিকায় আছেন জেএমএম নেতা হেমন্তও, যাঁকে জানুয়ারি মাসে অন্য এক মামলায় গ্রেফতার করা হয়।
আরো পড়ুন হেমন্তের হাওয়ায় ভরসা পেতে পারেন বিজেপিবিরোধী মুখ্যমন্ত্রীরা
সিবিআই হেফাজতে থাকাকালীনই সিসোদিয়া মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন, তাঁর সহকর্মী সত্যেন্দ্র জৈন – যিনি আর্থিক কেলেঙ্কারির মামলায় ইডির হাতে গ্রেফতার হয়ে প্রায় একবছর হল কারাগারে আছেন – তিনিও পদত্যাগ করেছেন। সোরেনের কথা আগেই বলা হল। এমতাবস্থায় কেজরিওয়াল কি হেফাজতে থাকালীন সরকার আর দল দুটোই চালাতে থাকবেন? জামিন না পেলে এমনটা করা হয়ত তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না। প্রশাসন চালাতে যেমন প্রতি মুহূর্তে সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়, তেমনি দরকার অতি সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর খোঁজখবর রাখা বা দরকারে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। তা কি হেফাজতে থাকাকালীন করা সম্ভব? আম আদমি পার্টিতে কেজরিওয়াল ছাড়া অতখানি দায়িত্ব নেওয়ার মত নেতা কিন্তু এখুনি দেখা যাচ্ছে না।
সেক্ষেত্রে সরকার চালাতে অসুবিধে দেখা দিতেই পারে। অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে দিল্লির পরিস্থিতি কিন্তু আলাদা। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৩৯এএ অনুযায়ী দিল্লিকে বিশেষ স্থান দেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী উপরাজ্যপাল এই অনুচ্ছেদের কার্যকারিতা স্থগিত রাখার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন জানাতে পারেন। সেক্ষেত্রে তিনি রাষ্ট্রপতিকে জানাতে পারেন যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে জাতীয় রাজধানীর প্রশাসন ২৩৯এএ অনুচ্ছেদ অনুসারে চালানো যাবে না। বলতে পারেন যে জাতীয় রাজধানী অঞ্চলের প্রশাসন যথাযথভাবে চালানোর জন্য এটা করা প্রয়োজনীয় এবং সমীচীন। কাজেই চালকের আসনে কাউকে তো বসাতেই হবে। যদিও দিল্লি বিধানসভার মেয়াদ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত, রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলে কেন্দ্রীয় সরকার দিল্লির নিয়ন্ত্রণ হাতে তুলে নিতে পারে।
আবার দলের এমন সময়, যখন আহ্বায়ক ইডির হেফাজতে আর লোকসভা নির্বাচন আসন্ন, দিল্লি আর পাঞ্জাবে কিছু আসন পাওয়ার আশা আছে আর বিরোধী জোটের অন্যতম মুখ হিসাবে তাঁকে গণ্য করা হচ্ছে, সেখানে কি দিল্লি সরকার খোয়ানোর মত কাজ করতে পারেন কেজরিওয়ালের মতো পোড়খাওয়া নেতা?
তাঁর রাজনীতিতে পা রাখাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে। দেশের ভোটারদের নিজেকে আর দলকে স্বচ্ছ দেখানোই তাঁর কাছে জরুরি। তাই কোনো চমক আশা করা যেতেই পারে। রাজনৈতিক চমক দিতে তিনি বরাবরই পারদর্শী।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







