বিরাট বড় এক জেলের মধ্যে এক নোংরা সেল। একা একজন মানুষের পক্ষে সেই সেলে দিন কাটানো দুঃসহ অভিজ্ঞতা। সেখানেই দিনরাত এক করে পড়াশোনা করে চলেছেন এক সুদর্শন যুবক। পাঞ্জাব সহ ব্রিটিশ ভারতের গ্রামে গ্রামে মানুষের মনে একটিমাত্র আকুতি – এই যুবকটি যেন কোনোরকমে প্রাণে বেঁচে যায়। অথচ যুবকটি ও তার সহযোগীরা ততদিনে মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত। দেশ থেকে স্বৈরাচারী ব্রিটিশ শাসক আর পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করার ডাক দিয়ে মাটির টানে প্রাণের আহুতি দিতে তৈরি। বাবা-মা, ভাইবোন, দেশের প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ – কারোর কথাই তাঁদের টলাতে অক্ষম। তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস – এই আত্মত্যাগ সারা দেশের যুবক-যুবতীর ঘুম ভাঙাবে, উদ্বুদ্ধ করবে অত্যাচারের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম সংগঠিত করতে। এই অঙ্গীকার সেই যুবক ভগৎ সিংকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়, ‘আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে আমরা এক চলমান আন্দোলনের অংশ। নিজেদের লক্ষ্যের প্রতি সবসময় স্থির থাকতে হবে। তাহলেই আমরা নিজেদের সাফল্য ও ব্যর্থতার সঠিক মূল্যায়ন করতে পারব, আর ভবিষ্যতের কর্মসূচি রূপায়ণ করতে পারব।” মৃত্যুর তিন সপ্তাহ আগে রাজনৈতিক কর্মীদের প্রতি তাঁর এই ছিল আহ্বান।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আজকের দিনে তাঁর দেশে বৈষম্য তাঁর সময়ের চেয়েও বেশি। ধর্ম, জাত, লিঙ্গ, ভাষার ভিত্তিতে বিভাজন বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃহৎ পুঁজির সঙ্গে রাজনৈতিক শাসকের আঁতাত জলের মত পরিষ্কার। বিশ্বব্যাপী ফ্যাসিবাদের আগ্রাসনের মাঝে হতাশ, নিরুদ্যম হয়ে পড়া খুব অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আজও অন্ধকারে আলোর সন্ধান নিয়ে আসেন লাহোর জেলের সেই ২৩ বছর বয়সী শহিদ-এ-আজম ভগৎ। তাঁর টু ইয়াং পলিটিকাল ওয়ার্কার্স রচনায় নিহিত আছে মুক্তির দিশা।
ভগৎ সিং ভারতের গোড়ার দিককার মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের অন্যতম। লেনিনের জীবনাদর্শ তাঁর পাথেয় ছিল। তাঁর বহু লেখায় লেনিনের কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠন, পুঁজিবাদ, ও সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে ভাবনার প্রত্যক্ষ ছাপ স্পষ্ট। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। বরং এখানে ভগৎ সিং লেনিন প্রদর্শিত পথে তখনকার ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতির চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। তিনি লেখেন, ‘পরিস্থিতির বিশ্লেষণে আমাদের সবসময় বস্তুনিষ্ঠ আর সৎ হতে হবে।’ কংগ্রেসের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের গোলটেবিল বৈঠকের পর কোনোরকম রাখঢাক না করেই ভগৎ লেখেন যে আইন অমান্য কর্মসূচির উপসংহার ঘোষিত হবে আপসের মাধ্যমে। তা নিয়ে অবশ্য তাঁর সমস্যা ছিল না। অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের মত তিনি বুঝেছিলেন, শাসকের সঙ্গে সাময়িক আপস হল সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু তা বৃহত্তর লড়াইয়ের এক স্তর মাত্র। সমাজের সমস্ত অংশের মানুষকে সংগঠিত করে রাজনৈতিক লড়াইয়ে নামলে তবেই শাসককে উৎখাত করা সম্ভব।
আরো পড়ুন মওলানা ভাসানী: জনগণের পবিত্র হিংসার প্রফেট
জনগণের মাঝে সাংগঠনিক কাজকে ভগৎ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন। শ্রমিক-কৃষকের ঐক্য সংগঠিত করতে একটি বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্ব যে অপরিসীম, সে সম্পর্কে তাঁর কোনো দ্বিধা ছিল না। মনে করতেন সেই সংগঠনের কর্মীদের কড়া অনুশাসন মেনে চলা প্রয়োজন। শুরুতে গরীব খেটে খাওয়া মানুষকে নিয়ে ছোট ছোট অর্থনৈতিক দাবি নিয়ে আন্দোলন করে, পরবর্তীকালে সেগুলিকে রাজনৈতিক সংগ্রামে উন্নত করার যে চিরন্তন মার্কসবাদী তত্ত্ব সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিকে অনুপ্রাণিত করেছে, তা ভগতের কাছেও সমান প্রাসঙ্গিক। সমস্ত সুযোগের সদ্ব্যবহার, প্রোপাগান্ডা, দেশব্যাপী পার্টি প্রকাশনা ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন, কৃষক মজুর ইউনিয়নকে শ্রেণি সংগ্রামে অগ্রণী করে তোলার দায়িত্ব পার্টির। তার চালিকাশক্তি হিসাবে যুব আন্দোলনকে চিহ্নিত করেছেন তিনি। কারণ যুবসমাজের অফুরান সৃষ্টিশীলতা একটি বিপ্লবী পার্টির মূলধন। তাই এই লেখা তাদের উদ্দেশেই।
ভগৎকে ব্রিটিশ সরকার জঙ্গি বলে সম্বোধন করত। তিনি বারবার এই তকমাটিকে অগ্রাহ্য করেছেন এই লেখায়। কারণ তিনি একজন বিপ্লবী, যার নির্দিষ্ট সাংগঠনিক কর্মসূচি রয়েছে। ভগৎ লেখেন ‘আমি বলছি না যে বোমা বন্দুক অকাজের জিনিস। বরং উল্টো। কিন্তু, অন্ধের মত খালি বোমা নিক্ষেপ অনেক ক্ষতি ডেকে আনে।’ তাঁর মতে, কমিউনিস্ট পার্টির সশস্ত্র বিভাগ থাকা অবশ্যপ্রয়োজন। সেই বিভাগের কাজ করবে পার্টির রাজনৈতিক কাজের পরিপূরক, তা থেকে স্বতন্ত্র নয়। কোনরকম হঠকারিতার বিপক্ষে তাঁর অবস্থান।
যাঁর নিজের জীবন ধৈর্য ও নিষ্ঠার মূর্ত প্রতীক, তাঁর জন্য বিপ্লবী রাজনীতির পূর্বশর্তও এই দুই বৈশিষ্ট্য। তাঁর এই উদ্ধৃতি থেকেই তাঁর ভাবনা স্পষ্ট হবে – ‘এই সংগ্রাম শেষ হয়ে যাওয়ায় সবচাইতে নিষ্ঠাবান বিপ্লবীর মনেও বিরক্তি আসবে। কিন্তু তোমাদের কোনো ভয় নেই। সমস্তরকম আবেগঘন কল্পনাকে দূরে রাখো, সঠিক তথ্যকে আপন করে নাও। বিপ্লব সংগঠিত করা খুব কঠিন কাজ। কোনো এক ব্যক্তির পক্ষে বিপ্লব করা সম্ভব নয়। কোনো নির্দিষ্ট তারিখেও বিপ্লব করা সম্ভব নয়। কিছু বিশেষ অবস্থা বৈপ্লবিক পরিস্থিতির জন্ম দেয়। একটি পার্টির কাজ এই পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়া। মানুষকে বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করা ভীষণ কঠিন। তার জন্য বিপ্লবীদের অনেক আত্মত্যাগ স্বীকার করতে হবে।’ তাঁর কর্মসূচি রূপায়িত হতেই কুড়ি বছর সময় লাগবে – একথা বলে তিনি বিপ্লবীদের নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে সততা বজায় রাখতে বলেছেন। তাঁর মতে, গান্ধীর এক বছরে স্বরাজের মত আকাশকুসুম স্বপ্ন না দেখে নিরন্তর কাজ করে যাওয়াই কমিউনিস্টদের উচিত।
আগামী প্রজন্মের জন্য বিপ্লবের লক্ষ্য তিনি স্থির করে দিচ্ছেন এই লেখায় – সমাজের সমাজতান্ত্রিক পুনর্নির্মাণ। তাঁর কাছে মার্কসবাদই গণমুক্তির একমাত্র পথ। অন্য অনেক বামপন্থীর মত ভাববাদী হাওয়ায় গা না ভাসিয়ে তিনি বিপ্লবের এক অনুপুঙ্খ রূপরেখা তৈরি করেন। এক শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন বাস্তবে রূপান্তরিত করার নীল নকশা হয়ে ওঠে এই লেখা। ভগৎ বারবার আমাদের মনে করিয়ে দেন যে বিপ্লব একটি মুহূর্ত নয়, বছরের পর বছর ধরে চলমান সংগ্রাম। তাই নিষ্ঠা ভরে মানুষের মাঝে কাজ করে যাওয়াই উচ্চতম বৈপ্লবিক কাজ।
শেষ করি এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে। গতবছর ভগতের ভাইপো, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্তা শেওনান সিংয়ের সান্নিধ্য লাভ করি। খুব ভাল মানুষ, অনেকক্ষণ গল্প করলেন। বহু কথার মাঝে তাঁকে আমি জিজ্ঞেস করি, ‘ভয়কে জয় করা কী করে সম্ভব?’ উত্তরে তিনি বলেন, ‘ভগৎ সিং তাঁর ক্ষুদ্র জীবনে যত বই পড়েছেন, আমি আমার ৭২ বছরের জীবনে তা পড়তে পারিনি। ভয় সবার লাগে, খুব স্বাভাবিক। কিন্তু ভগৎ সিং ভয়কে জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন তাঁর মতাদর্শ, চর্চা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে।’ মনে গেঁথে রয়েছে তাঁর কথাগুলি। উল্লিখিত রচনায় এই ভাবধারা ফুটে ওঠে ছত্রে ছত্রে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








“তরুণ রাজনৈতিক কর্মীদের প্রতি” সম্পূর্ণ লেখাটি marxists.org-তে নেই, shahidbhagatsingh.org-তে আছে। নয়া দিশা পত্রিকা গোষ্ঠী সাম্প্রতিককালে এই সম্পূর্ণ লেখাটির একটি বাংলা অনুবাদ করেছে।