দেবজিৎ ভট্টাচার্য

শিশুদের মুখে যখন কথা ফোটে, তখন তারা যা শোনে তাই বলে। আরেকটু বয়স বাড়ার পর হামাগুড়ি দেওয়া শুরু করলে যা দেখে তাই অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এই জন্য মনোবিজ্ঞানীরা অনেক সময় পরামর্শ দেন, শিশুর সামনে ভাষা সংযত রাখার, তাকে স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বড় করার। কারণ শিশুরা শৈশবে যা দেখে এবং শোনে, অবোধের মত তাই বলে নির্বিচারে।

সেদিক থেকে দেখলে সাংবাদিকের কর্তব্য শিশুর মত থাকা, অর্থাৎ সমাজে তথা রাষ্ট্রে যা দেখছেন এবং শুনছেন সেটাই বিবৃত করা। সংবাদ সেটাই যা সত্যনিষ্ঠ, তথ্য দ্বারা প্রমাণিত। সাংবাদিকতা মানে হল সকলের চোখের আড়ালে থাকা ঘটনাগুলোকে খুঁজে বের করে প্রকাশ্যে আনা, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা। তবেই গণতন্ত্র ছড়িয়ে পড়ে, জনগণের গণতান্ত্রিক চেতনার উন্নতি হয়, স্বাস্থ্যকর গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হয়। ফলে কোনো দেশে সাংবাদিকতার অবস্থা কেমন তা দিয়ে সেই দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যের অবস্থা বোঝা যায়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশ ভারত সাংবাদিকতার পক্ষে বিপজ্জনক। তাদের বার্ষিক রিপোর্টগুলোতে একথা জানিয়েছে সারা পৃথিবীর সংবাদমাধ্যমের তদারকি সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স। সাম্প্রতিক রিপোর্টে গভীরভাবে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে ভারতের সংবাদমাধ্যমের অবস্থা নিয়ে। লেখা হয়েছে ‘India’s media has fallen into an “unofficial state of emergency” since Narendra Modi came to power in 2014 and engineered a spectacular rapprochement between his party, the BJP, and the big families dominating the media.’ অর্থাৎ ভারতের সংবাদমাধ্যম ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকে অঘোষিত জরুরি অবস্থার মধ্যে দিয়ে চলেছে। এই অবস্থা তৈরি হয়েছে মোদীর পার্টি বিজেপি এবং সংবাদমাধ্যমে একাধিপত্য বিস্তার করা পরিবারগুলোর আঁতাতের ফলে।

আরও অনেক রিপোর্টই বলছে, ভারতের মূলধারার অনেকগুলো সংবাদমাধ্যম সরাসরি অতি ধনী ব্যবসাদার এবং সরকারগুলোর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত, তাদের রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার প্রচার ও প্রসারে ব্যস্ত। সেই তালিকায় অর্ণব গোস্বামী, অঞ্জনা ওম কাশ্যপ, সুধীর চৌধুরী প্রমুখ সাংবাদিক ও তাঁদের সংবাদমাধ্যমগুলো রয়েছে। এই সাংবাদিকদের বার্ষিক গড়ে আয় ৮-১০ কোটি। ফলে সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ১৮০ দেশের মধ্যে ভারতের স্থান হয়েছে ১৫১ (যা ২০১৬ সালে ছিল ১৩৩)। অবশ্য ২০২৪ সালে ভারত ১৫৯ নম্বরে ছিল।

দেশের সাংবাদিকতার দুঃসময়ে সাংবাদিকরাও আড়াআড়িভাবে ভাগ হয়ে গিয়েছেন। একদিকে আছেন গোদি মিডিয়ার উপরে উল্লিখিত সাংবাদিকরা, অন্যদিকে যাঁরা সরকার ও অতি ধনী শ্রেণির কাছের লোক হতে পারেননি। তাঁরা অনেকেই কাজের জায়গা হারিয়েছেন। যেমন ববি ঘোষ (হিন্দুস্তান টাইমসের প্রধান সম্পাদক ছিলেন), পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা (ইপিডব্লিউ সম্পাদক ছিলেন), হরিশ খারে (দ্য ট্রিবিউনের প্রবীণ সাংবাদিক), রবীশ কুমার (এনডিটিভি), পুণ্যপ্রসূন বাজপেয়ী (এবিপি নিউজ) প্রমুখ। এঁদের পাশাপাশি সাগরিকা ঘোষ (অধুনা সাংবাদিকতা ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেস থেকে রাজ্যসভার সাংসদ), রানা আয়ুবের মত আরও অনেক বিশিষ্ট সাংবাদিক, মন্ত্রী ও অতি ধনীদের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতা ও সোশাল মিডিয়া ট্রোলদের হাতে ধারাবাহিকভাবে হেনস্থার শিকার হয়েছেন। সরকারকে প্রশ্ন করা, রাজনৈতিক দলগুলোকে এবং তাদের নেতাদের কুকীর্তি ফাঁস করে দেওয়ার কারণে ছত্তিসগড়ের সাংবাদিক মুকেশ চন্দ্রকরের মত অনেককে প্রাণও হারাতে হয়েছে। আবার সিদ্দিক কাপ্পানের মত অনেকে বিনা অপরাধে হাজতবাসও করেছেন। কাশ্মীরের সাংবাদিকদের কারাবাস তো নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মাস দুয়েক আগে কেরলের এক স্বাধীন সাংবাদিক রেজাজ এম শিবা সিদ্দিককে মহারাষ্ট্র পুলিসের সন্ত্রাসবাদবিরোধী স্কোয়াড গ্রেফতার করে। তাঁকে কী অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে, সে সম্পর্কে পুলিসের বয়ান ক্রমাগত বদলাতে থাকে। প্রথমে বলা হয়েছিল, তিনি সোশাল মিডিয়ায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরোধী এবং দেশবিরোধী পোস্ট করছিলেন। পরে জোড়া হয় মাওবাদীদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ। তারপর আবার এয়ার গান হাতে ইনস্টাগ্রামে ছবি পোস্ট করা অপরাধ বলা হয়। ২০২২ সালে একইভাবে মাওবাদীদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে কালা আইন ইউএপিএতে ঝাড়খণ্ডের সাংবাদিক রূপেশ কুমার সিংকে গ্রেফতার করা হয়। এবছর এপ্রিল মাসে বহু সাংবাদিক, আইনজীবী এবং সমাজকর্মী তাঁর মুক্তির আবেদন জানান সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্নার কাছে। কিন্তু রূপেশ এখনো কারান্তরালে।

উত্তরপ্রদেশের সাংবাদিক কাপ্পান গ্রেফতার হয়েছিলেন হাথরাসে ধর্ষিত এবং খুন হওয়া দলিত মেয়েটার খবর করতে যাওয়ার পথে, যে প্রতিবেদন তিনি আদৌ লেখেননি তারই জন্যে। অভিযোগ করা হয়েছিল, তিনি নাকি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় উস্কানি দিতে যাচ্ছিলেন। তাঁকে দুবছরের বেশি সময় হাজতবাস করতে হয়।

রিপোর্টার্স উইদাউট ফ্রন্টিয়ার্স সংস্থা কাশ্মীরকে ‘খবরের কৃষ্ণগহ্বর’ বলেছে। ফরাসি সাংবাদিক ভ্যানেসা দুনিয়াককে ফ্রান্সে ফিরে যেতে বাধ্য করা এবং বিদেশের সাংবাদিকদের ভারতে রিপোর্ট করতে আসার ব্যাপারে একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করা নিয়েও এই সংস্থা প্রশ্ন তুলেছে। ভারতে ২০১৫-২০১৭ সালের মধ্যে নজন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। ত্রিপুরার সুদীপ দত্ত ভৌমিক ও শান্তনু ভৌমিক, উত্তরপ্রদেশের নবীন গুপ্তা এবং কর্ণাটকের গৌরী লঙ্কেশ ২০১৭ সালে খুন হয়েছেন। আরও তিন জন সাংবাদিক খুন হন ২০১৮ সালে। আসলে সাংবাদিকদের বন্দি এবং হত্যা করার মানে হল, সরকারগুলি ও অতি ধনীদের বাঁধনে গোটা দেশকে কারাগারে পরিণত করার চেষ্টা এবং জনগণের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নষ্ট করার স্পৃহা।

এখন দেশের সবথেকে খারাপ সময় চলছে বলে মতপ্রকাশ করেছেন বর্ষীয়ান সাংবাদিক এবং বিশিষ্ট কবি মৃদুল দাশগুপ্ত। তিনি গত ৩ মে ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে’ উপলক্ষে বঙ্গদর্শন ইনফরমেশন ডেস্ক বলে এক ওয়েবসাইটে বাংলার সাংবাদিকতার পরিবেশ নিয়েও দুঃখপ্রকাশ করেছেন। বলেছেন ‘জরুরি অবস্থাকালে এই ভারতীয় সাংবাদিকতাই আন্তর্জাতিক করতালি পেয়েছে। সেসময় কলকাতার সংবাদপত্রগুলিও সেন্সরশিপ সম্পর্কে প্রতিবাদ জ্ঞাপন করত প্রথম পৃষ্ঠার সিংহভাগ শূন্য অর্থাৎ সাদা রেখে। যদিও সে সময় অনেকগুলি বণিক সঙ্ঘ ইন্দিরাবিরোধী বা জরুরি অবস্থাবিরোধী ছিল। আমি ৪০ বছরের অধিক সময় ধরে সাংবাদিকতা করেছি, একাধিক সংবাদপত্রে। আমি সাহসী, স্বাধীনচেতা পূজনীয় অগ্রজদের দেখেছি। আবার আত্মসমর্পণকারী হাঁটু মুড়ে বসা মানুষজনও দেখেছি। সবিস্তারে বলার ক্ষেত্র এটি নয়। লিখব, কাগজ কোথায়? বাংলায় এই মুহূর্তে কোনও স্বাধীন প্রেস নেই। বামন দশা চলছে সাংবাদিকদের। খর্বকায়, নতমুখ, পরাধীন।’

আরো পড়ুন সাংবাদিকতাকে বন্দি করেছে বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ একদিকে যখন দেশের গরীব মানুষ এবং নিপীড়িত জনগোষ্ঠীগুলোর সবথেকে কঠিন অবস্থায় দিন কাটছে, তখন তাঁদের জীবনসংগ্রামের সত্য তুলে ধরার সাংবাদিকতার সংকটও দেখা দিয়েছে। নামী দামী দৈনিক কাগজের এক সিনিয়র সাংবাদিক বললেন, শিল্প সংক্রান্ত সমস্ত খবর প্রত্যেকটা সংবাদমাধ্যম মালিকপক্ষের ঘর থেকে তুলে আনে। তাই এখন খেটে খাওয়া মানুষের খবর জানার একমাত্র উপায় অনুসন্ধানমূলক ছোট পত্রিকা, কিছু ইউটিউব চ্যানেল আর ওয়েবজিন।

আসলে নয়ের দশক থেকে শুরু হওয়া নব্য উদারনৈতিক অর্থনীতির প্রভাবে এখন সবকিছুই অতি ধনীদের করতলগত হয়েছে, সংবাদমাধ্যমও বাদ পড়েনি। ফলে প্রকৃতির নিয়মেই অত্যাচারিত সাংবাদিকরা, গরিব মানুষ ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীগুলোর কাছাকাছি আসার চেষ্টা করছেন। হয়তো একসময় অনেকেই সরাসরি তাঁদের সংগ্রামের পক্ষ নিতেও বাধ্য হবেন। ছোট পত্রিকা (লিটল ম্যাগাজিন), স্বাধীন সাংবাদিকতা, ইউটিউব চ্যানেল, ওয়েবজিনগুলোর উপর ভর করে অনেক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিকও নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে চাইছেন গোদি মিডিয়ার সাংবাদিকদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে। অতি সম্প্রতি এই দ্বন্দ্বের প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেখা গেল, বুক ফুলিয়ে উগ্র জাতীয়তাবাদ প্রচারকারী এক মহিলা সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কাশ্মীর টাইমসের সম্পাদক অনুরাধা ভাসিনের পক্ষ নিয়ে সাউথ এশিয়ান উইমেন ইন মিডিয়ার বিবৃতিতে। সেখানে বলা হয়েছে সাংবাদিকদের অধিকার এবং কর্তব্য হল যারা উচ্চপদে আসীন তাদের প্রশ্নের মুখে ফেলা। এই সময়ে দাঁড়িয়ে এই বিবৃতি বড় পাওনা।

নিবন্ধকার গবেষণামূলক শ্রমিক পত্রিকা ‘বিবাদী’-র সঙ্গে যুক্ত। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.