তারা আসগর
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পালাবদলের সময়গুলো প্রায়ই যুগপৎ আশা ও নিরাশা নিয়ে আসে। একদিকে থাকে সংস্কারের নতুন ভাষা, অন্যদিকে থেকে যায় চেনা নীরবতা। সংস্কার, গণতন্ত্র, অংশগ্রহণ, অন্তর্ভুক্তি – এই শব্দগুলো আন্দোলনের সময়ে প্রবলভাবে উচ্চারিত হয়। কিন্তু রাষ্ট্র যখন তার উন্নয়ন বা সংস্কারের কাঠামো সাজায়, তখন এই ভাষাগুলো হঠাৎ করে থেমে যায়, ঝাপসা হয়ে যায়। ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের পর যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল, তা প্রথমে এক ধরনের আশা জাগিয়েছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন, এবার হয়ত নতুন কণ্ঠ উঠে আসবে। এমন কণ্ঠ যাদের এতদিন রাষ্ট্র শুধু অগ্রাহ্য করেছে, কখনোই স্বীকৃতি দেয়নি। সেইসব ট্রান্স, কুইয়ার, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী কিংবা জাতিগতভাবে প্রান্তিক মানুষদের জন্য হয়ত এবার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিতরে একটা নিরাপদ জায়গা তৈরি হবে।
কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে, তত স্পষ্ট হচ্ছে যে পরিবর্তনের ভাষা নিয়ে চর্চা থাকলেও কাঠামো পুনর্গঠনের পদ্ধতি সেই পুরনোই রয়ে গেছে। নতুন মুখ এসেছে বটে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা, নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা, রাষ্ট্রের ভাবনাকাঠামো এখনো খুব চেনা। সেখানে এক ধরনের নির্দিষ্ট পরিচয়ের বাইরে খুব বেশি ভাববার বা কথা বলার জায়গা নেই। এই লেখাটি সেই রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক কাঠামোর মধ্যেকার নীরবতাকে খতিয়ে দেখার চেষ্টা। কেবল একজন বিশ্লেষকের নয়, বরং একজন উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নাগরিকের দৃষ্টিতে। আমি বুঝতে চাই কীভাবে ‘অন্তর্ভুক্তি’ ও ‘বহুত্ববাদ’ শব্দগুলো প্রায়শই সংস্কার প্রস্তাবে এবং সামাজিক পরিসরে উচ্চারিত হলেও, সেগুলো এক পর্যায়ে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে কোনো দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব না রেখেই।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
পরিবর্তনের ভাষা আর প্রতীকের টানাপোড়েন
বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা দেখেছি, প্রত্যেক রাজনৈতিক আন্দোলনের পরে কিছু নতুন শব্দ বা শব্দবন্ধ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। নব্বইয়ের দশকে ‘গণতন্ত্র’ ছিল সেইরকম একটা শব্দ, যা একসময় প্রায় রাষ্ট্রীয় আদর্শ হয়ে উঠেছিল। ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলনে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’, ‘বিচার’, ‘জাতীয়তা’ নিয়ে আবারও নতুন আলোচনার জন্ম হয়। ২০২৪ সালের ছাত্র ও নাগরিক আন্দোলনের পর আমরা দেখতে পেলাম, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’, ‘নতুন নেতৃত্ব’, ‘নতুন প্রজন্মের রাজনীতি’, ‘রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কার’ – এই কথাগুলো সামনে এল। প্রথমদিকে এই ভাষা আশাব্যঞ্জক ছিল। একঝাঁক তরুণ নেতৃত্ব, বিদ্যায়তনিক বা সংস্কৃতি জগতের মানুষের সম্পৃক্ততায় প্রতিশ্রুতি ছিল এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার। সরকারের কাঠামোয় এমন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা আসছিলেন, যাঁরা অনেকে আগে কখনো সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। এই প্রবেশ নতুন চিন্তার পথ খুলে দিতে পারত।
কিন্তু এইসব ভাষা বা শব্দ বাস্তবে রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কারে কতটা জায়গা করে নিল? প্রথমদিকে আমরা দেখি, কিছু তরুণ মুখ সামনে এসেছে, কিছু নারীকে রাজনৈতিক বক্তৃতার মঞ্চে দেখা গেছে। সংবাদমাধ্যমে বলা হচ্ছে, এ এক নতুন বাংলাদেশ, যেখানে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ফিরছে। কিন্তু শুরুর কিছু প্রতীকী পদক্ষেপ, কিছু নতুন ধারার শব্দ ব্যবহার – এইসব দেখে যতটা পরিবর্তনের আশা জেগেছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার বাস্তব প্রতিফলন ততটা স্পষ্ট হয়নি। বরং ধীরে ধীরে দেখা গেল, নেতৃত্বের কেন্দ্রে এখনো সেই পরিচিত গড়ন। পুরনো পরিচয়গুলোই আবার কেন্দ্রে জায়গা নিচ্ছে – সিসজেন্ডার, মুসলমান, বাঙালি পুরুষ নেতৃত্বে ফিরে আসছে। কিছু নারীর উপস্থিতি, কিছু সংখ্যালঘুর প্রতীকী জায়গা ছিল। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেন্দ্রে তাদের উপস্থিতি প্রায় নেই। এই ধারা নতুন নয়। আগেও আমরা দেখেছি, নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু বা আদিবাসীদের রাজনৈতিক উপস্থাপন হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তাদের বলা হয়নি ‘এসো, তুমি নীতিনির্ধারক হও।’ বরং বলা হয়েছে ‘থাকো, কিন্তু চুপচাপ। চাহিদা দেখাও, কিন্তু ঠিক যতটা আমরা চাই ততটাই।’ এতে তাদের ভূমিকা এক ধরনের আলংকারিক উপস্থিতিতে নেমে আসে।
এখানে প্রশ্ন ওঠে – পরিবর্তন কি কেবল ভাষার স্তরে আটকে যাচ্ছে? প্রতীকী অন্তর্ভুক্তি কি বাস্তব ক্ষমতা বণ্টনে অনুপস্থিত থাকছে? নারী, সংখ্যালঘু কিংবা লিঙ্গ বৈচিত্র্যের মানুষকে যেটুকু জায়গা দেওয়া হচ্ছে, তার বেশিরভাগটাই প্রতীকী। যেন আন্তর্জাতিক মহলকে দেখানোর জন্যই এই বৈচিত্র্য। আসল সিদ্ধান্তগ্রহণে তাদের কোনো ভূমিকা থাকছে না। বরং তাদের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রিত, প্যাকেজড এবং প্রাপ্য সম্মান ও নিরাপত্তা থেকে অনেক দূরে।
সংবিধান সংস্কারে ‘বহুত্ববাদ’ প্রত্যাখ্যান
২০২৫ সালের ২৭ মে সংবিধান সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। এই রিপোর্ট এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। কারণ এটা প্রকাশ করে রাষ্ট্র নিজের ভবিষ্যৎ কাঠামো কেমন তা দেখতে চায়। সেখানে ১৩ খানা মূল সংস্কারের প্রস্তাব ছিল, যার মধ্যে একটা ছিল ‘রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে বহুত্ববাদ’ অন্তর্ভুক্ত করা। বহুত্ববাদ মানে, রাষ্ট্র তার কাঠামোয় নানারকম পরিচয়কে – ধর্ম, ভাষা, জাতি, লিঙ্গ, যৌনতা – স্বীকৃতি দেবে। এর মানে রাষ্ট্রের নীতিগুলো আর একমাত্রিক হবে না, বরং বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা নিয়ে কাজ করবে। কিন্তু এই প্রস্তাব ছিল সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত এবং অবাক করা ব্যাপার হল, সব বড় রাজনৈতিক দল মিলে এই প্রস্তাব বাতিল করে। এ নিয়ে দলগুলো একমত হয়। এমনকি দলগুলোর মধ্যে যেসব বিষয়ে মতানৈক্য ছিল, যেমন জেলাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন, নির্বাচন কমিশন সংস্কার, পরিবর্তনকালীন ন্যায়বিচার – সেগুলো নিয়ে ভিন্নমত হলেও ‘বহুত্ববাদ’-এর প্রশ্নে সবাই একমত হল। এ কেবল নীতিগত প্রশ্ন নয়। বরং এ থেকে বোঝা যায়, রাষ্ট্র এখনো নিজের কাঠামোয় ভিন্নতাকে ধারণ করতে রাজি নয়। তারা মনে করে, বৈচিত্র্য থাকলে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বিপদ।
এই ভয় নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশের সংবিধান ১৯৭২ সালে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ নিয়ে লিখিত হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিসর ছোট হয়ে এসেছে। ১৯৭৭-৭৮ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত, সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে বারবার পশ্চাদপর অবস্থান, রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার সম্পর্কে নীরবতা – সবই আসলে একই কথা বলে। তা হল, রাষ্ট্র নির্দিষ্ট পরিচয় ছাড়া অন্যকিছু নিয়ে অস্বস্তি বোধ করে। এই অস্বস্তি বহুত্ববাদকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে রাখে। যেন ভিন্নতা মানেই সমস্যা, আর সমতা মানে সবাইকে এক ছাঁচে ফেলা। এই ঐক্য এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক আপোসেরও ইঙ্গিত দেয়। যেমন বৈচিত্র্য স্বীকার করলেই ক্ষমতার কাঠামোয় ভাঙন ধরতে পারে, নীতি প্রণয়ন প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে কিংবা ভোটভিত্তিক রাজনীতির ক্ষেত্রে ‘ঝুঁকি’ তৈরি হতে পারে – এই আশঙ্কা থেকেই হয়ত এমন সিদ্ধান্ত এসেছে।
তবে এর সামাজিক অভিঘাত আরও গভীর। যখন রাষ্ট্রীয় নীতিতে ভিন্নতাকে অস্বীকার করা হয়, তখন তা কেবল এক কাগুজে শব্দ বাদ দেওয়া নয়, বরং তা এক ধরনের পরিপ্রেক্ষিত সরিয়ে দেওয়া, যেখানে ট্রান্স, কুইয়ার, আদিবাসী, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাস্তব অভিজ্ঞতা আর রাষ্ট্রের সংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে কোনো সংযোগ থাকে না। এতে দুটো বিচ্ছিন্ন সত্তা সৃষ্টি হয়, যা আসলে রাষ্ট্র আর নাগরিকের মধ্যেকার এক নিরাপত্তাহীন সম্পর্কের বয়ান পরিবেশন করে আমাদের সামনে।
এখানে একটা প্রশ্ন উঠে আসে। যে দেশে এত ধরনের মানুষ বাস করে, যেখানে সংখ্যালঘু পরিচয়ের মানুষের সংখ্যা অনেক, সেখানে রাষ্ট্রীয় কাঠামো এতটা একরৈখিক ও একমাত্রিক হতে পারে কীভাবে? এ তো কেবল একটা প্রস্তাবনা বাতিল নয়, এক ধরনের রাষ্ট্রীয় ঘোষণাপত্র, যা বলছে এই রাষ্ট্র এখনো নির্দিষ্ট কিছু পরিচয়কেই নাগরিকতার মানদণ্ড হিসাবে মানে। তাহলে এই মনোভাব একটি মৌলিক প্রশ্ন ছুঁয়ে যায় – রাষ্ট্র কার জন্য? রাষ্ট্র কাকে নাগরিক বলে?
নিয়ন্ত্রিত অন্তর্ভুক্তি: কারা থাকতে পারে, কতটুকু থাকতে পারে
আমরা সম্প্রতি দেখেছি, এক তরুণ কুইয়ার অ্যাকটিভিস্ট, যিনি আগে আন্দোলনের সময়ে খুব সক্রিয় ছিলেন, তাঁকে একটা নতুন রাজনৈতিক দলের প্রাথমিক তালিকায় রাখা হয়েছিল। সোশাল মিডিয়ায় সেই খবর ছড়িয়ে পড়ার কয়েক দিনের মধ্যে তাঁর দৃশ্যমান যৌন পরিচয় নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে, তাঁর নাম সরিয়ে ফেলা হয় দলের ওয়েবসাইট থেকে। এই কাজের কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ভিতরের সূত্র বলছে, দলের কিছু সিনিয়র নেতা এই তরুণের প্রকাশ্য যৌন ও লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে অস্বস্তিতে ছিলেন।
অনেকে এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে ভাবতে পারেন। কিন্তু এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বলে দেয়, এটা কেবল এক ব্যক্তির অপসারণ নয়, বরং এক স্থায়ী রাজনৈতিক প্রবণতা। যেভাবে পরিচয়, রাজনৈতিক সুবিধা ও গ্রহণযোগ্যতার ধারণা মিলেমিশে একটা নীরব কাঠামো গড়ে তোলে, তা আমাদের ভাববার বিষয়। আমার পর্যবেক্ষণে, এই ধরনের ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির অপসারণ নয়, বরং একটা রাজনীতির সংকীর্ণতার উদাহরণ। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এখনো নেতৃত্ব মানে নির্দিষ্ট ধরনের কিছু মানুষ। তাদের পরিচয়, ভাষা ও আচরণ ‘স্বাভাবিক’ ও ‘গ্রহণযোগ্য’। যারা এই পরিসরের বাইরে, তাদের অংশগ্রহণ শর্তসাপেক্ষ। তাদের উপস্থিতিতে ততক্ষণ আপত্তি নেই, যতক্ষণ না তারা ‘অতিরিক্ত’ হয়ে উঠছে। এই ঘটনা আমাদের দেখিয়ে দেয় যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো এখনো মনে করে – নেতৃত্বে থাকার জন্য একজন মানুষের পরিচয় হতে হবে নির্দিষ্ট রকমের। পুরুষ বা জন্মগত নারী, ধর্মীয়ভাবে মুসলমান এবং বাঙালি। আর তার ভাষা, চালচলন, পোশাক বা ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি যেন ‘সাধারণ’ বা ‘গ্রহণযোগ্য’ হয়। এগুলোই যেন আসল যোগ্যতা। যারা এই ছাঁদের বাইরে, যারা একটু বেশি ‘ভিন্ন’, যেমন ট্রান্স, নন-বাইনারি বা উন্মুক্ত কুইয়ার পরিচয়ধারী, তাদের উপস্থিতি বরদাস্ত করা হবে না। খানিকটা জায়গা দিলেও ভাবখানা হল ‘তুমি থাকতে পারো, কিন্তু নিজের যৌন বা লিঙ্গ পরিচয় দেখাতে পারবে না।’ এই ধরনের অন্তর্ভুক্তিকে আমি বলি নিয়ন্ত্রিত অন্তর্ভুক্তি। এই অন্তর্ভুক্তি কেবল ছবি তোলার জন্য। যেন বলা ‘দেখো, আমরা বৈচিত্র্যকে স্বাগত জানাই।’ কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার আসল জায়গাগুলোতে ছবির মানুষগুলো থাকে না। এই অন্তর্ভুক্তি কোনো আদর্শগত দায় থেকে আসে না। বরং এ এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল, দল বা জোটের ভাবমূর্তি রক্ষা করার হিসাব। অর্থাৎ বৈচিত্র্যপূর্ণ মানুষকে রাখা যতক্ষণ সুবিধাজনক মনে করা হয়, ততক্ষণই তাদের রাখা হয়।
রাজনৈতিক নীরবতা এবং সামাজিক পরিসরের সংকোচন
এই প্রবণতা শুধু দলের ভিতরের সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, কিছু তরুণ ও পরিচিত রাজনৈতিক কর্মী, যাঁদের আমরা একসময় প্রগতিশীল বলে ভেবেছিলাম, তাঁরাই এখন সোশাল মিডিয়ায় কুইয়ার ও ট্রান্স মানুষদের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। তাঁদের বক্তব্যের ভাষা সরাসরি আক্রমণাত্মক না হলেও, তার মধ্যে আছে এক ধরনের কৌশলগত বিদ্বেষ। তাঁরা বলছেন এই পরিচয়গুলো আমাদের ‘সংস্কৃতির বিরুদ্ধে’, বা ‘ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে বেমানান।’ এভাবে তাঁরা কৌশলে একটা ভেদরেখা টেনে দেন – আমরা বনাম তারা। এই তারা হলো কুইয়ার বা ট্রান্স মানুষ, যাদের জীবন, ভালবাসা বা বিশ্বাস মূলধারার চেনা কাঠামোর বাইরে। এইসব বক্তব্য ধর্ম, সংস্কৃতি কিংবা জাতীয়তাবাদী ব্যাখ্যা – যারই আশ্রয় নিক, ফলাফল হয় একই। কুইয়ার, ট্রান্স, অথবা অ-ধর্মীয় পরিচয়ধারীরা দেশ বা সমাজের বাইরে অবস্থান করছে বলে বোঝানো হয়। ধর্মীয় ভাষা বা সাংস্কৃতিক ‘মূল্যবোধ’ তুলে ধরা এইসব বক্তব্য মূলত এক বহিষ্কারমূলক জাতীয়তাবাদের ধারক।
এইসব বক্তব্য রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক দলগুলো সরাসরি সমর্থন না করলেও, কেউ প্রতিবাদও করে না। কেউ স্পষ্ট করে বলে না যে এই ভাষা গ্রহণযোগ্য নয়। সমাজের এবং রাষ্ট্রের বড় পরিসরে এই নীরবতাই এক ধরনের সম্মতি। এতে বোঝা যায়, রাষ্ট্র এবং সমাজের কাছে এই বিদ্বেষের ভাষা সহনীয়। এই নীরব সম্মতিই সামাজিক অগ্রসরতার পরিসরকে সংকুচিত করে। যখন কোনো দলের প্রভাবশালী সদস্য বা নেতা কুইয়ারবিদ্বেষী কথা বলেন আর দল চুপ থাকে, তখন এক ধরনের বার্তা দেওয়া হয় যে, আমরা এ নিয়ে কিছু বলব না। তুমি চাইলে বলতেই পারো। বা আমরা একমত এই মন্তব্যের সঙ্গে। এই নীরবতা আরও ইঙ্গিত দেয় যে বহুত্ববাদ ধারণাগতভাবে অস্বস্তিকর এবং তা রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
কাঠামোর ভাষা যখন একমাত্রিক
রাষ্ট্র, রাজনীতি, আইন – এইসব কাঠামো সবসময় নির্দিষ্ট কিছু অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। সাধারণত মধ্যবিত্ত, সিসজেন্ডার, পুরুষ, সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রচিন্তা চলে। ট্রান্স বা কুইয়ার মানুষের অভিজ্ঞতা সেই কাঠামোয় জায়গা পায় না। তাদের রোজকার নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক বর্জন, নিজের পরিচয় টিকিয়ে রাখার লড়াই – এসব রাষ্ট্রের নীতিতে প্রতিফলিত হয় না। এ নিছক ভুল বা অবহেলা নয়। এটা কাঠামোগত সমস্যা, ভিন্নতাবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি, যা মনে করে – পরিচয় যত কম ভিন্ন হবে, রাষ্ট্র তত স্থির থাকবে। রাষ্ট্রের এই মানসিকতা রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ হতে পারে, কিন্তু সামাজিকভাবে খুবই বিপজ্জনক। যখন রাষ্ট্র স্থিতি বা শান্তি রক্ষার কথা বলে, তখন তা প্রায়ই ভিন্ন কণ্ঠকে চুপ করিয়ে দিয়ে। প্রশ্নকে ঠেকিয়ে রেখে। নতুন অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করে।
এই বাস্তবতায় ক্রমশ যে প্রশ্ন জরুরি হয়ে উঠছে, তা হল কেন রাজনৈতিক ভবিষ্যতের চিন্তায় ভিন্নতাকে ধারণ করা যাচ্ছে না? কেন ট্রান্স বা কুইয়ার সমাজের অভিজ্ঞতা, সংগঠন এবং নেতৃত্বের মডেলগুলোকে নীতি নির্মাণ বা সাংবিধানিক কাঠামোর অংশ হিসাবে ভাবা হচ্ছে না? যদি আমরা ক্ষমতার ভাষাকে বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখা যায়, রাষ্ট্র এখনো নিজেকে সমতা নয়, স্থিতির কাঠামোয় কল্পনা করে। সেই কাঠামোয় চ্যালেঞ্জ নয়, ঐক্য চাই। প্রশ্ন নয়, সমন্বয় চাই। কিন্তু এই সমন্বয়ের ধারণা অনেক সময় ভিন্নতাকে ধ্বংস করে।
ভবিষ্যতের ভাবনায় ভিন্নতা অনুপস্থিত হলে কী ঘটে?
আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব, যতবার রাষ্ট্র নিজের কাঠামোকে সংকীর্ণ করেছে ততবার সামাজিক বিপর্যয় ঘটেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি নিয়ে প্রতিশ্রুতি দিলেও তার বাস্তবায়ন না হওয়া, রোহিঙ্গাদের পরিচয়হীন করে রাখা বা এলজিবিটিকিউ+ অধিকার নিয়ে কোনো রাষ্ট্রীয় অবস্থান না থাকা – এইসব উদাহরণ এই কাঠামোগত সংকীর্ণতার চিহ্ন। অথচ বহু বছরের অভিজ্ঞতা বলে দেয়, ট্রান্স, কুইয়ার এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠী রাজনৈতিকভাবে কেবল দাবিদার নয়, বরং বিকল্প কাঠামোর ধারক। তারা যত্ন, পারস্পরিক নির্ভরতা এবং অসাম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ভিতর দিয়ে নেতৃত্ব ও সংগঠনের অন্যরকম মডেল তৈরি করে। এইসব ধারণা দিয়ে রাষ্ট্রকে ভিন্নভাবে ভাবতে শেখায়। কিন্তু যখন এই কণ্ঠগুলোকে প্রান্তে রাখা হয়, তখন রাষ্ট্র হারায় এক সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। একটা রাষ্ট্র, যা নিজেকে গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে, তা যদি বৈচিত্র্যকে ভয় পায়, তাহলে বুঝতে হবে সেটা আসলে একটা ভিন্নতাবিহীন উন্নয়নকেই তার লক্ষ্য মনে করে। যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা একমাত্রিক পরিচয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, তখন শুধু কিছু মানুষই নয়, পুরো রাষ্ট্রের সম্ভাবনাই সীমিত হয়ে পড়ে।
আরো পড়ুন ভারত বনাম ইন্ডিয়া: আমাদের সেই তাহার নামটি
একজন কুইয়ার কর্মীর নাম মুছে ফেলা, প্রস্তাবনা থেকে বহুত্ববাদ শব্দটা বাদ দেওয়া – এই ঘটনাগুলো আলাদাভাবে দেখলে সামান্য মনে হয়, কিন্তু এগুলো বড় রাজনৈতিক বাস্তবতারই অংশ। এই বাস্তবতায় প্রান্তিক পরিচয়ধারী মানুষদের জায়গা নেই। তারা অতিরিক্ত, তারা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’, তারা গ্রহণযোগ্য নয় এবং তাদের কোনো সাংবিধানিক সুরক্ষা নেই। যদি এই নতুন বাংলাদেশ সত্যিই কোনো পরিবর্তন করতে চায়, তাহলে প্রথম কাজ হবে ক্ষমতা কাঠামোর পুনর্গঠন। অন্তর্ভুক্তিকে শর্তহীন করতে হবে। বহুত্ববাদকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে জায়গা দিতে হবে।
এ কাজ কঠিন। তবু এটাই একমাত্র পথ। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নয়, প্রতিনিধিত্বের পথ। না হলে শূন্যতা আর নীরবতাই আবার জিতে যাবে। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ ফের হয়ে উঠবে শুধু অতীতের প্রতিধ্বনি।
নিবন্ধকার একজন বাংলাদেশি ট্রান্সজেন্ডার শিল্পী, লেখক ও শিক্ষক। বর্তমানে নিউইয়র্কের বাসিন্দা। দক্ষিণ এশীয় প্রান্তিক অভিজ্ঞতা, লিঙ্গ রাজনীতি ও অভিবাসনের ভাষা নিয়ে কাজ করছেন
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








