সৌম্যকান্তি ভট্টাচার্য
‘আমি যে রসিক তার প্রমাণ আমার রসোপলব্ধি। আমি যে রূপকার তার প্রমাণ আমার রূপোপলব্ধি। শিল্পীমাত্রেই একাধারে রসিক ও রূপকার… রূপসৃষ্টি থেকে মনে হতে পারে রূপ আপনাতে আপনি সম্পূর্ণ। কিন্তু তা নয়। রূপ হচ্ছে রসের পরিসমাপ্তি।’ অন্নদাশঙ্কর রায়ের এই অভিব্যক্তি পড়তে পড়তে যাঁদের নাম মনের মধ্যে ভিড় করে, চিত্রগ্রাহকদের মধ্যে সেবাস্তিয়াও সালগাদো তাঁদেরই একজন। একাধারে রসিক ও রূপকার, পরিব্রাজকের মত হাতে ক্যামেরা নিয়ে বিশ্বভ্রমণ করা এই মানুষটিকে নিয়ে কিঞ্চিৎ কথা হয় মাঝেমধ্যে, তাও খুবই সীমিত গণ্ডির মধ্যে। যেখানে আলোচনা হয়, সেখানেও তাঁর কাজের চমকপ্রদ শৈলী নিয়েই কথা হয় বেশি। অনেকসময় তাঁরই ছবির গুণে কিছু অনুভূতির টুকরো কথা ভেসে ওঠে। কিন্তু তাঁর কাজ ও জীবন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা দুর্লভ। একাশি বছর বয়সেও কর্মঠ এই মানুষটি যখন গত ২৩ মে প্রয়াত হলেন, সে খবর দেখে আমাদের অনেকেরই মনের গভীরে এক স্বজন, যিনি একাধারে স্রষ্টা, সাথী ও শিক্ষক, তেমন মানুষকে হারানোর বেদনা নাড়া দিয়ে গেল। আসলে সময়ের অক্ষরেখায় আলোকচিত্রীরা ইতিহাসের সাক্ষ্য দিয়ে যান আর সেইসব ছবি দলিল হয়ে রয়ে যায় এমন সব মুহূর্তের, যার পুনরাবৃত্তি সম্ভব নয়। মুহূর্তটি চলে যায়, আলোকচিত্রী দলিল রেখে দেন। মুহূর্তগুলির মতই, প্রকৃতির নিয়মেই বিদায় নেন শিল্পী, কিন্তু রেখে যান তাঁর সৃষ্টি, তাঁর অস্তিত্বের দলিল।
১৯৪৪ সালে ব্রাজিলের এক সচ্ছল কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা কৃষিকাজে প্রবেশ করার আগে পেশায় ছিলেন ফার্মাসিস্ট। চেয়েছিলেন ছেলে বড় হয়ে হয় কৃষিকাজ করুক, নইলে উকিল হোক। তাই সালগাদো কিছুদিন আইন নিয়ে পড়াশোনাও করেন। তিনি গ্রাম ছেড়ে শহরে উচ্চশিক্ষার জন্য শহরে রওনা দেওয়া লোকেদের প্রথম প্রজন্ম। কিন্তু আইনের ঐতিহাসিক আঙ্গিক বাদে বাকি অংশে তিনি বিশেষ আগ্রহ বোধ করেননি। ব্রাজিলে তখন টালমাটাল রাজনৈতিক পরিবেশ। ১৯৫০-এর দশকে ব্যাপক নগরায়ন, শিল্পের বিকাশ হচ্ছে। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন শহুরে মধ্যবিত্তের, শ্রমিকশ্রেণির উত্থান। পরিচিত কৃষিক্ষেত্রের চিত্র পাল্টে যাচ্ছিল। শহরে প্রয়োজন শ্রমিকের, তাই গ্রাম থেকে শহরে ছুটছে মানুষ। কিন্তু একের পর এক পরিবার শহরে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ছে, নিঃস্ব হচ্ছে। কৈশোরের পরিচিত পরিবেশের সঙ্গে এই নতুন চিত্র একেবারেই বেমানান। এই বৈষম্যের মাঝে যুবক সালগাদোর বন্ধুবৃত্ত গড়ে উঠল বিভিন্ন বামপন্থী দলের ছাত্রদের নিয়ে। আকর্ষণ বাড়ল অর্থনীতির প্রতি, ঠিক করলেন অর্থনীতি নিয়েই পড়াশোনা করবেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
তখনই পরিচয় লিলিয়ার সাথে, যিনি সালগাদোর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সঙ্গিনী হয়ে থাকবেন, পুষ্ট করবেন, অংশগ্রহণ করবেন তাঁর সৃজনকে। ১৯৬৪ সালে ঝড়ের মত হাওয়া বদল। ব্রাঙ্কোর নেতৃত্বে সামরিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হল ব্রাজিলে, শুরু হল চূড়ান্ত কমিউনিস্টবিরোধিতা। এমনকি সেই সেনা অভ্যুত্থানকে যুক্তিসিদ্ধ করতে একথাও বলা হল যে, কিউবা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মিত্রতা থেকে ব্রাজিলকে রক্ষা করতেই এর প্রয়োজন। সেই নতুন শাসনব্যবস্থায় একের পর এক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটতে থাকে। প্রতিবাদে পথে নামে মানুষ। অন্যদিকে আমেরিকা সিআইএ-র সাহায্যে লাতিন আমেরিকায় অনুপ্রবেশ শুরু করে। তার বিরুদ্ধেও গড়ে ওঠে প্রতিরোধ। মনে রাখা দরকার, সালগাদো তখনো যুবক, আলোছায়ার জগতে প্রবেশ দূরের কথা, ক্যামেরা সম্পর্কেও তখন প্রায় কিছুই জানেন না। তিনি বলছেন ‘লিলিয়া আর আমার অঙ্গীকার আরও তীব্র হয়ে ওঠে। স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সমস্ত প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডে আমরা অংশগ্রহণ করছিলাম; আমরা আমাদের কমরেডদের সঙ্গে একসাথে, আমাদের আদর্শ রক্ষার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম।’
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, ব্রাজিল ছেড়ে পালাতে হয়। কিন্তু যাবেন কোথায়? সেন্টার ফর রিসার্চ ইন ইকনমিক্স অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিক্সে পড়াশোনা করতে চলে যান ফ্রান্সে। সেখানেই ক্যামেরার সঙ্গে প্রথম পরিচয়, যদিও ক্যামেরাটা লিলিয়া জোগাড় করেছিলেন স্থাপত্য নিয়ে নিজের গবেষণার জন্য। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অর্থনীতিবিদ হিসাবে কাজ করতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের সুবাদে যখন আফ্রিকা যেতে হত সালগাদোকে, তখন একরাশ ছবি তুলে নিয়ে ফিরতেন। আস্তে আস্তে বুঝলেন, অর্থনীতি চর্চার চেয়ে বেশি মন টানছে ছবি তোলা। পথ বদলানোর সিদ্ধান্ত নিলেন লিলিয়া আর সালগাদো। আলোকচিত্রী হয়ে ওঠার সেই শুরু।
প্রথমে টুকটাক খেলার ছবি তুলেছেন। কিন্তু প্রাণ খুঁজে পেলেন অন্যত্র। সাতের দশক কেটে গেল মূলত বিভিন্ন এজেন্সির প্রকল্পের কাজ করতে বহু জায়গা পরিদর্শনে। রোয়ান্ডার কফি শ্রমিকদের জীবন, নাইজেরিয়ার দুর্ভিক্ষ, মোজাম্বিকের গৃহযুদ্ধ। ১৯৭৯ সালে যুক্ত হন ম্যাগনাম ফটোজের সঙ্গে। তাঁর প্রথম মৌলিক আকরগ্রন্থ আদার আমেরিকাজ প্রকাশ করেন ১৯৮৪ সালে। বহুদিন ব্রাজিল থেকে দূরে থাকার পর ফিরে গেলেন লাতিন আমেরিকার কৃষকদের মধ্যে। সাত বছর ধরে ইকুয়েডর, পেরু, বলিভিয়ায় ছবি তুলেছেন। একেক দিনে পেরোতে হয়েছে ৭০০-৮০০ মিটার চড়াই পথ। দক্ষিণ ইকুয়েডরের ইন্ডিয়ান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। উইম ওয়েন্ডার্স আর জুলিয়ানোর (সালগাদোর ছেলে) যৌথ নির্দেশনায় তৈরি ২০১৪ সালের দ্য সল্ট অফ দি আর্থ তথ্যচিত্রে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে উঠে এসেছে ওই মানুষগুলির জীবনবোধ, রীতি রেওয়াজ, সংস্কৃতির কথা।
মিক্সেস নামক একটি কৃষক সম্প্রদায়ের ছবি তুলে ধরেছেন, যারা এত সঙ্গীতপ্রেমী যে ওই সম্প্রদায়ের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাতে জানে। এভাবেই সময় কাটিয়েছেন উত্তর মেক্সিকোর তারাহুমারাদের সঙ্গে। এই কাজ করতে গিয়ে পোর্ট্রেট সম্পর্কে বলেছেন, পোর্ট্রেট তোলার মুহূর্তে যেন ক্ষণিকের জন্য সামনের মানুষটির জীবনবোধ ফুটে ওঠে। সেই বোধই ছবিতে প্রাণ সঞ্চার করে। সালগাদোর কর্মপদ্ধতি দেখলে মনে হয় যেন একজন নৃতাত্ত্বিক ফিল্ড ওয়ার্ক করছেন। কিন্তু তাঁর ফিল্ড নোটগুলো জীবন্ত।
সালগাদো যখন এসব ছবি তুলে বেড়াচ্ছেন, তখন তাঁর কিশোর সন্তান ফ্রান্সে। ছোটবেলা থেকে জুলিয়ানো বেশিরভাগ সময়েই বাবাকে কাছে পায়নি। কিন্তু সালগাদো ছিলেন তার কাছে দৃষ্টান্ত, অনুসরণীয় অভিযাত্রীর মত। দ্বিতীয় সন্তান রদ্রিগোর জন্মের পরেই ডাক্তাররা জানান, তার ডাউন সিনড্রোম রয়েছে। গভীর বেদনায় কিছুটা সময় কাটানোর পর সবাই মিলে চলে যান ব্রাজিলে, নিজেদের পুরনো বাড়িতে। ঘরে ফেরার এই অভিজ্ঞতা সালগাদোকে আরও বেশি করে এগিয়ে দেয় বিশ্বের দিকে। দেখেন এক দশকের ব্যবধানে ব্রাজিলের চেহারা একেবারে পাল্টে গেছে। তিন বছর ধরে সালগাদো হেঁটে বেড়ান ব্রাজিলের বিভিন্ন প্রান্তে, মূলত উত্তর ব্রাজিলে। উত্তর-পূর্ব ব্রাজিলে তখন শিশুমৃত্যুর হার খুব বেশি। বহু শিশু খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার আগেই মারা যেত। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস ছিল, যারা দীক্ষালাভের আগেই মারা যায়, তারা স্বর্গে যেতে পারে না। স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝে ত্রিশঙ্কু অবস্থায় থেকে যায়। মৃত্যুর সময়ে শিশুর চোখ খোলা থাকলে তাকে সেভাবেই কবর দেওয়া হত; যাতে সে নিজে থেকে পথ খুঁজে নিতে পারে। না হলে তো অনন্তকাল ধরে ভাসমান, পথহীন, এক গহ্বরে বাঁধা পড়ে থাকবে। শিশুমৃত্যুর হার এত বেশি ছিল যে গির্জা থেকে কফিন ভাড়া দেওয়া হত। একই কফিনে বহু শিশুর শেষকৃত্য সারা হত। সেই নিদারুণ সংকটের আশ্চর্য ছবি ধরা আছে সালগাদোর ক্যামেরায়।
ব্রাজিলের ভূমিহীন চাষিদের লড়াই আন্দোলনের ইতিহাসও তুলে ধরেছেন। তাদের রাজনৈতিক লড়াই আন্দোলনের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম কীভাবে মিলে মিশে গেছে তাও দেখিয়েছেন। খাদ্য, পুষ্টি না জুটলেও ওই চাষিরা দৃঢ়তার জোরে অতিক্রম করে ফেলত সব শারীরিক সীমাবদ্ধতা। সালগাদোর পরিবারের যে প্রায় ২০,০০০ একর জমি ছিল, খরায় তার প্রায় পুরোটাই মরুভূমির মত হয়ে গিয়েছিল। গোটা এলাকার মাটি এতই শুকনো আর শক্ত হয়ে গিয়েছিল যে অনেকেই জমি জায়গা ছেড়ে দক্ষিণের শহরাঞ্চলের উদ্দেশে সপরিবারে রওনা দেয়। সেই দৃশ্য সালগাদোর চিন্তাজগতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। আলোকচিত্র সম্পর্কে নতুন দিগন্তের সন্ধান দেয়।
এরপর তিনি চলে যান আফ্রিকায়। যখন প্রথম আফ্রিকা গিয়েছিলেন ১৯৭৩ সালে, তখন মূলত অর্থনীতির কাজে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু রোয়ান্ডা, বুরুন্ডি, জাইরে, উগান্ডা এবং কেনিয়া ঘুরে আফ্রিকার মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন নিজের এক টুকরো ব্রাজিল। ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের আঙ্গিকে আত্মীয়তা বোধ করেছেন আফ্রিকার সঙ্গে। স্মৃতিচারণ করতে করতে ফিরে গেছেন কোটি কোটি বছর আগে, যখন আজকের দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, ম্যাডাগাস্কার, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, আন্টার্কটিকা – সবই ছিল একটিই ভূখণ্ড। এভাবে ভাবতেন বলেই বর্তমানের যাবতীয় বেড়াজাল তাঁর কাছে মূল্যহীন। কোনো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকেই আপন ভাবতে তাঁর অসুবিধা হয়নি। তবে হ্যাঁ, কেবলমাত্র এই ভৌগোলিক রোম্যান্টিকতাকে কেন্দ্র করেই বর্তমান যুগের সমস্যার সমাধান করা যাবে বলে ভাবা বাস্তবসম্মত নয়। সালগাদো তা ভাল করেই জানতেন এবং সে কারণেই আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ইতিহাসের দিকে বিশেষ নজর দিয়েছেন। নিছক কল্পনাবিলাসী হয়ে থাকেননি। ইতিহাস থেকে তুলে ধরেছেন – কীভাবে একসময় পর্তুগিজরা আফ্রিকার মোজাম্বিক, গিনি, অ্যাঙ্গোলা, বেনিন, নাইজেরিয়া থেকে দাসদের তুলে নিয়ে যেত ব্রাজিলে। ব্যাখ্যা করেছেন – কেন ব্রাজিলের সঙ্গে আফ্রিকার জনজাতির সাংস্কৃতিক স্তরে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তাই বলেছেন ‘আফ্রিকা, মাই আদার ব্রাজিল।’
আরো পড়ুন অনন্ত কুয়ার জলে ‘বাঙালি’ পড়ে আছে
১৯৮৪ সালে তাই আবার পাড়ি দেন আফ্রিকায়। দুবছরের কাজের ফলশ্রুতি সাহেল: দি এন্ড অফ দ্য রোড। সুদান ও ইরিত্রিয়ার সীমান্তবর্তী আধা-শুষ্ক অঞ্চল; ইথিওপিয়ার উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত বরাবর অবস্থিত এই সাহেল। চিত্রগ্রহণের বিষয়বস্তু ছিল ‘ক্ষুধা’। সাহেল অঞ্চলে সপ্তদশ শতক থেকেই খরা হয়ে চলেছে। কিন্তু ১৯৬৮ থেকে ১৯৮০-র দশকের গোড়ার মাঝামাঝি, যে সময়কালের শেষ দিকে সালগাদো সেখানে কাজ করেছেন, প্রায় ১,০০,০০০ মানুষ রোগে এবং মহামারীতে প্রাণ হারান। চারদিকে গৃহহারা মানুষের ভিড় আর প্রবল দুর্ভিক্ষ, ঘরছাড়াদের ঠাঁই দিতে বহু উদ্বাস্তু শিবির। সাহেল সম্পর্কে সালগাদো বলেন ‘এ বোধহয় পৃথিবীর সর্ববৃহৎ রিফিউজি ক্যাম্প। আমি দেখাতে চেয়েছি যে কীভাবে আমাদের অগোচরেই সভ্যতার এক বিশাল অংশের মানুষ এখানে বাস করে প্রবল দারিদ্র্যের মধ্যে।’ ইথিওপিয়া শুধুমাত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়। যুদ্ধ, সংঘাত, খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক অস্থিরতার ফল। সালগাদোর ভাষায় ‘It was brutal political dishonesty’।
কল্পনা করুন, এক রুগ্ন পিতা, নিজের দুহাতে ধরে আছেন মৃত্যুমুখী জীর্ণ সন্তানের কঙ্কালসার দেহ। পিছনে মরুভূমির ধুলো উড়ছে, একটা উট মৃতপ্রায়। অথচ সেই বাবার চোখে এক ঝলক আলো এখনো বেঁচে আছে। জীবনের আশা হারিয়ে যায়নি, কোথাও জীবনের প্রতি গভীর বিশ্বাস আছে। ওইসব উদ্বাস্তু শিবিরে মানুষ রাগ করে কম, কারণ শরীরে খাদ্য নেই। ডাইরিয়া হলে লিটার লিটার জল প্রতিদিন শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। তাই প্রবল আবেগের ভার শরীর নিতে পারে না। ক্ষোভ, ক্ষুধা, রাগ, অভিমান ইত্যাদি আবেগকে স্থান দিলে যেন মৃত্যু স্বয়ং এসে উপস্থিত হয়। সাহেলে জীবন মৃত্যুর তফাত করা কঠিন, মৃত্যু যেন রোজকার সঙ্গী। তার মাঝেও তাদের আপাত মলিন চোখের নীরবতার আড়ালে খুঁজে পাওয়া যায় বেঁচে থাকার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। মানুষের জীবনের মূল্য বুঝতে ব্যর্থ হলে, সমাজ সম্পর্কে ভাবতে ভাবতে ক্লান্তি নেমে এলে সালগাদোর ছবিগুলো ধেয়ে আসে। মনে করায়, এখনো অনেকটা পথ হাঁটা বাকি, এখনো বহু পর্বত হতে হবে পার।
তারপর ১৯৮৬-১৯৯১ সালগাদো ঘুরেছেন প্রায় ৩০টি দেশে। কাজ করেছেন সভ্যতার কারিগরদের নিয়ে। ওয়ার্কার্স: অ্যান আর্কিওলজি অফ দি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এজ ছিল সালগাদো ও লিলিয়ার ‘ট্রিবিউট টু লেবার’। কুয়েত, বাংলাদেশ, পোল্যান্ড, ভারত, কিউবা, চীন, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, কাজাখস্তান সহ বহু দেশে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন পেশার শ্রমিকদের ছবি তুলেছেন। ছবি তুলতে গিয়ে ভেবেছেন কাঁচা মাল, শ্রম এবং পুঁজির আন্তঃসম্পর্কের কথা। এই ছবির সম্ভার যেন বৃহৎ শিল্পের যুগের মহাকাব্য। সভ্যতার স্রষ্টা শ্রমিকরা নায়ক। মনে পড়ে যায় ব্রেখটের সেই ‘পাঠকের প্রতি পড়তে জানা এক শ্রমিকের কিছু প্রশ্ন’।
কারা ওই সাত দরজার থিব্স নগরী গড়েছিল?…
ব্যাবিলন, যাকে বারবার ধ্বংস করা হয়েছিল,
তাকে প্রতি বার গড়ে তুলেছিল কারা?…
মহান রোম, বিজয়ী খিলানে ভরপুর।
নির্মাণ করেছিল কারা?…
সালগাদো উৎপাদনের ভূরাজনৈতিক সমীকরণগুলির অনুসন্ধান করতে গিয়ে লক্ষ করেন, কীভাবে কাজাখস্তানে তৈরি ফসফেট সার হিসাবেও ব্যবহৃত হয়, আবার মানুষ মারার জন্যে নাপাম রাসায়নিক তৈরি করতেও। বাংলাদেশে পুরুষানুক্রমে শেখা বুনন পদ্ধতি ব্যবহার করে শস্যের বস্তা তৈরি হয়। আবার সেই বস্তাতেই বালি ভরে যুদ্ধক্ষেত্রে বাংকার তৈরি হয়। ব্রাজিলের আখ চাষ থেকে যেমন চিনি পাওয়া যায়, তেমনই পাওয়া যায় মিথানল। সালগাদোকে ভাবিয়েছে উৎপাদনের ব্যাপ্তি, তার বাজার, তার প্রয়োগ এবং সর্বোপরি এসবের অন্তরালে থাকা শ্রমিকরা। অনন্য অভিজ্ঞতা হয় কিউবার তামাক চাষিদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে। তামাক পাকানোর সময়ে যখন সবাই একসাথে কাজ করে, তখন মনোযোগ ধরে রাখার জন্য কেউ না কেউ গল্প বলত। একসময় রাজা আর্থারের কাহিনি শোনাত শ্রমিকরা। কিন্তু বিপ্লব পরবর্তী কিউবায় সালগাদো তাদের মুখে শুনতে পান কার্ল মার্কস, ভ্লাদিমির লেনিনের জীবনী; বহু যুগান্তকারী বিপ্লবের আখ্যান।
শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করার সূত্রেই বিশেষ মনোযোগ দেন খনি শিল্পের উপর। ব্রাজিলের সেরা-পেলাদা স্বর্ণখনিতে তোলা সালগাদোর ছবি হয়ত অনেকেরই দেখা, চিত্রগ্রাহকের নাম না জেনেই। ১৯৮০ সালে যখন ওই খনিতে কাজ শুরু হয়, তখন সালগাদো ছবি তোলার অনুমতি পাননি। তার কারণ ওই খনি ছিল ফেডারেল পুলিস পরিচালিত। বামপন্থীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে এবং প্রত্যক্ষভাবে প্রতিবাদী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করার কারণে ব্রাজিলের গোয়েন্দা সংস্থা সালগাদোকে প্রায় কালো তালিকাভুক্ত করে রেখেছিল। ১৯৮৬ সালে ওই খনি পরিচালনার দায়িত্ব মাইনার্স কো-অপারেটিভের হাতে গেলে সেবাস্তিয়াও ঢুকতে পারেন। যা দেখলেন, তার বর্ণনা এরকম ‘আমার পায়ের কাছে দেখলাম প্রায় একটা ফুটবল স্টেডিয়ামের মত বড় গর্ত। পঞ্চাশ হাজার শ্রমিক একসাথে কাজ করছে। এর গভীরতা প্রায় ৭০ মিটার এবং এই কর্মযজ্ঞে একটিও যান্ত্রিক সরঞ্জাম নেই। ওদের দেখে মনে হচ্ছিল যেন কাদামাটি দিয়ে তৈরি একেকটি মূর্তি।’
তবে সেখানে পৌঁছনো মাত্রই একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়ে যায়। এক শ্রমিক জানতে চান সালগাদো কোথা থেকে এসেছেন। সালগাদো উত্তর দেন ‘রিও দোচে’ (ওঁর জন্মস্থল)। কাকতালীয়ভাবে ওই খনির মালিক কোম্পানির নাম ছিল ‘ভেল দো রিও দোচে’। আসলে সালগাদোর ব্রাজিলের বাড়ির ঠিকানার নামেই কোম্পানির নামকরণ। সেই এলাকার বেশিরভাগ লোহার খনির মালিক ছিল ওই কোম্পানি। সালগাদোর উত্তর শুনে শ্রমিকরা তাঁকে কোম্পানির চর ভেবে বসেন। খাকি রঙের জামা আর হালকা রঙের পোশাক পরা সালগাদো নিচে নামতে গেলেই কর্মরত ৫০,০০০ শ্রমিকের কোলাহল হঠাৎ থেমে যায়। যার যা হাতে ছিল তা দিয়ে আওয়াজ করতে শুরু করেন তাঁরা। সে এক বিকট শব্দ। তারপর সেটাও থেমে যায়, সবাই নিজের কাজে ফিরে যান। সালগাদো কিছু বুঝতে পারেননি। বরং তিনি ছবি তোলা শুরু করলে দেখেন, যে যার কাজে ফিরে গেছে। সকলের ধাক্কা খেয়ে খেয়ে যখন নিচে পৌঁছলেন, ততক্ষণে মাথা থেকে পা কাদায় ঢাকা পড়ে গেছে; ক্যামেরার স্ট্র্যাপটাও বাদ যায়নি। কিন্তু কেউ সালগাদোর সঙ্গে কথা বলছেন না, তাঁর উপস্থিতি যেন সেখানে অবাঞ্ছিত। খনির একদম নিচে দাঁড়িয়ে ছিল একজন পুলিসকর্মী। মূলত বাকবিতণ্ডা, মারপিট আটকানোই তাদের দায়িত্ব। সেই পুলিসকর্মী সালগাদোকে একরকম ধমক দিয়েই পাসপোর্ট দেখতে চায়। পাসপোর্ট দেখাতে সালগাদো বাধ্য নন বলতেই হাতকড়া পরিয়ে সজোরে ঘুঁষি।
ম্যানেজারের কাছে নিয়ে যাওয়ার পর ভুল বোঝাবুঝি মেটে। ম্যানেজার ক্ষমা চান সালগাদোর কাছে। তবে তার চেয়েও ভাল ব্যাপার হল, পুলিসের কাছে সালগাদোর মার খাওয়ার দৃশ্য দেখে খনির শ্রমিকরা বুঝতে পারেন, সালগাদো কোম্পানির হয়ে চরবৃত্তি করতে আসেননি। শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিসের ছিল চূড়ান্ত শত্রুতার সম্পর্ক। কাজেই ম্যানেজারের ঘর থেকে বেরিয়ে যখন খনিতে গিয়ে হাজির হলেন সালগাদো, তখন সকলে মিলে হাততালি দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানান। তারপর সপ্তাহের পর সপ্তাহ তাদের সঙ্গে বসবাস সালগাদোর। ছবি তুলতে কোনো অসুবিধাই হয়নি, গভীর আত্মীয়তা গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে ভারতের বিহারের বিভিন্ন খনিতেও সময় কাটিয়েছেন তিনি।
সালগাদো বলেছেন ‘যখন আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করে আমি কীভাবে ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফির জগতে পদার্পণ করেছি, আমার উত্তর খুবই স্পষ্ট। চিত্রগ্রহণ আসলে আমার শেকড়ের এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সম্প্রসারণ মাত্র।’ এ থেকেই আসে তাঁর পরবর্তী কাজের অনুপ্রেরণা। ‘আমি একটি নতুন প্রোজেক্ট কল্পনা করতে শুরু করলাম। ব্যাপক হারে উৎপাদন ও শিল্পের সম্প্রসারণের ফলে মানুষের পরিবার পুনর্গঠনের কাহিনী।’ নয়ের দশকের শুরুতে লক্ষ্য করলেন, পাশ্চাত্যের বৃহৎ শিল্পগুলিকে কীভাবে দরিদ্র দেশগুলিতে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে শস্তায় শ্রমিক পাওয়া যাবে বলে। এই ঘটনা জনসংখ্যার বিশাল স্থানান্তরের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছিল।
চিত্রগ্রহণের একটি বিশেষ আঙ্গিক হিসাবে ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফির উদ্ভবের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে শিল্পবিপ্লবের সম্পর্ক আছে। যে শতাব্দীর প্রধান প্রাবন্ধিক ছিলেন মার্কস, সেই যুগেই শ্রমিকশ্রেণির ব্যাপক হারে বৃদ্ধি হওয়ার সাথে সাথে জন্ম হয়েছিল ফটোগ্রাফির এই বিশেষ ধারার। তার পরবর্তী শতকের শেষ দিকে কাজ করেছেন সালগাদো। তাই ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফির সর্বাঙ্গীণ বিবর্তনের ইতিহাস রচনা করলে শ্রমিকশ্রেণির উদ্ভব ও বিকাশের একটা ‘ভিজুয়াল’ ইতিহাস গড়ে তোলা সম্ভব। সালগাদোর মাইগ্রেশনস হল বিশ্ব পুঁজিবাদের প্রভাবে স্থানচ্যুত, গৃহহারা জনগোষ্ঠীর সেই অসামান্য দলিল। ছবছর কাজ করে এই দলিল খুঁজে পেয়েছেন বিহার থেকে সাও পাওলো, সাংহাই থেকে জাকার্তা, মুম্বাই থেকে লাতিন আমেরিকায়। ফিলিপিন্স, ইন্দোনেশিয়া, হন্ডুরাস – এ তালিকা বিরাট। নানা কারণে উদ্বাস্তু হয়ে মানুষের স্থানচ্যুত হওয়া উঠে এসেছে এই কাজে। ১৯৯৮ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ঘর হারিয়েছে হন্ডুরাসের বিরাট জনগোষ্ঠী, রাজনৈতিক দমনপীড়নের শিকার হয়েছে ইরাকের কুর্দরা, যুদ্ধের কারণে স্থানচ্যুত আফগানরা আশ্রয় নিয়েছে উদ্বাস্তু শিবিরে। এছাড়াও ছিল মোজাম্বিকের গৃহযুদ্ধ। সালগাদো বলেছেন, ‘এই কাজটা করার সময়ে আমি এত কষ্ট, ঘৃণা এবং সহিংসতা দেখেছি যে হতবাক হয়ে গেছিলাম”। ফলেপুনর্বিবেচনা করে কাজটার নতুন নাম দেন এক্সোডাস।
ইউরোপের বহু চিত্রগ্রাহকের কাছেই সালগাদো গ্রহণযোগ্য হননি। অনেকে বলেছে তিনি একজন ‘aesthete of misery’। অর্থাৎ দারিদ্র্য, শোষণের চিত্রকে আলোকসজ্জায় সাজিয়ে সুন্দর করে তোলার দোষে দুষ্ট। আবার এক্সোডাস-এর জন্য অনেকে তাঁকে ‘বামপন্থী জঙ্গী’ হিসাবেও বর্ণনা করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের শিল্পক্ষেত্রে দেখে তিনিই এককালে বলেছিলেন “দ্য ওয়ার্কার্স প্যারাডাইস’। তিনি যে আজীবন বামপন্থী আদর্শের কিছু মৌলিক চিন্তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন তা অস্বীকার করার কিছু নেই। তাঁর কর্মপদ্ধতি, সমাজের বিভিন্ন সমস্যা প্রসঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গি এবং মূল্যায়ন ব্যাপকভাবে বামপন্থী মতাদর্শ প্রভাবিত। আবার শোষণের সৌন্দর্যায়ন করার অপবাদ নিয়ে ভাবতে গেলে আমাদের কিছু মৌলিক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। সালগাদো এই অপবাদ যাঁরা দিয়েছিলেন তাঁদের প্রশ্ন করেছেন, ধনীদের উপস্থাপনাকে হতে হবে তথাকথিত অর্থে সুন্দর আর দারিদ্র্যের চিত্র হতে হবে কুৎসিত? এ কেমন বাধ্যবাধকতা? আলোকচিত্রীরা কাজ করেন আলো ও সত্য নিয়ে। সালগাদো তাই বলেছেন, আলো তো সকলের উপর সমানভাবে পড়ে। যেখানে দারিদ্র্য, সেখানে কি আত্মসম্মান, আত্মমর্যাদাবোধ নেই? তাহলে কেন তাকে কুৎসিতভাবেই ফুটিয়ে তুলতে হবে?
প্রসঙ্গত, সালগাদোর তোলা ছবিগুলো সত্যকে তুলে ধরতে ব্যর্থ নয়। বরং শৈলীর উপর তাঁর দখল বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে পেরেছে মানুষের দুঃখ দুর্দশার কথা। যে কথাগুলো চিত্রগ্রাহকরা বলতে অক্ষম, সেকথা স্পষ্টভাবে বলেছেন। তার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় দমনেরও সম্মুখীন হতে হয়েছে। কবি জন কিটস লিখেছিলেন ‘Beauty is truth, truth beauty’। সুতরাং সৌন্দর্য কেবলমাত্র আঙ্গিকের মাপকাঠিতে বিচার করা যায় না। শিল্পের সর্বাঙ্গীণ মূল্যায়নেই তা সম্ভব। সালগাদোর মতে ‘আমাদের স্বীকার করতে হবে যে এই ভোগবাদী সমাজ – যার আবর্তে আমরা সকলেই আবদ্ধ – পৃথিবীর অগণিত মানুষকে শোষণ ও দারিদ্র্যের মুখে ঠেলে দেয়। আমাদের সকলের কর্তব্য হল উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে বৈষম্য এবং তার ফলে সৃষ্ট বিপর্যয়গুলোর ধারাবাহিকতা সম্পর্কে নিজেদের অবগত রাখা… এ তো আমাদেরই পৃথিবী, আমাদের দায়িত্ব নিতেই হবে। বিশ্বজোড়া সংকট তো আলোকচিত্রীরা তৈরি করে না, এ তো বর্তমান সমাজের অকার্যকারিতার লক্ষণ। আমরা সকলেই তো তার অংশীদার। আলোকচিত্রীরা আয়নার মত কাজ করে। তাই আমার সাথে voyeurism নিয়ে কথা বলবেন না। Voyeur হল সেইসব রাজনীতিবিদ, যারা এই সংকটের সামনে নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে, voyeur সেইসব সামরিক বাহিনী, যারা রোয়ান্ডায় দমনপীড়নে উস্কানি দিয়েছে, সহজতর করেছে। তারা দায়ী। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ, যারা নিজেদের শত ব্যর্থতার বোঝা লক্ষ লক্ষ মানুষের হত্যা রুখতে পারেনি, তারাও দায়ী।’
১৯৯৯ সালে সালগাদো আর লিলিয়া বৃক্ষরোপণ শুরু করেন। কেন? কারণ পর্তুগিজ উপনিবেশ হয়ে ওঠার আগে ব্রাজিল বিস্তীর্ণ বনভূমি ছিল, যা আকারে ফ্রান্স দেশটার দ্বিগুণ। সালগাদোর পরিবারের জমি ছিল তেমন এলাকাতেই। সপরিবারে ব্রাজিলে ফিরে তিনি দেখেছিলেন গোটা অঞ্চলটা সাফ করে দেওয়া হয়েছে। শহর গড়ে তুলতে, ইস্পাত শিল্পের প্রয়োজনে জঙ্গল ধ্বংস করা হচ্ছে। বন জঙ্গল উজাড় হয়ে যাওয়ার ফলে বৃষ্টির জল আর জমিতে ধরা থাকে না। এক সময় যা ছিল উর্বর এলাকা, তা পরিণত হয় শুষ্ক অঞ্চলে। ফলে লিলিয়া একদিন বলে বসলেন ‘চলো সালগাদো, আমরা আবার গাছ লাগাই।’ তারপর ইনস্তিতুতো তেরা চালু করেন দুজনে মিলে। বহু মানুষের যৌথ উদ্যোগে, অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রায় ১৭,০০০ একর জমি পরিণত হয় প্রাকৃতিক সংরক্ষণাগারে। ফিরে আসে একসময় হারিয়ে যাওয়া বহু প্রজাতির কীটপতঙ্গ, পশুপাখি। ২০০১ আর ২০১৩ সালের তফাত ছবিতে দেখলেই বোঝা যায়।
যে প্রকৃতির সঙ্গে দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে সভ্যতার জন্ম, সেই প্রকৃতির দিকে ফিরে তাকানোর সিদ্ধান্ত নেন ২০০২ সালে। আট বছর মূলত পায়ে হেঁটে বিশ্বভ্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেন। বলেন ‘এতবছর ধরে পুরুষ, নারী, শিশু এবং তাদের দৈনন্দিন জীবন চিত্রিত করার পর এখন আমি আগ্নেয়গিরি, টিলা, হিমবাহ, বন, নদী, গিরিখাত, তিমি, বল্গা হরিণ, সিংহ, পেলিকান, জঙ্গলের জগৎ, মরুভূমি এবং বরফের খেতের ছবি তুলতে বেরিয়ে পড়লাম।’
গেলেন চার্লস ডারউইনের গ্যালাপাগোসে। গেলেন ম্যাডাগাস্কার, সুমাত্রা, মেন্তাওই দ্বীপে, হিমালয়ে। রাশিয়ার এশিয়ার দিকটায় গেছেন বার তিনেক। যাত্রা করেছেন অ্যামাজনের মধ্য দিয়ে। গেলেন আলাস্কা, আর্জেন্টিনা, চিলে, ভেনেজুয়েলা। দক্ষিণ জর্জিয়ায় যে অঞ্চলে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি আছে, যেখানে বিশাল সংখ্যায় পেঙ্গুইনের বসবাস, সেখানেও গেলেন। বই তৈরি করলেন, নাম দিলেন জেনেসিস। যিনি মনে মনেই ব্রাজিল ও আফ্রিকা – আটলান্টিক মহাসাগরের দুই প্রান্তের মধ্যে দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন ভৌগোলিক ইতিহাসের সূত্রে, সেই সালগাদোর ভাবনা পূর্ণতা পেল এই কাজে। নামটা শুনে বাইবেলের কথা মনে পড়ে যেতে পারে। কিন্তু সালগাদোর কথায় ‘আমার কাছে এর সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং এটা একটা ইঙ্গিত করার ইচ্ছে মাত্র যে কীভাবে বহু যুগ আগে প্রকৃতির অদ্ভুত সম্প্রীতি কালের নিয়মে বহু প্রজাতির বৈচিত্র্যের জন্ম দিয়েছিল। আমরা সকলেই প্রকৃতির এই বিস্ময়কর সৃষ্টির অংশ।’ জেনেসিস করতে গিয়েই প্রবেশ করেন আদিবাসী জনজাতির মাঝে। যারা প্রকৃতির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ, তাদের কথা বাদ দিয়ে প্রকৃতি নিয়ে কথা বলা আড়ম্বর মাত্র। তাই নৃতাত্ত্বিক, ভাষাবিজ্ঞানীদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগেই এ কাজ করতে উদ্যোগ নেন। সে অভিজ্ঞতার ব্যাপ্তি এখানে তুলে ধরা সম্ভব নয়। আধুনিক সমাজব্যবস্থার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক, অনেক ক্ষেত্রে তাদের পরিবেশের উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আক্রমণ, তাদের বৈচিত্র্যময় ও ব্যতিক্রমী যাপনশৈলী নিয়ে সে এক বিস্তৃত কাজ।
২০০৮ সালের শরৎকালে সালগাদো পায়ে হেঁটে ইথিওপিয়ার পার্বত্য অঞ্চলের প্রায় ৮৫০ কিমি অতিক্রম করেন। পরে বলেন ‘পঞ্চান্ন দিন ধরে আমি হেঁটেছি, কোনো বাঁধানো রাস্তায় নয়। বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী বারবার ব্যবহারের ফলে চিহ্নিত হওয়া পথ ধরে।’ ২০১১ সালে আর্কটিক সার্কলের নেনেট জনগোষ্ঠীর কাছে গিয়ে উপস্থিত হন। পৃথিবীর বহু প্রান্তে নিজ নিজ রীতি রেওয়াজের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বসবাস করলেও আদিবাসীদের মধ্যে এক বড় সাদৃশ্য হলো তাদের গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনযাপন। আমাদের অতিপরিচিত আধুনিক সমাজের সঙ্গে তুলনা করে সালগাদো বলেন ‘বস্তুগত বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমরা প্রত্যেকেই নিজস্ব পরিসরে একাকী অনেককিছু করতে সক্ষম হয়ে উঠেছি। কিন্তু মানবসভ্যতার ইতিহাস নিহিত আছে ঐক্যবদ্ধ জীবনবোধের মধ্যে। আমরা যেন তার ঠিক বিপরীত দিকে হাঁটা দিচ্ছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা চূড়ান্ত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী হয়ে উঠছি। কেউ আমাকে বিশ্বাস করাতে পারবে না যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের কোনও মূল্য আছে…”।
মাইগ্রেশন করার পর মুষড়ে পড়েছিলেন তিনি। সভ্যতার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তা ভারাক্রান্ত করছিল। কিন্তু জেনেসিস তৈরি করতে গিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যায়। একদিকে দেখেছেন ভোগবাদী সমাজের অন্তর্দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ, জ্বরা, মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রকৃতির অবমাননা। অপরদিকে মেহনতি মানুষের স্পর্ধা, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় বাঁধন, বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। প্রকৃতির মাঝে খুঁজে পেয়েছেন সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস, জীবনের গান। জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে বলছেন ‘আমি কোন এক ঐশ্বরিক স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করি না যিনি প্রকৃতি এবং সমগ্র জীবজগৎকে পরিচালনা করেন। আমি বিবর্তনে অনেক বেশি বিশ্বাস করি এবং নিজেকে ডারউইনের একজন শিষ্য মনে করি। আমি বিশ্বাস করি কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম বিদ্যমান; অর্থাৎ দ্বান্দ্বিকতা, সঞ্চিত অভিজ্ঞতা, পরিপক্কতার মাধ্যমেই অগ্রগতির পথ প্রশস্ত হয়।’ বলেছেন, বিজ্ঞানের ভিত্তিতেই সমাজ ও সভ্যতার ওঠাপড়াগুলোর মূল্যায়ন করা সম্ভব। সালগাদোর জীবনই যেন একটি দলিল। ছবি তোলা তাঁর কেরিয়ার ছিল না, বরং সেটাই ছিল তাঁর জীবন।
নিবন্ধকার আলোকচিত্রী। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।






