২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার পর্ব চলাকালীন বিশ্বজিৎ রায় (মধুদা) আর আমি একদিন ভোরবেলা নন্দীগ্রামের দিকে রওনা দিচ্ছিলাম। ওই কেন্দ্রে প্রার্থী ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। সেখানকার মানুষের মন বুঝতেই যাওয়ার পরিকল্পনা। ভোর চারটে নাগাদ যে গাড়ির চালককে আমরা ঠিক করেছিলাম সাধারণ ভাড়ার গাড়ির চেয়ে কম ভাড়ায়, তিনি ফোন করে জানালেন যে তিনি আসছেন না। আমি অত ভোরে আর কোনো গাড়ি জোগাড় করতে পারলাম না, ফলে নন্দীগ্রাম যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করতে হল।
সেদিন আমি মধুদা সম্পর্কে একটা জিনিস জানতে পারলাম যেটা চিরকাল মনে রেখে দেওয়ার মত। সেটা হল উনি অকুস্থলে গিয়ে প্রতিবেদন লিখতে কত গভীরভাবে দায়বদ্ধ। সেইসময় মধুদার বয়স ৬১ আর শরীরটাও খুব ভাল ছিল না। তবু উনি সেখানে যেতে বদ্ধপরিকর ছিলেন যেখানে সাংবাদিকতার ভাষায় যাকে ‘স্টোরি’ বলে, তা তৈরি হচ্ছিল। ওঁর সঙ্গে কাজ করতে শুরু করার পরে আমার আফসোস হত, অকুস্থলে গিয়ে কাজ করার যে উদ্যম ওঁর ছিল, সেটায় উৎসাহ দেওয়ার সঙ্গতি আমাদের ছিল না বলে। ওই নির্বাচনের মরশুমেই, তার কিছুদিন আগে, আমরা সিঙ্গুর আর আসানসোলে গিয়েছিলাম রিপোর্টিং করতে। আমরা দুজনে একসঙ্গে বহু মিছিল, প্রতিবাদ কর্মসূচির রিপোর্টিংও করেছি। মধুদা বুঝতেন যে আমাদের টানাটানির সংসার। তা নিয়ে কখনো অনুযোগ করেননি।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
উনি দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, দ্য স্টেটসম্যান এবং দূরদর্শনে কাজ করেছেন। একটা সময়ে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বও স্বীকার করে নেন। কেবল পশ্চিমবঙ্গের অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলোর একটা ছোটখাটো নেটওয়ার্ক তৈরি করতেই মধুদা সাহায্য করেননি, ব্যক্তিগতভাবে আমাদের সাইট ইনিউজরুম ইন্ডিয়া-কে দুবার আর্থিক মদত জুগিয়েছিলেন।
স্বাধীন সংবাদমাধ্যমে তিনি যে গভীরে গিয়ে, শব্দসংখ্যার সীমাবদ্ধতা বা বাণিজ্যিক স্বার্থের সীমাবদ্ধতা ছাড়া লিখতে পারতেন – এই ব্যাপারটা মধুদা পছন্দ করছেন বলে মনে হত। গলওয়ান উপত্যকায় ভারত আর চীনের বিবাদের সময়ে তাঁর বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনগুলো বহু মানুষ পড়েন এবং তাতে যে অন্তর্দৃষ্টি ছিল তা প্রশংসিত হয়। উনি সবসময়েই অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকতেন, কারণ ওঁর খবরকে দেখার নজরটাই ছিল আলাদা।
শেষ চার বছর মধুদা শান্তিনিকেতনে থাকতেন। সেখানে বসে রাজনীতি, সংস্কৃতি আর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে লেখালিখি চালিয়ে গেছেন। প্যালেস্তাইন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতামত নিয়ে কাজ করেছেন, তুলে ধরেছেন ওই বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ আর অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের বিস্তারিত আদানপ্রদান। এবছরের কলকাতা বইমেলায় বাংলায় গাজা নিয়ে একখানা বই প্রকাশ করেন মধুদা। মৃত্যুর আগে তিনি আরেকটা বইয়ের কাজ করছিলেন। সে বইটা রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী আর জওহরলাল নেহরুর প্যালেস্তাইন সম্পর্কে চিন্তাভাবনা নিয়ে।
পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘকাল সাংবাদিকদের অভয়ারণ্য ছিল। এই রাজ্যের বৌদ্ধিক বাস্তুতন্ত্র এমন অনেককে লালন করেছে যাঁরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে স্বনামধন্য হয়ে উঠেছেন। কিন্তু মধুদার মত আপোসহীন এবং বিদ্রোহী সাংবাদিক কমই হয়েছে। গত ১৫ মে (বৃহস্পতিবার) ৬৫ বছর বয়সে মধুদা বালিগঞ্জের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তিনি বাংলা আর ইংরিজি, দুই ভাষাতেই সাবলীলভাবে লিখে গেছেন এবং মাঝে মাঝে কবিতাও লিখেছেন। দ্য টেলিগ্রাফে মধুদার প্রাক্তন সহকর্মী সুপ্রতিম পাল যথার্থই বললেন ‘মধুদা সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গের কোনো নিউজরুমের শেষ বিদ্রোহী’। মধুদার সাংবাদিক জীবন চার দশকের বেশি বিস্তৃত। গোটা সময়টা জুড়েই তিনি সদর্থক সাংবাদিকতার অনুশীলন করেছেন।
পাটনার বাসিন্দা বর্ষীয়ান সাংবাদিক দীপক মিশ্র বললেন ‘উনি জন্ম বিপ্লবী। নিজের বিশ্বাস এবং কাজের প্রতি সর্বদা দায়বদ্ধ।’ মধুদা সম্পাদিত বইগুলোর মধ্যে একটা – ওয়ার অ্যান্ড পীস ইন জঙ্গলমহল বিতর্ক তৈরি করেছিল, যখন বম্বে হাইকোর্টের এক বিচারপতি মানবাধিকার কর্মী ভার্নন গনজালভেসের জামিনের আবেদনের শুনানিতে প্রশ্ন তোলেন – কেন একজনের কাছে ওয়ার অ্যান্ড পীস বইটা থাকবে। এই উল্লেখে অনেকে মধুদার বইটার সঙ্গে লিও তলস্তয়ের বিখ্যাত উপন্যাসকে গুলিয়ে ফেলেন এবং সোশাল মিডিয়ায় ব্যাপক রাগের বিস্ফোরণ হয়, ভিন্ন স্বর সম্পর্কে রাষ্ট্রের অসহিষ্ণুতা নিয়ে গভীরতর আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।
মধুদা নিউজরুমের ভিতরে কত তীক্ষ্ণ এবং অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলতেন তার বহু কাহিনি আমি শুনেছি। দ্য টেলিগ্রাফ থেকে ছাঁটাই হওয়ার পরে তিনি যে জোরালো এবং নির্ভীক লেখাটা লিখেছিলেন, তাও পড়েছি। যে কোনো বিষয়ে জোরালো মতামত সত্ত্বেও মধুদা কিন্তু বিখ্যাত ছিলেন তাঁর বিনয় এবং সহৃদয়তার জন্য। দ্য টেলিগ্রাফ আর আমাদের সাইট, দুই জায়গাতেই ওঁর সঙ্গে কাজ করা সুচেতা চক্রবর্তী বললেন ‘জুনিয়রদের প্রতি মধুদা অত্যন্ত সহৃদয় এবং সহানুভূতিশীল ছিলেন।’
আরো পড়ুন স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করতে গোপন সরকারি উদ্যোগ
লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বললেন ‘আমরা একজন আপোসহীন অ্যাক্টিভিস্ট-লেখক এবং সাংবাদিককে হারালাম। এমন একজন যিনি সর্বদা সাধারণ মানুষের জন্যে কাজ করেছেন এবং স্বাধীন প্রেস আর নাগরিক অধিকারের জন্যে লড়েছেন।’
অ্যাক্টিভিস্ট এবং বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলাম বললেন ‘আমরা অনেকবার ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং টিমগুলোতে একসঙ্গে কাজ করেছি। ওরকম পরিশ্রমের কাজ কেবল সেইসব সাংবাদিকরাই করতে পারেন যাঁরা সাংবাদিক হিসাবে দায়িত্বও বোঝেন, আবার গভীর সামাজিক দায়িত্বও বোধ করেন।’
মধুদার পরিবারে আছে তাঁর দুই ছেলে, কবীর আর কণিষ্ক, এবং মধুদার মা। ওঁর স্ত্রী দেবযানীদি, যিনি নিজেও সাংবাদিক ছিলেন, বছর দেড়েক আগেই প্রয়াত হয়েছেন।
মধুদা সাংবাদিকতার মধ্যে দিয়ে এক উন্নততর সমাজ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করেছিলেন। সাংবাদিকতা কেমন হতে পারে এবং কেমন হওয়া উচিত তার মানদণ্ড আরও উঁচুতে তুলে দিয়েছিলেন। কামনা করি, তাঁর স্বপ্ন যেন একদিন সত্যি হয়।
ইনিউজরুম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মূল নিবন্ধ থেকে ভাষান্তরিত। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।









আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে মধুর সাথে পরিচয়। ও, নীলাঞ্জন এবং আরো একজন এসেছিল আমার কাছে ব্যারাকপুর বেল্টের চটকল শ্রমিকদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরিতে সাহায্য করার জন্য। ঐ এলাকায় তখন আমার যথেষ্ট পরিচিত ছিল। সম্ভবত ২-৩ দিন পর পর ফিল্ড সার্ভে করেছিল। বুঝেছিলাম ওরা খুবই পরিশ্রমী। বিশাল লেখাটি প্রতিক্ষণ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। মধু বা অন্যদের সাথে পরেও যোগাযোগ ছিল। সম্ভবত ১৯৯৪ সালের বইমেলায় শেষ বারের মত মধুর সাথে কথা হয়েছিল। আমি তখন কানোরিয়া শ্রমিক আন্দোলনের উপর আমার সম্পাদিত একটি পুস্তিকা বিলি করছিলাম। মধু সেদিন একটা খুব প্রাসঙ্গিক উক্তি করেছিল যা আজও আমার কানে বাজে। আমার স্মৃতিচারণায় কয়েকটি লাইন মধুর জন্য থাকছে। সেখানেই মধুর উক্তিটি থাকবে। মধু সত্যিই একটু অন্যরকম মানুষ ছিল।