শিল্পক
গত ১৫ মে (বৃহস্পতিবার) কলকাতা শহর যা দেখল তা এককথায় অবিশ্বাস্য। প্রকাশ্য রাস্তায় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উপর পুলিসি হামলার এক মর্মন্তুদ দৃশ্য। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত আটটা ছুঁই ছুঁই। হঠাৎ শুরু হল বেধড়ক লাঠিচার্জ। কারোর মাথা ফাটল, কারোর পা রক্তাক্ত হল। মাটিতে নিস্তেজ হয়ে পড়ে যাচ্ছেন মাস্টাররা, পুলিশের হুঁশ নেই। হাতে লাঠি আর মাথায় সরকারের আশীর্বাদ নিয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে বিকাশ ভবনের গেটে। মার খাওয়া জনতা খানিক পিছু হটল। অতর্কিত এই আঘাত তখনো হজম হয়নি তাদের। কিন্তু তারা উঠে দাঁড়াল, রুখে দাঁড়াল, ঘুরে দাঁড়াল। খানিক পরেই তৃণমূল কংগ্রেসের গুন্ডাবাহিনী এলাকায় ঢুকলেও, আন্দোলনকারীদের রোষের মুখে তারা পালাতে বাধ্য হল। সেদিনই শহরে বৃষ্টি নেমেছে ঝিরিঝিরি। জন্মভূমির মাটি আর বধ্যভূমির কাদা মিলেমিশে যাওয়ার সন্ধিক্ষণেও সংগ্রাম হারিয়ে দিল দমনকে। পুলিশ পিছু হটল সেই রাতে। আন্দোলনের ঝাঁঝ বাড়ল।
আসলে মাস হিসাবে মে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৭ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না এবং বিচারপতি সঞ্জয় কুমারের বেঞ্চ যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের এবছরের শেষ পর্যন্ত স্কুলে কাজ করে মাইনে পাওয়ার ছাড় দেয়। পাশাপাশি ওই বেঞ্চ নির্দেশ দেয় – ৩১ মে-র মধ্যে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দিষ্ট পরিকল্পনা সরকার, স্কুল সার্ভিস কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আলাদা আলাদা হলফনামা জমা দিয়ে জানাতে হবে আর নিয়োগ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি ২৯ মে-র মধ্যে প্রকাশ করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশানুসারে চাকরি ফিরে পেতে গেলে সকলকেই এই নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। আর ঠিক এইখানেই যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা অধিকার মঞ্চ পালটা প্রতিবাদের ডাক দিয়েছে। তাদের প্রশ্ন – একবার পরীক্ষায় পাশ করে যাওয়া সত্ত্বেও কেন আবার নতুন করে তাদের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে রাজ্যের সরকারের ভূমিকা। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ তাঁরা নাকি অমান্য করতে পারবেন না। অথচ নিজেদের দুর্নীতির কথা একবারও সৎসাহস নিয়ে স্বীকার করে উঠতে পারছেন না। আজ এতগুলো মানুষের কাজ হারানোর জন্য প্রথমত এবং প্রধানত যদি কেউ দায়ী হয়, তা এরাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকার। বছরের পর বছর ধরে শিক্ষাক্ষেত্রে যে ঘুঘুর বাসা তৈরি হয়েছে, তার মাশুল গুনতে হচ্ছে শিক্ষাক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষকে। ২০১৬ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকার ও তৃণমূলের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের প্রকাশ্য দুর্নীতি আজ দিনের আলোর মত স্পষ্ট। ২০২৪ সালে কলকাতা হাইকোর্টের রায়ে ২০১৬ সালের প্যানেলের গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়াকেই অবৈধ হিসাবে ঘোষণা করা হয়। এপ্রিলে সুপ্রিম কোর্টের রায় সেই মতকেই আরও বৈধতা দেয়। সমস্ত শিক্ষক, শিক্ষিকা, শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। সংখ্যাটা ২৫,৭৫২। যদিও এই রায় অনুযায়ী, ‘টেইন্টেড’ বলে চিহ্নিতদের এতদিন ধরে পাওয়া বেতন সুদ সমেত সরকারকে ফেরত দিতে হবে। বাকিদের তা করতে হবে না। এই রায়ের পরেই নতুন উদ্যমে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা অধিকার মঞ্চ। লাগাতার আন্দোলনের চাপে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য হন। কিন্তু সে আলোচনায় কোনো সদর্থক সমাধান বেরোয়নি। ফলে আন্দোলনের ঝাঁঝ বাড়ে। প্রথমে ওঁরা রাজ্যজুড়ে ৯ এপ্রিল জেলা স্কুল পরিদর্শকদের অফিসে অভিযানের ডাক দেন। বহু জায়গায় সেদিন তাঁদের উপর পুলিসি আক্রমণ হয়। এর প্রতিবাদে তার পরদিনই শিয়ালদা থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত মিছিল হয়। ওই সপ্তাহেই সল্টলেকে এসএসসি ভবন অভিযানের ডাক দেওয়া হয়। আন্দোলনের চাপে পড়ে রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য হন। যদিও তা থেকে কোনো সমাধান সূত্র বেরিয়ে আসেনি। শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছিলেন, আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দাবি মেনে নিয়ে ২১ এপ্রিলের মধ্যে ‘যোগ্য’ এবং ‘অযোগ্য’ তালিকা প্রকাশ করা হবে। যদিও সেই মৌখিক আশ্বাসে আশ্বস্ত না হয়ে তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে নিয়ে যেতে দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থান শুরু করেন। এরই মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের ১৭ এপ্রিলের রায় বেরোয়। কিন্তু ২১ এপ্রিল পেরিয়ে যাওয়ার পরেও এসএসসি যোগ্য-অযোগ্য তালিকা প্রকাশ করেনি, বরং শিক্ষামন্ত্রী তাঁর বক্তব্য থেকে সরে এসে বলেন যে আইনি পরামর্শ নাকি এই তালিকা প্রকাশের বিপক্ষে। তাই প্রকাশ করা যাবে না। শেষপর্যন্ত কয়েকদিন পরে শিক্ষক-শিক্ষিকারা মাইনে পেতে শুরু করেন। ফলে তাঁরা সাময়িকভাবে আন্দোলন প্রত্যাহৃত হয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী মে মাস থেকে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার ঘোষণা নতুন করে অস্থিরতার জন্ম দেয়। তার ফলস্বরূপ গত কয়েকদিন সল্টলেকের বুকে বহু আঘাত সহ্য করেও মাটি কামড়ে পড়ে আছেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা।
উল্লেখ্য, গোটা আন্দোলন পর্ব অদৃশ্য হয়ে গেছেন শিক্ষাকর্মীরা। না সংবাদমাধ্যমে, না মূলধারার আন্দোলনে তাঁদের নাম আসছে। অথচ সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তাঁদেরও কাজ চলে গেছে এবং তাঁরা ডিসেম্বর পর্যন্তও মাইনে পাবেন না। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আন্দোলনের সঙ্গে শিক্ষাকর্মীদেরও যুক্ত করতে পারলে তবেই আন্দোলনের তীব্রতা বাড়বে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, খানিক আড়ালে থেকে শিক্ষাকর্মীরাও অনশন আন্দোলনে সামিল ছিলেন। যোগ্য শিক্ষক শিক্ষিকা অধিকার মঞ্চের নেতৃত্বকেও এই সমন্বয়ের গুরুত্ব বুঝতে হবে।
কিছুদিন হল, এই আন্দোলনে এক নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিজেপি নেতারা এতে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছেন। আন্দোলনরত জনতা আগের পর্যায়ে ভোটবাজ দলগুলোকে আন্দোলন থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হলেও, এই পর্যায়ে পেরে উঠছেন না। এই আন্দোলনের সমাবেশে শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য রাখা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু। বিশেষত তাঁর নাম যখন এই দুর্নীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে। পাশাপাশি ইনিই আন্দোলনের প্রথম পর্বে ঢুকতে না পেরে, শিক্ষক আন্দোলনকে প্রকাশ্যে দিল্লি পুলিস দ্বারা দমন করার কথা বলেছিলেন। আর জি কর আন্দোলনের গোটা পর্ব জুড়ে সচেতনভাবে বিজেপিকে প্রবেশ করতে না দেওয়া গোটা লড়াইকে বাংলার গণতান্ত্রিক সমাজের কাছে এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পেরেছিল। পাশাপাশি বিজেপির বিভাজনের রাজনীতিকেও সোচ্চারে দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছিল। বর্তমান আন্দোলনের নেতৃত্ব যদি বিজেপিকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন, তাহলে আন্দোলনের গণতান্ত্রিক পরিসর আরও বড় হবে। নতুবা শিক্ষক আন্দোলনের কাঁধে ভর করে নিজেদের বিভাজনের রাজনীতির বীজ নতুনভাবে বুনতে সক্ষম হবে বিজেপি।
এই আন্দোলন নতুন করে কিছু রাজনৈতিক প্রশ্নকে পশ্চিমবঙ্গের সমাজে হাজির করেছে বা অদূর ভবিষ্যতে করতে পারে।
প্রথমত, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা পশ্চিমবঙ্গে নতুন নয়। এখন শিক্ষকের অভাবে বা ছাত্রছাত্রীর অভাবে বহু সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে স্কুলশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত এত মানুষের কাজ হারানোর অর্থই হল গোটা সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাটাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া। ২০২০ সালে দেশে লাগু হওয়া নয়া জাতীয় শিক্ষানীতির উদ্দেশ্যই এই – সরকারি শিক্ষাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে শিক্ষায় বেসরকারিকরণের পথ খুলে দেওয়া। সরকারি শিক্ষার অব্যবস্থা গোটা সমাজের কাছে এমন নগ্ন যাচ্ছে যে আলাদা করে বেসরকারিকরণের আর প্রয়োজন পড়ছে না। এমনকি শ্রমজীবী পরিবারের সন্তানরাও বাধ্য হচ্ছে বেসরকারি স্কুলে পড়তে। তাদের পরিবারের ঘাড়ে চাপছে বিপুল ঋণের বোঝা।
দ্বিতীয়ত, সরকারি ব্যবস্থায় চুক্তিভিত্তিক কর্মীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে দেশজুড়েই। এই আন্দোলনে, একদম প্রথম পর্বে নেতাজি ইন্ডোরের সভাতেও মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই সুরই ধ্বনিত হয়। চাকরি চলে গেলেও, অল্প মাইনে দিয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিয়োগ করা সম্ভব। চাকরি যাওয়া শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষাকর্মীরা খড়কুটোর মত সেই চাকরিই আঁকড়ে ধরবেন। সরকারও দায় ঝেড়ে ফেলতে পারবে। সুপ্রিম কোর্টও এই প্রসঙ্গে নির্বিকার। আসলে গোটা দেশের কর্ণধারদের সাধারণ নীতির মূল লক্ষ্য এক। সে এ রাজ্যের সরকারই হোক আর কেন্দ্রীয় সরকার।
তৃতীয়ত, সরকারি স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার অধিকারের মৌলিক প্রশ্নও আজ সংকটের মুখে। ২০০৯ সালের শিক্ষার অধিকার আইন অনুযায়ী, ৬-১৪ বছর বয়স পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীর শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কস্তুরীরঙ্গন কমিটির রিপোর্টে ৩-১৮ বছর বয়সী সকলের শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করার কথা বলা আছে। অথচ জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ এই বিষয়টিকে সুকৌশলে এড়িয়ে গেছে। শিক্ষার অধিকারের স্বীকৃতি ওই নীতিতে নেই। বরং ৫-১০ কিলোমিটারের মধ্যে বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক, উচ্চপ্রাথমিক, উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় সংযুক্ত করে একেকটা স্কুল চত্বর বানানোর সুপারিশ আছে। আর্থিকভাবে লাভজনক নয় এমন স্কুলগুলোকে বন্ধ করে এই ‘কমপ্লেক্স’ বানানোর কথা বলা আছে। এছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি স্কুলগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধনের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
বাংলার এতগুলো সরকারি স্কুলের বিপুলসংখ্যক শিক্ষক, শিক্ষিকা, শিক্ষাকর্মীর কাজ হারানো এসবেরই পথ খুলে দিচ্ছে। কিছুদিন পরে হয়ত পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তের সরকারি ও বেসরকারি স্কুলগুলোকে মিলিয়ে দেওয়া হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে বিজেপি সরকার প্রণীত স্কুলশিক্ষার এই নীতির সঙ্গে মূলগতভাবে তৃণমূল যা করছে তার কোনো ফারাক নেই।
চতুর্থত, আর জি কর আন্দোলনে আমরা দেখেছি, ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ বলে পরিচিত সুপ্রিম কোর্টের প্রতি বিশ্বাস সমাজে কতটা কমেছে। সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ওই মামলা গ্রহণ করে। তাতেও আন্দোলনের ধার কমেনি। জুনিয়র ডাক্তাররা কোর্টের নির্দেশ অগ্রাহ্য করেই আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। আজ শিক্ষক-শিক্ষিকারাও নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর নির্দেশের বিরুদ্ধে আন্দোলনে লিপ্ত হয়েছেন। রাষ্ট্রব্যবস্থার বিভিন্ন স্তম্ভের প্রতি বিশ্বাসের অভাব কিন্তু সমাজের পরিবর্তনমুখী শক্তিগুলোর পাশাপাশি ফ্যাসিবাদী শক্তির হাতও শক্ত করে।
পঞ্চমত, বাংলার পুলিস সম্পর্কে ঘৃণা গত এক বছরে নতুন মাত্রা নিয়েছে। এ যেন বামফ্রন্ট সরকারের শেষ কয়েক বছরের মত। এই গণঘৃণা আগামীদিনে বিস্ফোরিত হবে কিনা তা সময়ই বলবে। কিন্তু রাষ্ট্রকাঠামোর স্থিতাবস্থা যে প্রশ্নের মুখে পড়ছে বারবার, তা বোঝার জন্য রাজনৈতিক বিশ্লেষক হতে হয় না। এরই মধ্যে সংঘ পরিবার রাজ্য সরকার পরিচালিত পুলিসকে মুসলমান তোষণকারী বলে অভিহিত করছে। তারাও পুলিসি ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাওয়াকে নিজেদের ফ্যাসিবাদী কর্মসূচিতে ব্যবহার করতে চাইছে। পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক জনতার একথা বোঝা প্রয়োজন। রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে ধূমায়িত ক্ষোভকে প্রগতির দিকে ধাবিত করা সময়ের দাবি। নাহলে ফ্যাসিবাদের হাত ধরে এই সময়ের সমস্ত লড়াইয়ের স্থান হবে আস্তাকুঁড়ে।
ষষ্ঠত, বেকারত্বের জ্বালায় জর্জরিত বাংলার যুবসমাজ ফ্যাসিবাদী আরএসএস-বিজেপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। সমাজের এই অংশকে নয়া উদারনৈতিক উন্নয়ন মডেলের বিরুদ্ধে টেনে আনতে না পারলে তৃণমূলবিরোধিতা অচিরেই বিজেপির রাজনীতির অনুকূলে চলে যাবে। সেই কঠিন কিন্তু আবশ্যিক দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে।
আরো পড়ুন এসএসসি: রাত জেগে পড়াশোনা করেছিলাম কি পুলিশের মার খাব বলে?
গোটা পশ্চিমবঙ্গ এখন বারুদের স্তুপের উপর দাঁড়িয়ে। একদিকে তৃণমূল সরকারের মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতি এবং স্বৈরাচার, অন্যদিকে পরিকল্পিত মুসলমান বিদ্বেষের রাজনীতি নিয়ে সংঘ পরিবার আগামী বছরের বিধানসভা ভোটের আগে সর্বশক্তি দিয়ে বাংলার মাটি দখল করতে উদ্যত হয়েছে। এরই মধ্যে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সোচ্চার উপস্থিতি এই বাইনারির বাইরে বেরিয়ে বিকল্প পরিসরের জন্ম দিচ্ছে। বেসরকারিকরণের প্রশ্নে তৃণমূল বিজেপিরই পথের পথিক, নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি লাগু করার কাজও সে ঘুরপথে করছে। কিন্তু এই মুহূর্তে বাংলার সমাজ যতটা অস্থিরতার সামনে দাঁড়িয়ে, তাতে জনতার অধিকার আন্দোলনের ধারাকে আরও বিকশিত করা না গেলে অচিরেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আঁতুড়ঘরে পরিণত হবে আমাদের ভালবাসার মাটি।
আর জি কর আন্দোলনে খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্যে হলেও এই বাইনারি ভেঙে পশ্চিমবঙ্গের সমাজে প্রগতিশীল রাজনীতির বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মুর্শিদাবাদের দাঙ্গা বা পহলগামোত্তর যুদ্ধোন্মাদনাকে কেন্দ্র করে কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমের সরাসরি সহায়তায় সংঘ পরিবার নতুন করে পায়ের তলায় মাটি পেয়েছে। এই প্রেক্ষিতেই শিক্ষক-শিক্ষিকা-শিক্ষাকর্মীদের আন্দোলন নতুন ব্যঞ্জনা নিয়ে হাজির হয়েছে। শিক্ষার অধিকার, ছাত্রছাত্রীদের অধিকার তথা বৃহত্তর সমাজের আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে না পারলে শিক্ষক-শিক্ষিকারাও নিজেদের দাবি আদায় করতে পারবেন না। আর জি কর আন্দোলন প্রকৃত অর্থেই একটা গণআন্দোলন হয়ে উঠেছিল জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের লড়াকু ঐক্যের মধ্যে দিয়ে। ধর্ষণ ও হত্যার বিচারের দাবি সাধারণ মেয়েদের নিরাপত্তার দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। সরকারি মেডিকাল কলেজগুলোতে হুমকি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে তোলা আওয়াজ রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জমতে থাকা স্বরগুলোকে ভাষা দিয়েছিল। শিক্ষক সমাজের আন্দোলনও সেই বৃহত্তর ঐক্য দাবি করছে।
যদি এই আন্দোলন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নিজেদের অধিকারের পাশাপাশি বাংলার মানুষের বিরুদ্ধতার কণ্ঠকে আরও বিকশিত করে, তাহলে রাজ্য রাজনীতির এই কঠিন সময়ে নতুনভাবে গণতান্ত্রিক পরিসর অক্সিজেন পাবে। বিভাজনের রাজনীতির বিপরীতে অধিকারের রাজনীতি মাথা তুলে দাঁড়াবে। নতুবা কেউ চাকরি তো ফেরত পাবেনই না, উপরন্তু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দিকে এক কদম পিছু হাঁটা হবে।
নিবন্ধকার ছাত্র সংগঠন পিডিএসএফের সভাপতি। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








