গত ৩ মার্চ ২০২২, কলকাতার প্রাণকেন্দ্র কলেজ স্ট্রিটে অরাজনৈতিকভাবে সাধারণ শিক্ষক পদপ্রার্থীরা এক জমায়েত ও মিছিলের ডাক দিয়েছিল বেলা এগারোটায়। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় এক হাজার ছেলেমেয়ে সেদিন জড়ো হয়েছিল বইপাড়ায়। কিন্তু কলকাতা পুলিশের বিশেষ ও বিশাল বাহিনী প্রিজন ভ্যান, জলকামান নিয়ে রণসাজে এবং যুদ্ধং দেহি মনোভাবে তৈরি ছিল অনেক আগে থেকেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রার্থীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। অতঃপর আন্দোলন দমন করতে বলপূর্বক ৪০ জনকে গ্রেফতার করে ছত্রভঙ্গ করা হয়। ধৃতদের লালবাজারে সন্ধে সাড়ে ছটা পর্যন্ত বন্দি করে রাখা হয়।

আমরা সাধারণ চাকরিপ্রার্থী। আমাদের অন্যায় আমরা তিন বছর ধরে স্নাতক, দুবছর ধরে স্নাতকোত্তর এবং এক বছর কেউ বা দুবছর ধরে বি এড করেছি। আমাদের অন্যায় আমরা সুস্থ ও সুন্দরভাবে বাঁচতে চেয়েছি। আমাদের অন্যায় নিজের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য আমরা পরীক্ষা দিতে চেয়েছি, নিজের মেধার উপর ভিত্তি করে শিক্ষক হতে চেয়েছি। যে সমাজ থেকে আমরা অনেক কিছু পেয়েছি, সেই সমাজকে কিছু ফিরিয়ে দিতে চেয়েছি।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

১৯৯৯ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের স্কুলগুলোতে শিক্ষক নিয়োগের জন্য স্কুল শিক্ষা দফতর লিখিত পরীক্ষা নেওয়া শুরু করে স্কুল সার্ভিস কমিশন (এসএসসি)-র মাধ্যমে। ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং ধনী, দরিদ্র, মধ্যবিত্ত নির্বিশেষে নিজের যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রায় কয়েক লক্ষ ছেলেমেয়ে স্কুলে চাকরি পেয়েছে। কিন্তু ২০১১-২২ — এই এগারো বছরে অসংখ্যবার নিয়ম ও চেয়ারম্যান বদলালেও পরীক্ষা হয়েছে মাত্র দুবার — ২০১২ আর ২০১৬। প্রসঙ্গত বলে রাখা দরকার, আগের এগারো বছরে, অর্থাৎ ১৯৯৯-২০১০ পর্যন্ত পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগের জন্য একটাই পরীক্ষা হত। ২০১২ সালের পরে নিয়ম করা হয়, পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণীর জন্য আপার প্রাইমারি পরীক্ষা (১৫০ নম্বরের টেট) হবে আর নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির জন্য বিষয়ভিত্তিক একটা পরীক্ষা (এসএলএসটি ৫৫ নম্বরের) হবে।

২০১৫ সালে একটা আপার প্রাইমারি পরীক্ষা হয়, যার দুবার ইন্টারভিউ হয়েছে কিন্তু আজও নিয়োগ হয়নি। ২০১৬ সালে হয়েছে দ্বিতীয় ও শেষবারের মত বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষা, যার ভুয়ো নিয়োগ নিয়ে আদালত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। এই পরীক্ষায় মেধা তালিকায় নাম থাকা কিছু প্রার্থী ১৮৪ দিন ধরে গান্ধীমূর্তির পাদদেশে অবস্থান বিক্ষোভ করছে। তেসরা মার্চ আমরা সকলে কলেজ স্ট্রিটে উপস্থিত হয়েছিলাম এই পরীক্ষার নতুন বিজ্ঞাপন চেয়ে, পরীক্ষায় বসতে চেয়ে। এতগুলো বছর ধরে আমাদের জীবনের মূল্যবান সময়টা বেকারত্বের ফাঁসে আটকে আছে। তার থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম আমরা। এটাই আমাদের অপরাধ। তাই আমাদের জুটেছে পুলিশের মার, লালবাজারে কেটেছে আমাদের গোটা দিন।

আমাদের মধ্যে এমন অনেকে আছে যারা ত্রিশোর্ধ, একবারও ভাল করে পরীক্ষা দিতে পারেনি। তারা কাল একটা নতুন বিজ্ঞাপনের জন্য কলকাতার রাজপথে জমা হয়েছিল। অথচ দিনশেষে তাকে সুদূর বাঁকুড়া বা মেদিনীপুর, রায়গঞ্জের বাড়িতে ফিরতে হয়েছে খালি হাতে, পুলিশি নির্যাতনের চিহ্ন নিয়ে।

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের স্কুলগুলোর অবস্থা সংকটজনক। এত বছর ধরে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে না, অথচ প্রত্যেক বছর বিরাট সংখ্যক শিক্ষক অবসর নিচ্ছেন, উৎসশ্রীর ফলে প্রচুর বদলি হচ্ছে, ফলে স্কুলগুলো ধুঁকছে। এরপর আছে সরকারের বেসরকারিকরণের চিন্তা। আপনার কাছে অর্থ থাকলে আপনার সন্তান পড়তে পারবে, চাকরি বাকরি পাবে। নইলে চপশিল্পই ভবিতব্য।

শিক্ষক নিয়োগের দাবি উঠলেই সরকার জানায় কোর্ট কেসের জটিলতায় তারা আবদ্ধ। ১৯৯৯ থেকে ২০১০ পর্যন্ত এগারোবার পরীক্ষা হয়েছে, একটাও কেস হয়নি। কিন্তু পরের এগারো বছরে অনুষ্ঠিত দুটো পরীক্ষাতেই এত কেস হল কেন? কোনো ফাঁক, কোন ত্রুটি না থাকলে কেসগুলো চলছে কী করে?

আমরা পড়াশোনা করেছি, শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছি। সেখানে আমাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে কাশফুলের বালিশ। আর নিয়োগের দাবিতে পরীক্ষা দিতে চাইলে, নিজের অধিকার বুঝে নিতে গেলে পুলিশ দিয়ে রাস্তায় ফেলে মারা হচ্ছে।

ছোটবেলায় পড়েছিলাম, শিক্ষকরা হলেন সমাজের মেরুদণ্ড। অথচ আজ চাকুরে শিক্ষিকরা বিভিন্ন কারণে শ্রেণিশত্রুতে পরিণত হয়েছেন। আর আমরা যারা শিক্ষক হতে চাই তাদের দিন কাটছে হতাশা, ব্যর্থতা, অবসাদ, আন্দোলন, অনশন আর লালবাজারে। ভুরি ভুরি দুর্নীতি প্রমাণিত, অথচ সরকার চলছে। রাজ্যবাসীর জীবন, যৌবন, ভবিষ্যৎ আটকে পড়েছে ভাতা এবং শ্রীতে। আজ মনে হচ্ছে, রাত জেগে পড়াশোনা করেছিলাম কি শুধু পুলিশের মার খাব আর হতাশায় মরে যাব বলে?

লেখিকা চাকরিপ্রার্থী। নিয়োগের দাবিতে আন্দোলনের কর্মী। মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.