শাহনওয়াজ আলি রায়হান

লোকসভায় নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাস হয়েছিল ২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বর, রাজ্যসভায় ১১ তারিখ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পথে নামলেন ১৬ ডিসেম্বর, রেড রোড থেকে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি — চার কিলোমিটার রাস্তা। মাঝের কটা দিন বাংলার মুসলমানদের কাছে প্রলয়ের মত ছিল। হতাশা, ক্ষোভ ও একাকিত্ব। যাঁদের সঙ্গে একই হাওয়া-জল খেয়ে বড় হওয়া, সেই প্রতিবেশীরা অনেকেই উল্লাসে পটকা ফাটাচ্ছে! ভবিষ্যতে কী হবে কেউ জানে না। আমাদের স্কুলের বন্ধুরা সবাই চুপ, কেউ কেউ মুখ খুলল তখন, যখন মুর্শিদাবাদে কোথাও একটা ট্রেনের ফাঁকা কামরায় আগুন লাগানোর ছবি ভাইরাল হল। ভাবখানা হল, মুসলিমরা কত হিংস্র! যাদের সাথে টিফিন ভাগ করল, একই বেঞ্চে ছয় বছর পাশাপাশি বসল, তাদের দেশছাড়া হয়ে যাওয়ার সংকটের থেকেও তাদের বেশি মায়া রেলের সম্পত্তি নিয়ে! এই মাঝের কটা দিন কংগ্রেস, সিপিএম, তৃণমূল — কেউ জেলাগুলোতে একটু আস্থা, একটু সহানুভূতি নিয়ে মুসলিমদের দিকে এগিয়ে যায়নি। উল্টে মুসলিমরা প্রতিবাদ করতে গেলে শাসক দলের স্থানীয় নেতারা (বেশিরভাগই মুসলিম) বিরোধিতা করেছে। এমনকি পুলিশকে এগিয়ে দিয়েছে। সুতি, সুজাপুর, সামসি, হরিশচন্দ্রপুর — নানা জায়গায় রাজ্যের পুলিস প্রতিবাদরত মুসলিম যুবকদের হেনস্থা করেছে। তারা অনেকে পুলিশি অভিযানের ভয়ে এই সময় রাতে বাড়িতে ঘুমোতে পারেনি।

আন্দোলনকারীদের উপর অভিযোগ চাপাতে সুজাপুরে পুলিশ নিজেই নয়মৌজা ঈদগাহে গাড়িতে আগুন দিচ্ছে, এমন ভাইরাল ভিডিও সবাই দেখেছে। পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন পথে নামলেন, তখন একে একে সবাই নামল। সেটা নাগরিকত্ব আইনের বিরোধিতার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেন একটা প্রতিযোগিতাও ছিল। নিজেদের দলের মুসলিম নেতা-কর্মীদের ময়দানে নামিয়ে দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো নাগাড়ে পার্ক সার্কাসের ধর্নাকে হাইজ্যাক করতে উঠেপড়ে লেগেছিল। আর বছর দেড়েক পরেই যে বিধানসভার ভোট। একদিকে হিন্দুত্ববাদের উত্থানে নিজ দেশেই মুসলিমদের কোণঠাসা করার রাজনীতি, অন্যদিকে যাদের উপর ভরসা করে ওই দমবন্ধ করা অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার আশা করা –তাদের কাছ থেকে পদে পদে হতাশা উপহার পাওয়া। রামমন্দির, কাশ্মীর, রাজনৈতিক বন্দীসহ নানা বিষয়ে সচেতন নীরবতা বজায় রেখেছিল সেই দলগুলো, যাদের ধর্মনিরপেক্ষতার উপর ভরসা করে মুসলিমরা সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজেছে। রাজ্যের মুসলিমদের সাম্প্রতিক সময়ে মন ভেঙে যাওয়ার একটা কারণ হল, যে তৃণমূলকে তাঁরা গত নির্বাচনে ঢেলে ভোট দিয়ে জেতালেন, সে-ই এখন সর্বভারতীয় রাজনীতিতে বিজেপির প্রতিপক্ষ হতে নরম হিন্দুত্বের কার্ড খেলতে পিছপা হচ্ছে না। হিন্দুত্বের রাজনীতি করা লোকেদের দলে নিচ্ছে নির্দ্বিধায়। পুরভোটের টিকিট দেওয়ার সময়ে বৈষম্য করছে দলেরই মুসলিম নেতাকর্মীদের সাথে। মোদীর মত মমতার মন্দিরে মন্দিরে পুজো দেয়ার ছবিও ফলাও করে পোস্ট হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে। একদা একইভাবে হিজাব পরে দোয়া রত অবস্থায় রাস্তাঘাটে যাঁর বড় বড় হোর্ডিং, ব্যানার দেখা যেত — তিনিই কিনা কর্ণাটকে হিজাব নিয়ে মুসলমানদের উপর আক্রমণ সম্পর্কে স্পিকটি নট।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়ানো সকলের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। এর জন্য ধার্মিক-অধার্মিক, রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক হওয়া জরুরি নয়। এগুলোকেই ইমানুয়েল কান্ট ‘ক্যাটাগরিক্যাল ইমপারেটিভ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। নাগরিকত্ব আইন বিরোধী আন্দোলনের সময়ে অনেক অমুসলিম শিক্ষিত তরুণ-তরুণী এই নৈতিক কর্তব্যবোধ থেকেই পার্ক সার্কাসে এসেছে। নিজেরা আন্দোলনকারীদের হাতে মেহদি লাগিয়ে দিয়েছে, গান করেছে, স্লোগান দিয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এই বোধ থেকে পরিচালিত হয়নি। বিশেষ করে শাসক দলের। তারা শুরুতে চুপ, লোকসভায় ভোটাভুটির সময়ে তাদের সাংসদ উধাও। মমতা পথে নামার পর যখন নিজেরা আস্তে আস্তে প্রতিবাদ শুরু করল তখন শাহিনবাগ-পার্ক সার্কাস মডেলে কোনও ধর্না নয়, বরং জেলাগুলোতে বেছে বেছে মুসলিম এলাকায় জনসভা বেশি হল। আইন পাস করল হিন্দুত্ববাদীরা, সমর্থন করল হিন্দুদেরই একাংশ আর প্রতিবাদী জনসভার মঞ্চ বাঁধা হচ্ছে মুসলিম পাড়ায়! ভাবখানা হল, কোনোরকমে পাশে আছি বার্তা দিয়ে মুসলিম ভোট ধরে রাখা। আর যেখানে যেখানে মুসলিম যুবকরা নিজ উদ্যোগে কোনও প্রতিবাদ করতে গেছেন, মিম জুজু দেখিয়ে তাঁদের উপর পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এটা নিশ্চয় রাজনৈতিক চাপ ছাড়া হয়নি। নইলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কণ্ঠরোধ তো পুলিশের এক্তিয়ারে পড়ে না।

একইরকম বার্তা বেশ কদিন ধরে পাচ্ছি আনিসের হত্যার প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে। রাজ্যের নানা জায়গায় আনিস হত্যার প্রতিবাদে সোচ্চার হলেই মুসলিম যুবকদের স্থানীয় শাসক দলের নেতাকর্মীদের চোখ-রাঙানির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। শাসক দলের মুসলিম নেতারা আর সবে যতই ঢিলেমি করুক, মুসলিমরা একটু নিজ উদ্যোগে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করছে, দলীয় আনুগত্য ছেড়ে সক্রিয় হচ্ছে দেখলেই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। এই বুঝি মুসলিম ভোট হাতছাড়া হল। আমাদের ভয় না করলে, নিজেরাই স্বাবলম্বী হলে দলে আমি কী করে পাত্তা পাব? কে আমাকে ভোট দেবে? দেখেন না, মুসলিম মন্ত্রীরা সারা বছর নীরবই থাকেন। কিন্তু যখনই মনে হয় পার্টির মুসলিম ভোট ধরে রাখা দরকার, তখনই ইমাম বরকতি ইস্যু, বিধানসভা ভোট থেকে আমতা থানাকে ক্লিনচিট দেওয়া — সবেতেই চাঙ্গা হয়ে ওঠেন ওই মুসলিম নেতারা। আনিসের মৃত্যুর পরও দেখা গেল দল থেকে বারবার মিডিয়ার সামনে এগিয়ে দেয়া হচ্ছে পরিবহন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমকে। সাচার কমিটির রিপোর্ট বের হওয়ার পর একইরকম সক্রিয়তা আমরা দেখেছিলাম সিপিএমের মুসলিম মুখগুলোর।

এই নিরাপত্তাহীনতা, এই চাটুকারিতা, এই আনুগত্য প্রমাণের দায় — সবকিছুই অন্যদের চেয়ে দলের মুসলিম বিধায়ক, মন্ত্রী, জেলা সভাপতি, ব্লক সভাপতি, বুথ সভাপতিদের বেশি। সেই কারণেই প্রত্যেক নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি লাশ পড়ে মুর্শিদাবাদ জেলার বুথগুলোতে। ওখানে প্রতিযোগিতা বেশি, দলের তরফ থেকে চাপানো টার্গেট পূরণ করার চাপ বেশি, নিজেকে নানাভাবে প্রমাণ করার দায় বেশি। সর্বোপরি এসব দলের স্থানীয় পর্যায়ে যারা মুসলিম মুখ হয়ে সম্প্রদায়ের ভোট পাইয়ে দেয়ার ঠিকাদারি করে, তাদের অনেকেই স্থানীয় পর্যায়ের গুন্ডা-মস্তান।

আনিস খান এই ভোট(ব্যাংক) ম্যানেজ সর্বস্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থার বলি। আনিসের হত্যার জন্য জেলায় জেলায় যাঁরা প্রতিবাদ করছেন, সেই মুসলিম যুবসমাজের অনেকে শাসক দলের মুসলিম নেতাদের হুঁশিয়ারির সম্মুখীন। এই ব্যবস্থা রীতিমত সহিংস, যার নমুনা আমরা পুরভোটে দেখেছি। এখানে আদর্শ, চেতনা, উন্নয়ন কিছুই গণ্য হয় না। সমষ্টির ভোট-খাজনা তুলে দিয়ে কিছু লোকের ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাম আমলে কায়েম হয়েছিল, এ হল তারই ঘাসফুল সংস্করণ।

কংগ্রেস আমলে বেশি ভোটে দাঁড়াত জেলার মুসলিম জমিদার, জোতদার, বিত্তশালীরা। তাঁরা ভোটারদের অনেকটা প্রজা হিসাবে গণ্য করতেন। অনুগ্রহের পাত্র ভেবে কিছু এলাকায় উন্নয়ন করতেন, বিনিময়ে ভোট নিতেন। নিজের আসন ধরে রাখতেন। শ্রেণির পার্থক্য প্রবল হওয়ায় ভোটারদের নিজের সমপর্যায়ের ভাবতেন কম নেতাই। নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক হিংসা তখনো বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ না হওয়ায়, মুসলিমদের লাশও কম পড়ত। দেশভাগ পরবর্তী সময়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে জান-মালের নিরাপত্তাই তখন সংখ্যালঘুর প্রধান কাম্য।

বাম আমলে এই বিত্তশালী গোষ্ঠীর জায়গায় সাধারণ মানুষ টিকিট পেতে শুরু করল। শিক্ষিতদের দলে জায়গা হলেও স্থানীয় পর্যায়ে হোমরা-চোমরারাই মুসলিম এলাকায় পার্টি অফিসগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে লাগল। এরাই আজ তৃণমূল করে, অনেক বিবর্তন পার করে ভয়ানক হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতি নেতাদের অতিক্রম করে অনুগামীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু সাক্ষ্যপ্রমাণ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, আনিস এইসব গোষ্ঠীরই চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিল। সে কোনো নির্দিষ্ট দল করত না, ছোটবড় নানা দলে তাকে দেখা যেত। এই অস্থিরতা যেন কোনো একক দলীয় আধিপত্য অস্বীকার করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এনআরসি-সিএএর নিশানায় থাকা একটা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের নানা সম্ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখা। যে বা যারা আনিস মারা যাবার পর “আনিস শুধু আমাদেরই ছিল” দাবি করার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে, তারা আদতে রাজনৈতিক বহুত্বের পথে আনিস যেটা অর্জন করতে চেয়েছিল, সেটাকে দেখতে নারাজ। ক্ষমতার রাজনীতি চেয়ে, বোধ করি, জনগণের মুক্তির রাজনীতিই তার কাছে বেশি কাম্য ছিল। নরেন্দ্র মোদীর উত্থানের পর এমন আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা মুসলিম যুবক-যুবতীর সংখ্যা কিন্তু দেশে প্রতিদিন বাড়ছে। এমনকি কোনো দলীয় পতাকা ছাড়াও এরা অনেক সময় রাষ্ট্রের নানা দমন-পীড়নের মোকাবিলা করছে।

আনিসের মৃত্যুর পর কলকাতায় রাস্তায় মুসলিম ছাত্রসমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশকে নিজেদের মত করে প্রতিবাদে সোচ্চার হতে দেখা যাচ্ছে। এটা একটা নতুন ব্যাপার। এর আগে হয় নির্লিপ্ততা দেখা যেত, নয় বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অন্ধ অনুসরণ। এই সাহসের শুরুটা হয়েছিল নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলন দিয়ে। আনিসের আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ হয়ে এই মুসলিম যুবক-যুবতীদের নিজেদের পাড়ায়, এলাকায় আষ্টেপৃষ্ঠে থাকা দলীয় রাজনীতির আধিপত্যকামী চক্রের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াতে হবে। মুসলিম সম্প্রদায়ের ভেতরের প্রবীণ নেতৃত্ব বরাবরই শাসকপন্থী। ধর্মীয় ব্যক্তিত্বেরা; পীর, ওলামা, ভাতা পাওয়া ইমাম-মুয়াজ্জিনরা শাসক দলের অনুগত হয়ে যে নির্লিপ্ত জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন, তাতে এঁদের কাছ থেকে স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে যাওয়ার আশা করা আকাশকুসুম কল্পনা। এঁরা বড়জোর আনিসের বাবার পাশে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলবেন, তাঁর কবরে গিয়ে দোয়ার ছবি আপলোড করবেন। কিন্তু উপরে যে এজেন্সি-নির্ভর রাজনৈতিক ব্যবস্থার কথা বললাম, তার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলবেন না।

এদের জন্যই মুসলিম সমাজে স্বাভাবিক নেতৃত্বর উদয় আটকে আছে। রাজনৈতিক প্রয়োগ, বিকল্প নিয়ে চিন্তাভাবনার কোনো সম্ভাবনাই তৈরি হয় না এই কারণে। এই ব্যবস্থার কোনো চিরস্থায়ী রং নেই। কাল এটা লাল ছিল, আজ সবুজ, পরশু অন্য কিছু হবে। কিন্তু কারো না কারো অধীনেই থাকবে, স্বাবলম্বী হবে না। বরং গোটা সম্প্রদায়ের ভোট কুক্ষিগত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কিছু লোক শাসকের সঙ্গে একটা চুক্তি করবে। তাই দেখছেন না, মুসলিম সমাজের অনেকে আনিসের খুনির সাজা চাই বলছে, কিন্তু আনিসের বাবার দাবি মেনে সিবিআই চাই কথাটা বলতে অস্বস্তি বোধ করছে?

আনিস এই ব্যবস্থারই বিরুদ্ধে ছিল। এখন আলিয়া ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছাত্রছাত্রীরা পথে নেমে আন্দোলন করছেন, তাঁদেরও এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে। যেমনভাবে অতীতে দলিত, যাদবদের আন্দোলনকে আমরা ভারতের নানা জায়গায় স্বতন্ত্রভাবে আওয়াজ তুলতে এবং রাজনৈতিকভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দেখেছি। এরকম বড় উদ্দেশ্যে যদি আন্দোলনকে চালিত করা যায়, তাহলে শুধু মুসলিম পাড়াগুলোই নয়, সারা বাংলাই রাজনৈতিক হিংসার সংস্কৃতি থেকে অনেকটা মুক্তি পাবে। মুসলিম সমাজের উপর সবরকম দলীয় রাজনীতির শ্বাসরোধী বন্ধন কিছুটা হলেও আলগা হবে।

এই আওয়াজ মুসলিম যুবসমাজকেই সবচেয়ে আগে তুলতে হবে, তাঁদের প্রবীণরা নানা পিছুটানে স্থবির। আনিসের হত্যার পর থেকেই ময়দানে বেশ সক্রিয়ভাবে হাজির নানা গোষ্ঠীকে বুঝতে হবে এবং অন্যদেরও বোঝাতে হবে, এই আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক দলের নেহাত ঘুরে দাঁড়ানোর আন্দোলন নয়, বরং রাজনৈতিক হিংসার চক্রব্যূহ থেকে একটা অরক্ষিত বর্গ, সম্প্রদায়কে বার করে আনার অহিংস আন্দোলন। প্রবল হিন্দুত্বের উত্থান যখন তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোকেও নরম হিন্দুত্বের তাস খেলতে বাধ্য করছে, তখন কোনোরকম ভারসাম্যের খেলায় না গিয়ে সাম্প্রদায়িকতার চুলচেরা বিশ্লেষণ রাজনীতির মূলস্রোতে পুনঃস্থাপন করার আন্দোলন। উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে বিজেপি হেরে গেলে “চুপ, বিজেপি চলে আসবে” বলে বাংলায় পরের নির্বাচনগুলোতে মুসলিম ভোট কারোর একার পক্ষে হাতিয়ে নেওয়া এখন কঠিন। সম্প্রদায়টির মান্যগণ্যরা যতই নিজ নিজ ব্যক্তিস্বার্থ দেখুক, যুবসমাজের একটা সচেতন অংশ কিন্তু আনিস-সম সাহসে ইতিমধ্যেই বলীয়ান। এ ব্যাপারে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলন দিশারীর ভূমিকায়।

দুঃখ একটাই, আনিস হত্যার পর মুখ্যমন্ত্রী অনেক কথা বলেছেন, তাঁর দলের ছাত্রসংগঠন পথেও নেমেছে। কিন্তু প্ৰতিহিংসার রাজনীতিতে লাগাম দেয়ার জন্য তৃণমূল কী কী পরিবর্তন আনবে নিজের দলীয় সংস্কৃতিতে — তা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বা অন্য কারো মুখ থেকে এখনো কিছুই শোনা যায়নি। আনিস খান অসহিষ্ণুতার রাজনীতি প্রতিরোধ করতে গিয়ে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার নিশানায় পরিণত হয়েছিল। এত অসহায় পরিণতি যেন আর কারো না হয়।

নিবন্ধকার অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেন। মতামত ব্যক্তিগত

আরো পড়ুন

জীবিত আনিসের চেয়ে মৃত আনিসকে বেশি ভয় পাচ্ছে মমতা সরকার?

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.