মাঝেমধ্যে এমন সময় আসে, যখন দিনগুলো লম্বা হয়ে যায়। কয়েকটা সপ্তাহ বা মাসে যা ঘটতে পারত, একটি দিন নিজের শরীরে তার সবটুকু ধারণ করে। এরকম সময়ে একটা সপ্তাহ এক বা একাধিক মাসের মতো হয়ে ওঠে। একটা মাস হয়ত হয়ে ওঠে বছরের সমান। এক বা দেড় বছরে পেরিয়ে আসা যায় কয়েক দশক।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন ক্রান্তিকাল বেশ কয়েকবার এসেছে। আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দি সেনাদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন, ১৯৫৯ সালের খাদ্য আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক গণআন্দোলন, নকশালবাড়ি। বড় বদলের সম্ভাবনার সূচনা হয়েছিল একটা ছোট্ট ফুলকিকে কেন্দ্র করে। ক্রমশ সেই ঘটনা বড় হতে থাকে, আরও বড় হতে থাকে, অমিত সম্ভাবনার জন্ম দেয়। খুব পিছনে তাকানোর দরকার নেই। ২০০৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৭ সালের ১৪ মার্চ — এই সাড়ে পাঁচ মাসে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি কয়েক দশক পেরিয়ে আসার সম্ভাবনা তৈরি করতে পেরেছিল। তবে সম্ভাবনা তৈরি হলেই যে সব সময় তার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটবে,এমন তো হয় না। কামদুনির সময়টা যেমন। প্রবল সম্ভাবনাময় একটা সময় শেষ পর্যন্ত গতিমন্থরতায় ভুগে নিঃশেষ হয়ে গেল।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সম্ভাবনার জন্ম দেয় সময়। তাকে যত্ন করে, লালনপালন করে বড় করে সচেতন রাজনৈতিক শক্তি। বিস্ফোরণের জন্ম দেয় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও প্রত্যাশা। এক পর্যায় থেকে আরেক পর্যায়ে উত্তরণ সম্ভব হবে কিনা তা নির্ভর করে রাজনৈতিক শক্তির বিচক্ষণতা এবং দায়বদ্ধতার উপর।

এত কথা বলার কারণ একটাই। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা আনিস খানের মৃত্যু এক বিপুল সম্ভাবনাময় পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। গত ১২ বছরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এমন সম্ভাবনাময় লগ্ন আর আসেনি। সারদা সহ চিটফান্ড দুর্নীতির সময়ও রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস দল এবং তাদের সর্বোচ্চ নেত্রীর প্রতি আনুগত্য প্রবল ছিল, কামদুনির সময়েও তাই। সাড়ে তিন দশকের শাসক বামপন্থীদের প্রতি জনগণের বীতরাগ তখনও সম্পূর্ণ দূরীভূত হয়নি। ২০১৫ সালের হোক কলরব আন্দোলন শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে নিঃসন্দেহে আলোড়িত করেছিল, কিন্তু গ্রামাঞ্চলে তার প্রভাব ছিল কম। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সমাজে হোক কলরব কার্যত কোনো দাগ কাটতে পারেনি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনের ভাষা, উচ্চারণ এবং পদ্ধতির সঙ্গে বাংলার প্রান্তিক এলাকার পড়ুয়াদের তেমন কোনো আত্মিক সংযোগ ছিল না। ঐতিহাসিক মহামিছিলে বিভিন্ন জেলা থেকে কাতারে কাতারে ছাত্রছাত্রীরা সমবেত হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্ত খুব দ্রুতই তাঁরা ছিটকে যান। মহামিছিলের এক মাস পূর্তিতে আরও একটি মিছিলের ডাক দেওয়া হয়, তাতে লোকজন বিশেষ হয়নি। এরপর ক্রমশ আন্দোলনটি যাদবপুরকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে।

২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল জয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেস দল একদিকে রাজ্যে নিজেদের শাসনকে আরও শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে চেয়েছিল। অন্যদিকে দলের অন্দরে দ্রুত প্রবল উত্থান হয় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন কার্যত তৃণমূলের একচেটিয়া হিংস্র দখলদারির সামনে বিরোধী বাম-কংগ্রেসের অসহায় আত্মসমর্পণের ছবি সামনে আনে। জেলায় জেলায় যে সব পকেটে বাম ও কংগ্রেস শক্তিশালী ছিল, ক্রমশ সেখান থেকে উবে যেতে শুরু করে। পুলিশ, প্রশাসন ও তৃণমূলের ঐক্যবদ্ধ শক্তি গ্রামাঞ্চলে কার্যত শ্বাসরোধকারী অবস্থার জন্ম দেয়। এই অস্বাভাবিক অবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের সার্বিক ক্ষোভের প্রকাশ ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফল। বিজেপির বিপুল সাফল্য আদতে বাম-কংগ্রেসের অপদার্থতা, প্রতিরোধ গড়তে না পারা এবং তৃণমূলের গণতন্ত্র হত্যার বিরুদ্ধে রায়। নিঃসন্দেহে বিজেপি-আরএসএসের হিন্দুত্ববাদী প্রচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, কিন্তু বিরোধী ভোট পদ্মফুলে জমাট বাঁধার নেপথ্যে ছিল এই বিশ্বাস — একমাত্র বিজেপিই পারে তৃণমূলকে রুখতে।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল এই বিশ্বাসকে চূর্ণ করে দিয়েছে। বিজেপি থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে নেতার তৃণমূলের ফিরে আসা নিঃসন্দেহে রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে বিরক্ত করেছে। বাবুল সুপ্রিয়র মতো আগমার্কা দাঙ্গাবাজ যখন জার্সি বদলে ফেলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তৃণমূলের মুসলিম জনভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় স্তরে তৃণমূল নেতাদের দাদাগিরি, দুর্নীতি, সবরকম বিরোধী মতকে গলা টিপে মারার চেষ্টা। বিজেপির জুজু না থাকায় মুসলিম সমাজের মধ্যেও তৃণমূলের প্রতি নিরুপায় সমর্থন কমছে। বামপন্থীরা শূন্য হয়ে যাওয়ার পর খানিকটা হলেও সক্রিয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। সেইসঙ্গে এমন কিছু ঘটনা ঘটছে যা বার বার ২০০৬ সালের শেষ লগ্ন বা ২০০৭ সালের গোড়ার দিকের কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছে।

একদিকে দেউচা পাঁচামির আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের রক্তচাপ বাড়ছে। নাগরিক সমাজের প্রতিবাদীদের জোর করে আটকানো হচ্ছে, হোটেল থেকে পিটিয়ে বের করে দেওয়া হচ্ছে। প্রসেনজিৎ বসুর মতো বিদগ্ধ অর্থনীতিবিদকে খুনের মামলা দিয়ে জেলে ঢোকানো হয়েছে। অন্যদিকে আদিবাসীরাও জবাব দিচ্ছেন। প্রসেনজিৎদের হেনস্থা করায় তৃণমূলের কয়েকজন নেতা, যাঁরা স্থানীয় স্তরে অত্যন্ত প্রভাবশালী, তাঁরাও আক্রান্ত হয়েছেন বলে খবর। অর্থাৎ চাকাটা কিন্তু ঘুরছে। খুব ধীরে হলেও ঘুরছে।

অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস দলটা মোটামুটি আড়াআড়ি বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। একদিকে পার্থ চট্টোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম, সুব্রত বক্সীর মতো প্রবীণ নেতারা, অন্যদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর যুব বিগ্রেড। প্রতিটি জেলায়, প্রতিটি ব্লকে ‘মাদার’ এবং ‘যুব’ তৃণমূলের সমান্তরাল সংগঠন। খোদ দলনেত্রী এই বিবাদ মেটাতে নাজেহাল।

বিধানসভায় বিপুল জয়ের পর যখন ভিতরে-বাইরে একাধিক সমস্যায় তৃণমূল উদ্বিগ্ন, তখন রাজ্য রাজনীতির মঞ্চে ছায়া ফেলল এক মৃতদেহ। আনিস খানের লাশের ছায়া ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে, অসংখ্য সম্ভাবনার জন্ম দিচ্ছে। কেবল শাসক নয়, বিরোধীদের কাছেও নানা কারণে অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে।

আনিস হত্যার বিচার চেয়ে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে ভয় পাচ্ছে তৃণমূল। এটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। হাওড়া গ্রামীণের পুলিশ সুপারকে ভবানী ভবনে ডেকে পাঠানো, রাজ্য পুলিশের ফেসবুক পেজে পোস্ট করে তদন্তে সাহায্য করা এবং পুলিশের উপর ভরসা রাখার জন্য আনিসের পরিবার ও জনতার কাছে আর্জি, দুই পুলিশকর্মীর গ্রেফতার, মুখ্যমন্ত্রীর “ফেভারিট ছেলে” তত্ত্ব, আমতা থানার ওসিকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া — একের পর এক ঘটনায় স্পষ্ট যে সরকার চরম অস্বস্তিতে রয়েছে। অস্বস্তির কারণটাও স্পষ্ট। বিজেপির জুজু দেখিয়ে মুসলিম সমাজের যে বিপুল সমর্থন তৃণমুল পেয়েছিল, তাতে চিড় ধরছে। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে আসে। তাদের হাত ধরে ক্রমশ সরকার বিরোধিতার আঁচ বাড়ছে। কোনো বিরোধী দলের নেতৃত্ব ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ হচ্ছে, হাজার হাজার সংখ্যালঘু মানুষ তাতে সামিল হচ্ছেন। রাজ্য সরকার এবং তার সর্বোচ্চ পদাধিকারী এই সঙ্কেত বুঝতে ভুল করেননি। যদি আনিসের বিচারের দাবিতে আন্দোলন এভাবেই এগোতে থাকে, তাহলে তা বিদ্যমান রাজনৈতিক আধারের জন্ম অপেক্ষা না করে নিজেই নতুন আধার নির্মাণও করতে পারে। একথা স্পষ্ট যে, সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরীর মতো নেতাদের আর কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই৷ তাঁরা যে কার্যত সরকারের রাবার স্ট্যাম্প হয়ে গিয়েছেন, তা সংখ্যালঘু সমাজ বুঝে ফেলেছে।

তবে আনিসের লাশ যে বিরোধীদেরও মুশকিলে ফেলেনি তা নয়। বিজেপির অস্বস্তি সহজবোধ্য। এনআরসি বিরোধী আন্দোলনের কর্মীর খুনের বিচার চাইতে তাদের ঢোঁক গিলতে হচ্ছে। দিলীপ ঘোষ স্পষ্টই বলেছেন, মুসলিম বলেই আনিসকে নিয়ে এত হইচই। শুভেন্দু অধিকারী বিচারের দাবি তুললেও তেমন সোচ্চার নন। অন্যদিকে বামপন্থীরা রাজপথের দখল নিয়েছেন। যা প্রতিবাদ হচ্ছে তা মূলত বাম ছাত্র-যুবদের ব্যানারে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে স্বতঃস্ফূর্ত সংখ্যালঘু জনতার প্রতিবাদ ‘ভ্যানগার্ড’ ছাত্র-যুবদের আন্দোলনকে পিছনে ফেলে দিচ্ছে। বৃহস্পতিবার আমতা থানায় আনিসের পরিবার ও পড়শিদের বিক্ষোভের যা মেজাজ ছিল, তা এখন অবধি দক্ষিণ কলকাতা বা জেনএনইউ-এর ছাপমারা অভিজ্ঞ ছাত্রনেতারা দেখাতে পারেননি। প্রশ্ন জাগে, এত বড় ঘটনার পরপরই বামফ্রন্ট কি পারত না হাওড়া গ্রামীণ এলাকায় ধর্মঘট ডাকতে? ঘটনার পরদিনই কি অবরুদ্ধ হওয়ার কথা নয় লালবাজার বা ভবানী ভবন?

আনিস কোন দল করতেন, তা নিয়ে গবেষণা চলছে। আনিসকে কখনো এআইএসএফের মিছিলে, কখনো বামেদের ব্রিগেডের মঞ্চে, কখনো সিপিআইয়ের প্রচারে, কখনো ছাত্র পরিষদের সভায়, কখনো ‘বিপ্লবী বাম’ মিছিলে দেখা গেছে। আসলে আনিস পশ্চিমবঙ্গের সেই লক্ষ লক্ষ ছাত্র-যুবর প্রতিনিধি, যাঁরা জীবনের প্রতিদিনের জ্বলন্ত সমস্যাগুলোর প্রতিকার চেয়ে তীব্রভাবে আঁকড়ে ধরতে চান তৃণমূল-বিজেপি বিরোধী গণআন্দোলনের পতাকা। তাই আনিসকে কোনো দলই পুরোপুরি করতে পারেনি। আনিসের মৃত্যু যে অমিত সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে, তাকে কি ধারণ করতে পারবে তথাকথিত সচেতন রাজনৈতিক শক্তিগুলো?

আরো পড়ুন

আনিস খান হত্যা: যেটুকু জানি

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.