২০১৪ সালে রানী রাসমণি রোডে বিজেপির উত্থান দিবসের সভা থেকে মমতা ব্যানার্জিকে উদ্দেশ্য করে বিজেপির তৎকালীন জাতীয় সভাপতি অমিত শাহ হুঙ্কার দিয়েছিলেন ‘আমি অমিত শাহ, বিজেপির একজন ছোট কর্মী। আমি তৃণমূলকে বাংলা থেকে উৎখাত করতে এসেছি। এই সভা দেখিয়ে দিচ্ছে যে আপনার (সরকারের) দিন গোনা শুরু হয়ে গেছে।’
এক দশকে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। দুটো বিধানসভা এবং দুটো লোকসভা নির্বাচন পেরিয়েছে। সেদিন যে বিজেপির একজনও বিধায়ক ছিল না পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায়, তারা এখন রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল। এক ডজন সাংসদ হয়েছে। এই এক দশক পেরিয়ে কলকাতায় ২০২৫ সালের বছর শেষের সাংবাদিক সম্মেলন থেকে সেই শাহ আবার ঘোষণা করেছেন যে, বিজেপির সঙ্গে তৃণমূলের কোনো সেটিং নেই। বরং তাঁরা মমতা ব্যানার্জির সরকারকে উৎখাত করতে বদ্ধপরিকর।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
২০১৪ সালের সেই সভায় শাহ সারদা দুর্নীতি থেকে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী — সব বিষয়ই রেখেছিলেন। সেই দুর্নীতি ও অনুপ্রবেশ এখনো বিজেপির কাছে বড় ইস্যু। গত ১০-১২ বছরে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, সরকারের বিপক্ষে আদালতের নির্দেশ এবং নানা অভিযোগে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা, বিধায়ক, সাংসদ, মন্ত্রীদের গ্রেফতারির সংখ্যা লাফে লাফে বেড়েছে। অনুপ্রবেশের ইস্যু এখন ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় এসে ঠেকেছে।
গতি ধীর হলেও, দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলায় কেন্দ্রীয় সংস্থার তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, বিজেপির সাংগঠনিক শক্তির দুর্বলতা নিয়ে সমস্যা থাকলেও, বিজেপি কিন্তু লক্ষ্যে অবিচল।
আমরা এখন ‘আগে রাম, পরে বাম’ তত্ত্ব নিয়ে চর্চা করলেও, মমতা যখন ক্ষমতায় আসার মুখে, তখন থেকেই বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের চর্চায় ছিল ‘আগে বাম, পরে রাম’। বহু বিজেপি নেতার সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে আসত – আগে বামেদের হটাক মমতা, তারপর বিজেপি ক্ষমতার জন্য ঝাঁপাবে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পরে বিজেপি-আরএসএসের ‘পুবে দেখো’ নীতি সেই ক্ষমতার লক্ষ্যেই বিজেপিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
বিজেপি নেতারা এ ব্যাপারে সদা সতর্ক যে যদি মমতা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়, তাহলে বিরোধী পরিসরে যেন এমন কোনো রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি না হয় যাতে বামেরা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠে সেই শূন্যতা পূরণ করে ফেলে। কাজেই বিজেপির কাছে মমতাকে ক্ষমতাচ্যুত করা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ বামেদের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া। একথা মাথায় রাখলে প্রশ্ন হল, ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন — যা নতুন বছরের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঘটনা হতে চলেছে — সেখানে কি বিজেপি এবার সর্বশক্তি দিয়ে মমতাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ঝাঁপাবে?
এটা ঠিক যে মমতাকে নিয়ে আরএসএসের অখুশি হওয়ার কোনো কারণ নেই। মমতা সরকার ক্ষমতায় আসার পরে এই রাজ্যে আরএসএসের সংগঠন ও কাজকর্ম যেভাবে বেড়েছে তাতে গেরুয়া শিবির অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। একইসঙ্গে, যে মমতার হিজাব পরা ছবি রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেখা যেত, তিনিই এখন আলোচনার শিরোনামে থাকেন জগন্নাথধাম, মহাকাল মন্দির ও দুর্গাঙ্গনের জন্য। মুর্শিদাবাদে হুমায়ুন কবীরের মসজিদ তৈরির ডাক থেকেও তিনি কৌশলে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। দলের বিধায়ক হলেও হুমায়ুনকে সাসপেন্ড করেছেন। যে হারে মমতা মন্দির তৈরির ডাক দিচ্ছেন, সেখানে একটা নতুন মসজিদ তৈরি করার কথা বলার কোনো জায়গাই নেই তৃণমূল নেত্রীর জন্য।
আরো পড়ুন রামনবমী ঘিরে সাম্প্রদায়িক সংঘাত উস্কে দিচ্ছে বিজেপি, তৃণমূল
কিন্তু ২০২৬ নির্বাচনের ফলাফল কি শুধু মন্দির-মসজিদের রাজনীতি দিয়েই নির্ধারিত হবে? হয়ত নয়। কিন্তু এই রাজনীতিতেই বিজেপি বেড়ে খেলতে পারে। ওটাই তাদের পরিচিত মাঠ। সেখানে তৃণমূল কংগ্রেসকে পরিচিতির রাজনীতিতে টেনে আনতে পারলে সুবিধা বিজেপির। সে কাজই তারা বারবার করছে। সে সন্দেশখালির ঘটনাই হোক বা এসআইআর। আর দেখাই যাচ্ছে, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি বা আরজিকর আন্দোলন বিজেপির পালে হাওয়া টানতে ব্যর্থ হয়েছে।
নির্বাচনে জিততে যে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্যে কয়েকটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ — এক হচ্ছে জনপ্রিয় নেতা। পশ্চিমবঙ্গে মমতাকে জনপ্রিয়তায় টেক্কা দেওয়ার ধারেকাছেও পৌঁছতে পারেননি বিজেপির কোনো নেতা। না, মোদী নিজেও পারেননি। শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রামে মমতাকে হারিয়ে জিতেও গোটা রাজ্যে জনপ্রিয়তার নিরিখে অনেক পিছিয়ে।
দ্বিতীয় বিষয় হল সংগঠন। যে যা-ই বলুন, তৃণমূল স্তরে জোরালো সংগঠন থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত নির্বাচনী রাজনীতিতে সাংগঠনিক শক্তির একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। এসআইআর প্রক্রিয়ার শুরু থেকে তৃণমূল কংগ্রেস সেই শক্তিতেই জনসংযোগে ঝাঁপিয়ে পড়তে পেরেছে। পাড়ায় পাড়ায় থেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে ‘বিজেপি পরিচালিত’ নির্বাচন কমিশন সাধারণ জনগণকে কী বিপদে ফেলেছে। সংগঠনের উপর বিজেপি নেতৃত্ব বারবার জোর দিলেও এখনো তৃণমূলের যে সংগঠন রয়েছে, তার ধারেকাছে বিজেপি পৌঁছতে পারেনি। তাই এসআইআর সংক্রান্ত শুনানির ঘরে তৃণমূলের বুথ স্তরের এজেন্টদের ঢুকতে না দেওয়া নিয়ে অভিষেক ব্যানার্জি যতটা বিচলিত, তার ছিটেফোঁটাও বিজেপি নেতৃ্ত্বের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।
তৃতীয় হল, কর্মসূচি। মমতা যেভাবে বিভিন্ন শ্রী প্রকল্পের মাধ্যমে জনগণের হাতে টাকা তুলে দেওয়ার কর্মসূচি নিয়েছেন, তার বিকল্প বিজেপির কাছে নেই। কারখানা হোক বা না হোক, প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা যতই বাড়ুক, জনগণ হাতে নগদ টাকা পেয়ে খুশি। জনকল্যাণের স্বার্থে এইসব প্রকল্পের গুরুত্ব কতটা, তা যে কোনো দলের মাঠেঘাটে রাজনীতি করা কর্মীরাই বোঝেন। বিজেপি যতই ডবল ইঞ্জিনের সরকারের কথা বলুক, তাতে যে চিড়ে ভেজে না, তা বিগত নির্বাচনগুলোতেই দেখা গেছে। ক্ষমতায় থাকা একটা দলের থেকেও ভাল কোনো বিকল্প এবং কার্যকরী কর্মসূচি সামনে রাখতে না পারলে সেদিক থেকে মানুষের মন জয় করা খুবই কষ্টকর। আর এখন ভারতীয় নির্বাচনী রাজনীতির যা গতিবিধি, তাতে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মত জনমোহিনী প্রকল্পই সবার তুরুপের তাস হয়ে উঠছে। তা সে মহারাষ্ট্রের লাডকি বহিন যোজনা হোক বা বিহারের মহিলাদের জন্য দশ হাজার টাকার প্রকল্প।
এছাড়া আদর্শগত দিক থেকে ভোটারদের মন জয় করাও গুরুত্বপূর্ণ। মোদী যেমন হিন্দুত্ব ও জাতীয়তাবাদকে হাতিয়ার করে এগিয়েছেন বা রাহুল গান্ধী যেমন সংবিধানকে রক্ষা করা বা ‘ভালবাসার দোকান’ খোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এগিয়েছিলেন, সেরকম কোনো তীব্র আদর্শগত অবস্থান নিয়ে বড় অংশের ভোটারকে নিজেদের দিকে টেনে আনাও নির্বাচনী কৌশলের অঙ্গ। এখানে মোদীর জাতীয়তাবাদ বা বিজেপির হিন্দুত্বের ঝংকার কিন্তু গত নির্বাচনে মমতা ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’ বলে থামিয়ে দিয়েছিলেন। এবারেও বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় এলে বাঙালিকে কী কী বিপদের মুখে পড়তে হবে তার বয়ান তৈরি হচ্ছে নতুন করে।
তাহলে নির্বাচনে জেতার জন্য বিজেপির হাতে যা পড়ে রইল তা হল, দীর্ঘকাল ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ। সেটা থাকলে উপর্যুক্ত সব কৌশলই ব্যর্থ বা ব্রাত্য হতে পারে। স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের রসদ অনেক রয়েছে এই বাংলায়। তার ট্রেলার (মূলত শহরাঞ্চলে হলেও) আমরা দেখেছি আরজিকর আন্দোলনের সময়ে। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিও বাংলার বড় অংশের মানুষকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু এর আগের নির্বাচনে দেখা গেছে – দুর্নীতি সরকারের নির্বাচনের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় না।
এই মুহূর্তে বিজেপির হাতে মূল ইস্যু কিন্তু দুর্নীতি নয়। তারা অনুপ্রবেশকারী, সংখ্যালঘুদের থেকে হিন্দুদের বিপদ ইত্যাদিতেই মনোযোগী। এই তথাকথিত বিপদের শঙ্কায় শহুরে মধ্যবিত্তদের অনেকেই প্রভাবিত এবং তৃণমূলের বাপবাপান্ত করছে। হুমায়ুনের মসজিদ নির্মাণ সেই আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছে। সেই অংশের মানুষ (যার মধ্যে বাম সমর্থকদের এক বড় অংশ রয়েছেন) কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাঙালি মাছে ভাতে থাকবে কিনা সে চিন্তা বাদ দিয়ে ভোট দিতে যেতে পারেন। সেখানেই শমীক ভট্টাচার্যের মত শহুরে মধ্যপন্থী মুখকে সামনে রেখে, শুভেন্দু অধিকারীর মত ‘মমতা বেগম’ বলা অধুনা কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতাকে নির্বাচনী ময়দান গরম করতে ছেড়ে রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে মমতার মুসলমান ভোটে ফাটল ধরানোর চেষ্টাও জারি রয়েছে সমান তালে। কারণ সেই ভোটে ভাঙন ধরাতে না পারলে ভোটারদের ৭০ শতাংশের মধ্যে ৪০%-৪২% ভোট পেয়েও বিজেপির ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে না।
সঙ্গে অবশ্যই আছে এসআইআর। খসড়া তালিকা দেখে বোঝার উপায় নেই কতজনের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ যাবে। শুনানির ঘরে তৃণমূল নেতাদের অনুপস্থিতি সেই ধারণা তৈরির পক্ষে বড় বাধা। চূড়ান্ত তালিকার পরে ভোট দোরগোড়ায় চলে আসবে। সেখানে নতুন করে যোগ্য ভোটারদের নাম তোলার কাজের সময় খুবই কম থাকবে। সুতরাং ভোটার তালিকা নড়বড়ে হয়ে গেলে তৃণমূলের বিপদ যে বাড়বে তা নিয়ে সংশয় নেই। সেক্ষেত্রে নির্বাচনে সুবিধা পাবে বিজেপি। সেই বিপদের আশঙ্কায় তৃণমূল নেতৃত্ব সরব হয়েছেন স্বাভাবিকভাবেই।
২০২৬ সালের নির্বাচন আসলে মমতার সাংগঠনিক ক্ষমতা, জনমোহিনী কর্মসূচী, নিজের জনপ্রিয়তা দেখানোর লড়াই নয়। বিজেপির ভরসা কিন্তু মানুষের ক্ষোভ।
এখন বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাঙালিকে মাছ-মাংস খাওয়া তুলে দিতে হবে কিনা বা সংখ্যালঘুদের গলার আওয়াজ আরও লঘু হয়ে যাবে কিনা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি আরও তীব্র হবে কিনা, তৃণমূল ক্ষমতায় থাকলে দুর্নীতি আরও বাড়বে কিনা, সাংবিধানিক সংকট আরও বড় আকার নেবে কিনা — এই সমস্ত বিষয়ের উপরেই এই রাজ্যের ভোটারদের রায় দিতে হবে।
কাজেই ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের লড়াইয়ের ফল মূলত ভোটারদের মনোভাবের উপরেই নির্ভর করবে। রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা শুধু ইন্ধন জোগাবেন। নেতৃত্বের জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক ক্ষমতা, আদর্শগত অবস্থান বা সরকারি কর্মসূচি এবারে গৌণ বিষয়।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








