ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের অভিবাসী শ্রমিকরা দেশের অসংগঠিত ক্ষেত্রের, সংখ্যাগরিষ্ঠ অর্থনীতির মেরুদণ্ড। সম্প্রতি ওড়িশার সম্বলপুরে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনা আবার প্রশ্ন তুলেছে তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও নাগরিকত্বের অধিকারের ক্রমবর্ধমান বিপন্নতা নিয়ে। ২৪ ডিসেম্বরের সন্ধ্যায় মুর্শিদাবাদের যুবক জুয়েল রানা একদল উন্মত্ত জনতার নির্মম আক্রমণে নিহত হন। এই ঘটনা এক ভয়াবহ সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র (আধার) থাকা সত্ত্বেও নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে। অন্যদিকে ধর্ম-ভাষা-অঞ্চলভিত্তিক বিদ্বেষের বিষবৃক্ষ ক্রমশ বড় হচ্ছে।
খবরে প্রকাশ, জুয়েল ও তাঁর দুই সহকর্মী এক চায়ের দোকানে বসেছিলেন। একদল স্থানীয় যুবক প্রথমে তাঁদের কাছে বিড়ি এবং টাকা চায়। তাঁরা সেসব দিতে অস্বীকার করলে আক্রমণকারীরা আধার কার্ড দেখাতে বাধ্য করে এবং ওঁরা বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী বলে সন্দেহ প্রকাশ করে। জুয়েল কার্ড দেখানোর আগেই লোহার রড, বাঁশ ও কাঠের তক্তা দিয়ে প্রচণ্ড প্রহারের শিকার হন। মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে এবং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর দুই সহকর্মীও গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পুলিশ ছজনকে গ্রেফতার করেছে বলেও জানা গেছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে দুটো আলাদা বয়ান সামনে এসেছে।
ওড়িশা পুলিশের বক্তব্য, এই হত্যার কারণ ‘আকস্মিক প্ররোচনা’। সুনির্দিষ্ট আক্রমণ নয়। অর্থাৎ আক্রমণকারীরা আগে থেকে জুয়েলদের মারবে ঠিক করে আসেনি এবং এতে ধর্মীয় বা জাতিগত বিদ্বেষ কাজ করেনি। যদিও জুয়েলের পরিবার, সহকর্মী ও রাজনৈতিক দলগুলো তা মনে করছে না। জুয়েলের মা নাজিমা বিবি ও তাঁর সহকর্মীরা বলেন, এই আক্রমণের স্পষ্ট কারণ হল নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ এবং জুয়েলরা বাংলাদেশী কিনা তা যাচাই করা। পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এই হত্যাকাণ্ডকে ভারতীয় জনতা পার্টির বাঙালিবিদ্বেষী রাজনীতির সরাসরি ফল বলে উল্লেখ করেছে। তারা অভিযোগ করেছে, বাঙালি মুসলমানকে ক্রমাগত অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দেওয়ার বিষাক্ত ভাবনা রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে যাওয়া এমন হিংসাত্মক নব্য হিন্দুত্ববাদী উন্মত্ত জনতার জন্ম দিয়েছে।
বাস্তবিক, জুয়েলের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হয় না। এ এক উদ্বেগজনক বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ।
মাত্র কয়েক মাস আগেই, ওড়িশার ঝাড়সুগুদা ও সম্বলপুর জেলায় প্রায় ৪৫০ জনকে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী ও রোহিঙ্গা শরণার্থী সন্দেহে আটক করা হয়েছিল। একই দিনে (২৪ ডিসেম্বর) ভুবনেশ্বরে, ন্যাশনাল হকার্স ফেডারেশনের বিবৃতি অনুযায়ী, কিছু হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী ক্রিসমাসের জিনিসপত্র বিক্রি করা দরিদ্র হকারকে তাঁদের ধর্মীয় পরিচয় জিজ্ঞাসা করে হয়রান করে এবং হিন্দুরাষ্ট্রের নাম করে ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য করে। ন্যাশনাল হকার্স ফেডারেশন এই ঘটনাকে দরিদ্র জনতার জীবিকা ও ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর উপর সরাসরি হামলা বলে অভিহিত করেছে।
আরো পড়ুন রামমন্দির হল খিদের পাহাড়ের উপর হিন্দুত্ব-কর্পোরেট সৌধ
এইসব ঘটনা আমাদের বেশকিছু গভীর ও অমীমাংসিত প্রশ্নের সামনে এনে দাঁড় করায়। রাষ্ট্রের দেওয়া যাবতীয় পরিচয়পত্র (আধার কার্ড, ভোটার কার্ড) যদি একজন সাধারণ নাগরিকের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য যথেষ্ট না হয়, তাহলে তার শেষ অবলম্বন কী? ভাষা, পোশাক বা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কারা ভারতীয় আর কারা বিদেশী বা অনুপ্রবেশকারী তা বিচার করার অধিকার উন্মত্ত জনতা বা স্থানীয় হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর পুরোপুরি করায়ত্ত হয়ে যাচ্ছে না তো? জীবিকার সন্ধানে নিজের দেশের ভেতরে রাজ্যান্তরে গমনকারী লক্ষ লক্ষ অভিবাসী শ্রমিক কি তাহলে স্থায়ীভাবে সন্দেহভাজন অনাগরিক হয়ে যাচ্ছেন?
জুয়েলদের জন্য ন্যায়বিচার চাই তো বটেই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন এঁদের মর্যাদার নিশ্চয়তা।
জুয়েলের পরিবার ন্যায়বিচার চায় আর হকাররা চান নিরাপদে জীবিকা নির্বাহের অধিকার। তবে এই বিচ্ছিন্ন বিচার বা রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাও এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে বিষাক্ত কথাবার্তা বন্ধ করা। দেশের এক বৃহৎ অংশের নাগরিকের প্রতি ক্রমাগত সন্দেহ ও বিদ্বেষের বীজ বপন করে চলেছে গোদি মিডিয়া এবং বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী নেতা। প্রয়োজন নাগরিকদের মধ্যে এই বোধ জাগানো যে, ভারতীয় পরিচয় কোনো একটা নির্দিষ্ট ভাষা, ধর্ম বা সংস্কৃতির একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। যে যুবক পেটের তাগিদে ঘর ছেড়ে অন্য রাজ্যে কায়িক শ্রম করে, সে যদি সেখানে বিদেশী সন্দেহে প্রাণ হারায়, তাহলে সেই দেশের অন্তঃস্থল যে ঘৃণার অসুখে অসুস্থ হয়ে গিয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। জুয়েলের মৃত্যু কেবল একটা পরিবারের শোকের বিষয় নয়, এই ঘটনা রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসাবে আমাদের সকলের বিবেকের কঠিন পরীক্ষা। আমরা সে পরীক্ষায় পাশ করব কিনা তা ভবিষ্যৎ বলবে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







