আজকাল দেশে এত ঘটনা পরপর ঘটে যায় যে সেসব দুর্ঘটনার ঘনঘটায় সব খবর সবসময় চোখেও পড়ে না, বা অনেকসময় নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের খাতিরে স্বার্থপরের মতই এড়িয়ে যাওয়ার ইচ্ছে জন্মায়। তবে তার মধ্যেও উন্নাও নিয়ে সম্প্রতি যা ঘটে গেল, তা বোধহয় নারীবাদী বা নারী নয়, কোনো সচেতন মানুষের পক্ষেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ অন্ধ হলে তো প্রলয় বন্ধ থাকে না। তাছাড়া গায়ের জোরে আমরা যা-ই প্রমাণ করি না কেন, উন্নাওয়ের ঘটনা বা তার পরবর্তী ঘটনাবলী আজকের ভারতে মোটেই অতি বিরল ঘটনা নয়।

২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশের উন্নাওয়ে এক নাবালিকা নির্মম গণধর্ষণের শিকার হয়। অভিযোগের আঙুল ওঠে তৎকালীন বিজেপি বিধায়ক কুলদীপ সিং সেংগার সহ আরও কয়েকজনের দিকে, যাদের মধ্যে দুজন ছিল পুলিসকর্মী। এক্ষেত্রে পকসো আইন (প্রোটেকশন অফ চিলড্রেন ফ্রম সেক্সুয়াল অফেন্সেজ অ্যাক্ট, ২০১২) লাগু হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু উত্তরপ্রদেশের আদিত্যনাথ সরকার এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। কুলদীপ নিজের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিপত্তির জোরে মেয়েটি ও তার পরিবারকে অভিযোগ ফেরত নেওয়ার জন্যে চাপ দিতে থাকে। মেয়েটির বাবাকে পুলিস এক পুরনো অভিযোগে গ্রেফতার করে এবং লকআপে তাঁর মৃত্যু হয়। মেয়েটি নিজেও এক সন্দেহজনক গাড়ি দুর্ঘটনার মুখে পড়ে। এত চাপের মধ্যেও দমে না গিয়ে, মেয়েটি মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বিচারের দাবিতে গায়ে আগুন দিতে গেলে বাধ্য হয়ে আদিত্যনাথ একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করেন। পরবর্তীকালে কুলদীপ দোষী সাব্যস্ত হয় এবং শেষপর্যন্ত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ফিরে আসা যাক বর্তমানে। ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে দিল্লি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ অধুনা বিজেপি থেকে বিতাড়িত কুলদীপকে জামিন দিয়ে দেয়। জামিন দেওয়ার যুক্তি কী? যাকে বলা হচ্ছে পকসো আইনের ‘হাইপারটেকনিকাল’ দৃষ্টিভঙ্গি। সেংগারের উকিল আদালতে সওয়াল করেন যে, যেহেতু ভারতীয় ন্যায় সংহিতা অনুসারে বিধায়ক সরকারি চাকুরে নন, তাই পকসোর ধারা অনুসারে তাঁকে জনপ্রতিনিধি হওয়ার কারণে অভিভাবক বলে গণ্য করা যায় না। অতএব পকসোর যে ধারা অনুসারে সেংগারের শাস্তি হয়েছে, সেটি এক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। হাইকোর্টের দুই বিচারপতি এই যুক্তি মেনে নিয়েই জামিনের আদেশ দেন। কিন্তু অনেক আইনজ্ঞ দেখিয়েছেন, পকসো আইনের ৪ নম্বর ধারাতেই যে কোনো অপ্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে যৌনাচারে (penetrative sex) লিপ্ত হলে আজীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে দিল্লি হাইকোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চের চোখ এড়িয়ে গেছে সেই ধারা। সুতরাং আইনের ফাঁক গলে কুলদীপ জামিন পেয়ে গেছেন।

আরো পড়ুন নাসার আর ব্রিজভূষণ: যৌন নির্যাতনের আমরা ওরা

স্বাভাবিকভাবেই এই রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে পথে নেমেছেন নির্যাতিতা ও তাঁর মা। বর্তমানে দিল্লিনিবাসী মেয়েটিকে প্রতিবাদ করতে দেখা গেছে দিল্লি হাইকোর্টের সামনেই। অবাক করার মত ব্যাপার হল, রাষ্ট্রের রক্ষীবাহিনী ধর্ষিতা ও তার মায়ের উপরেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে। অবশ্য অবাক হওয়া হয়ত আমাদেরই ভুল, কারণ গত কয়েক বছরে এদেশে অসম্ভব যন্ত্রণাদায়ক সব দৃশ্য তো দেখাই গেছে। ধর্ষকদের সদাচারের জন্য মুক্তি দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত দেখা গেছে, ছাড়া পাওয়ার পর মালা পরিয়ে তাদের বরণ করে নেওয়ার দৃশ্যও আমাদের দেখা হয়ে গেছে। পরে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তাদের জেলে ফিরতে হয়েছে।

কাজেই সেংগারকে স্বাগত জানাতে কিছু অনুগতের উপস্থিতি বা নির্যাতিতা মা, মেয়েকে প্রতিবাদস্থল থেকে পুলিশের টেনে হিঁচড়ে তুলে নিয়ে যাওয়া এদেশে আর নতুন কিছু নয়। নির্যাতিতা মেয়েটির মা বলেছেন, যেহেতু কুলদীপকে জেলে রাখা গেল না, তাই নিরাপত্তার খাতিরে তাঁদেরই যেন জেলে পুরে রাখা হয়। তবে মেয়েটির বাবার আবার জেলেই মৃত্যু হয়েছিল এবং শরীরে নানাবিধ আঘাতের চিহ্নও পাওয়া গিয়েছিল। তাই জেলের মধ্যেও যে ওঁরা নিরাপদে থাকবেন তা মোটেই বলা যায় না।

অর্থাৎ দিনের শেষে দেখা যাচ্ছে, ‘বেটি বচাও বেটি পঢ়াও’ স্লোগানের ঢক্কানিনাদের আড়ালে আসল ছবিটা খুবই বিপজ্জনক। নাবালিকা ধর্ষণের মত অপরাধ, বিচারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা, অভিযোগকারীদের সুরক্ষা বিঘ্নিত করা সত্ত্বেও যদি এমন আইনের ফাঁক খুঁজে অপরাধী মুক্তি পেয়ে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে বিচারব্যবস্থা বা আইনের উপর ভরসা রাখবেন? কীভাবেই বা মেয়েদের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা যাবে? যোগিতা ভায়ানার মত নারী অধিকার কর্মী বা এআইডিডব্লিউ-এর মত সংগঠন এই রায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছে। ইতিমধ্যে নির্যাতিতা এবং তাঁর মা, রাহুল ও সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে কথা বলেছেন। রাহুল নিজের এক্স হ্যান্ডেলে এ বিষয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গেও দেখা করে সমস্যাটি তুলে ধরতে চেয়েছিল নির্যাতিত মেয়েটির, কিন্তু এখন পর্যন্ত সে সুযোগ তাকে দেওয়া হয়নি। জনমানসে গত কয়েক দিনে প্রবল প্রতিক্রিয়া হয়েছে এই ঘটনাবলীতে। তারপর গতকাল সুপ্রিম কোর্ট কুলদীপের জামিন স্থগিত রেখেছে। এখন প্রশ্ন হল, অপরাধ প্রমাণ হয়ে যাওয়ার পরেও একজন অত্যাচারিত মেয়েকে কেন এইভাবে চালিয়ে যেতে হবে? এরকম লড়াই কতজন, কীভাবে করতে পারবেন, সেটাও বড় প্রশ্ন।

সুপ্রিম কোর্ট স্থগিতাদেশ দেওয়ার আগেই কিন্তু বিজেপির মহিলা কর্মী, সমর্থকরা (ভুল পড়েননি) পথে নেমে পড়েছিলেন সেংগারের পক্ষ নিয়ে। অবশ্য এটাও নতুন নয়। ২০১৮ সালে জম্মুর কাঠুয়ায় সে ছোট্ট মেয়েটিকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছিল, তার ধর্ষক ও হত্যাকারীদের সমর্থনে বিজেপির নেতারা পর্যন্ত পথে নেমেছিলেন। তাহলে এদেশের মেয়েরা যাবে কোথায়? এই দেশ কি তবে নারীশূন্য ভূমি হওয়াই উচিত? ভারতের বেটির তো বাঁচার কোনো রাস্তা দেখা যাচ্ছে না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.