মধ্য কলকাতার বাসিন্দা ৫৮ বছর বয়সী একজন মহিলা এই মুহূর্তে নিজের পেট চালানোর কষ্ট নিয়ে কম ভাবছেন। বেশি ভাবতে হচ্ছে তাঁর নাগরিকত্ব থাকবে কি থাকবে না তাই নিয়ে। তিনি বিভিন্ন বাড়ির কাজের লোক। নির্বাচন কমিশন থেকে তাঁকে এবং তাঁর ছেলেকে ৩ জানুয়ারি (শনিবার) শুনানিতে ডাকা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার চলতি বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর (এসআইআর) অংশ হিসাবে। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক সেই মহিলা বললেন ‘আমি কসবায় জন্মেছিলাম ১৯৬৭ সালে। আমার বাবা এসেছিল উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর থেকে। আমার যখন ১৮-১৯ বছর বয়স, তখন বাবা মারা যায়। মা মারা গেছিল মায়ের নিজের গ্রামে। এখন আমার রোজ উদ্বেগের মধ্যে কাটছে।’
তাঁর উদ্বেগের কারণ তাঁর নাগরিক পরিচয় নয়, কাগজপত্রের অভাব। যার অনেকগুলো এমনভাবে হারিয়েছে যে ওঁর কিছু করার ছিল না। ‘মোটামুটি ২৫ বছর আগে আমরা ঘুটিয়ারিতে চলে আসি। আমার বরের মনের অসুখ ছিল আর প্রচুর মদ খেত। সে চিত্তরঞ্জন হাসপাতাল থেকে হারিয়ে যায়। ছমাস পরে আমার এক ছেলে রেল অ্যাকসিডেন্টে মরে যায়। ওর মোটে ১৭ বছর হয়েছিল। সেবছর কলকাতায় বন্যা হয়েছিল। আমরা একটা কাঁচাবাড়িতে থাকতাম। আমার বাবা-মা, বরের অনেক কাগজ তখন নষ্ট হয়ে গেছে। তখন কোনোমতে বাঁচার চেষ্টা করেছি, কাগজ বাঁচানোর কথা তো ভাবিনি।’
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
তিনি আরও বললেন যে গত কয়েক বছরে আমফানের মত বারবার আসা প্রাকৃতিক দুর্যোগ অসুবিধা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ‘আমার বাবা-মায়ের পরিচয় দেয়ার মত পুরনো কাগজপত্তর আমার কাছে নেই। তবে আমার প্যান কার্ড, আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড আছে।’
এই মহিলার অবস্থা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পশ্চিমবঙ্গের এক বড় অংশের ভোটার এখন এসআইআর প্রক্রিয়ার কারণে এই ধরনের অসুবিধায় পড়েছেন।
কারা আতসকাচের নিচে এবং কেন?
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার প্রথম খসড়া থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আরও ১.৬৭ লক্ষ ভোটারের নাম খসড়ায় রয়েছে, যাঁরা যাচাইয়ের নোটিস পাবেন বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন চিহ্নিত করেছে যে এর মধ্যে ৩১ লক্ষ ভোটারের ম্যাপিং হয়নি আর ১ লক্ষ ৩৬ কোটি ভোটারের ‘লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ (যৌক্তিক অসঙ্গতি) রয়েছে। দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজের প্রতিবেদন বলছে, প্রথম পর্যায়েই প্রায় ১০ লক্ষ ভোটারকে শুনানির নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বিহারে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া প্রথম খসড়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল। পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু ভোটার যাচাই প্রক্রিয়া দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায় জুড়ে চলবে। অর্থাৎ খসড়ায় নাম আছে মানেই যে চূড়ান্ত তালিকায় একজন ভোটারের নাম থাকবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
আরো পড়ুন মানুষকে আরও বিপদে ফেলবে নয়া অভিবাসন ও বিদেশি আইন
নির্বাচনী আধিকারিকরা এ পর্যন্ত বুথ লেভেল অফিসারদের মাধ্যমে প্রায় ৩২ লক্ষ নোটিস পাঠিয়েছেন অসঙ্গতির কারণে। বাকি নোটিসগুলো, যা যাবে ১ কোটি ৬৭ লক্ষ ভোটারের বেশিরভাগের কাছে, সরাসরি মুখ্য নির্বাচনী অফিসার পাঠাবেন।
কেন ভোটাররা নোটিস পাচ্ছেন?
আধিকারিকরা বলছেন, নোটিস দেওয়া হচ্ছে মোটামুটি তিনরকম কারণে – ১) যেখানে ভোটাররা বাবা-মায়ের বদলে ঠাকুর্দা-ঠাকুমা বা দাদু-দিদিমার সঙ্গে লিংকড, ২) যেখানে একজন বাবার নামের সঙ্গে ছয় বা তার বেশি সন্তান লিংকড, ৩) বয়সজনিত ধারাবাহিকতার অভাব, যেমন বাবার সঙ্গে সন্তানের বয়সের তফাত ১৫ বছরের কম অথবা ৫৫ বছরের বেশি।
কিন্তু ভোটাররা এবং গবেষকরা বলছেন, বহু অসঙ্গতির কারণ প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত ভুল, মোটেই ভোটারদের তরফে তথ্য বিকৃতি নয়।
পুরনো ভোটার তালিকায় নতুন ভুল: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আশ্চর্য কীর্তি
বড় অংশের নোটিসের কারণ ২০০২ সালের ভোটার তালিকা, যা তৈরি করা হয়েছিল বাংলায়। পরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ইংরিজি করা হয়েছে। বহু ক্ষেত্রে এর ফলে নাম বিকৃত হয়ে গেছে। যেমন নিমাই ব্যানার্জি নামের একজন ভোটার নোটিস পেয়েছেন, কারণ তাঁর বাবার নাম হয়ে গেছে ‘Byneerjnzee’। রানা বণিক নামে আরেকজন ভোটারের বাবা চন্দন বণিকের পদবি বদলে হয়ে গেছে ‘Vanek’, ফলে তিনি অসঙ্গতির নোটিস পেয়েছেন।
এখন ভোটারদের এমন ভুলের ব্যাখ্যা দিতে বলা হচ্ছে বা সংশোধন করতে বলা হচ্ছে, যে ভুল তাঁরা করেননি এবং যার উপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণও নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে দ্বিতীয় পর্যায় পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক হতে চলেছে
সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব, যিনি সুপ্রিম কোর্টে বিশেষ নিবিড় সংশোধনী প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে আপত্তি করেছিলেন, সম্প্রতি কলকাতায় এসে সতর্ক করে গেছেন যে দ্বিতীয় পর্যায় পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের পক্ষে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে চলেছে।
এই প্রক্রিয়ার উপর নজর রাখছেন এমন এক গবেষক বললেন ‘প্রথম খসড়ায় ৫৮ লাখ ভোটারের নাম কাটা নিরাপদ ব্যাপার ছিল, যেটা বিএলও-দের দিয়ে করানো হয়েছে। অনেকের ধারণা, খসড়ায় নাম আছে মানেই বিপদ কেটে গেছে। এটা ধরে নেওয়া ভুল। আসল পরীক্ষা হল নোটিসের এমন জবাব দিতে পারা যা কর্তৃপক্ষকে সন্তুষ্ট করতে পারে। প্রশ্ন হল, কতজন ভোটার সেটা করতে পারবেন? বিশেষ করে গরিব মানুষ, বয়স্ক মানুষ, প্রবাসী শ্রমিক এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আক্রান্ত মানুষ কি পারবেন?’
তিনি আরও একটা বড় দুশ্চিন্তার কথা বললেন। ‘যদি একজন ভোটারের নাম চূড়ান্ত তালিকায় না থাকে, তাহলে তাঁর নাগরিকত্ব বা ভোটাধিকার প্রমাণ করার কোনো কার্যকরী উপায় নেই।’
দেখুন এসআইআর নিয়ে আমাদের পডকাস্ট
উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত
জানা যাচ্ছে যে কোনো কোনো এলাকায় একেকটা বুথে শতাধিক ভোটার নোটিস পেয়েছেন। সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত জেলা হল উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা।। শুনানি প্রক্রিয়া লক্ষ লক্ষ ভোটারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে, বিশেষ করে তাঁদের যাঁরা জীবনে বহুবার জায়গা বদল করেন, দারিদ্র্যের মধ্যে কাটান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হয়েছেন এবং প্রশাসনিক অবহেলার শিকার হন।
মধ্য কলকাতার ওই ৫৮ বছর বয়সী পরিচারিকার মত অনেকেই এজন্যে ভীত নন যে তাঁরা আসলে বিদেশি। তাঁরা ভীত এই ভেবে যে প্রমাণ করে উঠতে পারবেন না তাঁরা বিদেশি নন।
মূল প্রতিবেদন: ইনিউজরুম
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








