সালটা ২০২০। অক্টোবর মাস। বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে নিয়ে পুলিসের সঙ্গে রীতিমত যুদ্ধ করে তিনি উত্তরপ্রদেশের হাথরসে পৌঁছে গিয়েছিলেন। গণধর্ষণে মৃতার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। সংবাদমাধ্যমে তিনি বলেছিলেন, হাথরসে গিয়ে পরিবারের দুঃখ ভাগ করে নেওয়া থেকে পৃথিবীর কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না। সংবাদপত্রের খবরে প্রকাশ পেয়েছিল, প্রিয়াঙ্কা মৃতার মাকে জড়িয়ে ধরে তাঁর চোখের জল মুছিয়ে দিয়েছিলেন। আজ প্রায় চারবছর পরে তিনি বা তাঁর বোন কেউই কলকাতার দিকে একবার তাকালেন না! একজন তরুণী ডাক্তারি ছাত্রীর সরকারি হাসপাতালে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় শুধু একটি দায়সারা, আনুষ্ঠানিক টুইট। করেই তিনি নিজেকে সরিয়ে রাখলেন গোটা ঘটনা থেকে। গণবিক্ষোভের আঁচ তাঁদের স্পর্শও করল না। মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ না হোক, ডাক্তারদের এবং নারী সুরক্ষা নিয়ে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ, পরামর্শ বা পরিকল্পনার কথাও শোনা গেল না তাঁর থেকে! বরং তাঁর নিজের লোকসভা কেন্দ্রে এক দলিত যুবককে গুলি করে মারার ঘটনায় পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে গিয়ে সাংবাদিকদের আর জি কর নিয়ে প্রশ্নের মুখে, দলিত যুবকের হত্যা ছাড়া অন্য কোনো বিষয় নিয়ে মন্তব্য করবেন না বলে জানালেন। তিনি রাহুল গান্ধী।

চারবছর আগে তখন সামনে উত্তরপ্রদেশে নির্বাচন ছিল। তাঁর দলের অবস্থা সেইসময় মোটেই ভাল ছিল না। তিনিও সদ্য হয়ে যাওয়া ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে আমেথি থেকে ভোটে লড়ে হেরে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয় আসন কেরলের ওয়ায়নাড় থেকে জিতে সাংসদ হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু কংগ্রেস লোকসভায় বিরোধী দলের মর্যাদাটুকুও পায়নি।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এখন কিন্তু রাহুল লোকসভার বিরোধী দলনেতা। কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর আর মণিপুর থেকে মুম্বাই পর্যন্ত জোড়া ভারত জোড়ো যাত্রা করে তিনি নিজের ভাবমূর্তিতে আমূল পরিবর্তন এনেছেন। বিজেপির ধারে কাছে পৌঁছতে না পারলেও, লোকসভায় নরেন্দ্র মোদীর দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া আটকে দিয়েছেন। সেই উত্তরপ্রদেশেই তিনি সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে জোট করে কাজটি সুসম্পন্ন করেছেন। আর কিছু না হোক, তিনি মোদীবিরোধীদের মনে আশা জাগিয়েছেন যে মোদীর রথও রুখে দেওয়া যায়।

সেই রুখে দেওয়ার কাজে যাঁরা সাহায্য করেছেন তাঁদের অন্যতম মমতা ব্যানার্জি। সেই কৃতজ্ঞতার বশেই কি রাহুল আর জি কর নিয়ে এই গণআন্দোলন থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখছেন? যাতে তৃণমূল সরকারকে কোনো বিড়ম্বনায় না পড়তে হয়? তাহলে তো বলতে হয় ‘রাজনীতি’ রাহুলই করলেন। মোদীর সঙ্গে তাঁর কী ফারাক রইল? ক্ষমতা দখল বা ক্ষমতায় টিকে থাকার রাজনীতি তো রাহুলের কাছে দেখতে চায়নি তাঁর প্রতি ভরসা রাখা জনতা। ভবিষ্যতে যাতে ইন্ডিয়া জোটে কোনও আঁচড় না লাগে, দরকারে তৃণমূলের সমর্থন তাঁর দিকেই থাকে, তা নিশ্চিত করতে দেশের বিরোধী দলনেতা এমন একটি ইস্যু থেকে নিজেকে দূরে রাখবেন!

অবশ্য এমন সুবিধাবাদী রাজনীতি তো নতুন নয়। যিনি নিজের দলের সাতবারের সাংসদ, গত লোকসভায় কংগ্রেসের দলনেতা, পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরীর ‘হাত’ ছেড়ে দিতে পারেন শুধু মমতাকে চটাবেন না বলে, তিনি আর জি কর কাণ্ডে যে এমনটা করবেন, তা আর নতুন কী? পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের সঙ্গে আসন সমঝোতা হয়নি রাহুলের দলের। তবুও মমতা বিজেপির আসন সংখ্যা কমাবেন – এই আশায় রাহুল ২০২৪ নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে একটি নির্বাচনী সভা করতে পর্যন্ত আসেননি। বরং মমতার বিরুদ্ধে মন্তব্য করায় অধীরকে দল থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন রাহুলের আস্থাভাজন, সর্বভারতীয় কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে।

মনে রাখতে হবে, সেদিন হাথরসে যে প্রতিনিধি দল রাহুলের সঙ্গে গণধর্ষণে মৃতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল, সেই দলে ছিলেন অধীরও। আজ সেই অধীর ভোটে হেরে গিয়েও কংগ্রেসের সীমিত শক্তি নিয়ে আর জি কর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন, অথচ রাহুল নীরব।

কিন্তু এ তো রাজনৈতিক কৌশলের খেলা। সারা দেশের একটি অঙ্গরাজ্যের আঞ্চলিক দলকে বিরক্ত না করার কৌশল। অথচ আর জি কর মেডিকাল কলেজের এই নৃশংস ঘটনা যে সারা দেশের ডাক্তারদের আন্দোলনের পথে যেতে বাধ্য করল, পশ্চিমবঙ্গের জনগণকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করল, ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা ছাপিয়ে দুর্নীতি ও সরকারি স্বজনপোষণের কীর্তি সামনে এল, সেই আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর কথা একবারও ভাবলেন না রাহুল! মমতার বিরুদ্ধে কথা বললেই বিজেপি শক্তিশালী হয়ে যাবে — শুধু এই অঙ্ক কষেই চুপ করে মুখ ফিরিয়ে রইলেন রাহুল! এই রাহুলই তো সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে সুর চড়ান তাঁর ভাষণে — সংসদের বাইরে হোক বা ভিতরে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উদাহরণ তুলে আনেন। সেই রাহুল একটিবার মৃতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করার কথাও ভাববেন না?

আরো পড়ুন কতটা পথ পেরোলে পরে ভারত পাওয়া যায়?

রাহুল ভাবতে পারেন, তিনি কোনো কড়া অবস্থান নিলে এই গণআন্দোলনের চরিত্র বদলে যেতে পারে দলীয় রাজনীতির সংস্পর্শে। কিন্তু যেখানে বিজেপি ও সিপিএম এর থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে, সেখানে দেশের বিরোধী দলনেতা কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য রাখবেন না এ কেমন করে হতে পারে? এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়ালে রাহুল রাজনীতি করছেন বলে অবশ্যই ঝাঁপিয়ে পড়ত তৃণমূল কংগ্রেসও। যার প্রভাব দিল্লির সংসদীয় রাজনীতিতেও পড়ত। কিন্তু রাহুলের রাজনীতি কি কেবলই বিজেপিবিরোধী? মানবতার সপক্ষে নয় তাঁর রাজনীতি? তিনি সাধারণ মানুষের প্রতিষ্ঠানবিরোধী ক্ষোভকে সমর্থন করবেন না? যে গণআন্দোলন থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, নারী সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তাকে স্বীকৃতি দেবেন না?

তিনিই তো ভারত জোড়ো যাত্রাকে দলীয় রাজনীতির বাইরে নিয়ে গিয়ে একটি মানবিক জনআন্দোলনের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। যখন দলীয় রাজনীতির বাইরে একটি গণআন্দোলন গড়ে উঠছে, তাঁর কি দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না, দেশের বিরোধী দলনেতা হিসাবে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সেই আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানো? নাকি এই রাজ্যে তাঁর নিজের দলের অস্তিত্ব নেই বলেই তিনি পাত্তা দিচ্ছেন না এই ঘটনা সংক্রান্ত আন্দোলনকে, তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের একেবারে বাইরে রাখছেন পশ্চিমবঙ্গকে? এই রাজ্য কি এই দেশের অংশ নয়?

শুধু তৃণমূলের সমর্থনের উপর কতটা ভরসা করা যায়, সেই অভিজ্ঞতা রাহুলের আছে নিশ্চয়ই। ইন্ডিয়া জোটের শুরুতে উদ্যোগী হলেও মমতা যেভাবে একলা চলো রে নীতি নিয়েছিলেন, তা নিশ্চয়ই এত সহজে ভুলে যাননি রাহুল। অথচ পশ্চিমবঙ্গের এত বড় একটি ঘটনা থেকে নিজেকে সন্তর্পণে সরিয়ে রেখে রাহুল দেশের বিরোধী দলনেতা হিসাবে সংকীর্ণ রাজনীতি করছেন। এ তাঁর পরিবর্তিত ভাবমূর্তির সঙ্গে খাপ খায় না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.