তাঁর ছদ্মবেশ ধারণের ক্ষমতা ছিল সুবিদিত। শোনা যায় বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জের হাতির হাওদায় বোমা মারার পর ব্রিটিশ পুলিশ গোটা দেশে যখন খুঁজে বেড়াচ্ছে তাঁকে — মাথার দাম যখন সেই আমলে এক লাখ টাকা — তখন তিনি ছাপোষা শিক্ষক হয়ে দেরাদুনে বড়লাটের উপর হামলার বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব পাশ করে একের পর এক সভা করছেন। লাহোর থেকে প্রকাশিত হিন্দু পত্রিকায় তাঁর শিষ্য ভাই পরমানন্দ এই ঘটনার উল্লেখ করে পরবর্তীকালে লিখেছিলেন “দুঃসাহসী রাসবিহারী এই সব কাজ করার পর দিল্লী থেকে গা ঢাকা দিয়ে ঐ দিনই দেরাদুনে পৌঁছে সেখানে সন্ধ‍্যায় একটি জনসভায় ভাষণ দেন। তাতে তিনি কঠোর ভাষায় বোমা নিক্ষেপকারীর নিন্দা করেন।”

এটা অস্বীকার করার কোন জায়গা নেই যে যতই তাত্ত্বিকরা সিপাহী বিদ্রোহকে ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততন্ত্রের পুনরুত্থানের প্রয়াস বলে অভিহিত করুন না কেন, চাষী সৈনিক গরীব প্রান্তিক সহযোগে এই বিদ্রোহ ব্রিটিশ সাম্রাজ‍্যবাদের ঘুম ছুটিয়ে দিয়েছিল। আর একই সাথে ‘ভাগ করো আর শাসন করো’ এই নীতির বিরুদ্ধে সিপাহীদের বিদ্রোহ ছিল এক জোরালো চপেটাঘাত, কারণ এই বিদ্রোহ হিন্দু-মুসলিম ঐক‍্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল তার সম্পূর্ণ শরীরী ভাষায়। সূদূর লন্ডন থেকে মার্কস সেজন‍্যই বিদ্রোহীদের অভিনন্দিত করেছিলেন এবং ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে চিহ্নিত করেছিলেন।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও যে অত‍্যাচার বিদ্রোহী ও সাধারণ জনগণের ওপর ব্রিটিশ শাসক করেছিল, তা স্বাধীনতাকামী ভারতীয়দের চোখে, স্মৃতিতে ও সত্তায় গাঁথা হয়ে যায়। সেজন‍্যই তাঁরা যে কোন মূল্যে এই বিদ্রোহ বহ্নি দেশের বুকে আবার জ্বালানোর স্বপ্ন দেখতেন এবং দিনের পর দিন মাসের পর মাস কাজ করে গেছেন সেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে।

১৯১৫ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রথম পর্বেই সমগ্র ভারত জুড়ে এমনই একটি গণবিদ্রোহের তথা অভ‍্যুত্থানের পরিকল্পনা গৃহীত হয়। বিষ্ণু গণেশ পিংলে, কর্তার সিং, হরদয়াল প্রমুখ বিপ্লবী গদর পার্টির প্রবাসী বিপ্লবীদের (প্রায় চল্লিশ হাজার ছিল তাদের সংখ্যা) দেশে ফিরে আসার আহ্বান জানান। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় চার হাজার জন ইতিমধ্যেই পাঞ্জাবে পৌঁছে গিয়েছিলেন। ঠিক ছিল বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে আমেরিকা থেকে কলকাতা হয়ে আরো পনেরো হাজার বিপ্লবী পাঞ্জাবে পৌঁছবেন। বিপ্লবী অবনী মুখার্জি আর বিষ্ণু পিংলে অস্ত্র আমদানির পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। রাসবিহারী ছিলেন এই অসাধারণ লড়াইয়ের প্রাণপুরুষ। প্রকাশ্যে ও গোপনে ছদ্মবেশে তিনি প্রায় ছাব্বিশটি সেনানিবাসের সাথে যোগাযোগ করেন এবং ভারতীয় সেনাদের এই অভ‍্যুত্থানে অংশগ্রহণ করতে রাজি করিয়ে ফেলেন। শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলনকেও এই সংগ্রামের সাথে অন্বিত করার পরিকল্পনা গৃহীত হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত বিশ্বাসঘাতক কৃপাল সিং-এর বিশ্বাসঘাতকতায় এই পরিকল্পনা ব‍্যর্থ হয়।

এক দিকে যতীন মুখার্জি, অন্য দিকে রাসবিহারী বসু। এঁরা বিপ্লবী আন্দোলনে বাংলার দুই স্তম্ভ। রাসবিহারী চরম সঙ্কটে বিদেশে থেকেও জীবন সায়াহ্ন পর্যন্ত নিয়ে গেছেন আপোষহীন সংগ‍্রামের প্রস্তুতি, এবং শেষ পর্যন্ত আর এক কৃতী পুরুষ সুভাষচন্দ্রের হাতে আজাদ হিন্দ ফৌজের দায়িত্ব সমর্পণ করে তাঁর জীবনদীপ নেভে। নিজের দল ধ্বংস হয়ে গেলেও সমস্ত সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে দেশের সেবায় নিয়োজিত অন্যান্য সমস্ত বিপ্লবী দল ও সংগঠনকে রাসবিহারী নিরলস সাহায‍্য করে গেছেন সারাজীবন।

যেমন ছিল ছদ্মবেশ ধারণের ক্ষমতা তেমনই মাতৃভাষার মতই গুরমুখী, হিন্দি, উর্দু সহ পনেরোটি ভাষায় তিনি কথা বলতে পারতেন অনর্গল। গোটা দেশ জুড়ে আর্মি ক‍্যান্টনমেন্টগুলোতে ঘুরে ঘুরে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের যে পরিকল্পনা তিনি করেছিলেন, বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তা ব‍্যর্থ হওয়ার পর বিফল মনোরথ হয়ে তাঁকে দেশ ছাড়তে হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে। যদি সেই বিদ্রোহ সফল হত, হয়ত ভারতবর্ষের ইতিহাস ও জাতীয় আন্দোলন অন্য দিকে মোড় নিত।

দেশের বুকে ফাঁসি অবশ‍্যম্ভাবী হওয়ার কারণেই এই অগ্নীশ্বরকে বিদেশে চলে যাওয়া নিশ্চিত করতে হয়েছিল। শুধু যে নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে, তা নয়। তাঁর পরবর্তী জীবনপ্রবাহ সে কথা প্রমাণ করেছে। চলে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল অবিচ্ছিন্নভাবে বিপ্লবী কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়া এবং সংগঠনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য। তাঁর সেই বিদেশযাত্রার ইতিহাসও কি কম রোমাঞ্চকর?

রাসবিহারী প্রথম দিকে বিদেশ যেতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু সংগঠনের বাকিরা শেষ পর্যন্ত তাঁকে বিশ্বাস করাতে সফল হন যে তাঁর এই যাত্রার উদ্দেশ‍্য হবে ব্রিটিশবিরোধী দেশ থেকে অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করে দেশে পাঠানো, যাতে তাঁর সহযোদ্ধারা বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন নতুন করে গণঅভ‍্যুত্থান ঘটাতে পারে। এই সময় রবীন্দ্রনাথের জাপান ভ্রমণের বন্দোবস্ত হচ্ছিল। রবীন্দ্রনাথের আত্মীয় প্রমথনাথ ঠাকুরের ছদ্মনামে রাসবিহারীর জন‍্য পাসপোর্ট ও ভিসা সংগ্রহ করা হল। ভাবা যায়, যে ঠাকুর পরিবার এক দিকে মহারানীর আশীর্বাদপুষ্ট, অন্য দিকে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং নাইট মর্যাদায় ভূষিত হয়েছিলেন, সেই রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন‍্য হয়ে রাসবিহারী পাড়ি দিচ্ছেন বিদেশে, যাতে দেশের বাইরে গিয়ে তিনি তাঁর কর্মকাণ্ড অক্ষুণ্ণ রাখতে পারেন! রাসবিহারী তাঁর অসমাপ্ত জীবনীতে জানিয়েছেন, ১৯১৫ সালের ১২ই মে খিদিরপুরের বারো নম্বর জেটি থেকে জাপানগামী জাহাজে তিনি জাপান যাত্রার জন্য আরোহণ করেন।

তাঁর আর এক প্রবাদপ্রতিম শিষ্য শচীন সান্যাল, এবং গিরীজা দত্ত ছিলেন এই মহান অন্তর্ধানের শেষ মুহূর্তের সাক্ষী। শচীন সান্যাল লিখেছেন অন্তিম মুহূর্তে তাঁর সহকর্মীদের প্রতি বার্তা ছিল “দলকে বাঁচিয়ে রাখবে এবং তাকে প্রতিপালন করবে। নূতন নূতন কর্মী সংগ্রহ করবে। ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর সাথে খুব সতর্কভাবে যোগাযোগ রক্ষা করবে।” ইনি যদি শরৎবাবুর পথের দাবী উপন‍্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র না হন, তবে আর কে? কোন আক্রোশে সর্বশক্তিমান সরকার বাহাদুর পথের দাবী-কে নিষিদ্ধ করেছিল তা-ও সহজেই অনুমেয়।

রাসবিহারী ছিলেন এক অদম‍্য বিপ্লবী। যাঁকে ব্রিটিশ সরকার বাহাদুর অনেক বাহাদুরি করেও কোনদিন গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তাঁর সারা জীবনের আদর্শ তিনি নিজের কথাতেই বলে গেছেন, “আমি একজন যোদ্ধা,আর এক যুদ্ধ বাকী আর সেই হবে আমার শ্রেষ্ঠ এবং শেষ যুদ্ধ।” নিশ্চিতভাবে আজাদ হিন্দ ফৌজের লড়াই ছিল সেই অন্তিম যুদ্ধ, ব্রিটিশ ভারতে যা একদিকে নৌবিদ্রোহকে অনুপ্রাণিত করে আর অন্য দিকে কোটি কোটি ভারতবাসীর বুকে স্বাধীনতার স্বপ্ন এঁকে দেয়। চার দশক জুড়ে এক শক্তিশালী সাম্রাজ‍্যের ঘুম কেড়ে নিয়েছিলেন যে রাসবিহারী, তিনি সারা পৃথিবীর মহান বিপ্লবীদের সাথেই তুলনীয়।

বিপ্লবী রাসবিহারী বসু – ছবি Wikipedia থেকে

Leave a Reply