ডিসেম্বরের হিমশীতল রাতে ঘুমন্ত ভেড়ার পালের প্রহরায় থাকা গ্রাম্য মেষপালকদের খবর দিয়ে যান ঈশ্বরের দূত – অদূরেই ডেভিডের নগরীর প্রান্তে জন্ম নিয়েছেন ঈশ্বরের সন্তান। ছুটে যান দরিদ্র মেষপালকেরা। খসে পড়া তারার ইশারা অনুসরণ করে সুদীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিন ম্যাজাইও চলেন ঈশ্বরের পুত্রের সন্ধানে। কী দেখেন তাঁরা? দেখেন, সাদার উপর কালো খোপ খোপ নকশার ‘কেফিয়া’ (ফিলিস্তিনি স্কার্ফ, যা হয়ে উঠেছে প্রতিরোধ সংগ্রামের প্রতীক) জড়ানো দেবশিশু অবহেলায় পড়ে রয়েছেন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে। বড়দিনের প্রাক্কালে এমনই দৃশ্যকল্পের নির্মাণ হয়েছে বেথলেহেমের এভানজেলিকাল লুথারিয়ান গির্জার ভিতর। “ফিলিস্তিনি শিশুদের কাছে এই বড়দিনের বাস্তবতা এমনই। যীশু যদি আজ জন্মাতেন, গাজার ধ্বংসস্তূপের নীচেই জন্মাতে হত তাঁকে।” বলেছেন যাজক মুন্থার ইসাক।
প্যালেস্তাইনের অন্তর্গত ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের বেথলেহেম শহরের চার্চ অফ নেটিভিটিকে আক্ষরিক অর্থেই বলা চলে খ্রিস্টধর্মের আঁতুড়ঘর। যে গুহায় যিশুখ্রিস্টের জন্ম, তারই উপরে প্রথম গির্জাটি তৈরি করেন সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন। ৩৩০ থেকে ৩৩৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তৈরি হয় সেই গির্জা। প্রায় দুই শতক পরে সামারিটান বিদ্রোহের সময়ে আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া গির্জাটিকে নতুন করে নির্মাণ করেন সম্রাট জাস্টিনিয়ান। তারপর দেড় হাজার বছর ধরে সুদীর্ঘ রক্তক্ষয়ী ক্রুসেড, মামলুক এবং অটোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস পেরিয়ে, একটু একটু করে প্যালেস্তাইন বেদখল হয়ে যাওয়ার সাক্ষী থেকেছে বেথলেহেমের পবিত্র চার্চ অফ নেটিভিটি। প্রতিবছর এই সময়ে ১৫ থেকে ২০ লক্ষ দর্শনার্থীর ভিড় হয় সেখানে। চার্চ অফ নেটিভিটির বাইরেকার ম্যাঙ্গার স্কোয়্যার গমগম করে গানে, আলোয়, মানুষে। বেথলেহেমের ৭০% বাসিন্দার রুটিরুজি নির্ভর করে আন্তর্জাতিক দর্শনার্থীদের উপর। এই বছরটা অন্যরকম। হাজার হাজার শিশুর লাশ ছুঁয়ে এসেছে বড়দিন। যুদ্ধ চলছে। গণহত্যার বিরাম নেই। তাই দর্শনার্থীর সংখ্যা শূন্য। সমস্ত হোটেলের বুকিং বাতিল, সব দোকান বন্ধ। টিমটিম করে খুলে থাকা দু-একটি দোকানেও নেই কোনো ক্রেতা। চার্চ অফ নেটিভিটি থেকে মাত্র সাড়ে ন কিলোমিটার উত্তরে একইরকম নির্জনে বিষাদাচ্ছন্ন দাঁড়িয়ে রয়েছে আল আকসা মসজিদ। গত কয়েক মাসে যে মসজিদের নাম জেনে গিয়েছে গোটা বিশ্ব।
২০০২ সালে দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময়ে যখন বেথলেহেম শহরের দখল নিয়ে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতা যোদ্ধাদের খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছিল ইজরায়েলি বাহিনী, সেইসময় মুক্তিকামী ফিলিস্তিনিদের আশ্রয় দেয় চার্চ অফ নেটিভিটি। ইজরায়েলের সেনা একমাসের ওপর ঘিরে রাখে গির্জাটি। ট্যাংক বসানো হয় ম্যাঙ্গাস স্কোয়্যারে। ইজরায়েলের জায়নবাদী গণমাধ্যম অভিযোগ করে, খ্রিষ্টান যাজকদের গির্জার ভিতরে বন্দি করে রেখেছে ফিলিস্তিনিরা। কিন্তু যাজকরা বলেন উল্টো কথা। তাঁরা পক্ষ নেন ফিলিস্তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ৷ বলেন, ফিলিস্তিনিরা গির্জার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করেছেন।
গত কয়েকমাসে গাজার ক্যাথলিক হোলি ফ্যামিলি চার্চ পরিণত হয়েছে আক্রান্ত মানুষের আশ্রয়স্থলে। খাবার ও জলের সন্ধানে গির্জার বাইরে বেরোতে গিয়ে ইজরায়েলি বাহিনীর গুলিতে সেখানে গত সপ্তাহে মারা গিয়েছেন দুজন মহিলা – সম্পর্কে মা ও মেয়ে। আহত হয়েছেন আরও সাতজন।
১৯৪৭ থেকে ইজরায়েল অধিকৃত প্যালেস্তাইনে খ্রিস্টানদের সংখ্যা কমেছে অনেকটাই ৷ ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক ও জেরুজালেম মিলিয়ে এখনো ৫০ হাজারের কাছাকাছি খ্রিস্টানের বাস। ২০২৩ সালের বড়দিনে তাঁদের ঘরে কোনো উৎসবের আলো জ্বলছে না। ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের খ্রিস্টান যাজক এবং পৌর কর্তৃপক্ষ মিলিতভাবে উৎসবের সমস্ত আয়োজন বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই ছবি জেরুজালেমেও। বড়দিনের উৎসব বাতিল করার ঘোষণা প্রথম করে পড়শি দেশ জর্ডান। ইজরায়েলি আক্রমণের তীব্র নিন্দা করে নভেম্বরের শুরুতেই জর্ডানের গির্জা কর্তৃপক্ষ সমিতি জানিয়ে দেয় তাদের এই সিদ্ধান্তের কথা। নভেম্বরের ১২ তারিখ থেকে গির্জাগুলিতে পাওয়া সমস্ত দানের অর্থও গাজায় ত্রাণ হিসাবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। গির্জা কর্তৃপক্ষ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম দাব্বুর বলেন “বহু মুসলমান মনে করেন খ্রিস্টানরা পশ্চিমের মানুষ। কিন্তু আমরা, সন্ত পিটারের সন্তানরা, দুই সহস্র বছর ধরে এখানে রয়েছি। আমরা একই জনতার অংশ।” জর্ডানের অ্যাসেম্বলিজ অফ গড চার্চের সভাপতি ডেভিড রিহানির মতে, পশ্চিমি বিশ্বকে তাঁরা জানাতে চান যে খ্রিস্টধর্ম অন্ধ পক্ষপাতিত্ব অনুমোদন করে না। জর্ডানিয়ান এভানজেলিকাল কাউন্সিলের সভাপতি ইমাদ মায়াহ জানান “এমনকি এই ঘোষণারও কোনো প্রয়োজন ছিল না। জর্ডানবাসী কোনো আনন্দ অনুষ্ঠানই উদযাপন করছে না। এমনকি বিবাহ অনুষ্ঠানও সারা হচ্ছে নিতান্ত সাদামাটাভাবে।”
জর্ডানের রাজা আবদাল্লা দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন একাধিকবার। অক্টোবরের শেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি জো বাইডেনের সঙ্গে একটি বৈঠক তিনি বাতিল করেন এবং নভেম্বরে জর্ডানের রাষ্ট্রদূতকে সরিয়ে নেন ইজরায়েল থেকে। বিশ শতকের গোড়া থেকেই জেরুজালেমের মুসলমান এবং খ্রিস্টান — উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মস্থানই রক্ষার দায়িত্ব পালন করে এসেছে হাশেমাইট সাম্রাজ্য। সবচেয়ে বেশি ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুর বসতি জর্ডানে ইসলামিক গোষ্ঠীগুলি তেমন জনপ্রিয় নয়। কিন্তু ইজরায়েলের আক্রমণের ভয়াবহতার প্রশ্নে সমস্ত জর্ডানবাসী একমত হয়ে প্যালেস্তাইনের পাশে আছেন।
প্যালেস্তাইনের অধিকাংশ মানুষই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। স্বাভাবিকভাবেই গত আড়াই মাস ধরে চলা গণহত্যায় গাজায় যাঁরা প্রাণ হারাচ্ছেন, তাঁদের অধিকাংশই ধর্মে মুসলমান। গাজার প্রধান প্রতিরোধী শক্তি হামাসও ইসলামিস্ট। ইসলামিক বিশ্বের বাসিন্দাদের বড় অংশের সমর্থনও তাই প্যালেস্তাইনের পক্ষে। কিন্তু কোনোভাবেই ফিলিস্তিনের মুক্তিসংগ্রামকে যে কেবল মুসলমানদের লড়াই বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় না, উপরের ছবিগুলি থেকে তা স্পষ্ট। আরব খ্রিস্টানদের বিরাট অংশ কেবল ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার সমর্থকই নন, সরাসরি সেই সংগ্রামের অংশ। প্যালেস্তাইনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি কমিউনিস্ট গেরিলা বাহিনী পিএফএলপি। এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা জর্জ হাবাস ছিলেন একজন আরব খ্রিস্টান। এমন উদাহরণ আরও অনেক।
জায়নবাদবিরোধী ইহুদিরা যেমন সর্বতোভাবে ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামের পাশে দাঁড়িয়েছেন, ঠিক তেমনই আরব খ্রিস্টানরাও এই লড়াইয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ধর্মের ভিত্তিতে ভাবলে এই সংগ্রামকে বোঝা যাবে না। বুঝতে হবে ঔপনিবেশিক দখলদারির বিরুদ্ধে আরব জনগণের প্রতিরোধের জায়গা থেকে। পশ্চিমি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সমর্থনপুষ্ট ইজরায়েলের বিরুদ্ধে যে বৃহত্তর আরব ঐক্য, তা বহুমাত্রিক। হামাস বা হিজবুল্লার মত ইসলামিস্ট শক্তি যেমন তার অংশ, ঠিক তেমনই ফাতাহর মত ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি, পিএফএলপির মত কমিউনিস্টরাও এই সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ শরিক। বিশেষত ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে প্রতিরোধ সংগ্রামের মূল ধারাটি ধর্মনিরপেক্ষ এবং বামপন্থী। যাঁরা প্যালেস্তাইনের মুক্তির লড়াইকে মুসলমান বনাম ইহুদিদের ধর্মযুদ্ধ হিসাবে দেখাতে চান, তাঁরা ইতিহাস ও সত্যের প্রতি সুবিচার করেন না।
দুই সহস্রাব্দ আগে অমৃতের সন্তান জন্ম নিয়েছিলেন বেথলেহেমে। তাঁর গাত্রবর্ণ আদৌ সাদা ছিল কিনা তা নিয়েও রয়েছে বহু প্রশ্ন। বাদামি চামড়ার যিশু বহু দেশে হয়ে উঠেছেন মুক্তিসংগ্রামের পরম আত্মীয়। দু হাজার বছর পরে তাঁর জন্মস্থানেই প্রতিদিন মৃত্যু হচ্ছে অসংখ্য শিশুর, তারাও অমৃতেরই পুত্রকন্যা সব। তাই বেথলেহেমে, খোদ যিশুর জন্মস্থানেই এবার বড়দিনে কোনো আলো জ্বলছে না। মৃত শিশুদের রক্তের সমুদ্রের মাঝখানে উৎসবের আলো জ্বলে উঠলে যে যিশুকেই অপমান করা হয়।
ক্যুয়ো ভাদিস উপন্যাসের সেই দৃশ্যের কথা মনে পড়ে। সম্রাট নিরো খ্রিস্টানদের বধ্যভূমিতে পরিণত করেছেন রোমকে। সন্ত পিটার বিহ্বল, দিশেহারা। তিনি রোম ছেড়ে চলে যাচ্ছেন দূরে। সঙ্গী কেবল কিশোর নাজারিয়াস। পথ চলতে চলতে পিটার দেখলেন এক অলৌকিক আলো নেমে আসছে আকাশ থেকে – সেই আলোর বৃত্তে ক্রুশবিদ্ধ যিশু। নতজানু হলেন পিটার। প্রশ্ন করলেন, ‘ক্যুয়ো ভাদিস, ডোমিনি – হে প্রভু, আপনি কোথায় চলেছেন?’ যিশু উত্তর দিলেন, তিনি রোমে যাচ্ছেন, যেখানে তাঁর সন্তানদের হত্যা করা হচ্ছে, যে রক্তাক্ত কসাইখানা থেকে পালিয়ে আসছেন পিটার। সম্বিত ফিরল পিটারের। তিনি নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। ফিরে চললেন রোমে, সম্রাট নিরোর তৈরি বধ্যভূমিতে জীবনের গান গাইতে।
বেথলেহেমের আস্তাবলে জন্ম নেওয়া যিশু আজ কোথায় যেতেন? তিনি যেতেন ফিলিস্তিনে, শিশুদের বধ্যভূমিতে। সেখানে কোনো আলো নেই আজ ৷ অন্ধকার তাঁকে স্বাগত জানাত ধ্বংস ও মৃত্যুর পৃথিবীতে, গণহত্যার মাঝে – তাঁর জন্মভূমিতে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
রেজিস্টার করুন আমাদের ওয়েবসাইটে
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








