তীর্থ দাশগুপ্ত
২০ জানুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একইসঙ্গে টালমাটাল ও উদগ্রীব ছিল। প্রথমটার কারণ ক্যালিফোর্নিয়ার বিধ্বংসী দাবানল, স্মরণকালে এরকম বিপর্যয় দেখেনি আমেরিকা। যেন পৃথিবীর শেষ দেখানো কোনো হলিউডি ব্লকবাস্টার। দ্বিতীয় কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার মার্কিন রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ গ্রহণ। প্রায় আধঘন্টার জ্বালাময়ী ভাষণে ট্রাম্প নতুন আমেরিকা তৈরি হবে বলে ঘোষণা করলেন। উপস্থিত ছিলেন প্রযুক্তি জগতের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্করা – মেটার মার্ক জুকেরবার্গ, অ্যালফাবেট বা গুগলের সুন্দর পিচাই, অ্যামাজনের জেফ বেজোস, অ্যাপলের টিম কুক। আর ছিলেন এই টেক শিরোমণিদের মধ্যমণি এবং ট্রাম্পের চোখের মণি, টেসলা ও স্পেস এক্স মালিক ইলন মাস্ক। তাঁর মুখে ছিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ২৭৭ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে সাফল্য পাওয়ার হাসি।
‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা)-এর সেই উত্তুঙ্গ মুহূর্তে, ‘দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ (আমেরিকার সাতটা সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি কোম্পানি)-এর ডিজিটাল ডানায় ভর দিয়ে যখন পৃথিবীতে প্রযুক্তি উপনিবেশবাদের শিকড় আরও গভীরভাবে বিস্তৃত করার স্বপ্নে মশগুল আমেরিকার দক্ষিণপন্থীরা, প্রায় একই সময়ে সংবাদমাধ্যমের নজর এড়িয়ে আত্মপ্রকাশ করে চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উৎপাদন – ডিপসিক R1। ট্রাম্পের শপথগ্রহণে উপস্থিত ছিলেন স্যাম অল্টম্যানও, যাঁর ওপেন এআই নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী গুগলের থেকে অনেক এগিয়ে। ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জাদুদণ্ড ভাবা হয় তাঁর চ্যাটজিপিটিকে। আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের দৈত্যের মত তার ক্ষমতা। এই এআই দৈত্যের প্রাণ হল ১০”x৪” মাপের একটা ছোট্ট চিপ। আমেরিকার হাতে আছে সেই চিপ এবং তার শক্তিতে সৃষ্ট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গণকগুলো। আগামীদিনে ব্যবসা বাণিজ্য থেকে প্রতিরক্ষা – সবেতেই তাই দিয়ে প্রতিযোগী মহাশক্তি চীনকে টেক্কা মারার পরিকল্পনা করেছে তারা। ট্রাম্পে সরকারের দ্বিতীয় দিনেই অল্টম্যানকে পাশে নিয়ে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন মাগার ৫০০ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প স্টারগেট। এর লক্ষ্য মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় দ্রুত এগিয়ে আসা চীনকে কোণঠাসা করা।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
কিন্তু জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করা সমস্ত শক্তি একযোগে জানাল ডিপসিক R1-এর কথা, যা গুগল জেমিনি, ফরাসি মিস্ত্রাল বা মেটার লামার থেকে ধারে ও ভারে অনেক এগিয়ে। কুলশ্রেষ্ঠ ওপেন এআই-এর চ্যাটজিপিটির সঙ্গে প্রায় সব বিভাগেই পাল্লা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে ডিপসিক। আমেরিকার প্রযুক্তি শিল্পে এবং সংবাদমাধ্যমে যেন বাজ পড়ল। মার্ক অ্যান্ড্রিসেন ছোট্ট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ পোস্ট করলেন তাঁর এক্স হ্যান্ডেল থেকে ‘Deepseek R1 is AI’s Sputnik moment’। অর্থাৎ ডিপসিক R1-এর আত্মপ্রকাশ ও তার অভাবনীয় সাফল্য প্রায় ছয় দশক আগে ঘটে যাওয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের স্পুৎনিক লঞ্চের সঙ্গে তুলনীয়। অ্যান্ড্রিসেন কে? তাঁর পোস্ট গুরুত্বপূর্ণ কেন? তিনি সিলিকন ভ্যালির খ্যাতনামা ব্যক্তি। একাধারে প্রযুক্তিবিদ, উদ্ভাবক, উদ্যোগী, বিনিয়োগকারী। যাঁরা নয়ের দশকে ইন্টারনেটের প্রথম যুগে পুরনো, পালতোলা জাহাজের স্টিয়ারিংয়ের মতো লোগোওলা একখানা ব্রাউজার ব্যবহার করেছেন, তাঁরা জানেন নেটস্কেপ ন্যাভিগেটরের নাম। মাইক্রোসফটের সঙ্গে ব্রাউজার যুদ্ধে পরাস্ত হওয়ার আগে একাধিপত্য ছিল নেটস্কেপের। অ্যান্ড্রিসেন সেই ব্রাউজারের নির্মাতা। পরবর্তীকালে তাঁর ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্মের টাকায় পুষ্ট হয়েই বিকশিত হয়েছে ফেসবুক, টুইটার, এয়ার বিএনবি, রোবলক্স (গেমিং প্ল্যাটফর্ম), ওপেন এআই-এর মত বিখ্যাত কোম্পানি।
অ্যান্ড্রিসেনের এক লাইনের পোস্টে স্পষ্টতই ইঙ্গিত ছিল আমেরিকা আর সোভিয়েত ইউনিয়নের ঠান্ডা যুদ্ধের দিকে। সেই ঠান্ডা যুদ্ধে সম্মানের লড়াই ছিল মহাকাশ প্রযুক্তিকে ঘিরে। একবিংশ শতাব্দীতে আমেরিকা আর চীনের এই দ্বিতীয় ঠান্ডা যুদ্ধে লড়াই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে, যা আমাদের চেনাজানা দুনিয়াটাকে আমূল বদলে দিতে চলেছে।
ডিপসিক যে ২০ পাতার গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে সেখান থেকে জানা গেছে তাদের এআই মডেল ট্রেনিংয়ের খরচ মাত্র ৫.৬ মিলিয়ন ডলার। চ্যাটজিপিটির সেই বাবদ খরচ ৪১-৭৮ মিলিয়ন ডলার। উপরন্তু R1 তৈরি করতে প্রায় এক-দশমাংশ কম চিপ লেগেছে। সেই চিপ আবার এনভিডিয়া-র পুরনো A100 সিরিজের। এখানেই শেষ নয়। R1 ব্যবহার করতে কোনো পয়সা লাগবে না এবং এটা ওপেন সোর্স প্রযুক্তি। অর্থাৎ সফটওয়্যার ডেভেলপাররা এর কোডবেস ব্যবহার করতে পারবেন। মেটার লামা ছাড়া বাকি সব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যাপই কিন্তু ক্লোজড সোর্স বা প্রোপ্রাইটরি। চড়া লাইসেন্সিং ফি দিতে হয়। অর্থাৎ চীন যেখানে এত কম খরচে ডিপসিকের মত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অ্যাপ তৈরি করে ফেলেছে, সেখানে আমেরিকান কোম্পানিগুলোর পেছনে বিনিয়োগকারীরা ঢালছে বিপুল অর্থ।
ব্যাপারটা কী হল আমেরিকার প্রযুক্তিজগতের রাজাগজারা তা বোঝার আগেই চড়চড় করে পড়তে থাকে তাদের শেয়ারের দর। মার্কিন শেয়ার বাজার থেকে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার উবে যায়। টেসলা, অ্যামাজন, অ্যালফাবেট, মাইক্রোসফট সহ ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’-এর প্রায় সবার শেয়ার পড়ে যায়। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হয় বাজারের শীর্ষস্থান দখল করে থাকা এনভিডিয়ার। তাদের শেয়ারের দাম প্রায় ১৭% পড়ে যায়, ক্ষতির পরিমাণ ৫৮৯ বিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে মার্কিন শেয়ার বাজারের সূচক ন্যাসড্যাক তিন শতাংশের বেশি পড়ে যায়। আমেরিকার প্রযুক্তি শিল্প ও সংবাদমাধ্যমের ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা।
কেমন করে এমন ঘটাতে পারল চীন? ফিরে যাওয়া যাক বছর দশেক আগে।
‘সাইবার নিরাপত্তা ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা অর্থহীন’ এবং ‘তথ্য ছাড়া আধুনিকীকরণ সম্ভব নয়’। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসেই এই দুটো কথা বলেছিলেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি শি জিনপিং। কেন বলেছিলেন? ঠিক তার এক বছর আগেই মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগের প্রচুর গোপন তথ্য ফাঁস করে রাশিয়ায় পালিয়ে গেছেন এডওয়ার্ড স্নোডেন। সেইসব তথ্য থেকে জানা গেছে, কীভাবে মার্কিন সরকার এমনকি বন্ধুরাষ্ট্রের উপরেও গুপ্তচরবৃত্তি করতে ছাড়েনি, চীন তো কোন ছাড়। আর এই গুপ্তচরবৃত্তি সম্ভব হয়েছে আমেরিকার হাই টেক নজরদারি ব্যবস্থার সাহায্যে।
শি তথা চীনা নেতৃত্ব দেখেন যে চীনের যে সব বড় প্রযুক্তি কোম্পানি রয়েছে (বাইডু, আলিবাবা, টেনসেট, বাইট ডান্স) তাদের তথ্যকেন্দ্রগুলো (ডেটা সেন্টার) পুরোপুরি মার্কিনি চিপের উপর নির্ভরশীল। ২০০০-২০১০ চীন তেলের থেকে বেশি সেমি কন্ডাক্টর চিপ আমদানি করেছে (সূত্র: ক্রিস মিলার লিখিত চিপ ওয়ার)। চীনের পুরো তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা তখন মার্কিন কোম্পানিগুলোর কোর প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল ছিল। মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম ইনটেল চিপ ছাড়া অচল। বিশাল বিশাল তথ্যকেন্দ্রগুলো x86 সার্ভার চিপ ব্যবহার করে, যা একমাত্র ইনটেল আর এএমডি-ই তৈরি করে। চীন এএমডি বা এনভিডিয়ার মত জিপিইউ (গ্রাফিকাল প্রসেসিং ইউনিট) তৈরি করতে পারত না। ও জিনিস ছাড়া এআই সিস্টেম তৈরি করা সম্ভব ছিল না।
তবে এইসব চিপের সবটাই যে আমেরিকার হাতে ছিল তা নয়, তাদের দখলে ছিল বাজারের ৫০.২%। দক্ষিণ কোরিয়া (১৩.৮%), জাপান (৯%) আর তাইওয়ানের (৭%) হাতেও আছে। চীনের হাতে ছিল ৭.২%। সুতরাং শি যথার্থই বুঝেছিলেন যে চীনের তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ইত্যাদির জন্যে যে কোর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় তার প্রায় পুরোটাই প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছ থেকে আমদানি করা এবং ব্যাপারটা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ। এরপর চীন মেড ইন চায়না প্রকল্প ঘোষণা করে। তাতে চিপ আমদানি ২০১৫ সালের ৮৫% থেকে ২০২৫ সালে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়। সেই পরিকল্পনা ফলপ্রসূ করতে চীন এক নতুন কৌশল নেয়।
চীনে আইবিএম কোম্পানির ব্যবসা ২০% কমে যায় স্নোডেনের গুপ্ত তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার পর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক নজরদারিতে আইবিএমের হাত ছিল। আজ যে আমেরিকা টিকটক নিষিদ্ধ করতে উঠে পড়ে লেগেছে, তার কারণ সে নিজের দেশের তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে দিয়ে নজরদারি চালিয়েছে। ফলে সে জানে বিপদটা কোথায়। আইবিএম সিইও গিন্নি রমেট্টি ২০১৫ সালে চীন সফর করেন চীনকে তুষ্ট করতে। কারণ আইবিএম-এর সার্ভার চিপ x86 চীনে প্রচুর বিক্রি হত। ইনটেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে চীনে বেশি চিপ বিক্রি করত আইবিএম। চীন সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। আইবিএম-কে চাপ দিয়ে চীনে সেমি-কন্ডাক্টর শিল্প স্থাপন করতে বাধ্য করে চীনা কোম্পানির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে।
স্মার্টফোনের জন্যে চিপ তৈরি করার কোম্পানি কোয়্যালকমও হুয়াশিনতং (Huaxintong) নামে এক চীনা কোম্পানির সঙ্গে জোট বেঁধে চীনে চিপ তৈরি করা শুরু করে। আমেরিকা অভিযোগ করে যে ওই চীনা কোম্পানি থেকে অন্তত একজন প্রযুক্তিবিদ পরবর্তীকালে ফাইটিয়াম (Phytium) বলে এক কোম্পানিকে চীনের হাইপারসোনিক মিসাইল তৈরি করতে সাহায্য করেছেন। তবে ওয়াশিংটনে সবচেয়ে শোরগোল হয়েছিল ইনটেলের প্রতিদ্বন্দ্বী এএমডিকে নিয়ে। তারা একটি চীনা কনসর্টিয়ামের সঙ্গে x86 চিপ তৈরি করার চুক্তি করে। ওই কনসর্টিয়ামের অন্যতম চীনা কোম্পানি সুগোন (Sugon) কোনো রাখঢাক না করেই জানিয়ে দেয় যে তাদের লক্ষ্য হল জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার জন্যে কাজ করা। পেন্টাগনের এক কর্তা জানান, তাঁরা এই চুক্তির বিরুদ্ধে। কিন্তু তাঁদের কিছু করার নেই, সমস্ত নিয়মকানুন মেনেই চুক্তি হয়েছে।
১৯৫৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্পুৎনিক প্রক্ষেপণের প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকাতে তৈরি হয় প্রতিরক্ষা গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান এআরপিএ। সাতের দশকে তার নাম বদলে করা হয় ডিএআরপিএ। ওই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেখে যে প্রচলিত যুদ্ধাস্ত্রের সংখ্যায় সোভিয়েত তাদের থেকে বেশ এগিয়ে। এই প্রাধান্য খর্ব করতে তারা এক নতুন কৌশল অবলম্বন করে, যার নাম অফসেট। ডিজিটাল মাইক্রোপ্রসেসর, সেন্সর স্টেলদ টেকনোলজি সহ অত্যাধুনিক বৈদ্যুতিন সমরাস্ত্র দিয়ে তারা সোভিয়েতের প্রচলিত অস্ত্রের সংখ্যাধিক্যকে ‘অফসেট’ করা, অর্থাৎ প্রতিরক্ষাগত ভারসাম্য বজায় রাখার নীতি নিয়েছিল। ২০১৩ সালে আমেরিকার প্রতিরক্ষা সচিব হয়ে চাক হেগেল ইতিহাস থেকে সেই পুরনো কৌশল ধার করলেন। তাইওয়ান প্রণালী, যা আমেরিকা ও চীনের সম্ভাব্য সংঘাত ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে, সেখানে চীন আমেরিকার তুলনায় অনেক বেশি যুদ্ধবিমান ও রণতরী হাজির করতে পারে অধিক দ্রুততায়। চীনের এই প্রাধান্য রোখার চাবিকাঠি আজকের আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের দৈত্যের হাতে, যার নাম এআই অথবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আমেরিকার ‘নিউ অফসেট’।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান ভ্যারমাখতের ব্লিৎসক্রিগের সাফল্যের পিছনে ছিল তার যন্ত্রচালিত প্যানজার ডিভিশন। পুরনো ঘোড়াবাহিত ধীরগতির যানের জায়গা নিয়েছিল দ্রুতগতির ইস্পাতের তৈরি ট্যাংক এবং মোটর ডিভিশনগুলো। একবিংশ শতাব্দীর যুদ্ধের ফলাফল নির্ণয় করবে কম্পিউটার ও এআই-এর সমন্বয়ে তৈরি স্বয়ংক্রিয় ড্রোন, রাডার, বিভিন্ন ধরণের জ্যামার এবং মানুষবিহীন যান। সমগ্র যুদ্ধক্ষেত্র পরিণত হবে ভার্চুয়াল ভিডিও গেমে। মানুষের সঙ্গে যুদ্ধরত মেশিনের সংযোগ রক্ষা করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। সেমি-কন্ডাক্টর, সেন্সর, জ্যামার দিয়ে তৈরি এক অদৃশ্য তড়িৎ চুম্বকীয় ক্ষেত্রের যুদ্ধে দরকার হবে বিভিন্ন অত্যাধুনিক কম্পিউটার সিস্টেম, যারা পরস্পরের মধ্যে কথা বলবে বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে। নিজেদের রেডিও সিগনালের দ্রুত আদানপ্রদান, শত্রুপক্ষের সিগনাল জ্যাম, লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান অনুমান, শত্রুপক্ষের অস্ত্রের গতিপথ নির্ণয় – এই পুরো ব্যবস্থা চালাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত অ্যালগরিদম। এর প্রাণ হল শক্তিশালী ডিজিটাল চিপ। সরাসরি যুদ্ধ করা ছাড়াও প্রয়োজনমাফিক মেশিনের রক্ষণাবেক্ষণ, নজরদারি, নতুন অস্ত্রশস্ত্র তৈরি – সবেতেই হাজির থাকবে এআই নামক এই দৈত্য।
এই যে আগামীদিনের সংঘাতের প্রস্তুতি, তাতে আমেরিকা বা চীন – কেউই সংশয়াতীতভাবে এগিয়ে নেই। কেননা একটা বা দুটো অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র তৈরি ব্যাপার নয় এটা, সীমাহীন জটিল এআই নির্দেশিত ব্যবস্থা সফলভাবে কার্যকর করতে হবে। অনেকগুলো কৃত্রিম মস্তিষ্কের মধ্যে মিলিসেকেন্ডে নিখুঁত সংযোগ ঘটাতে হবে। তথ্য, অ্যালগরিদম আর কম্পিউটিং শক্তি – এই তিনটে বিভাগ দিয়ে তুলনা করা যায় দুই মহাশক্তির মধ্যে। এই তিনটের মধ্যে একমাত্র তৃতীয়টায় আমেরিকা চীনের থেকে এগিয়ে। এই অত্যাধুনিক এআই সিস্টেম সফল করতে যে ধরনের তথ্যসম্ভার প্রয়োজন, তা এই মুহূর্তে দুই দেশের কারোর হাতেই নেই। অ্যালগরিদম ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে হিসাবটা আরেকটু জটিল। মার্কো-পোলো নামে এক গবেষণা সংস্থার হিসাবে বিশ্বের সেরা এআই গবেষকদের ২৯% ছিলেন চীনে, ২০% মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আর ১৮% ইউরোপে। চীনা গবেষকদের অনেকেই পরে আমেরিকায় চলে যান। মার্কো-পোলো জানাচ্ছে, এই গবেষকদের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই কাজ করেন ৫৯%। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ও অভিবাসন নিয়ে কড়াকড়ি এবং চীনের নিজের দেশে গবেষকদের ধরে রাখার চেষ্টার ফলে এই সংখ্যাও কমছে। তাই এই বিভাগে ধরে নেয়া যায় দুই পক্ষই তুল্যমূল্য।
চীনেরই এক সংস্থার ২০২১ সালের গবেষণা থেকে জানা গিয়েছিল, চীনের এআই সিস্টেমগুলোর প্রায় ৯৫% এনভিডিয়ার চিপ ব্যবহার করে। ২০২২ সালেই জো বাইডেনের প্রশাসন আমেরিকার নতুন রফতানি নিয়ন্ত্রক বিল পাস করে। এর লক্ষ্য ছিল চীনের চিপ সরবরাহ ব্যবস্থায় বাধা সৃষ্টি করা। সেইসময় ১৪ ন্যানোমিটারের চেয়ে ছোট চিপ (A100, H800) রফতানি করা যাবে না বলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ফলে এনভিডিয়া এই নিষেধাজ্ঞাকে পাশ কাটিয়ে কম ক্ষমতাসম্পন্ন চিপ (A800, H800) তৈরি করা শুরু করে। কিন্তু ২০২৪ সালের অক্টোবরে তাও নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। পাল্টা চীন গ্যালিয়াম ও জার্মেনিয়াম রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে, যা সেমি-কন্ডাক্টর তৈরি করার কাজে অপরিহার্য এবং প্রায় ৯৫% চীনেই পাওয়া যায়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে সর্বাধুনিক চিপের রফতানিতে নিষেধাজ্ঞার ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সর্বোত্তম প্রযুক্তি তার এবং তার মিত্রদের হাতে থাকবে। ফলে একমেরু বিশ্ব তৈরি হবে। যদিও মার্কিন কোম্পানিগুলো কিন্তু পুরোপুরি চিপ তৈরি করে না। ডিজাইন থেকে কম্পিউটারে পৌঁছে যাওয়া একটা চিপের উৎপাদনের বেশ কয়েকটা ধাপ রয়েছে। যেমন ডিজাইন, ফ্যাব্রিকেশন (চিপ ম্যানুফ্যাকচারিং), লিথোগ্রাফি (সার্কিট প্রিন্টিং), প্রোডাকশন ও প্যাকেজিং। এর মধ্যে চিপ ফ্যাব্রিকেশন বেশিরভাগটাই (৬৪.২%) করে তাইওয়ানের TSMC কোম্পানি। কোনো কারণে তাইওয়ান হাতছাড়া হয়ে গেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। তাইওয়ান এই কারণেই আমেরিকা ও চীন উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
ডিপসিকের গল্পে ফেরত আসার আগে সংক্ষেপে একটু চিপ প্রযুক্তির বিষয়ে জানা যাক। মুর’স ল বলে, দুবছর অন্তর কম্পিউটার চিপের মধ্যে ট্রানজিস্টরের সংখ্যা দ্বিগুণ হবে, ফলে কম্পিউটারের শক্তি বাড়বে এবং খরচ কমবে। ইনটেলের প্রতিষ্ঠাতা গর্ডন মুর ১৯৬৫ সালে এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। ট্রানজিস্টর হল একটা ছোট সুইচ, যা বিদ্যুৎ প্রবাহ অন বা অফ করে (বাইনারি ০ বা ১ কোড তৈরি হয়)। সেমি-কন্ডাক্টর হল এক ধরনের বিশেষ উপাদান, যাকে একইসঙ্গে বিদ্যুৎ পরিবাহক বা অন্তরক হিসেবে কাজ করানো যায়। সিলিকন হল সবচেয়ে জনপ্রিয় সেমিকন্ডাক্টর, যা দিয়ে ওই ট্রানজিস্টর সুইচ বানানো হয়। চিপ মানে একটা ছোট সিলিকন টুকরো, যার মধ্যে লাখ লাখ বা কয়েক বিলিয়ন ট্রানজিস্টর থাকে। তাই ট্রানজিস্টর যত ছোট হবে, একটা চিপের মধ্যে তত বেশি সংখ্যায় তা থাকতে পারবে। ফলে যত বেশি ট্রানজিস্টর তত বেশি শক্তিশালী চিপ। ততোধিক শক্তিশালী তার গণনা শক্তি (প্রসেসিং পাওয়ার)।
এবার ২০২৫ সালে এসে দেখা যাক ডিপসিক কী করেছে?
ডিপসিকের প্রতিষ্ঠাতা লিয়াং ওয়েনফেং ২০২১ থেকে এনভিডিয়ার সর্বাধুনিক চিপ (A100) সংগ্রহ করতে থাকেন। অর্থাৎ আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা বসানোর আগে থেকে। মোটামুটি দশ হাজার চিপ ডিপসিকের কাছে ছিল। চিপের অভাব থাকায় চীনের প্রকৌশলীরা হার্ডওয়্যারের চেয়ে সফটওয়্যার অ্যালগরিদমের উপর প্রথম থেকেই বেশি জোর দেন। কীভাবে কমসংখ্যক চিপ থেকে বেশি পরিমাণ প্রসেসিং পাওয়ার পাওয়া যায়, সেই চেষ্টা চলে। এককথায়, মুর’স ল-কে পাশ কাটিয়ে চলা। বুদ্ধি করে দুটো পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। প্রথমটা (Key Value Cache) হল কম কম্পিউটেশনাল পাওয়ার ব্যবহার করে সংরক্ষিত তথ্য বারবার ব্যবহার করা। দ্বিতীয়টা (Mixture of Expert) সম্পূর্ণ মডেলের পরিবর্তে ছোট ছোট বিষয়ের নির্দিষ্ট মডেল তৈরি করা, যাতে পুরো সিস্টেমটাকে সবসময় পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ করতে না হয়। এআই মডেল ট্রেনিংয়ের খরচ নির্ণয় করা হয় GPU hour-এর হিসাবে। এই নতুন পদ্ধতিতে কম সময়ে অনেক বেশি ট্রেনিং করানোর ফলে খরচ অনেক কমে যায়।
তাহলে শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াল? সামরিক দিক থেকে যে একমেরু বিশ্বের কথা ভাবছিলেন বিশেষজ্ঞরা, কারণ এআই প্রযুক্তিতে আমেরিকা বেশ কয়েক বছর এগিয়ে গিয়েছিল চীনের থেকে, সেই ভাবনা আর বজায় রাখা যাচ্ছে না। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মাথাব্যথা বাড়ল। এআই প্রযুক্তিতে আমরা হয়ত খুব শিগগিরই দ্বিমেরু বিশ্ব দেখতে পাব। সেই দুনিয়ায় দুই মহাশক্তির মধ্যে একটা ভারসাম্য থাকবে। ডিপসিক বাণিজ্যিকভাবেও আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমস্যায় ফেলল। অনেক কোম্পানিই এখন ডিপসিকের দেখানো পথে এগোতে পারে, কারণ তাদের কোডবেস উন্মুক্ত। প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন কোম্পানিগুলো দাম কমাতে বাধ্য হবে। কিন্তু ডিপসিকের সাফল্যের আরেকটা বড় দিক আছে। এআই শুধুই ধ্বংস, যুদ্ধ, এলাকা দখলের বিমর্ষ ছবি দেখায় না। আশার এবং স্বপ্নের ছবিও দেখায়। ডিপসিক ও তার প্রতিষ্ঠাতার আখ্যান আমাদের সেই ভরসাই জোগায়। কীভাবে?
আরো পড়ুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আশীর্বাদ না অভিশাপ? সুচির যে প্রশ্ন তুলেছিলেন
ওপেন সোর্স সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের দুনিয়ায় একটা প্রতিবাদের নাম। নয়ের দশকের শেষের দিকে তৈরি হওয়া এই আন্দোলন বিশ্বাস করে, প্রযুক্তি কোনো একক গোষ্ঠী বা দেশের একান্ত সম্পত্তি নয়। প্রযুক্তিবিদ ও প্রকৌশলীদের উদ্ভাবন পেটেন্ট মূল্যের বিনিময়ে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত নয়। লিয়াং ওয়েনফেং এবং তাঁর মত চীনা প্রকৌশলীদের এক বড় অংশ এই ওপেন সোর্স দর্শনে বিশ্বাস করেছে গবেষণা ও উদ্ভাবনের প্রতি ভালবাসা থেকে। আবহমানকাল ধরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যে জ্ঞান অন্বেষণের পথে ছুটিয়েছে মানুষকে, এঁরাও সেই নেশায় বুঁদ হয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবনের রাস্তা বেছে নিয়েছেন। নয়া উদারবাদী অর্থনীতির দুনিয়ায় এঁরা এক ধরনের রোম্যান্টিক।
চীনা প্রযুক্তিবিদদের দুনিয়ায় ‘Kaiyuan Qinghuai’ এমন এক দর্শন, যা বলে যে ওপেন সোর্স প্রযুক্তি শুধুমাত্র একটা সফটওয়্যার মডেল নয়, বরং একটা নৈতিক ও দার্শনিক প্রতিশ্রুতি, যেখানে উদ্ভাবন ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক সীমায় আটকে থাকবে না। ডিপসিকের বিনামূল্যের API (বিভিন্ন সিস্টেমের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে) ব্যবহার করে আরও অনেক মডেল তৈরি করা যাবে, যা কল্যাণকর কাজে নিযুক্ত হবে। এমনকি ওর্যাকলের ল্যারি এলিসন পর্যন্ত স্টারগেটের অর্থ বরাদ্দ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন ‘আপনারা ভাববেন না শুধুই সামরিক উদ্দেশ্যে এই অর্থ ব্যবহৃত হবে। ক্যান্সারের মত দুরারোগ্য ব্যাধি নির্মূল করার কাজেও আমরা এআইকে পূর্ণ উদ্যমে কাজে লাগাব।’
নিবন্ধকার এডিনবরা নিবাসী তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী। একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি এবং আলোকচিত্রী নিমাই ঘোষ সম্পর্কে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








