সালমান সিদ্দিকী

নতুন ইতিহাস রচনা করছে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম। গত কয়েকদিনের উত্তাল রাজপথ, পুলিসের বন্দুকের সামনে বুকটান করে দাঁড়ানো যুবকের ছবি, হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর রাজপথে নেমে আসা ঘটনা কাঁপিয়ে দিয়েছে রাষ্ট্রকে। সরকারি দল আওয়ামী লীগ তার যাবতীয় দানবিক শক্তি ব্যবহার করছে আন্দোলন দমনে। এখন পর্যন্ত অন্তত পাঁচজন শহিদ হয়েছেন। দেশজুড়ে চলছে ভয়াবহ নির্যাতন। অথচ একটুও ভয় না পেয়ে প্রতিরোধ করছে ছাত্রসমাজ।

এই আন্দোলন পরিচিত হচ্ছে কোটা সংস্কার আন্দোলন নামে। বাংলাদেশের কোটা ব্যবস্থা এবং ভারতের সংরক্ষণ এক নয়। মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরে মুক্তিযোদ্ধা কোটার একটা যৌক্তিকতা ছিল। যদিও এর ব্যাপক অপব্যবহার তখন থেকেই শুরু। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অনেকেই সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে লড়েছেন। অনেকেই শহিদ হয়েছেন, অনেকে আহত হয়েছেন। সামগ্রিক বিবেচনায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম এবং দ্বিতীয় প্রজন্মের জন্য কোটা সংরক্ষণের বিষয়টা গ্রহণযোগ্য ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ৫৩ বছর পর মুক্তিযোদ্ধাদের তৃতীয় এবং চতুর্থ প্রজন্ম, অর্থাৎ তাদের নাতি-নাতনিরা নিজেদের জন্য ৩০% সংরক্ষণ দাবি করতে পারেন না। এটা অযৌক্তিক এবং বৈষম্যমূলক। এটা মূলত মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের লোকজনকে প্রশাসনে বসানোর একটা চক্রান্ত।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। ছবছর আগেও এই কোটা সংস্কার চেয়ে পথে নেমেছিল ছাত্রসমাজ। কিন্তু এবারের আন্দোলনে সচেতন এবং অসচেতনভাবে আরও অনেকগুলি উপাদান যুক্ত হয়েছে। তার অন্যতম আওয়ামী লীগের আমলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ধ্বংসসাধন এবং বিদেশি শক্তির কাছে গোটা দেশকে ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদ। প্রথমে সংক্ষিপ্ত আকারে আন্দোলনের ইতিহাস বলে নেওয়া যাক।

২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে সারা দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। পুলিস ও ছাত্রলীগের হামলা-নির্যাতন মোকাবিলা করে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। আন্দোলনের এক পর্যায়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে কোটা ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল করার কথা ঘোষণা করে দেন। সেবছর অক্টোবর মাসে সরকার কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে বিজ্ঞপ্তি জারি করে। কিন্তু এবছর ৫ জুন হাইকোর্ট কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল করার রায় দেয়। এরই প্রেক্ষাপটে আবার সারা দেশ আন্দোলনে ফেটে পড়েছে। হাইকোর্ট সর্বশেষ রায়ে কোটা ব্যবস্থা চার সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেছে। অন্য এক রায়ে আবার কোটা ব্যবস্থার পরিবর্তন বা পরিবর্ধন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ার এক্তিয়ার একমাত্র নির্বাহী বিভাগের – এই কথা বলা হয়েছে।

সরকার ছাত্রদের এই যৌক্তিক এবং নৈতিক আন্দোলনকে পুলিশী হামলা, মামলা এবং ছাত্রলীগ দিয়ে দমন করার চেষ্টা করছে। তাতে এই আন্দোলনের তীব্রতা আরও বাড়ছে। চলমান আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন জেলায় হামলা হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা হয়নি। কিন্তু গত ১৬ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের মিছিলে নজিরবিহীন হামলা করেছে ছাত্রলীগ। পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছে, তার মধ্যে অনেকের আঘাত গুরুতর। মেয়েদের রাস্তায় ফেলে পেটানো হয়েছে। এটা বাংলাদেশে সাধারণ ঘটনা নয়। প্রতিবাদে সমস্ত ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে এসেছে।

এই ঘটনা ছাত্রলীগের ভিতরেও ভাঙন ধরিয়েছে। একের পর এক মধ্যম ও নিচের সারির নেতা পদত্যাগ করছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ এখন নিরাপদ বোধ করছে না। তাই তারা বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও এলাকা থেকে ভাড়া করা সন্ত্রাসীদের নিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকছে। এরাই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপরের সারির নেতাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে। পিছনে আছে পুলিস। এই মুহূর্তে ছাত্রলীগ ছাত্রবিচ্ছিন্ন ঘৃণিত একটি সংগঠন।

কোটা ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে সরকার নানা সওয়াল করছে। বলে রাখা দরকার যে, ২০১৮ সালের আন্দোলনে কোটা ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল করার দাবি ছিল না। বর্তমান আন্দোলনের দাবিতেও তা নেই। দাবি হল – অনগ্রসর জনগোষ্ঠী, আদিবাসী এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ কোটা রেখে কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার করা। এসব জনগোষ্ঠীর জন্য কোটা সংরক্ষণের পক্ষে, বিপক্ষে ভিন্ন ভিন্ন মত আছে। কিন্তু আন্দোলনের এই পরিস্থিতিতে সার্বিক দিক বিবেচনা করে, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা উল্লিখিত জনগোষ্ঠীর জন্য যৌক্তিক হারে কোটা সংরক্ষণ থাকা উচিত বলে মনে করছেন।

আওয়ামী লীগ মুক্তিযু্দ্ধকে তাদের রাজনৈতিক ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’-র নাম করে দুর্নীতি, লুঠপাটসহ এমন কোনো অপকর্ম নেই যা আওয়ামী সরকার করছে না। সত্যি কথা বলতে, আওয়ামী সরকার মুক্তিযুদ্ধের যে প্রকৃত চেতনা – ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচার’ – তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে দেশ পরিচালনা করছে। আওয়ামী সরকার মুক্তিযোদ্ধা কোটার নামে মূলত দেশের শোষিত জনগণের ঐক্য বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ সরকার জনগণের এক অংশকে অপর অংশের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলে বেকারত্বের সংকট আড়াল করতে চায়। মুক্তিযোদ্ধা কোটাকে তাদের ভোটব্যাঙ্ক এবং অন্যায় শাসন-শোষণ বজায় রাখার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে চায়।

আরো পড়ুন বাংলাদেশের বিপন্ন গণতন্ত্রের সংকট বাড়াবে একতরফা নির্বাচন

২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে ছিল ঘরে ঘরে চাকরি দেয়ার প্রতিশ্রুতি। পনেরো বছর পরের বাস্তবতা হল, এখন ঘরে ঘরে বেকার। ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। তারা আভাস দিয়েছে, আগামী কয়েক বছরে তা বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে ছয় কোটি হয়ে যাবে। বাংলাদেশের শ্রমশক্তির পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষকে খুঁজে নিতে হয়েছে স্বল্প আয়ের অনিশ্চিত কাজকর্ম। এদের মধ্যে রিকশা চালিয়ে, বাদাম বিক্রি করে, বাসা-বাড়িতে কাজ করে, কেউ বা গ্যারেজে কাজ করে কোনোরকমে জীবনধারণ করছেন। উচ্চশিক্ষিতদের একটা বড় অংশ বেকার। সরকারি এবং বেসরকারি – দুই ক্ষেত্রেই চাকরির সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য বলছে, সরকারি চাকরিতে অনুমোদিত পদের প্রায় ২৬% শূন্য, যা সংখ্যায় প্রায় পাঁচ লাখ। এসব শূন্য পদে নিয়োগ হলে বড় অংশের মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হত, কিন্তু সরকার তা করছে না। একইসঙ্গে লক্ষণীয়, সরকার নতুন করে পদ সৃষ্টিও করছে না। যত দিন যাচ্ছে বেকার সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। দেশের সমস্ত মানুষকে শোষণ করে মুষ্টিমেয় কয়েকজন সম্পদের পাহাড় গড়ছে। দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে কোনো শিল্পায়ন হচ্ছে না। অতীতে গড়ে ওঠা চিনিকল, পাটকলসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে ক্রমাগত দেশের অর্থনীতিকে আমদানি নির্ভর করা হচ্ছে। একটা শিল্প গড়ে উঠছে তো কয়েকটা বসে যাচ্ছে। কারখানাগুলোতে কর্মী ছাঁটাই, লে অফ চলছে। স্থায়ী কর্মী নিয়োগ না করে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ হচ্ছে। দেশের এই সার্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণেই কর্মসংস্থান নিশ্চিত হচ্ছে না। শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই এর জন্য দায়ী।

চাকরির ক্ষেত্রে এই কোটা ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে বহু জিজ্ঞাসা এবং আশঙ্কা রয়েছে। কারণ আমরা জানি যে, কোটা ব্যবস্থা না থাকলেই সবাই চাকরি পাবেন এমন নয়। আবার অনগ্রসরদের জন্য কোটা ব্যবস্থা থাকলেই সমাজে অগ্রসর ও অনগ্রসর অংশের মধ্যে সমতা বিধান হবে – তাও নয়। মুক্তিযুদ্ধের পর গত ৫৩ বছরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মাত্রায় কোটা ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। তার ফলাফল কী হয়েছে? অনগ্রসর জনগোষ্ঠী কি সত্যিই সুফল পেয়েছে? কোটা ব্যবস্থা কি সামাজিক বৈষম্য এবং ভেদাভেদ প্রকৃত অর্থে দূর করতে পেরেছে? বরং যত দিন যাচ্ছে, অনগ্রসর জনগোষ্ঠীগুলো আরও পিছিয়ে পড়ছে।

তাই কোটা সংরক্ষণই শেষ কথা নয়। প্রকৃতপক্ষে এইসব অংশের মানুষের জীবনযাত্রাকে উন্নত করে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে হবে যাতে তাদের অসহায় অবস্থার অবসান ঘটে। শিক্ষা, চাকরিসহ যেন কোনো ক্ষেত্রেই যেন আর কোটা সংরক্ষণের প্রয়োজন না পড়ে। সমস্ত অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উপর চাপিয়ে দেওয়া সামাজিক বৈষম্য ও বঞ্চনা দূর করতে সরকারের নিরলস প্রচেষ্টার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর ৫৩ বছর ধরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা এসেছে, তারা এইসব পিছিয়ে পড়া মানুষের উন্নতির জন্য কিছুই করেনি। বাস্তবতা হল, কোটা সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে খুব সামান্য অংশই উপকৃত হয়, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর হাজার হাজার পরিবারের লাঞ্ছনা, গঞ্জনা তাতে একটুও কমে না। একইভাবে শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় দেশ পরিচালিত হওয়ার কারণে দেশের বেকার সংকট বেড়েই চলে। বেকারদের কোনো সামাজিক নিরাপত্তা না থাকার কারণে সরকারি চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ছুটতে হয় যুবক-যুবতীদের। কোটা থাকা না থাকাকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্র তখন দুই শোষিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে মুখোমুখি দাঁড় করাতে চায়। সেদিক থেকে এবারের আন্দোলন পরিপক্কতার পরিচয় দিয়েছে। তারা কোটার যৌক্তিক সংস্কার চেয়েছে, সরকারের পাতা ফাঁদে এই আন্দোলন পা দেয়নি।

এই আন্দোলনে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা যে মনোবল ও সাহসের পরিচয় দিচ্ছে তা দুর্লভ। কোনো ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ বা বিশৃঙ্খলা শিক্ষার্থীরা করেনি। অথচ হাজার হাজার শিক্ষার্থীর বিরাট বিরাট মিছিল হয়েছে। শেখ হাসিনার কটূক্তির প্রতিবাদে রাতে হাজার হাজার মেয়ে রাস্তায় নেমেছে, কোনোরকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি।

এ এক অপূর্ব দৃশ্য। ফ্যাসিবাদী সরকারের জন্য এ এক অশনি সংকেত। কারণ এভাবেই যুগের পরিবর্তন ঘটে।

আন্দোলন চলমান। শিক্ষার্থীরা এখনো রাজপথে। দাবি আদায় না করে তারা ঘরে ফিরবে না।

নিবন্ধকার সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.