চোর বা ডাইনি সন্দেহে পিটিয়ে খুন করার ঘটনা পশ্চিমবঙ্গে নতুন নয়। ঘনঘন এই ধরনের খবর সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। প্রাইম টাইমে নয়, আড়ালে আবডালে। কিন্তু কিছুদিন ধরে গণপিটুনির ঘটনা একটু বেশিমাত্রায় দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ করে গণপিটুনির ঘটনা বেড়েছে কিনা, তা পুলিশের নথি দেখলে ভাল বোঝা যাবে, কিন্তু বিভিন্ন গণমাধ্যমে কয়েকদিন যাবৎ বেশকিছু কাণ্ড নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে।

আলোচনা চলা অস্বাভাবিক নয়। বেশ কিছু হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে গেছে। চোপড়ায় ‘জেসিবি’ বলে পরিচিত এক তৃণমূল নেতা এক ভদ্রমহিলা ও ভদ্রলোককে পরকীয়ার অভিযোগে সালিশি সভা ডেকে সবার সামনে নির্মমভাবে মেরেছে। আড়িয়াদহে তৃণমূলের মদতপুষ্ট মস্তান জয়ন্ত সিং এক মা ও তাঁর ছেলেকে পিটিয়ে মেরেছে। ভাঙড়ে চোর সন্দেহে এক ব্যক্তিকে স্থানীয় জনতা পিটিয়ে মেরে ফেলেছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

তিনটি ঘটনা তিনরকম। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে এমন আরও বেশকিছু ঘটনা ঘটে গেছে। কিন্তু তিনটিই একেক ধরনের গণপিটুনির প্রোটোটাইপ। প্রথমটি খাপ পঞ্চায়েতের মত নিকৃষ্ট প্রথার ভয়াবহ রূপ। দ্বিতীয়টি শাসক দলের ক্ষমতার নগ্ন আস্ফালন। তৃতীয়টি মানুষের হিংসাত্মক প্রবৃত্তির স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ। ধর্মীয় কারণে পিটিয়ে খুন করার ঘটনা সৌভাগ্যক্রমে পশ্চিমবঙ্গে তেমন ঘটে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুলিস পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে সংবাদমাধ্যমে ভিডিও সম্প্রচারিত হওয়ার পর জনমতের চাপেই পুলিস তার কাজ করেছে।

সাধারণত গণপিটুনিকে মানুষের সুপ্ত পাশবিক প্রবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা হয়। গণপিটুনির সময়ে অনেক মানুষ একসঙ্গে হিংস্র হয়ে ওঠে, তাদের ঠিক-ভুল বিচারের বুদ্ধি লোপ পায় – এই আমাদের সাধারণ ধারণা। এহেন চিন্তাভাবনা আমাদের সমস্যার মূলে পৌঁছতে খুব একটা সাহায্য করে না। পাশবিক আগ্রাসন ইত্যাদি বিশ্লেষণের আধার হয়ে উঠলে ‘মানুষ’ নামক এক বিমূর্ত সমসত্ত্ব জান্তব গোষ্ঠীর কল্পনা করা হয়, যার না আছে শ্রেণি, না আছে জাতি, লিঙ্গ বা ধর্মীয় পরিচয়। অথচ আমরা জানি, একজন মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থান তার বিশ্ববীক্ষাকে কীভাবে প্রভাবিত করে। মানুষের সহজাত হিংসাত্মক প্রবৃত্তি বলে কিছু আছে – একথা মেনে নিলে গণপিটুনির জটিল সমাজতাত্ত্বিক সমীকরণ থেকে অনেকটাই দূরে সরে যাওয়া হবে। ব্যবহারিক জীবনের যে কোনো কার্যকলাপ তার বৃহত্তর আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

তৃতীয় ধরনের গণপিটুনির ঘটনা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। চোর, ছেলেধরা, ডাইনি ইত্যাদি সন্দেহে এক বা একাধিক ব্যক্তিকে বেশ কয়েকজন মিলে মারা হয়। কিছু ক্ষেত্রে কেউ কেউ হয়ত সত্যিই কোনো অপরাধ করেছে, তা হলেও কিছু উন্মত্ত মানুষ তাদের কোনোরকম আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে নিজেরাই সাজা দেবে – এমনটা কখনোই বৈধ নয়। মাঝে মাঝে পুলিস হস্তক্ষেপ করে যারা মার খাচ্ছে তাদের বাঁচিয়ে ফেলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অবশ্য আহত ব্যক্তি মারা যায়। দৈনন্দিন জীবনের নানা অশান্তি, দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষকে যন্ত্রণা দেয়। মানুষ সেই অবসাদ উগরে দেওয়ার অবকাশ খোঁজে। তাছাড়া নিজের চেয়ে দরিদ্র বা দুর্বলের প্রতি শ্রেণি ঘৃণা বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থা এমনিতেও মানুষের মধ্যে তৈরি করে রাখে। গরিব, নিম্নবর্গীয় মাত্রেই চোর বা অপরাধী – এ ধারণা বহু উচ্চবর্গীয়, মধ্যবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্ত মানুষেরই রয়েছে। সেই ঘৃণা ও হতাশা থেকেই মোবাইল চোর সন্দেহে বউবাজারের হোস্টেলে কয়েকজন মধ্যবিত্ত ছাত্র একজন নিরপরাধ গরিব শ্রমিককে পিটিয়ে মেরে ফেলল কিছুদিন আগে।

সালিশি সভা করে শাস্তির নিদান দেওয়া অন্য রাজ্যের মত পশ্চিমবঙ্গেও বর্তমান। মানুষের ব্যক্তিজীবনের উপর কৌম চেতনার স্থায়ী প্রভাব এই সামাজিক ব্যাধির মূল কারণ। জমি, বাড়ি বা দাম্পত্য সম্পর্কিত পারিবারিক সমস্যা কৌমের ঠুনকো সম্মানের হানি ঘটাতে যথেষ্ট। তাই সালিশি সভার মাতব্বররা আদালত খুলে বসেন তার সুরাহা করতে। আশ্চর্যজনকভাবে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের অভাবে আধুনিক বুর্জোয়া গণতন্ত্রের সঙ্গে খাপ পঞ্চায়েত দিব্যি খাপ খেয়ে গেছে। দম্পতির সামাজিক বয়কট, মহিলাদের ধর্ষণ বা শারীরিক প্রহার – এই ধরনের নিদানই সাধারণত দেওয়া হয়ে থাকে। বেশিরভাগ সময়ে শাসক দলের নেতারাই খাপ পঞ্চায়েত বসান। বাংলার গ্রামে গ্রামে শাসক দলের নেতা, কর্মী সহ হোমরা চোমরারা দাপিয়ে বেড়ায়, খাপ পঞ্চায়েত বসিয়ে ‘অপরাধীদের শাস্তি’ দেয়। চোপড়ার তৃণমূল বিধায়ক যেভাবে দুষ্কৃতী জেসিবিকে গ্রামের সম্মানরক্ষক হিসাবে কার্যত সমর্থন করেছেন, তাতে তৃণমূল ও সালিশি সভার পারস্পরিক বন্ধুত্ব জলের মত স্পষ্ট হয়ে যায়।

আড়িয়াদহের ঘটনার সঙ্গে আবার সন্দেশখালি কাণ্ডের অসংখ্য মিল পাওয়া যায়। বহুদিন ধরেই মদন মিত্র-ঘনিষ্ঠ তৃণমূল নেতা জয়ন্ত সিং এলাকায় নানা দুর্নীতিমূলক কাজে যুক্ত। তার প্রভাব প্রতিপত্তি এতটাই, যে বেআইনিভাবে পুকুর বুজিয়ে প্রাসাদোপম বাড়ি তৈরি করে ফেললেও পুলিস বা পৌরসভা কোনোরকম পদক্ষেপ নেয় না। মা, ছেলের পিটুনিকে জয়ন্তর ক্ষমতার নগ্ন আস্ফালন হিসাবে দেখাই সমীচীন। অধ্যাপক দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের গবেষণা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল এক ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি’ রাজনীতি প্রবর্তন করেছে। প্রতিটি এলাকায় প্রোমোটার, জমি-বাড়ি-সুরকি-বালির ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় বাহুবলীরা তৃণমূলের এজেন্ট। তারা প্রত্যক্ষ কর্মী না হয়েও দলকে নির্বাচনী সাফল্য, প্রয়োজনীয় বাহুবল ও অর্থবল এনে দেয়। পরিবর্তে তাদের হাতে চলে আসে রাজনৈতিক প্রভাব এবং নিজেদের আইনি ও বেআইনি ব্যবসা চালানোর অলিখিত লাইসেন্স। তারা অরাজকতা চালাতে থাকে, অথচ বড় বড় নেতাদের হাত সবসময় তাদের মাথার উপর থাকে। এই গোটা ব্যবস্থা পুলিসের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া কখনোই স্থায়িত্ব অর্জন করতে পারত না। পুলিস সেইজন্য এই বাহুবলীদের বিরুদ্ধে কোনরকম ব্যবস্থা নেয় না। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মদতকে পুঁজি করে জয়ন্তরা ‘জায়ান্ট’ হয়ে ওঠে।

আরো পড়ুন লোধা বালককে খুন: সভ্যতার দুরারোগ্য ব্যাধি বেড়েই চলেছে

মানুষের আর্থসামাজিক অস্থিরতার প্রশমন না ঘটলে গণপিটুনির সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষের কঠিন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে যে রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষীরা নিজেদের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছে, তাদেরও মূল থেকে উৎখাত করা প্রয়োজন। সামাজিক স্তরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিরুদ্ধে প্রচারাভিযান চালানো এবং ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের শ্রম ও শ্রমিককে সম্মান করতে শেখানো বৃহত্তর সমাজের দায়িত্ব।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.