~ অন্বেষা চক্রবর্তী ~

বাবুশ্কা পুতুল মনে আছে? একটা পুতুলের ভেতর আরেকটা, তার ভেতর আরেকটা — আসাম, থুড়ি অসমের রাজনীতিও কতকটা তেমন। আসামের বাইরের লোকের কাছে এটা একটা নিটোল ‘কোহেরেন্ট’ রাজনীতি — যার একটা মূল সুর হল অনুপ্রবেশকারী তাড়ানো। আর ঠিকই তো, এই জাতীয়তাবাদী রাজনীতির রমরমার সময় কোন চুলোর কে এসে আমাদের দেশের সুযোগ সুবিধা (?) নিয়ে কেটে পড়বে — তা তো হতে দেয়া যায় না। সুতরাং আসামের রাজ্য এবং রাজনীতিকে এক লাইনে গুছিয়ে বর্ণনা করেই অন্য আলাপে চলে যাওয়া যায়। কিন্তু ওই যে শুরুতেই বাবুশ্কা পুতুলের কথা বলেছিলাম। আসামের রাজনীতিতেও আছে অগুনতি ‘ফল্ট-লাইন’, যেগুলো আপাতদৃষ্টিতে “অসমীয়া জাতীয়তাবাদী” রাজনীতির আড়ালে ঢাকা থাকে। গরুখুটিঁর ঘটনা হঠাৎ করে জাতীয় সংবাদমাধ্যমে আসামের এই অসংখ্য বলিরেখাকেই উদোম করে দিয়েছে।

আসামের রাজনীতির মূল চালিকা শক্তি, সে দেশভাগের অনেক আগে থেকেই ছিল, একটি ‘হোমোজেনাস’ অসমীয়া পরিচয় তৈরী করার রাজনীতি। এই আকাঙ্ক্ষা এতই তীব্র এবং তীক্ষ্ণ ছিল যে সিলেট রেফারেন্ডামে যখন আসামের সাথে রাজস্ব বাড়ানোর জন্য জুড়ে দেয়া শ্রীহট্ট জেলা পাকিস্তানে চলে গেল, আসামের রাজনীতিবিদরা এবং অসমীয়া জনগণ “আপদ বিদায় হইলো” বলে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন। লোকপ্রিয় গোপীনাথ বরদলৈয়ের সেই কতকালের চেষ্টা — আসামের এই বাংলা কথা বলা লোকগুলো পশ্চিমবঙ্গ কিংবা পূর্ব পাকিস্তানে চলে যাক। এই নিয়ে বড়লাট থেকে নেহরু, সবার কাছেই আসামের তাবড় রাজনীতিবিদরা দরবার করেছিলেন। যে কংগ্রেসকে এখন বিজেপি রোজ সকালে মুসলিম তোষণকারী এবং অনুপ্রবেশ-বান্ধব বলে গালাগাল না দিয়ে জলস্পর্শ করে না, সেই কংগ্রেস ১৯৪৫ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে লিখেছিল “Unless the province of Assam is organised on the basis of Assamese language and Assamese culture, the survival of the Assamese nationality and culture will become impossible. The inclusion of Bengali speaking Sylhet and Cachar and immigration or importation of lacs of Bengali settlers on wastelands has been threatening to destroy the distinctivness of Assam and has, in practice, caused many disorders in its administration.” সুতরাং এই ভয় আসামের রাজনীতিতে ভূশণ্ডির কাকের মতই চিরকাল বিরাজমান।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আরেকটুখানি ঘেঁটে যদি এই ভয়ের কারণ খোঁজা যায়, তাহলে পিছিয়ে যেতে হবে সেই ১৮২৬ সালে। আসামের অনাবাদী জমি চাষ করার জন্য তৎকালীন পূর্ববঙ্গ থেকে প্রচুর ভূমিহীন চাষীকে আসামে এনে জমি দেয়া হয়। এমনকি ১৯২৯ সালে আসামের নামকরা বুদ্ধিজীবী জগন্নাথ বুজর বড়ুয়া আসাম ব্যাঙ্কিং এনকোয়ারি কমিটিকে এও বলেন যে এই “অনুপ্রবেশের” ফলে বরপেটা জেলা আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে। কিন্তু এই সময় নাগাদই আসামের রাজনীতির হাওয়া অন্য দিকে বইতে শুরু করে। ১৯৩১ সালের আদমশুমারির পরে আদমশুমারির চিফ সুপারিনটেনডেন্ট সি এস মুলানের সেই কুখ্যাত এবং ইল-কন্সিভড উক্তি “The immigrant… has almost completed the conquest of Nowgong. The Barpeta subdivision of Kamrupa has also fallen to their attack and Darrang is being invaded. Sibsagar has so far escaped completely, but the few thousand Mymansinghias (immigrants from Mymansingh district of East Bengal) in North Lakhimpur are an outpost which may, during the next decade, prove to be a valuable basis of major operations.” এই উক্তি আসামের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ভিত আরও শক্ত করেছিল।

তারপরের কথা তো আগেই বলা হয়েছে। ১৯৪৮ সালে আসাম বিধানসভার একটি সার্কুলারের একটি অংশ এখানে উদ্ধৃত করা যাক। “In view of the emergency created by the influx of refugees into the province from East Pakistan territories and in order to preserve peace, tranquillity and social equilibrium in the towns and villages, the government reiterates its policy that settlement of land should be in no circumstances made with persons who are not indigenous to the province. The non-indigenous inhabitants of the province should include, for the purpose of land settlement during the present emergency, persons who are non-Assamese settlers in Assam though they already have lands and houses of their own and have made Assam their home to all intents and purposes (Revenue Deptt. no. 195/47/188 dt. 4.5.48).”

এই সার্কুলারের ফলে অসমীয়া নয় এমন বসবাসকারীদের মধ্যে উচ্ছেদের ভয় তৈরি হয়। এই ভয়ের ফল দেখা যায় ১৯৫১ সালের আদমশুমারিতে, যখন অসমীয়া ভাষীদের সংখ্যা কুড়ি বছরে ১৫০ শতাংশ বেড়ে যায়। কারণটা জৈবিক নয়, রাজনৈতিক। বিশাল সংখ্যক পূর্ববঙ্গীয় মুসলমান জনগণনায় বলেন “আমাগো ভাষা অসমীয়া।” এঁদের বোঝানো হয় অসমীয়া ভাষা আপন করে নিলে হয়ত জমি থেকে উচ্ছেদের ভয় আর থাকবে না। তৈরি হয় আসামের নতুন শ্রেণী — নয়া অসমীয়া বা ন’অসমীয়া, যাদের উত্তরসূরিদের লেখা মিয়াঁ কবিতা সিপাঝাড় ঘটনার পর আবার নতুন করে অন্তর্জালে ভেসে বেড়াচ্ছে।

এইসব সন, তারিখ, বছরের হিসাবে অনেকগুলো বছর কেটে গেছে। নেলি, আসাম আন্দোলন, বঙ্গাল খেদা থেকে NRC, CAA। শব্দ পাল্টেছে, অর্থ পাল্টায়নি। পুতুলগুলোর ধড়-মুন্ডু এদিক ওদিক হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সব পুতুল এখনো সমান হয়নি, কোনোদিন হয়ত হবেও না।

আসামের সর্বানন্দ সোনোয়ালের বিজেপি সরকারের কাল যদি হয় লক্ষাধিক মানুষের বেনাগরিক হওয়ার কাল, তাহলে হিমন্ত বিশ্বশর্মার রাজ্যপাট হল শয়ে শয়ে মানুষের গৃহহীন হওয়ার সময়। সংখ্যা দেখেই নতুনকে “লেসার ইভিল” ভাববেন না, সময় দিন আরও কিছুটা, ইনি সোনোয়ালকে ছাপিয়ে যাবেন। তাই তো এত তোড়জোড় করে উচ্ছেদ রাজনীতি — উচ্ছেদ উন্নয়ন। যাঁরা উচ্ছেদ হচ্ছেন তাঁদের বেশিরভাগই পূর্ববঙ্গ মূলের মুসলমান, গরিব চর অঞ্চলের বাসিন্দা। এঁদেরই পূর্বপুরুষরা নিজেদের ভাষা অসমীয়া লিখিয়ে একটু নিরাপত্তার সন্ধান করেছিলেন। কিন্তু এঁরা আজীবন ন’অসমীয়া রয়ে গেলেন — খাঁটি খিলঞ্জীয়ার পংক্তিভোজনে এখনো অস্পৃশ্য। এঁরা গরিব, তায় মুসলমান, তায় আসামের হিসাবে অখিলঞ্জীয়া। তাই আসামের রাজনীতিতে এঁরা বড়জোর একটা সংখ্যা — মানুষ কিছুতেই নয়। মানুষ মরলে দুঃখ হয়, বাংলাদেশি মরলে হয় না। তাই দুজনের মৃত্যুতে কোনো শোক প্রকাশ নেই, রাগ নেই। রাগের কারণ মাটিতে লুটিয়ে পড়া মানুষের উপর পদাঘাত। অসভ্য আচরণে অসুবিধা নেই, অসুবিধা অসভ্যতার প্রকাশে। যাঁরা মারা গেছেন, যাঁরা বেঁচেও মরে আছেন এবং যাঁরা আরও মরবেন (আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন না যে আপনাদের সম্মিলিত ছিছিক্কার আসাম সরকারকে নাড়িয়ে দেবে কিংবা থামিয়ে দেবে?), তাঁদের বেশিরভাগ মানুষ ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে ঘরছাড়া এবং সরকারি লাথিঝাঁটাও নতুন কিছু নয়। তারপরেও সেই লুঙ্গি পরা শীর্ণকায় মানুষটি কেন লাঠি উঁচিয়ে পুলিশের দিকে তেড়ে গেছিলেন জানেন? উচ্ছেদের ভয়ে নয় — সেটা ভবিতব্য। এঁরা চেয়েছিলেন নতুন বসতের একটা ঠাঁই, এবং একটু সময়, যাতে নিজেদের ঘরটুকু নিজেরাই খুলে নিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু পুলিশ যখন চোখের সামনে তাঁদের সেই কয়েক টুকরো টিনের ঘরও গুঁড়িয়ে দেয়, তখন রেগে যান। আরেকবার নতুন করে বাঁশ, টিন কেনার পয়সা কে দেবে এঁদের?

মৃতদের স্বজনদের কান্নার ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে আন্তর্জালে, মৃতের ভারতীয় নাগরিক হওয়ার পরিচয় নিয়ে লেখা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র তো নাগরিকদের বে-নাগরিক করে ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখে, আমাদের দেশে তো ভারতীয় মুসলমানদের এমনিতেই পিটিয়ে মেরে ফেলে সহনাগরিকরা। তাহলে আসামেই বা অনসমীয়া, অহিন্দুদের মরতে বাধা কী? অজুহাত? আপাতত জমি উদ্ধার, পরে আরও নতুন কিছু আসবে।

আসাম এমন এক রাজ্য, যেখানে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী “বদরুদ্দীন আজমল মুখ্যমন্ত্রী হয়ে যাবে” সরাসরি এই ভয় দেখিয়ে ভোট চান বিজেপির হয়ে। ভারতীয় গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে আজমলের মুখ্যমন্ত্রী হওয়া কিন্তু না-জায়েজ নয়। অথচ সেটাই ছিল আসামের গত বিধানসভা নির্বাচনের ভয় — সেখানে অধুনালুপ্ত মহাজোটকে জানান দিতে হয় যে আজমল মুখ্যমন্ত্রী হবেন না। এবার বুঝতে পারছেন তো আসামের রাজনীতিতে ভাষাগত এবং ধর্মীয় মৌলবাদের প্রেমটা কেমন জমেছে? মিয়াঁ উপভাষায় কবিতা লিখলেও যেখানে জেল হয়, সেখানে পুলিশের গুলিতে মানুষ মরবে এবং সরকারি চিত্রসাংবাদিক তার ওপর পদাঘাত করবে, সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? একে মুসলমান, তায় মিয়াঁ! তাই তো মুখ্যমন্ত্রী নির্বিচারে বলতে পারেন যে উচ্ছেদ চলবে, ঠিক যেমন আগে বলেছিলেন যে NRC হবেই। তখনো NRC ছুটদের কী হবে তা নিয়ে চুপ ছিলেন, এখনো উদ্বাস্তুদের কী হবে তা নিয়ে নীরব। হ্যাঁ, ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কিছু মামলা-টামলা হবে, কিন্তু কোনো শাস্তি হল কিনা, সেটাই কয়েক বছর পরে খুঁজে দেখতে হবে।

ততদিনে আরও কিছু লোক মরে যাবে, আরও কিছু লোক বাস্তুহারা হবে। আসামের হিন্দু বাঙালি বিজেপির তল্পিবাহক হয়ে বাঁচার চেষ্টা করবে, আসামের অসমীয়া হিন্দু বিজেপির মধ্যে অসমীয়া জাতীয়তাবাদ মিশিয়ে আবারও ‘হোমোজেনাস’ আসাম তৈরির চেষ্টা করবে। বরাকের সম্পন্ন বাঙালিরা পশ্চিমবঙ্গে এক টুকরো বাড়ি তৈরির আপ্রাণ চেষ্টা করে যাবে। যাদের এসব কিছু করারই সঙ্গতি নেই, তারা NRC, ডিটেনশন ক্যাম্প এবং উচ্ছেদের ত্র্যহস্পর্শে এমনিতেই বেশিদিন বেঁচে থাকতে পারবে না। এখানে যে স্বপ্ন দেখতে গেলেও খিলঞ্জীয়া হতে হয়।

লেখিকা বরাক উপত্যকার বাসিন্দাপেশায় বেসরকারি সংস্থার কর্মী।মতামত ব্যক্তিগত। 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.