নেপালে নতুন প্রজন্মের – তথাকথিত জেন জি – আন্দোলনের চাপে সরকারের পতন ঘটল। নেপালের সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকির নেতৃত্বে তৈরি হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। প্রধানমন্ত্রী কে পি ওলিকে ঠিক বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতই হেলিকপ্টারে করে পালাতে হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের সঙ্গে খুবই মিল এই ঘটনার। অনেকেই বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কার মত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলির ঘটনাবলী আর নেপালের ঘটনাকে একই পংক্তিতে রাখছেন। কিন্তু আসলে ঠিক কী ঘটল নেপালে?
এখানে প্রথমেই যে বিষয়টা খেয়ালে রাখা দরকার, তা হল নেপাল কিন্তু বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কা নয়। নেপালে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় এসেছিল। নেপালি কংগ্রেসের শক্তিশালী অস্তিত্ব সত্ত্বেও নেপালের রাজনীতিতে পতনের আগের দিন পর্যন্ত সরকারে ছিল কমিউনিস্টরা, প্রধান বিরোধীও ছিল কমিউনিস্টরা। বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে। শ্রীলঙ্কায় হয়েছিল অত্যাচারী স্বৈরাচারী মাহিন্দা রাজাপক্ষর সরকারের বিরুদ্ধে। কিন্তু নেপালে জেন জি আন্দোলন পরিচালিত হল রাজতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল যে শক্তিগুলো, তাদেরই বিরুদ্ধে। রাজতন্ত্রের আমলে সর্বাপেক্ষা নির্যাতিত হয়েছিল যে শক্তিগুলো, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সর্বাপেক্ষা মূল্য দিয়েছিল যে শক্তিগুলো, আজকের আন্দোলন পরিচালিত হল তাদেরই বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, গণরোষকে পরিচালিত করাও হল তাদের বিরুদ্ধে। শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হল, প্রকাশ্য রাস্তায় মারধোর করা হল, সেইসব মানুষের বাড়ি, অফিস জ্বালিয়ে দেওয়া হল। অথচ ভুঁইফোড় দলগুলোর একটাও কিন্তু আক্রান্ত হয়নি। তাদের কারোর অফিস বা বাড়িতে আগুন ধরানো হয়নি। নেপালের রাজনীতিতে যারা আজ সেই ঘৃণিত রাজতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার কথা নিত্য প্রচার করছে, জনমনকে কলুষিত করছে, বর্তমান অস্থিরতাকে ব্যবহার করে রাজতন্ত্র ফেরত আনার চেষ্টা করছে, তাদের উপর কিন্তু আক্রমণ হয়নি। ‘নেপো-কিড ক্যাম্পেন’ জাতীয় প্রচারে উদ্বেলিত দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভকারী জনতা জেল ভেঙে মুক্ত করে এনেছে রবি লামিছানের মত রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির (আরএসপি) নেতাকে, যিনি দুর্নীতির দায়ে জেলে ছিলেন। দুর্নীতিগ্রস্তদের বিরুদ্ধেই যদি এই আন্দোলন হবে, তাহলে তো এমন হওয়ার কথা নয়। বহু অভিযোগে অভিযুক্ত এই আরএসপি দলটার উপরেও কোনো আক্রমণ হয়নি। সমস্ত আক্রমণ কেন্দ্রীভূত হয়েছে গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে, কারা করল এই আন্দোলন? কী তাদের উদ্দেশ্য?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
নেপালের বর্তমান অস্থিরতাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অনেকেই রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে নেপালের দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামকে মনে রাখছেন না। ইতিহাস আলোচনা করার এ এক মৌলিক ত্রুটি। এই ত্রুটি নিয়ে যেমন আজকের অস্থিরতাকে বোঝা সম্ভব নয়, তেমনই সম্ভব নয় ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করা। তথাকথিত জেন জি আন্দোলনের চরিত্র বিচারও এর ফলে ভুল হতে বাধ্য।
অনেকেই আছেন যাঁরা আন্দোলন দেখলেই পুলকিত হয়ে ওঠেন। তাঁরা আন্দোলনের পবিত্রতায় বিশ্বাস করেন। ফ্যাসিবাদও যে একটা আন্দোলন – গণআন্দোলন, তা তাঁরা ভুলে যান। নয়া-ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদ যে অনেক সময়েই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে তাদের অপছন্দের শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলেই তার পরিবর্তন ঘটায় এবং নিজের পছন্দমত শাসককে ক্ষমতায় আনে – এই সত্য তাঁরা ভুলে যান। কোথাও দলবদ্ধ নাচ হচ্ছে দেখলেই তাঁদের কোমর দুলতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত তাঁরা ভিড়ে মিশে যান। দুনিয়ার সব নাচের আসরই যে আমার নয় – এই বোধটাই হারিয়ে যায়।
নেপাল এনজিও-দের স্বর্গরাজ্য। এমন প্রচুর এনজিও সেখানে কাজ করে, যারা মূলত মার্কিন অর্থে পোষিত। এদের একটা বড় অংশ সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার। বাংলায় বললে, যারা সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করে জনগণের ভাবনাচিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে, প্রভাবিত করে এবং আন্দোলনও গড়ে তোলে। আমেরিকার অর্থদানকারী সংস্থাগুলো নিজেদের পরিকল্পনামত এই শক্তিগুলোকে কাজে লাগায়। সোশাল মিডিয়া এদের একটা বড় হাতিয়ার, যার সাহায্যে এরা বহু অল্পবয়সী ছেলেমেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলে। ইতিমধ্যেই ‘হামি নেপাল’ নামক এনজিওর কথা প্রকাশ্যে এসেছে, যার কর্ণধার সুদান গুরুং নেপালের এই তথাকথিত জেন জি আন্দোলনে বিরাট ভূমিকা পালন করেছেন। হামি নেপাল যে আমেরিকার বারবারা ফাউন্ডেশন থেকে টাকা পায়, সেকথা সকলেই জানেন। কিন্তু হামি নেপাল একা নয়, নেপালের প্রায় ৩০০ এনজিও এবং তথাকথিত উন্নয়ন সংস্থা গত দশ বছরে ৯০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অর্থসাহায্য আমেরিকার থেকে পেয়েছে বা পাওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। USAID-এর মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ মার্কিন অর্থ নেপালে ঢুকছিল, ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর তাতে রাশ টেনেছেন বটে, কিন্তু অর্থ আসা একেবারে বন্ধ হয়নি।
পৃথিবীর সর্বত্রই আজকের তরুণ প্রজন্মের একটা বড় সমস্যা হল – এরা ইতিহাসচেতনাবিহীন। নয়া উদারবাদী শিক্ষাব্যবস্থা গোটা পৃথিবীতেই সুচতুরভাবে এদের এরকম করে তোলার কাজ করে চলেছে। ফলে সমাজে যদি এমন কোনো সচেতন রাজনৈতিক শক্তি না থাকে, অথবা যদি এমন রাজনৈতিক শক্তির গ্রহণযোগ্যতা না থাকে বা কমে যায় যারা সচেতনভাবে ইতিহাসের প্রবক্তা, তাহলে এমন একটা শূন্যতা সৃষ্টি হয় যা খুব সহজেই তরুণ প্রজন্মকে বিপথে চালিত করতে পারে। নেপালও তার ব্যতিক্রম নয়। নেপালের কমিউনিস্টরা নিজেদের দোষেই সেই গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন। এর ফলে তৈরি হয়েছে এক গভীর রাজনৈতিক শূন্যতা। তারই মাঝখান থেকেই ফুঁড়ে বেরিয়েছে ব্যাঙের ছাতার মত অজস্র এনজিও, যাদের পরিষ্কার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। হামি নেপাল খোলাখুলি এগিয়ে এসেছে, বহু সংগঠন আসেনি। তারা শুধু বিগত কয়েক দশক ধরে তরুণদের মধ্যে পার্টিবিহীন এমন এক ধরনের রাজনীতিকে জনপ্রিয় করে গেছে, যার মাথায় থাকবে একজন সৎ এবং যুক্তিবাদী ব্যক্তি।
সেই ব্যক্তিরা অনেক সময়েই টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর দ্বারা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যেমন স্বতন্ত্র পার্টির নেতা লামিছানে অতীতে ছিলেন একজন টেলিভিশন উপস্থাপক, যাকে বলে অ্যাংকর। কীভাবে তিনি জনপ্রিয় হলেন? ২০১৩ সালে দেশের প্রথম সারির সমস্ত রাজনৈতিক দলের নেতারা (কমিউনিস্ট পার্টিগুলোও) যখন গণতান্ত্রিক দেশের সংবিধান কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে মাথার চুল ছিঁড়ছিলেন, তখন এই লামিছানে টেলিভিশনে দীর্ঘতম উপস্থাপনার বিশ্ব রেকর্ড করে গিনেস বুকে নাম তোলার চেষ্টা করছিলেন। একজন ইউক্রেনিয়ান উপস্থাপকের একটানা ৫২ ঘন্টা উপস্থাপনার রেকর্ড ভেঙে লামিছানে ৬২ ঘন্টা লাগাতার কাজ করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি এসবই করতেন। সেবছর চ্যানেল থেকে পদত্যাগ করে সাধারণ নির্বাচনে দাঁড়িয়ে পড়েন এবং চিৎবান কেন্দ্র থেকে নেপালি কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টির (এমালে) হেভিওয়েট প্রার্থীদের হারিয়ে জিতেও যান। শুধু তাই নয়, তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি, মাওবাদী নেতা পুষ্পকুমার দহল, অর্থাৎ প্রচণ্ডকে, সমর্থন করে সরকারেও চলে আসে। রাজনৈতিক দর কষাকষির আবহে টিভি অ্যাংকর লামিছানে উল্কার গতিতে এরপর দেশের উপপ্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী – দুটো পদই হাসিল করে ফেলেন।
অথচ এই লামিছানে ২০১৯ থেকে বিভিন্ন অভিযোগে একাধিকবার গ্রেফতার হয়েছেন। ২০০৭-২০১৭ মার্কিন নাগরিক এই লামিছানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে একাধিক দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত কো-অপারেটিভ দুর্নীতির মামলায় এবছরের প্রথম দিকে তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়ে জেলে যান। নেপালের বর্তমান গণবিক্ষোভের সময়ে অনুগামীরা তাঁকে জেল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। এরা সেইসময় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, হত্যা ইত্যাদি কাণ্ড ঘটিয়ে বেড়াচ্ছিল গোটা কাঠমান্ডুতে। স্বাভাবিকভাবেই এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও স্বতন্ত্র পার্টি কিন্তু আক্রান্ত হয়নি, কারণ তারাই ছিল এই তথাকথিত গণআন্দোলনের কুশীলবদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রসঙ্গত, নেপালে জেল পালানো কয়েদিদের অবিলম্বে জেলে ফিরে আসার ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার কড়া নির্দেশ দেওয়ার পর লামিছানে জেলে ফিরেছেন।
বর্তমান পটপরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়া আর এক চরিত্র হলেন কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন্দ্র শাহ। ইনি জনপ্রিয় হয়েছেন র্যাপ গেয়ে। গায়ক হওয়ার জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে হঠাৎ রাজনীতিতে চলে আসা এই র্যাপার কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচনে কংগ্রেস এবং এমালে – উভয়কেই হারিয়ে মেয়র হন। আর এক চরিত্র কুলমান ঘিসিং ছিলেন নেপালের ইলেকট্রিসিটি বোর্ডের চেয়ারম্যান। নেপালের কুখ্যাত লোডশেডিং (পাওয়ার কাট) মোকাবিলায় তাঁর সাফল্য তাঁকে যে খ্যাতি দেয়, তাকে কাজে লাগিয়েই তিনি হয়ে ওঠেন রাজনৈতিক চরিত্র। বর্তমানে কারকির মন্ত্রীসভায় তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হয়েছেন।
নেপালের রাজনীতিতে এইভাবে উঠে আসা চরিত্রগুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল, এরা সকলেই এক ধরণের পার্টিবিহীন (কখনো কখনো গঠন করলেও সেখানে ব্যক্তিই মুখ্য হয়ে), মতাদর্শহীন, ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতির প্রবক্তা। এরা সহজেই মার্কিন সরকার বা ভারত সরকারের দ্বারা প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। এদের পিছনে বিশ্ব রাজনীতির বড় বড় শক্তিগুলো বিপুল টাকাও খরচ করে। ক্ষমতায় যাওয়ার পর অতি দ্রুত এরা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে এবং বিলাসব্যসনে ডুবে যায়। ঠিক যে যে অভিযোগ করে এরা আগেকার শাসকের বিরুদ্ধে জনবিক্ষোভে নেতৃত্ব দিয়েছিল, সেই একই কাজ এরা আরও দ্রুত, আরও নৈরাজ্যের মধ্যে দিয়ে সম্পন্ন করে গোটা অভ্যুত্থানকেই হাস্যকর ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে। মাঝখান থেকে আরও বড় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে ক্ষমতা দখল করার সুযোগ করে দেওয়া হয়। আরব বসন্ত থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের বাংলাদেশ পর্যন্ত ঘটনায় এই একই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি আমরা দেখতে পাচ্ছি।
নেপালে পালাবদলের পর এই চরিত্রগুলো এবার পরস্পরের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে। কারকি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান নিযুক্ত হওয়ার পর এবার ঝামেলা পেকেছে সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবিকে কেন্দ্র করে। সুদান গুরুংরা প্রথম থেকেই দাবি সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছিলেন। কিন্তু কারকি তাতে রাজি হননি। তিনি সংসদ অপরিবর্তিত রেখেই মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের পথে চলেছেন। সুদানদের অভিযোগ, সেই একই লোক নিয়ে আবার সরকার হচ্ছে। তাহলে এত প্রাণ কিসের জন্যে গেল? হামি নেপাল এখন নতুন করে ঝামেলা শুরু করেছে কারকি ও তাঁর নিয়োগ করা মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে। আবার নতুন করে উত্তপ্ত হচ্ছে কাঠমান্ডু। দক্ষিণ এশিয়ায় বিশ্ব রাজনীতির কুশীলবরা কে কার পিছনে দাঁড়িয়ে কাজ করছে তা নিশ্চিত করে বলা শক্ত, কিন্তু একথা নিশ্চিত যে আসলে নেপালের চরিত্ররা দাবার ঘুঁটি মাত্র। খেলছে অন্য খেলোয়াড়রা, আর এই খেলায় নেপালের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের কোনো স্বার্থ রক্ষিত হবে না। শেষ বিচারে এই চরিত্রগুলো কেউই নেপালি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না। প্রতিনিধিত্ব করে বিশ্ব রাজনীতির কুশীলবদের, নেপাল যাদের কাছে আধিপত্য বিস্তারের কুরুক্ষেত্র।
তবে একথা ঠিক যে আজকের এই অবস্থায় নেপালকে এনে ফেলল মূলত কমিউনিস্ট পার্টিগুলো। ১৯৯০ সাল থেকে রাজতন্ত্র বিরোধী গণআন্দোলন, ১৯৯৬-২০০৬ চলা নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)-র সশস্ত্র জনযুদ্ধ বহু আত্মত্যাগ এবং প্রাণ বিসর্জনের মাধ্যমে শেষপর্যন্ত রাজতন্ত্রকে উৎখাত করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়। একটা সময় ছিল যখন মাওবাদী পার্টির নেতারা দীর্ঘদিন আত্মগোপন করে কঠোর জীবনযাপন করেছেন। অনেক মাওবাদী এবং কমিউনিস্ট নেতা নেপালে থাকতেই পারেননি, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু কমিউনিস্টদের সব আত্মত্যাগ, সব বলিদান, রাজতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যাবতীয় গৌরব ম্লান হয়ে গেল ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পর তাঁদের চরম ব্যর্থতায়, যা শেষপর্যন্ত আজকের ঘটনা পরম্পরা সম্ভব করল।
২০০৫ সালের শেষে এসে মাওবাদী পার্টি সশস্ত্র জনযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটায় এবং অন্য ছয় দলের সঙ্গে একযোগে গণআন্দোলন চালিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করে। অতঃপর নিয়মতান্ত্রিক পথে সংগ্রাম চালানোর উদ্দেশ্যে এই সাত পার্টির জোট গঠিত হয়। ইতিমধ্যে মাওবাদীদের দশ বছরের গৃহযুদ্ধ এবং সংসদীয় দলগুলোর লাগাতার রাজতন্ত্রবিরোধী সংগ্রামের ফলে রাজতন্ত্র কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ২০০৬ থেকে শুরু হয় এই সাত পার্টির নেতৃত্বে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণআন্দোলন, যা লোকতান্ত্রিক আন্দোলন নামে খ্যাত। এর পরিণতিতে ২০০৭ সালে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে মাওবাদী দল সংখ্যাগরিষ্ঠ পার্টি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। শুরু হয় সংবিধান রচনার কাজ, যা বহু তর্ক বিতর্ক ও সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে অবশেষ ২০১৫ সালে গৃহীত হয়। কিন্তু ২০০৮-২০২৫ পর্যন্ত ১৭ বছরে ১৪ বার সরকার পরিবর্তন ঘটে, মাওবাদী পার্টি ভেঙে যায়। অন্যান্য কমিউনিস্ট পার্টিগুলোও ভাঙাগড়ার মধ্যে দিয়ে যায়। কমিউনিস্ট নেতৃত্বের মধ্যে রেষারেষি, ভাঙন, আবার অন্যের সঙ্গে ঐক্য চলতেই থাকে। পুরনো দলের অবলুপ্তি আর নতুন দল গঠনের হিসাব এত জটিল ও ভঙ্গুর হয়ে দাঁড়ায় যে এর ইতিহাস লিখতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভিতরের লোকেদেরও মাথা খারাপ হবার যোগাড়। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে সরকারের পরিবর্তন।
এই আবহে যা হয় না, তা হল জনগণের মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান। পরিপূর্ণ সমাধান না হোক, কিছুমাত্র সুরাহাও হয়নি কোনো সমস্যার। নেপালে এই কয়েক বছরে বেকারসমস্যা গগনচুম্বী, জীবনযাত্রা সেই নিচুতেই পড়ে আছে, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত আর অপেক্ষা অনন্ত। জনগণের ধৈর্যের বাঁধ তো ভাঙবেই। তার সুযোগ নেবে ওঁত পেতে বসে থাকা বিশ্বপুঁজির তালেবররা। সেটাই স্বাভাবিক। কে-ই বা একটা ছোট দেশেও কমিউনিস্টদের রমরমা সহ্য করে?
২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ক্রমশ নেপালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের কার্যকলাপ বাড়তে থাকে। হিন্দুত্ববাদী রাজতান্ত্রিক শক্তিকে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরাবার চেষ্টা চলতে থাকে, ২০১৯ সালের পর তা গতি পায়। ২০২২ সালের পর থেকে তা প্রচণ্ড গতিতে এগোতে থাকে। নেপালকে আবার হিন্দুরাষ্ট্র করার প্রচেষ্টা, রাজতন্ত্র ফেরানোর প্রচেষ্টা শুরু হয়। দুর্গাপ্রসাইয়ের মত লোকেদের মদত দেওয়া আরম্ভ হয়। এই দুর্গাপ্রসাই একসময় কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর মধ্যে বিচরণ করতেন, ধীরে ধীরে বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এর সঙ্গে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা যুক্ত হওয়ায় ক্রমশ তিনি হিন্দুত্ববাদীদের ক্রীড়নকে পরিণত হন।
আরো পড়ুন বাংলাদেশি হিন্দুকে নিয়ে ব্যবসা করবেন না, ভাই
অন্যদিকে চীন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পে ভারত দিয়ে ঘেরা হিমালয়ের ছোট্ট দেশ নেপালকে টেনে এনে ভারতের উপর তার নির্ভরতা অনেকটাই কমিয়ে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করে। একদিকে ভারত, অন্যদিকে চীন এবং আরেক দিকে আমেরিকা – এই ত্র্যহস্পর্শে কমিউনিস্টরা শেষপর্যন্ত ইতিবাচক পরিবর্তনের সমস্ত প্রচেষ্টা থেকেই হাত গুটিয়ে নেন। পরিস্থিতি কঠিন ছিল নিঃসন্দেহে। কিন্তু কঠিন পরিস্থিতিতেই তো নেতৃত্বের পরীক্ষা হয়। নিজেদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা, ব্যক্তিগত বিলাস আর দুর্নীতির পঙ্কে ডুবে যাওয়া কমিউনিস্ট নেতাদের চরম ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দেয়।
এখন তো ২০১৫ সালের সংবিধান বাতিল করতে হবে – এই দাবিও শোনা যাচ্ছে। বহু সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে অর্জিত সাধারণতান্ত্রিক নেপালের চেহারা আগামীদিনে কী দাঁড়াবে তা বর্তমানে অনিশ্চিত। অনেককিছু নির্ভর করছে নেপালের শ্রমিক, কৃষকদের উপর; দূরদর্শী কমিউনিস্ট ও গণতান্ত্রিক নাগরিক সমাজের উপর।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







