সাদিক মাহবুব ইসলাম
কালেভদ্রে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দেখলে বিস্মিত হতে হয়। বাংলাদেশ সম্পর্কে যেসব সংবাদ প্রকাশিত হয়, তা দেখার পর ঘাড় ঘুরিয়ে ডাইনে-বাঁয়ে তাকিয়ে দেখি, দেশটা বাংলাদেশ আছে, না আফগানিস্তান হয়ে গেছে? আবার চিন্তা করতে হয়, দেশে শরিয়তি আইন চালু হয়ে গেল নাকি? দেশে গৃহযুদ্ধ চলছে নাকি? দেশে নাকি সব হিন্দুকে ধরে ধরে মেরে ফেলছে? তখন বোঝা যায়, বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতীয় মিডিয়ার বয়ান একদম হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। সত্যের উপর দাঁড়িয়ে নেই।
গত ৫ আগস্ট বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান ঘটেছে। দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে রাখা শেখ হাসিনাকে জনতা ক্ষমতাচ্যুত করেছে। তিনি আজ ভারতে আরামে বসে দাবি করছেন যে গুলি চালিয়ে মানুষ মেরে তিনি ক্ষমতায় থাকতে পারতেন। ডাহা মিথ্যা কথা। তিনি যথেষ্ট মানুষ হত্যা করেছেন এবং প্রয়োজনে আরও অনেক লাশ ফেলতে তৈরি ছিলেন। গদিচ্যুত হবার দিনও তিনি সামরিক কর্তাদের বলেছিলেন লাশ ফেলে জনতাকে ঠান্ডা করতে। কিন্তু বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাহস হয়নি। হবার কথাও নয়। ওদিন ঢাকা শহরের রাস্তায় লাখ লাখ মানুষ নেমে এসেছিল। কেন? কারণ হাসিনা গুলি করে পাখির মত মানুষ মারিয়েছেন। আজকে আমাদের ভারতীয় বন্ধুরা ভাবেন, এমন মিষ্টি একটা মহিলাকে আমেরিকা ষড়যন্ত্র করে ক্যু করে নামিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ওঁদের বুঝতে হবে, তিনি তাঁর দেশবাসীকে উত্তর কোরিয়ার কায়দায় শোষণ ও নির্যাতন করেছেন এবং এই সাহসটা পেয়েছেন ভারত সরকারের মদতে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আমার লেখা আপনাদের কাছে কতটা বিশ্বাসযোগ্য হবে আমি জানি না। কারণ আপনাদের মনে বাংলাদেশের যে চিত্র আঁকা আছে, সেখানে বাংলাদেশকে আপনারা ভাবেন উত্তরপ্রদেশ বা বিহারের মত কোনো অনুন্নত জায়গা, যেখানে মুসলমানরা প্রতিদিন সকালে উঠে হিন্দু প্রতিবেশীর মেয়েদের তুলে নিয়ে আসে, জোব্বা-পাগড়ি পরে কিরিচ হাতে হিন্দুদের জবাই করে, আর আল্লা হো আকবর বলে মন্দির ভাঙে। অথচ বাংলাদেশে এমন ঘটে না। কিছুই ঘটে না তা নয়। ঘটে, কারণ উপমহাদেশ ধর্মান্ধ গাড়োলে ভরা। তবে নরেন্দ্র মোদীর মত কাউকে গদিতে রেখে বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলা মানায় না।
আসুন হিন্দু নির্যাতন নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে ‘সাম্প্রদায়িক নৃশংসতা’-র কবলে নয়জন হিন্দু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করে ১৯ সেপ্টেম্বর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। কিন্তু নেত্র নিউজের অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই মৃত্যুর ঘটনাগুলোর নেপথ্যে সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছিল না। বরং নয়জনের মধ্যে সাতজনই রাজনৈতিক সহিংসতা, গণসহিংসতা ও বৈষয়িক অপরাধমূলক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। প্রতিবেদন বলছে, নিহতদের তালিকায় থাকা তিনজন ব্যক্তি ৪ আগস্ট, অর্থাৎ হাসিনার পতনেরও একদিন আগে, মারা গেছেন। হাসিনার পতনের দিন মারা গেছে তিনজন। আর এঁদের মধ্যে একজন তো হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগের কর্মীদের গুলিতে নিহত হন। অথচ হাসিনার পুলিশ ও গুন্ডাদের হাতে এই অভ্যুত্থানেই কিন্তু নয়জন হিন্দু মারা গেছে। হাসিনার পুলিস গুলি করে ছোট্ট শিশু রিয়া গোপকে হত্যা করেছে। অথচ তাদের কথা কাউকে বলতে শোনা যায় না।
এরকম মিথ্যা প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে অজস্র বাংলাদেশবিরোধী প্রচার চালানো হচ্ছে ভারতে। সেখান থেকে চলে যাচ্ছে পশ্চিমের দেশগুলোতেও।
ভারতের কিছু সংবাদমাধ্যম এবং সোশাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের অনেকেই পুরনো বা অপ্রাসঙ্গিক ছবি বা ভিডিও দিয়ে, কোথাও মুসলিম ব্যক্তি বা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বাড়ি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হামলার দৃশ্য তুলে ধরে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা হয়েছে বলে প্রচার করেছেন। কোথাও আবার দাবি করা হয়েছে, তিন মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে ২৭,০০০ হিন্দু নিহত হয়েছেন।
বাংলাদেশের ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা রিউমর স্ক্যানার ৫-১৩ আগস্ট পর্যন্ত ছড়ানো এই ধরনের অপতথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছিল, যে ৫০টি এক্স হ্যান্ডেল থেকে এসব অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে, তাদের ৭২% ভারতীয়। এছাড়াও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়া তিন ছাত্রনেতা আগে নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সদস্য ছিলেন – এমন মিথ্যা দাবিও তুলতে দেখা গেছে, যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে ইসলামিক মৌলবাদের পৃষ্ঠপোষক হিসাবে দেখানোর প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। এসবে আবার বাতাস দিয়ে যাচ্ছেন তসলিমা নাসরিন বা নিঝুম মজুমদারের মত লোকজন, যাঁদের বিশ্বাসযোগ্যতা অত্যন্ত কম।
আরেক ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনে দেখা যায়, অগাস্ট থেকে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের মিথ্যা দাবি বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অপতথ্য। কোথাও বলা হয়েছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হিন্দুদের দেশ ছাড়ার ‘আল্টিমেটাম’ দিয়েছেন বা গণহত্যার আহ্বান জানিয়েছেন। কোথাও আবার দাবি করা হয়েছে, প্যালেস্তাইনের পতাকা হাতে মিছিল করে হিন্দুদের জবাই করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামাতে যোগ না দিলে অপহরণের শিকার হতে হবে, বন্যাত্রাণের বিনিময়ে হিন্দু শিশুর গলা থেকে তাবিজ খুলে নেওয়া হচ্ছে – এই ধরনের অপতথ্যও ছড়াতে দেখা গেছে।
নভেম্বরে এ ধরনের অপতথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে চট্টগ্রামে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ইস্কনের বিরোধী একটি ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে সংঘর্ষ এবং বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোট নামের নতুন একটি সংগঠনের মুখপাত্র চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতারি। ভারতের চিন্ময়কে নিয়ে এত মাথাব্যথার কারণ বোধগম্য হওয়া শক্ত। উমর খালিদ বা শার্জিল ইমামকে নিয়ে বাংলাদেশ এমন প্রতিক্রিয়া দেখায় না, দেখানোর কারণ নেই। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ডের অভিযোগে যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তার বিচার সেই রাষ্ট্রের মাথাব্যথা।
আরো পড়ুন মনু আর উমর: ও দয়াল, বিচার করো
গত ৫ নভেম্বর চট্টগ্রামে ইস্কনবিরোধী ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে সংঘর্ষে সেনাবাহিনীর ৫ সদস্য সমেত ১২ জন পুলিসকর্মী আহত হন। পরবর্তীকালে গ্রেফতার করা হয় ফেসবুক পোস্ট দেওয়া সেই ব্যক্তি এবং সংঘর্ষে জড়িত ৪৯ জনকে। ২৬ নভেম্বর রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময়কে। চট্টগ্রামের আদালতে চিন্ময়ের জামিন নামঞ্জুর হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় তাঁর অনুসারীরা। সেই সংঘাতে রাষ্ট্র পক্ষের একজন আইনজীবীকে হত্যা করা হয়। এরপর সারা দেশ একজোট হয়ে দাঙ্গা প্রতিরোধ করে। এবছর দুর্গাপুজোও শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে। অথচ ২০২১ সালে আওয়ামী লীগের আমলে দুর্গাপুজোয় হিন্দুদের উপর হামলা করা হয়েছিল। তখন কিন্তু বাংলাদেশ নিয়ে তেমন সাড়াশব্দ ছিল না।
গোটা আওয়ামী লীগ আমলেই হিন্দুদের উপর অত্যাচার চলেছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে চলেছে। হিন্দু মহাজোটের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২২ সালে ১৫৪ হিন্দু নিহত হয়েছেন, ২০২০ সালে ১৪৯ এবং ২০১৯ সালে ১০৮ জন। অথচ ভারতের বিবেক তখন ঘুমিয়ে ছিল (পরবর্তীকালে হিন্দু মহাজোট এই প্রতিবেদনের জন্যে আবার ক্ষমা চেয়েছিল)।
এছাড়াও মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র ২০১৩ থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিন্দুদের উপর আক্রমণের ৩,৬৭৯টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। ওই ঘটনাগুলিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের ১১ জন সদস্য নিহত হয়েছিলেন এবং আরও ৮৬২ জন আহত হয়েছিলেন। ওই সময়ে হিন্দু নারীদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের কয়েকটি ঘটনাও রিপোর্ট করা হয়েছে।
কাজেই বাংলাদেশে হিন্দুরা আওয়ামী আমলে নিরাপদ ছিল, এই কাল্পনিক ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আপনাদের। ভারতের রাষ্ট্রযন্ত্র তার সুবিধামত বাংলাদেশি হিন্দুদের গুটির মত ব্যবহার করছে। তাদের আসলে বাংলাদেশি হিন্দুদের নিয়ে মাথাব্যথা নেই। তাদের দরকার বাংলাদেশের ক্ষমতায় তাদের নিজের লোক, যাকে বাংলাদেশিরা তাড়িয়ে দিয়েছে। তাই এত গাত্রদাহ। ভারত সরকারের দাদাগিরি এখন আর বাংলাদেশে চলছে না, তাই এত কালি ছেটানো।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। তার জনগণকে সম্মান করতে হবে ভারতকে। বাংলাদেশিরা তাদের রায় দিয়ে দিয়েছে। এখন শত্রুতার সময় নয়, চট্টগ্রাম, রংপুর দখল নেওয়ার হুমকি দেওয়ার সময় নয়। বাংলাদেশ নিখুঁত দেশ নয়, কিন্তু আমাদের সরকারের প্রধান একজন বিশ্ববন্দিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ ক্রমশ নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে। আপনাদের দেশ কিন্তু বাংলাদেশ দিয়ে দুই ভাগ হয়ে আছে। মণিপুর জ্বলছে, আপনাদের মুসলমান প্রতিবেশীরা নির্যাতিত হচ্ছেন। দয়া করে সেদিকেও একটু তাকান। আমাদের হিন্দু ভাইবোনদের চিন্তা আমাদেরই করতে দিন। আপনাদের ভোটের রাজনীতির গুটি ওঁদের বানাবেন না।
নিবন্ধকার বাংলাদেশি সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








