এবারের মহারাষ্ট্রের নির্বাচনের ফল বেরোবার পর আবার ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) কারচুপির কথা উঠে এসেছে। নির্বাচন কমিশনের ভোট শতাংশের হিসাব আর প্রকৃত ভোটদানের মধ্যে ১৩ লক্ষ ভোটের গরমিল পাওয়া যাচ্ছে। প্রায় সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং বহু ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষও ইভিএম কারচুপির অভিযোগ এনেছেন। এই আবহে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ইভিএমে ভোটদান বন্ধ করে পুরনো ব্যালট পেপারে ভোটের পক্ষে জনমত গঠন করার জন্যে ভারতব্যাপী পদযাত্রা করুন, এমন প্রস্তাবও করেছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে। এই নিয়ে মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে তুলকালাম চলছে।
এতদিন পর্যন্ত প্রধানত রাজনৈতিক দলগুলিই ইভিএম নিয়ে সন্দেহ, অভিযোগ ইত্যাদি করে এসেছে। এখন কিন্তু সাধারণ মানুষও স্পষ্টভাবেই এই অভিযোগ আনছেন যে ইভিএমে কারচুপি হয়েছে। মহারাষ্ট্রের সোলাপুর জেলায় মারকাদওয়াড়ি নামের একটি ছোট গ্রামের বাসিন্দারা অত্যন্ত জোরের সঙ্গে এই অভিযোগ করেছেন যে ইভিএমে তাঁদের প্রকৃত মতামত প্রতিফলিত হয়নি। তাঁরা এই অভিযোগ করেই ক্ষান্ত হননি, ২৩ নভেম্বরের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নিজেদের গ্রামে ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণ করার সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেন। দিন ঠিক হয় ৩ ডিসেম্বর। এর জন্যে তাঁরা পুরোদস্তুর নির্বাচনী প্রক্রিয়া চালু করে দেন। ব্যালট ছাপানো হয়, ব্যালট বাক্স তৈরি হয়, ভোটার তালিকা তৈরি করা হয়, বুথ তৈরি হয়। এরপরেই খেলা জমে ওঠে। এ খবর সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশিত হওয়া মাত্র প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। রাজ্য সরকার কড়া হুঁশিয়ারি দেয় – যদি গ্রামবাসীরা এভাবে ভোটগ্রহণ করেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। দৃশ্যতই সরকার প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যায় এবং দমনপীড়ন চালানোর হুমকি দেয়। এমনকি কারফিউ জারি হয় এবং গ্রামবাসীরা ভোটদানে বিরত থাকেন। এই ঘটনা মহারাষ্ট্রের এবং জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচুর আলোচিত হয়েছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এখন প্রশ্ন হল, ইভিএমের কথা উঠলেই তো বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশন চরম আত্মবিশ্বাসে বুক ঠুকে বারবার বলে এই ব্যবস্থার কোনো ত্রুটি নেই। তাহলে মহারাষ্ট্র সরকার এত ভয় পেয়ে গেল কেন? তাহলে কি এই পাল্টা ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া ‘দুধ কা দুধ, পানি কা পানি’ করে দিত সব বিতর্কের? তাহলে কি সত্যিই ইভিএম নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠে আসছে, সেগুলো সত্যি? বিষয়টা ভারতের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই কিছু কথা আলোচনা হওয়া উচিত।
১৯৯০-এর দশক থেকে ভারতে ধীরে ধীরে ইভিএমে ভোটগ্রহণ চালু হয়। নতুন সহস্রাব্দে সর্বত্র চালু হয়ে যায়। ২০০৪ সালে সারা ভারতে ইভিএমে ভোট নেওয়া শুরু হয়, ২০০৯ সাল থেকে দেশের সমস্ত বিধানসভা নির্বাচনে এবং লোকসভা নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার আরম্ভ হয়ে যায়। কিন্তু শুরুতেই এই ব্যবস্থা বিরাট প্রশ্নের সামনে পড়ে যায়। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ ওঠে যে তারা ইভিএমে জালিয়াতি করেছে। এই অভিযোগ আনেন তৎকালীন জনতা দলের সভাপতি সুব্রহ্মণ্যম স্বামী। তিনি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে ইভিএম ব্যবহার করে নির্বাচনে কারচুপি করা হচ্ছে। দিল্লি হাইকোর্টে সুব্রহ্মণ্যম স্বামী বনাম নির্বাচন কমিশন মামলা দাখিল হয় (১১৮৭৯/২০০৯), সেই মামলা চলে দীর্ঘদিন। অতঃপর যা হবার তাই হয়। ২০১২ সালে আদালত রায় দেয় – না, ইভিএমে কোনো গণ্ডগোল নেই। সব ঠিক আছে।
কিন্তু এর মধ্যে একটি ঘটনা ঘটে যায়। অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার হরিপ্রসাদ নামের এক অখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারকে ইভিএম মেশিন চুরির অভিযোগে হায়দরাবাদে গ্রেফতার করে ২০১০ সালের ২১ অগাস্ট। হরিপ্রসাদ কেন ইভিএম চুরি করেছিলেন? তাঁর কথা অনুযায়ী, তিনি মেশিন চুরি করেননি। দুজন ব্যক্তি তাঁকে ২৪ ঘন্টা রাখতে পারবেন এই শর্তে একটি আসল ইভিএম (যা নির্বাচনে ব্যবহৃত হয়) দিয়েছিল।
কে এই হরিপ্রসাদ? একজন সাধারণ ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার। বিরাট কোনো বিদ্যায়তনিক কেরিয়ার বা বড় চাকরি তাঁর ছিল না। বরং তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াও শেষ না করা একজন ছাত্র। কিন্তু প্রতিভা বলে যদি কিছু থাকে, তবে তা হরিপ্রসাদের আছে। তিনি নিজের একটি ইলেকট্রনিক্স কোম্পানি খুলেছিলেন অল্প বয়সে। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস যখন নিশ্চিত হার এড়িয়ে আশাতিরিক্ত ভাল ফল করে, তখন সমস্ত পার্টি ইভিএম নিয়ে সোচ্চার হয়। বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদবানি ইভিএম নিয়ে সরকারের থেকে শ্বেতপত্র দাবি করেন। আদবানির দাবিতে গলা মেলায় সিপিএম, তৃণমূল, এআইএডিএমকে, টিডিপি, আরজেডি প্রভৃতি দল। তেরোটি রাজনৈতিক দল চিঠি লিখে নির্বাচন কমিশনের কাছে সর্বদলীয় সভার দাবি জানায়। এই আবহে অন্ধ্রপ্রদেশের একটি অখ্যাত সংগঠন – জন চৈতন্য বেদিকা – ইভিএমের বিরুদ্ধে প্রচারে নামে। সেই সংগঠনের সভাপতি ছিলেন হরিপ্রসাদের জেলার লোক। তিনি হরিপ্রসাদের কাছে এ ব্যাপারে সাহায্য চান। তারপর একদিন সবাই মিলে অন্ধ্রপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। নাইডু তাঁদের এগিয়ে যাবার পরামর্শ দেন। হরিপ্রসাদ খুব দ্রুত একটি নকল ইভিএম মেশিন বানিয়ে তার উপর পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়ে দেখিয়ে দেন যে খুব সহজেই ওই মেশিনকে বাইরে থেকে প্রভাবিত করে ফলাফল বদলে দেওয়া সম্ভব। এই নিয়ে সেইসময় ব্যাপক হইচই হয়।
হরিপ্রসাদের পরীক্ষানিরীক্ষার ভিত্তিতে জন চৈতন্য বেদিকা সুপ্রিম কোর্টে ২০০৯ সালের ৯ জুলাই একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করে। ২৭ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট মামলা খারিজ করে দিয়ে আবেদনকারীদের নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার নির্দেশ দেয়। ইতিমধ্যে রাজনৈতিক স্তরে ওই নিয়ে বিপুল হইচই শুরু হয়ে গেছে, জন চৈতন্য বেদিকা পুরোদস্তুর সচেতনতা প্রচারে নেমে পড়েছে। দেশের প্রধান বিরোধী দল বিজেপিও ইভিএমের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। মুম্বাই, নাগপুর, মধ্যপ্রদেশ আর হায়দরাবাদে তারা বড় বড় সভা করছে, হরিপ্রসাদকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হরিপ্রসাদ ভরা সভায় দেখাচ্ছেন কীভাবে ইভিএমে জালিয়াতি সম্ভব।
নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে হরিপ্রসাদের মুখোমুখি টক্কর হয় ২০০৯ সালের ১৭ অগাস্ট। তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার কোনো কথা শুনতে চাইলেন না। হরিপ্রসাদকে বললেন কীভাবে মেশিনে জালিয়াতি করা যায় তা হাতে কলমে দেখাতে। হরিপ্রসাদ এরই অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতেই কমিশন পিছিয়ে যায়। তাঁকে বলা হয় অন্যদিন আসতে। সেই অন্যদিন আসার আগেই হরিপ্রসাদের বিরুদ্ধে পুলিসে অভিযোগ করা হয় ইলেকট্রনিক্স কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া লিমিটেডের (ইসিআইএল) মাধ্যমে। নির্বাচন কমিশনকে ইভিএম সরবরাহ করে দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা। একটি হল ভারত ইলেকট্রনিক্স, অন্যটি এই ইসিআইএল। এই ইসিআইএল হঠাৎ হরিপ্রসাদের দলবলের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করে। এভাবে বারংবার কমিশনের সঙ্গে হরিপ্রসাদের দ্বৈরথ পিছিয়ে যেতে থাকে। অবশেষে বিরোধীদের চাপে শেষ পর্যন্ত ৩ সেপ্টেম্বর হরিপ্রসাদকে কমিশনের অফিসে ডেকে একটি মেশিন দেওয়া হয় কীভাবে হ্যাক করা সম্ভব তা দেখানোর জন্যে। হরিপ্রসাদের দল কাজ শুরু করার ১৩ মিনিটের মাথায় তাঁদের বাধা দেওয়া হয় এবং বেরিয়ে যেতে বলা হয়। সম্ভবত হরিপ্রসাদের টিমের কাজ দেখেই কমিশন বুঝে ফেলেছিল যে এবার আসল সত্য ফাঁস হয়ে যাবে। পরে কমিশন জানায়, হরিপ্রসাদরা রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মধ্যে মেশিনের খুঁটিনাটি জেনে যাচ্ছিলেন, যা দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার পক্ষে ক্ষতিকর হতে পারত ইত্যাদি।
অতঃপর হরিপ্রসাদ একটি সরকারি ইভিএম হাতে পাবার জন্যে মরিয়া হয়ে ওঠেন। তাঁর সঙ্গে মুম্বাইয়ের এমন কিছু ব্যক্তির যোগাযোগ হয় (যাঁদের পরিচয় হরিপ্রসাদ দেননি) যাঁরা ২৪ ঘন্টার বেশি রাখা যাবে না – এই শর্তে একটি মেশিন দিতে রাজি হয়। ইতিমধ্যে হরিপ্রসাদের দলে যোগ দিয়েছিলেন নেদারল্যান্ডসের ইভিএমবিরোধী আন্দোলনের বিখ্যাত কর্মী রপ গংগ্রিজপ। তাঁর আন্দোলনের জেরেই নেদারল্যান্ডসের নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার বাতিল হয়েছিল। হরিপ্রসাদের দলে যোগ দিয়েছিলেন আরও একজন – আমেরিকার কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ এবং মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যালেক্স হ্যালডারম্যান। তিনিও আমেরিকার ইভিএমবিরোধী আন্দোলনের কর্মী। হরিপ্রসাদ যেদিন ২৪ ঘন্টার জন্যে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের কাছ থেকে মেশিনটি পান, সেদিন তাঁর পুরো দল মুম্বাইতে উপস্থিত ছিল। মেশিন পরীক্ষা করে তাঁরা জানিয়ে দেন, একাধিক উপায়ে এই মেশিনকে বাইরে থেকে প্রভাবিত করে ভোটের ফলাফল বদলে দেওয়া সম্ভব। তাঁরা একটি ভিডিওতে দুটি পদ্ধতি হাতে কলমে দেখিয়েও দেন। একটি পদ্ধতিতে তাঁরা ডিসপ্লে বদলে ঠিক একইরকম দেখতে একটি ডিসপ্লে লাগিয়ে দেন এবং সেটিকে ইবিআর (ইন্টিগ্রেটেড ব্লুটুথ রিসিভার)-এর সঙ্গে যুক্ত করেন। এরপর আসল ভোট যা-ই হোক না কেন, দূরনিয়ন্ত্রিত ব্লুটুথ ডিভাইস ব্যবহার করে ইচ্ছামত ফলাফল বদলানো হয় খুব সহজেই। অন্য পদ্ধতিটি হল আগে থেকেই মেশিনের মেমরিকে ‘ম্যানিপুলেট’ করে রাখা। হরিপ্রসাদ জানান মেশিনগুলির মেমরি সিস্টেম মোটেই হ্যাকিং প্রতিরোধক নয়। তা খুব সহজেই বদলানো যায়। হরিপ্রসাদের এই ভিডিও প্রকাশিত হবার কিছুদিন পরে মুম্বাই পুলিস হায়দরাবাদ থেকে হরিপ্রসাদকে সরকারি ইভিএম চুরির অভিযোগে গ্রেফতার করে। যদিও এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি জামিন পান। ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর রায়ে বলেন, ‘যদি হরিপ্রসাদ মেশিনটি হস্তগত করে থাকেন শুধুমাত্র এর দুর্বলতা উদ্ঘাটনের জন্যে, তবে তিনি কোনো অপরাধ করেননি। বরং গণতন্ত্রের জন্য তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।’ যাই হোক, এর পরেও পুলিস তাঁকে রেহাই দেয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে লাগাতার তাঁকে উত্যক্ত করা হয়েছে।
এতকিছুর পরেও ভারতে ইভিএম ব্যবস্থাই চলছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে। সেদিন ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেস আজ বিরোধী। সেদিনের বিরোধী বিজেপি আজ অনেকদিন হল ক্ষমতায়। কিন্তু ইভিএম ব্যবস্থার গায়ে টোকা পর্যন্ত লাগেনি। সেদিন ইভিএমের বিরুদ্ধে যারা সবচেয়ে সোচ্চার ছিল, হরিপ্রসাদকে দিয়ে একের পর এক জনসভা করিয়েছে, সেই বিজেপিই আজ বলছে ইভিএম সম্পূর্ণ সুরক্ষিত একটি ব্যবস্থা। শুধু তাই নয়, এই সরকারের আমলেই ২০১৯ সালে নির্বাচন কমিশনের হেফাজত থেকে প্রায় ২০ লক্ষ ইভিএম হারিয়ে যায়, যা নাকি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে সকলেই কমবেশি নিরুত্তাপ। কেন নিরুত্তাপ? সে এক রহস্য বটে। একটা লোকসভা নির্বাচনে বর্তমানে দশ লক্ষ বুথ থাকে। সেখানে এই ‘হারিয়ে যাওয়া’ ২০ লক্ষ ইভিএম দিয়ে যে কোনো সময়েই যে বড় ধরনের হেরফের করা সম্ভব তা সবাই বোঝেন। তা সত্ত্বেও আইন, আদালত, প্রতিনিধি সভা, বিরোধী রাজনৈতিক দল – কেউই এসপার ওসপার করতে রাজি নয়। কিছু চিৎকার চেঁচামেচি সবাই করে বটে, কিন্তু শেষপর্যন্ত বুঝে নেবার তাগিদ থেকে নয়। প্রত্যেকেই কি এটাই ভেবে নিয়েছে যে এই ব্যবস্থার সুফল সকলেই পাবে, আজ না হয় কাল?
সম্প্রতি একটি ভিডিও সোশাল মিডিয়া এক্সে যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। দ্য কুইন্ট এমন দুজন ইঞ্জিনিয়ারের সাক্ষাৎকার নিয়েছে যাঁরা ইসিআইএলে ইভিএম নিয়ে চুক্তিভিত্তিক কাজে যুক্ত ছিলেন। প্রথমত, তাঁরা জানিয়েছেন যে তাঁরা চুক্তিতে কাজ করেছেন এবং এমন বহু ইঞ্জিনিয়ারকে ইসিআইএল নিয়োগ করে থাকে। অথচ এর আগে ইসিআইএল জানিয়েছিল তারা এ ব্যাপারে চুক্তির ভিত্তিতে কাউকে নিয়োগ করে না, যেহেতু বিষয়টি দেশের গণতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ইঞ্জিনিয়াররা একথাও বলেছেন যে, তাঁদের বারবার এ ব্যাপারে মুখ খুলতে বারণ করে দেওয়া হয়েছিল। একইসঙ্গে পরিষ্কার বলেছেন যে, ইভিএমে কারচুপি করা সম্ভব এবং যে ব্যবস্থায় এই বিপুল সংখ্যক চুক্তিভিত্তিক লোক নিয়োগ করা হয়, সেখানে খুব সহজেই অন্তর্ঘাত চালানো সম্ভব।
আরো পড়ুন ইভিএমে তিনবার কারচুপি করার সুযোগ আছে: জহর সরকার
এখন প্রশ্ন হল, যখনই কোনো নির্বাচনে ইভিএম জালিয়াতির কথা ওঠে, কমিশন বলে তা প্রমাণ করে দেখাতে। কিন্তু সত্যিই কি এ জিনিস প্রমাণ করা সম্ভব? যেখানে কমিশন এবং তার ইভিএম সরবরাহকারী সংস্থাগুলি মেশিন সংক্রান্ত সব ব্যাপারে চরম গোপনীয়তা বজায় রাখে, মেশিনের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অংশ মাইক্রোচিপ – অর্থাৎ মেশিনের মস্তিষ্ক – এদেশে তৈরিই হয় না, সেখানে কার সঙ্গে কী ধরনের সমঝোতা হচ্ছে এবং তার মধ্যে দিয়ে কীভাবে একটি নির্বাচনের ফলাফল পরিবর্তিত হচ্ছে তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা সাধারণ মানুষের পক্ষে কি আদৌ সম্ভব? নয় বলেই ইভিএম নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষের সন্দেহ একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় খারিজ করে দেওয়া যায়?
কেউ কেউ বলার চেষ্টা করেছেন যে ইভিএমে কারচুপি সম্ভব আর ইভিএমে কারচুপি হয়েছে – দুয়ের মধ্যে আকাশপাতাল ফারাক রয়েছে। কারচুপি যে হয়েছে তার পাথুরে প্রমাণ দিতে না পারলে এইসব অভিযোগের কোনো মূল্য নেই। তাই কি? ইভিএমে যে জালিয়াতি সম্ভব – এই তথ্যই কি ইভিএম ব্যবস্থা বাতিল করার পক্ষে যথেষ্ট নয়? বিশেষ করে আজকের দিনে? কিছুদিন আগেই তো আমরা দেখেছি কীভাবে ইজরায়েল মোটোরোলা কোম্পানি থেকে কেনা পেজার হস্তগত করে তাতে বিস্ফোরক ভরে রেখেছিল লেবাননে মানুষ মারার জন্যে। যে বিশ্বে এই ঘটনা ঘটতে পারে সেখানে ইভিএম জালিয়াতি করে ফলাফল বদলে দেওয়া কি খুব কঠিন? বিশেষত যেখানে অগ্রসর দেশগুলির অধিকাংশেই ইভিএম ব্যবস্থা বাতিল করে কাগজের ব্যালট ব্যবস্থা চালু আছে, সেখানে আমাদেরও ভাবতে হবে, এইরকম সন্দেহজনক এবং দুর্বল একটি ব্যবস্থার উপর আমরা আর কতদিন দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ছেড়ে রাখব?
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








