হঠাৎ করে যদি দেখেন নিজের দেশে আপনার বাঁচা-মরা নির্ভর করছে অন্য দেশের মর্জির উপর – তাহলে আপনার যেরকম অসহায় অবস্থা হবে, সিরিয়াবাসীর অবস্থাও সেরকমই। কারণ প্রায় এক দশকব্যাপী গৃহযুদ্ধের পুরোটাই চালিত হয়েছে অন্য দেশগুলির অঙ্গুলিহেলনে।
পশ্চিমী দেশগুলির এবং সিরিয়ার অধিকাংশ জনগণের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন অবশ্য পূরণ হয়েছে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই। সে দেশের রাষ্ট্রপতি বাশার আল-আসাদের আড়াই দশকের এবং তাঁর বাবা হাফেজ আল-আসাদের আমল ধরলে আসাদদের ৫৪ বছরের একনায়কতন্ত্রের অবসান হয়েছে। দেশ ছেড়ে রাশিয়ায় পালিয়েছেন আসাদ। যাওয়ার আগে আম দেশবাসী তো দূরস্থান, নিজের সমর্থকদের জন্যও কোনো বার্তা দিয়ে যেতে পারেননি বা চাননি সিরিয়ার পলাতক রাষ্ট্রপতি।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
গোটা পশ্চিমি দুনিয়া সেই ২০১১ সাল থেকে যে শাসনের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করে চলেছে, সেই শাসনের সমাপ্তি যে এরকম হঠাৎ করে হয়ে যাবে, তা কেউ ভাবতে পারেননি। যাদের জন্য এতদিন আসাদ ক্ষমতায় টিকে ছিলেন, তারাই তাঁর পতনের কারণ হয়ে উঠল।
২০১০ সালে আরব ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলিতে আমেরিকার মদতপুষ্ট যে আরব বসন্তের ঢেউ উঠেছিল, তাতে তিউনিসিয়া থেকে শুরু করে মিশর, লিবিয়ার মত দেশগুলিতে সাধারণ জনগণের বিদ্রোহে একের পর এক স্বৈরাচারী শাসকদের পতন হয়। অনেকে ভেবেছিলেন, সেই ঢেউয়ে সিরিয়ার বাশার আল-আসাদও ভেসে যাবেন। কিন্তু তা হয়নি।
সেই নয়ের দশক থেকেই পশ্চিমি দুনিয়া আরব দেশগুলিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নাম করে নিজেদের আধিপত্যবাদ নতুন করে শুরু করেছিল। তখন সোভিয়েত রাশিয়ার পতন হয়েছে। সারা বিশ্বজুড়ে আমেরিকার দাদাগিরির সামনে কেউ দাঁড়াতে পারছে না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সমাজ সংস্কার, জঙ্গিবিরোধী লড়াই যে গৌণ, আসলে আরবের তেলের ভাণ্ডারই যে আমেরিকার লক্ষ্য ছিল, তা নিয়ে এখন আর কারোর সন্দেহ নেই। না হলে একনায়কতন্ত্রের ধ্বজাধারী, খোদ আমেরিকায় ৯/১১ হামলার নেপথ্যে থাকা, মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী সৌদি আরবের শাসকদের সঙ্গে কী করে সখ্যতা বজায় রাখেন পশ্চিমি শাসকরা? শুধুই অস্ত্র কেনার চুক্তি, ব্যবসা বাণিজ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং আরব অঞ্চলে একটি বন্ধু বজায় রাখার বিনিময়ে সেদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা বা সমাজ সংস্কার করার ব্যাপারে নীরব থাকেন পশ্চিমি শাসকরা।
আমেরিকার বন্ধু হতে না চাওয়া সিরিয়ায় শুধু জনগণের বিদ্রোহে আসাদকে সরানোর পথে বাধা অনেক ছিল। সে দেশের বিদ্রোহীদের সমীকরণ ছিল খুবই জটিল। একদিকে জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলের রণনীতি থেকে সরে এসেছিলেন বারাক ওবামা। সরাসরি মার্কিন স্বার্থে আঘাত না লাগলে কোনো দেশে সেনা না নামানোর নীতি নিয়ে চলছিলেন ওবামা। তাই ইরাক বা আফগানিস্তানের মত আমেরিকা সরাসরি আসাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামেনি। তবে অস্ত্রশস্ত্র সহ সমস্ত সাহায্য পৌঁছে দিয়েছে তারা। কিন্তু আসাদের বিরুদ্ধে এতগুলি গোষ্ঠী লড়াই করছিল, যে আমেরিকা ঠিক কাদের সাহায্য করবে তা নিয়েই ধন্দ তৈরি হয়েছিল।
কারণ একদিকে তুরস্ক ফ্রি সিরিয়ান আর্মি গোষ্ঠীকে সাহায্য করছিল। উত্তর সিরিয়ায় এই গোষ্ঠীকে সাহায্য করার কারণ যতটা না আসাদের বিরোধিতা করা, তার থেকেও বড় কারণ ছিল ওই অঞ্চলেই তুরস্ক সরকারের বিরোধী কুর্দদের খতম করা। অথচ কুর্দরাও তখন ফ্রি সিরিয়ান আর্মির মতই আসাদের বিরুদ্ধে লড়ছে। আবার কুর্দদের সাহায্য করছে আমেরিকা। সেই সময় ইসলামিক স্টেট বা আইসিসও ওই অঞ্চলে প্রবল শক্তিশালী। তারাও আসাদের বিরুদ্ধে লড়ছে আসাদবিরোধী গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে হাত মিলিয়ে। এর মাঝেই আল কায়দা ভেঙে জাভাত আল নুসরাও আসাদবিরোধী লড়াইয়ে সামিল। তাদেরও তুরস্ক সাহায্য করছে। অভিযোগ ছিল আসাদবিরোধী লড়াইয়ে আমেরিকা জাভাত আল নুসরাকেও সাহায্য করেছে। অর্থাৎ বকলমে আল কায়দার দলছুটদের সাহায্য করেছে। এর সঙ্গে সিরিয়ার নিজস্ব জাতিগোষ্ঠীর অনেক ছোট ছোট দলও অস্ত্র হাতে এই গৃহযুদ্ধে সামিল ছিল। আর নিজের বিরোধীদের শায়েস্তা করার পাশাপাশি আসাদ যে মুসলমান মৌলবাদী সংগঠন ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধেও লড়ছেন, তাও দেখাতে চেয়েছিল সিরিয়া।
জটিল যুদ্ধের পরিবেশকে আরও জটিল করে তোলে রাশিয়া। মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের উপস্থিতি তৈরি করতে ভ্লাদিমির পুতিন এসে দাঁড়ান আসাদের পাশে। আরও একটা ঠাণ্ডা যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয় সিরিয়াকে ঘিরে। একদিকে আমেরিকার মদতপুষ্ট আসাদবিরোধী গোষ্ঠীগুলি আর অন্যদিকে রাশিয়ার মদতপুষ্ট আসাদ বাহিনী। এর পাশাপাশি আরবের আঞ্চলিক রাজনীতি তো ছিলই। একদিকে ইরান ও ইরাক আসাদকে সমর্থন জুগিয়ে চলছিল, ইরানের মদতপুষ্ট হিজবুল্লা জঙ্গি গোষ্ঠীও আসাদের সঙ্গে ছিল। সুন্নি মুসলমান অধ্যুষিত সৌদি আরব অবশ্য তখন আসাদের বিরুদ্ধে।
এই পরিস্থিতিতে ওবামা আর জোর করে আসাদকে সরাতে চাননি। ডোনাল্ড ট্রাম্প তো নিজের দেশ নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। পরে জো বাইডেনও যতটুকু না করলেই নয়, ততটুকুই করে গেছেন আসাদবিরোধীদের অস্ত্রশস্ত্র জোগান দিয়ে। এই সুযোগে পুতিনের আশীর্বাদ নিয়ে আসাদও যা ইচ্ছে তাই করে গেছেন। রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছেন নিজের দেশের নাগরিকদের উপর। বিদ্রোহীদের জেলবন্দী করেছেন। বহু বিশিষ্ট সিরিয়াবাসী ও আসাদবিরোধী প্রবক্তা দেশছাড়া হয়েছেন। উদ্বাস্তু হয়েছেন সিরিয়ার লক্ষ লক্ষ মানুষ।
সিরিয়ার নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান রাইটস সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৩৩,০০০ বন্দি জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন বা ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আসাদের পতনের পরে। তারপরেও প্রায় ৮০,০০০ সিরিয়াবাসী এখনো নিখোঁজ বা আসাদের অত্যাচারে মৃত। গত ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধে প্রায় ৬, ২০,০০০ সিরিয়াবাসীর মৃত্যু হয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের উদ্বাস্তু কমিশনের হিসেব অনুযায়ী প্রায় ৬০ লক্ষ সিরিয়াবাসী দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন এই ১৪ বছরের যুদ্ধে। দেশটি তছনছ হয়ে গেছে।
অন্যদিকে আসাদ কয়েকশো কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে – নিষিদ্ধ ড্রাগ তৈরি ও সরবরাহ করে ফুলে ফেঁপে উঠেছেন আসাদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংকে জমা হয়েছে তাঁর টাকা। তবু বিশ্ব রাজনীতির জটিলতায় এবং অন্তর্বর্তী সরকার কাদের নিয়ে তৈরি হবে সেই নিয়ে অনিশ্চয়তায় আসাদকে সরানো যায়নি।
এই গৃহযুদ্ধে যখন আসাদকে সরানো যাচ্ছে না, তখন ২০২০ সালে তুরস্ক বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলির পক্ষ থেকে সিরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করে। আবার আরব লিগের সদস্যরাও আসাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী হন। লিগের নেতাদের মনে আশা ছিল, আসাদকে নিজেদের দলে টেনে আনা যাবে এবং সিরিয়ার অবস্থা স্বাভাবিক করা যাবে। সেই আশায় ২০২৩ সালে ১২ বছরের নির্বাসনের অবসান ঘটিয়ে সৌদি আরবের জেড্ডাতে আসাদকে আহ্বান করা হয় আরব লিগের বৈঠকে। সেখানে ভাষণও দেন তিনি। ঠিক হয় সিরিয়ায় আরও বেশি ত্রাণ সাহায্য পাঠানোর পথ করে দেবেন তিনি। সিরিয়ার উদ্বাস্তুদের ফিরিয়ে নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করবেন, নিষিদ্ধ ড্রাগ পাচার বন্ধ করবেন, রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব মেনে রাজনৈতিক সমাধানের পথে এগিয়ে যাবেন।
বছর ঘুরে গেলেও একটা প্রতিশ্রুতিও পালন করেননি আত্মবিশ্বাসী আসাদ। এবছরের মে মাসে বাহরিনে আরব লিগের বৈঠকে আসাদকে ডাকা হলেও তাঁকে মুখ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। প্রতিবেশী রাষ্ট্র জর্ডনও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল আসাদের থেকে। কারণ আবার নতুন করে সুসম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টার মাঝেই সেদেশে সিরিয়ার তৈরি নিষিদ্ধ ড্রাগ ধরা পড়ায় রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লা সিরিয়ার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতেও দ্বিধা করেননি। তবু আসাদকে আর সরানো যাবে না বলেই ধরে নিয়েছিলেন বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রনায়ক।
তবু আসাদকে হঠানোর ব্যাপারে আশা ছাড়েনি দেশের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি। হায়াত তহরির আল-শাম গোষ্ঠীটি দেশের উত্তরের সব বিদ্রোহী ও জঙ্গি গোষ্ঠীগুলিকে একটি বড় ছাতার তলায় নিয়ে আসে। তার আগে থেকেই উত্তর ও উত্তর-পূর্বের বড় শহরগুলি বিদ্রোহীদের দখলে ছিল। ২০১৯ সালে আসাদও বোমা বর্ষণ করে এবং সেনা দিয়ে বিদ্রোহীদের উত্তরের ইদলিব প্রদেশে কোণঠাসা করে দিয়েছিলেন। অন্য দিকে পূর্ব সিরিয়ার অনেকটা অংশ বিদ্রোহীদের দখলে ছিলই। সেখানে আইসিসও সক্রিয় ছিল। শুধু উত্তর নয়, আল-শামের নেতারা দক্ষিণ সিরিয়ার প্রায় ২৫টি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গেও সম্পর্ক স্থাপন করেন। সবাই মিলে ধীরে ধীরে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সিরিয়ার রাজধানী দামাস্কাসের দিকে এগোবেন বলে ঠিক হয়।
সে সুযোগ এসে যায় যখন একদিকে আসাদের তুতো ভাই রামি মাখলাফের সঙ্গে আসাদ ও তাঁর স্ত্রী আসমার টাকার ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে ঝগড়া শুরু হয়, অন্যদিকে রাশিয়া ইউক্রেনকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আর গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সঙ্গে সঙ্গে ইজরায়েলের আক্রমণে ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লা বিধস্ত হয় বা নিজেদের বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এক সপ্তাহের মধ্যে হামাহ, হোমসের মত আসাদের দখলে থাকা শহরগুলির দখল নিতে শুরু করে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি। দক্ষিণ থেকেও আক্রমণ শুরু হয়। বন্ধুদের থেকে এই আক্রমণ ঠেকানোর মালমশলা আর পাওয়া যাবে না বুঝে আসাদ কোনো প্রতিরোধ তৈরি না করেই চম্পট দেন রাশিয়ায়। এক সপ্তাহের মধ্যে বিনা রক্তপাতে দামাস্কাসের দখল নেয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি।
পুতিন সামরিক সাহায্য করতে পারেননি আসাদকে, কিন্তু বন্ধুকে নিজের দেশে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। হয়ত পুতিনের মনে লিবিয়ার শাসক মুয়াম্মার গদ্দাফির জনতার হাতে মৃত্যুর দৃশ্যটি গেঁথে গেছে। তিনি হয়ত চাননি আসাদেরও একই পরিণতি হোক। তাতে পুতিনেরই মুখ পুড়ত। মধ্যপ্রাচ্যে তাঁকে আর কে বিশ্বাস করত? অথচ পরিবর্তিত বিশ্ব রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার উপস্থিতি জরুরি।
এই প্রায় বিনা রক্তপাতে আসাদের বিদায়ের পরে কী হবে সিরিয়ায়? আজ থেকে ১২ বছর আগেও আসাদ-পরবর্তী সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় ছিল। এখনো পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। আপাতত ৪১ বছর বয়সী মহম্মদ আল-বাশিরের প্রধানমন্ত্রিত্বে অন্তর্বর্তী সরকার চলবে সিরিয়ায়। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ২০২৫ সালের ১ মার্চের মধ্যে নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেবে। ২০২৪ সালের শুরু থেকে বাশির সিরিয়ান স্যালভেশন গভমেন্টের রাজনৈতিক প্রধান হিসাবে উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ায় ইদলিব ও আলেপ্পো প্রদেশে কাজ করছিলেন। তাঁকে সমর্থন জুগিয়েছিল তহরির আল-শাম গোষ্ঠী।
এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বেই আসাদের শেষমেশ পতন হল। অথচ এই গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধেও ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপর বিদ্বেষ তৈরির অভিযোগ রয়েছে। আবার এই গোষ্ঠীটি এখনো আমেরিকা ও ব্রিটেনের জঙ্গি গোষ্ঠীর তালিকাভুক্ত। এখনো সরকারিভাবে সিরিয়ার উপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা জারি আছে। তার মেয়াদ আগামী ২০ ডিসেম্বর শেষ হবে। তারপর আমেরিকা কী করবে তার উপর নির্ভর করছে অন্য দেশগুলি কীভাবে সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করবে।
দেশত্যাগী বিশিষ্ট সিরিয়াবাসীদের অনেকেই একে একে দেশে ফিরে আসছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই চান দেশের সব গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে সরকার তৈরি হোক। সেই সরকার গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সবাইকে নিয়ে দেশ চালাক। কিন্তু সিরিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা করুণ, মূল্যবৃদ্ধি চরমে। যুদ্ধে যুদ্ধে বিধস্ত শহরগুলি। তুরস্ক ইতিমধ্যে সিরিয়ার উদ্বাস্তুদের টাকা দিয়ে ফেরানোর ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছে। সিরিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে খুশির আবহ তৈরি হলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় কাটেনি।
আরো পড়ুন রমজান মাসে ইফতার নয়, দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গাজা
ইতিমধ্যেই ইজরায়েল সিরিয়ার পশ্চিমের কয়েকটি এলাকায় নিজেদের আধিপত্য কায়েম করতে শুরু করেছে গায়ের জোরে। দামাস্কাসের কাছে বোমা বর্ষণও করেছে। হিজবুল্লার সামরিক কাঠামো খতম করার নামে আক্রমণ করেছে সিরিয়ার কয়েকটি অঞ্চলেও। যদিও সিরিয়ায় তেলের ভাণ্ডার সীমিত, যেটুকু রয়েছে তা দেশের পূর্বাঞ্চলে। সেখানে তেলের উৎপাদন এই ১২ বছরে কমে গেছে অনেকটাই। সেই তেলের খনিগুলির দখল কোন কোম্পানি নেবে বা আদৌ নেবে কিনা, তাও দেখতে হবে নতুন সরকারকে। এই পথ দিয়েই ইরান তেল রফতানি করে। এখানে নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চাইবে তারাও।
রাশিয়া চাইছে সিরিয়ায় তাদের যুদ্ধবিমান ও ঘাঁটিগুলি যেমন ছিল, যেন তেমনই থাকে। সে ব্যাপারে সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যোগাযোগও তৈরি করেছে তারা। এখন পর্যন্ত আসাদ রাশিয়ায় কোথায় আছেন তা জানা নেই বা আসাদের কোনো বক্তব্য রাশিয়া সম্প্রচার করেনি। আসাদকে আশ্রয় দেওয়া যেন নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো বিঘ্ন না ঘটায়, তা নিশ্চিত করতে চাইছেন পুতিন।
অন্যদিকে আমেরিকার বিদেশ সচিব অ্যান্থনি ব্লিংকেন মধ্যপ্রাচ্য সফরে বেরিয়ে পড়েছেন। সরেজমিনে পরিস্থিতি বুঝতে ইরাকে গিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের সহযোগী দেশগুলির সঙ্গে শলা পরামর্শ করছেন সিরিয়ার অবস্থা নিয়ে। জানুয়ারিতে ট্রাম্প দায়িত্ব নিলে বোঝা যাবে সিরিয়া নিয়ে আমেরিকা কী ভূমিকা নেয়। সৌদি আরব, জর্ডন, ইরান, তুরস্ক – সবাই এখন দেখতে চাইছে কী হয় সিরিয়ায়। হঠকারী কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না তারা।
আসাদ শাসনের অবসানের পর আজ থেকে প্রায় বছর আটেক আগে এক সিরিয়াবাসী ছাত্রের কথা এখনো কানে বাজছে। লন্ডনের কাফেতে বসে সে বলেছিল, ‘মাঝে মাঝে মনে হয়, কেন যে আসাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে গেল আমাদের দেশের লোকেরা! সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে ধরপাকড় হত ঠিকই। কিন্তু দেশে একটা আপাত স্বাভাবিক অবস্থা ছিল। বিদ্রোহ করতে গিয়ে পুরো দেশটাই ধ্বংস হয়ে গেল যুদ্ধে যুদ্ধে। এতগুলো দেশ শুধু নিজেদের স্বার্থ দেখল, সাধারণ সিরিয়াবাসীর কথা কেউ ভাবে না।’
সত্যিই তো। সাধারণ সিরিয়াবাসীকে নিয়ে কে চিন্তিত? এখনো সব দেশ নিজেদের স্বার্থই দেখবে। অথচ সিরিয়া পুনর্গঠনে অন্যান্য দেশগুলির দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে সেদেশের সাধারণ মানুষকে। আসাদের পতনেই তাই সব সমস্যার সমাধান হল না।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








