কে এই বিজেপি বা আনন্দবাজার? ২০২১ সালে কি তারা বলেছিল, যে বাংলাদেশের মেয়েরা সন্ধের পর বাইরে বেরোতে পারছে না? প্রশ্ন একজন বাংলাদেশি হিন্দুর
মধুসূদন পাল
আমি তখন একটা টিভি চ্যানেলে চাকরি করি। কলকাতায় আমাদের প্রতিনিধি ছিলেন মঈন ভাই (নাম পরিবর্তিত)। তিনি মাসে, দুমাসে একবার ঢাকায় আসতেন। মঈন ভাইয়ের সাথে জম্পেশ আড্ডা হত। একদিন চায়ের দোকানে কথায় কথায় সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ উঠল। মঈন ভাই অট্টহাস্য করে বলেছিলেন ‘দাদা, আমরা বলি হিন্দু-হিন্দু ভাই ভাই। এটা মিথ্যে। আসলে সংখ্যালঘু-সংখ্যালঘু হল ভাই ভাই। সংখ্যালঘুর বেদনা কখনো তার অন্য দেশের ধর্ম ভাই বুঝতেই পারবে না।’
বিদ্যুৎ চমকের মত প্রেমদাসা স্টেডিয়ামের কথা মনে পড়ে গেল। শ্রীলঙ্কার হীরক রাজার ওই অত্যাধুনিক স্টেডিয়ামের পিছনেই মুসলিম জনগোষ্ঠীর আবাস; জেনিভা ক্যাম্পের মতই। যেখানে হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই। বৌদ্ধদের আক্রমণের শিকার হয়ে তামিল হিন্দুরা ওই ক্যাম্পে মুসলিম ভাইয়ের ঝুপড়িতে আশ্রয় নেয়। আবার সেই মুসলিমকেই ‘গরুর মাংস বহন করছে’ সন্দেহে পিটিয়ে মারে ভারতের হিন্দু আর লাভ জেহাদ করার সন্দেহে বুলডোজার চলে সেই মুসলমানের বাড়িতেই। আবার ওই হিন্দুর ঘরের শেকল তুলে দিয়ে পুড়িয়ে মারে বাংলাদেশি হিন্দু।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সবই ভাই ভাই খেলা। সবই সিংহাসন আর সম্পত্তি দখলের বাণিজ্য।
স্রেফ এই কারণটুকুই যথেষ্ট আজকাল বাংলাদেশি হিন্দুদের নিয়ে বিজেপি, আনন্দবাজার গোষ্ঠী যে দরদ দেখাচ্ছে – তাকে প্রহসন বলে মনে করার জন্য। সেইসঙ্গে আওয়ামী লিগ হিন্দুদের জন্য যে অশ্রু বিসর্জন করছে, তা একজন হিন্দু হিসাবে আমার ক্ষতস্থানে মরিচ ডলার মত। জ্বালা করছে।
আমি বাংলাদেশি হিন্দু হিসাবে কখনো প্রত্যক্ষ নির্যাতনের শিকার হইনি, কখনো পেশাগত জীবনে বঞ্চিত হইনি। কখনো কখনো বরং ‘প্রিভিলেজ’ পেয়েছি। তা বলে কি বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন হয় না? বা হচ্ছে না? অবশ্যই হয়। এই দেশে সবচেয়ে ধারাবাহিকভাবে ও নিষ্ঠার সঙ্গে যে কাজটা হয়, সেটা হল হিন্দু নির্যাতন।
আমি সাতচল্লিশ বা একাত্তর দেখিনি। এমনকি বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে কী হয়েছিল, সেটাও আমাদের গ্রামে কখনো টের পাইনি। তবে একটা আতঙ্ক আত্মীয়স্বজনের ছিল, এটা মনে আছে। আমার মত বাংলাদেশি হিন্দুর কাছে সাম্প্রদায়িক অবদমন বলতে ছিল শুধু ‘বুলিইং’। ছোটবেলায় বন্ধুদের প্রিয় ছড়া ছিল ‘হিন্দু হিন্দু তুলসী পাতা; হিন্দুরা খায় গরুর মাথা।’ আর বড়বেলায় আমার খুব ধর্মনিরপেক্ষ বন্ধুকেও ইন্ডিয়া বোঝাতে বলতে শুনি ‘দাদাদের দেশ।’
এই ছোটবেলার বা বড়বেলার বন্ধু বুঝতেও পারে না, এই ছড়া বা কথাটা আমাকে কতটা আহত করে। আমি তো ‘দাদা’, মানে হিন্দু। তাহলে আমার দেশ কি ভারত? এই সংবেদনশীলতা আমার বন্ধুদের ছিল না। তা নিয়ে অবশ্য আমার অভিযোগ নেই। এই ছোট ছোট ব্যাপারগুলো সংখ্যাগুরুরা পৃথিবীর কোথাও বুঝতে পারে না।
আমি সুপরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক হামলা প্রথম দেখি ২০০১ সালে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সারা দেশে নৃশংস তাণ্ডব চালানো হয়েছিল। আমি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ছেলে। বুঝতেই পারেন, ধর্ষণ, হত্যা, লুঠ – তখন সবই দেখতে ও শুনতে হয়েছে। আমাদের পাড়ার হিন্দুদের বাজার করতে বের হওয়াও নিষেধ ছিল সেইসময়।
এরপর কিছুকাল নীরবে চললেও সরব অত্যাচার বন্ধ ছিল। শাহবাগ-হেফাজত কাণ্ডের পর রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় এবং স্থানীয় আওয়ামী নেতাদের চেষ্টায় এই কটা বছর ধারাবাহিকভাবে হিন্দু এলাকায় আক্রমণ, জমি দখল, উচ্ছেদ করার মত ঘটনা ঘটেছে। আজ যে ‘ফেসবুকে স্ট্যাটাস নিয়ে হিন্দু পাড়া উচ্ছেদ’ দেখছেন, এটা গত প্রায় এক দশক ধরে নিয়মিত হয়ে আসছে। রিপাবলিক টিভি বা বিজেপি তখন এসব জানত না। সুনামগঞ্জের ঝুমন দাস থেকে শুরু করে সাতক্ষীরা, সাভার, বাগেরহাট, খুলনা। একটা ফেসবুক স্ট্যাটাস এবং সেই ধারাবাহিকতায় উচ্ছেদ অভিযান – শত শত জায়গায় এইসব সুপরিকল্পিত আক্রমণ হয়েছে।
২০২১ সালটা ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে আতঙ্কের সময়। দেশের গণ্ডা গণ্ডা মন্দিরে সেবার আক্রমণ হল, হত্যাকাণ্ডও হল। তারপরও প্রশাসন বলল, হিন্দুদের নিজেদের ভলান্টিয়ার বাহিনী বানিয়ে মন্দির রক্ষা করতে হবে। কৃতজ্ঞতা জানাই আমার এলাকার সাংসদকে। তিনি একবিন্দু হিন্দুদের পাশে না দাঁড়ালেও স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য নিজের ছবিওয়ালা টি-শার্ট ছেপে দিয়েছিলেন। এইসব কাণ্ডের কোনোটারই বিচার হয়নি। প্রায়শই মানসিকভাবে অসুস্থ লোকেদের উপর দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রীরা বলেছেন, বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আর আমরা এলাকায় বসে দেখেছি কেমন করে ক্ষমতাসীন নেতারা এসব ঘটিয়ে জায়গা দখলের উৎসব চালিয়েছেন।
আমি সবসময় বলি, পৃথিবীতে সাম্প্রদায়িক নির্যাতন বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বলে কিছু নেই। সব জমি আর ক্ষমতা দখলের খেলা। আমার উপজেলার সবচেয়ে বেশি হিন্দু সম্পত্তি দখল হয়েছে আওয়ামী জমানায়। কে দখল করেছে? একজন মাত্র মানুষ। তখনকার উপজেলা চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লিগের সভাপতি। এটা সারা দেশেই ঘটেছে।
এবার বলেন, আমি এরপরও কেন এই বিজেপি, আরএসএস, আনন্দবাজার, আওয়ামী লিগ বা সনাতনী মহাজোট যখন নর্তন কুর্দন করে, সেটাকে প্রহসন বলব না? এই সনাতনী মহাজোট কেন নিজেদের হিন্দু না বলে সনাতনী বলে? ২০০১ সালে তারা কি একটাও বিবৃতি দিয়েছিল? ২০২১ সালে তারা কি একটাও মিছিল করেছিল? কে এই ইস্কন? আজ যারা তুলসী গাবার্ডের জোরে লম্ফঝম্প করছে। এরা কি বাংলাদেশের .১% হিন্দুরও প্রতিনিধিত্ব করে?
কে এই বিজেপি বা আনন্দবাজার? ২০২১ সালে কি তারা বলেছিল, যে বাংলাদেশের মেয়েরা সন্ধের পর বাইরে বেরোতে পারছে না? তখন ভারতের বিদেশমন্ত্রক কি একটাও বিবৃতি দিয়েছিল? দেয়নি। কারণ বিজেপির তখন পশ্চিমবাংলার নির্বাচনে জেতার জরুরত ছিল না। এই জরুরত এমন জিনিস যে মমতা ব্যানার্জির মত মানুষও বাংলাদেশে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের বাহিনী পাঠাতে চায়।
আর আমাদের আওয়ামী লিগ? তারা কী করেছে? তাদের নেতারা হিন্দু নির্যাতন নিয়ে ২০০৮ সাল থেকে ঠাট্টা করে চলেছেন। ২০২১ সালের কমিশনের রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। সেই নির্যাতনকারীদের আওয়ামী নেতারা পুনর্বাসন দিয়েছেন। এই আমাদের আওয়ামী লিগ। তাদের কাছে হিন্দু ছিল একটা গ্যারান্টিড ভোটব্যাংক আর এখন তুলসী গাবার্ডকে দেখানোর একটা কার্ড মাত্র।
আরো পড়ুন সিএএ নাগরিকত্ব দেওয়ার আইন নয়, নাগরিকত্বের মরীচিকা
তাহলে কি এই তদারকি সরকারের সময়ে হিন্দুরা খুব সুখে আছে? মোটেও না। আগের চেয়েও হিন্দুরা এখন খারাপ আছে। সত্যিই এখনকার মত দমবন্ধ করা পরিবেশে হিন্দুরা কখনো ছিল বলে মনে পড়ে না। সে দায় আমি কার উপর চাপাব? ডক্টর মহম্মদ ইউনুসকে হিন্দুর শত্রু, আওয়ামীর শত্রু এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ কে বানাল? ভাবেন।
আজ তো আগের দলেরই দেখানো পথে তারা পরিকল্পিতভাবে সম্পত্তি দখল করছে এবং ত্রাস সৃষ্টি করছে। আমার দলই তো এই পথ দেখিয়ে গেছে। সেই ফেসবুক স্ট্যাটাস, সেই নির্যাতন, সেই এলাকা দখল এবং সেই বিচ্ছিন্ন ঘটনার বিবৃতি।
শেষ কথা বলি ভাই। বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য কাউকে দরদ দেখাতে হবে না। রিপাবলিক টিভির হনুমান-নৃত্য দরকার নেই, বিজেপির ঘেরাওয়ের দরকার নেই, এবং অবশ্যই আওয়ামী লিগের কান্নাকাটির দরকার নেই। যখন দরকার ছিল তখন আপনারা আরও কাঁদিয়েছেন আমাদের। এখন দয়া করে আমাদের একা ছাড়েন। মরতে হলে নিজেদের বুদ্ধিতে মরব, বাঁচতে হলে নিজেরাই বাঁচতে পারব। আমাদের বেচা-বিক্রি আর কইরেন না।
মাঝে মাঝে মনে হয়, আপনারা ঢাকা শহরের ভিক্ষুক সিন্ডিকেটের সেইসব দালাল, যারা নিজেরাই মানুষ পিটিয়ে প্রতিবন্ধী বানিয়ে, শরীরে ঘা তৈরি করে পথে বসিয়ে দেয় এবং কেঁদে বলে, দুটো পয়সা দিয়ে যান বাবা। দয়া করে আমাদের ঘা নিয়ে ব্যবসা বন্ধ করেন। ওতে আমাদের জীবন আরও অনিশ্চিত হচ্ছে। আমাদের রেহাই দেন।
আমি বলি কী, আপাতত ছটা মাস আপনারা এসব নেত্য বন্ধ করে নিজেদের প্রশ্ন করেন। প্রশ্ন করেন, কেন আপনারা হেফাজত ও হিজবুতের এই ক্ষমতায়ন ঘটালেন, কেন ছাত্র লীগের সজ্ঞানে ও ছায়ায় শিবির এরকম শক্তিশালী হয়ে উঠল, কেন সৈয়দ আশরাফের উত্তরসুরি হিসাবে একজন ভাঁড়কে বেছে নেওয়া হল, কেন যাবতীয় লুটেরার আশ্রয় হয়ে উঠলেন জয় ও রেহানা, কেন শেখ হাসিনা নির্বিচারে মানুষ মেরে টিকে থাকতে চাইলেন এবং কেন মুক্তিযুদ্ধ ও হিন্দুরা কেবল ব্যবসার অস্ত্র হয়ে উঠল। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজুন, অনেককিছু বুঝতে পারবেন। তা বাদ দিয়ে এই হিন্দু-ব্যবসা করবেন না, ভাই।
হয়ত আমি বাঁচব না, অমুক বাঁচবে না, তমুক বাঁচবে না। কিন্তু এই দরদ দেখানো বন্ধ করলে হিন্দুরা অন্তত টিকে থাকবে। সাতচল্লিশে-একাত্তরে-একুশে যখন বিলুপ্ত হয় নাই, এবারও হবে না।
ধন্যবাদান্তে…
লেখক বাংলাদেশি সাংবাদিক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








